ঢাকা     মঙ্গলবার   ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২ ||  আশ্বিন ১২ ১৪২৯ ||  ২৯ সফর ১৪৪৪

সুন্দরবনে যেখানে বাঘ দেখেছিলাম সেখানেই হলো মোড়ক উন্মোচন 

কেএমএ হাসনাত || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৩:২১, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২২   আপডেট: ১৪:৫০, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২২
সুন্দরবনে যেখানে বাঘ দেখেছিলাম সেখানেই হলো মোড়ক উন্মোচন 

অনন্য এক অনুভূতি নিয়ে সুন্দরবন থেকে ফিরে এলাম। অনন্য অনুভূতি বলছি এ কারণে যে, এমন আর কখনো হয়েছে বলে আমার জানা নেই। সেই অনুভূতি পাঠকের সঙ্গে শেয়ার করার  জন্যই এ লেখা।

যে কোনো বইয়ের মোড়ক উন্মোচন বা প্রকাশনার জন্য আলাদা করে অনুষ্ঠান করা হয়। সেগুলো সাধারণত শহরে বেশ ঘটা করেই অনুষ্ঠানটি করা হয়। সুন্দরবনের দুর্গম কোনো জায়গায় বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠান হয়েছে বলে আমার জানা নেই। সেদিক থেকে বলতে গেলে এ এক বিরল ঘটনা। অবশ্য এর একদিন আগেই বইটি বাজারে এসেছে। বলছিলাম ফরিদী নুমানের ‘সুন্দরবনে বাঘের মুখোমুখি’ বইটির কথা। 

সুন্দরবন নিয়ে অনেক লেখালেখি আছে। ২০১৭ সালে ফরিদী নুমানের ‘আমাদের সুন্দরবন’ নামে আরো একটি বই প্রকাশিত হয়েছে। ‘সুন্দরবনে বাঘের মুখোমুখি’ বইটি তার বাঘের ছবি তোলার অভিজ্ঞতাকে ভিত্তি করে লেখা। বইটি প্রকাশ করেছে মাতৃভাষা প্রকাশ। বইটির প্রচ্ছদ এঁকেছেন লেখক নিজেই। মুখবন্ধ লিখেছেন খসরু চৌধুরী। যাদের সুন্দরবন নিয়ে আগ্রহ রয়েছে তাদের জ্ঞানভাণ্ডার আরো সমৃদ্ধ করবে এই বই।

এবারের সুন্দরবন ট্রিপ নিয়ে একটু বলতে চাই। দিনটি ছিল ৩১ আগস্ট। সুন্দরবন টানা তিনমাস বন্ধ ছিল। এ সময় বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর প্রজননের সময়। এ ছাড়া সুন্দরবনের জীববৈচিত্র সংরক্ষণে বন বিভাগ প্রতিবছর তিন মাসের জন্য বনে প্রবেশ নিষিদ্ধ করে। এ সময় কেউ সুন্দরবনে ঢুকতে পারে না। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর প্রথম দিনই অর্থাৎ ১ সেপ্টেম্বর সুন্দরবনে ঢুকবো এটা মাথায় রেখে আমরা কয়েকজন ফটোগ্রাফার ৩১ আগস্ট রাতে মোংলায় পৌঁছাই। আমরা চারজন তিমু হোসেনের গাড়িতে আর বাকিরা বাসে মোংলা পৌঁছাই। সেখানে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল ‘আলোর কোল’ নামে ছোট একটি জাহাজ। এর আগে সুন্দরবনে ঢোকার প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা সম্পন্ন করা হয়। মোংলা থেকে দেশী নৌকা করে আমরা জাহাজে উঠি। সেখান থেকে সামান্য দূরে যাওয়ার পর বন বিভাগ থেকে দেওয়া নিরাপত্তাকর্মীকে তুলে আমরা সুন্দরবনের দিকে রওয়ানা দেই।

সারারাত টানা চলার পর জাহাজ একটি জায়গায় নোঙ্গর করে। সেখানে ট্যুর প্ল্যান চূড়ান্ত করা হয়। সে অনুযায়ী সারাদিন দেশী নৌকায় বিভিন্ন খালে ঘুরে সূর্য ডোবার সময় একটা জায়গায় আমাদের নৌকা থেমে যায়। জায়গাটি চেনা চেনা লাগছিল। আমাদের টিম প্রধান এবং পেশাদার ফটোগ্রাফার ইমদাদুল ইসলাম বিটু ভাইকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, সারপ্রাইজ আছে। অপেক্ষা করেন।

যে জায়গায় নৌকা ভেড়ানো হয় সেটা দেখিয়ে বিটু ভাই বললেন, দেখেন তো জায়গাটা চেনা লাগছে কিনা? কিছুক্ষণ দেখার পর জায়গাটা চিনতে পারলাম। এটা সেই ঐতিহাসিক জায়গা যেখানে সুন্দরবনের অন্যতম আকর্ষণ বেঙ্গল টাইগারের দেখা মিলেছিল!

কথা চলছিল, সে ট্রিপে যারা ছিলেন না তারা বিভিন্নভাবে আমাদের অভিজ্ঞতা জানার চেষ্টা করেন। ফরিদী ভাই ও বিটু ভাই আমাদের সে অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিচ্ছিলেন। আমাদের ওই টিমের মধ্যে ফরিদী ভাই, বিটু ভাই, ফরিদপুরের ডা. সাইফুল ইসলাম এবং আমি ছিলাম। সে ট্যুরের অন্যতম উদ্যোক্তা আদনান হোসেন সম্রাট বিদেশে অবস্থান করার কারণে যোগ দিতে পারেননি। এ ছাড়া আদনান আসিফ অন্য একটা ট্যুরে ছিলেন বলে যোগ দিতে পারেননি। মুগনিউর রহমান মনি পারিবারিক কাজে আটকা পড়েছেন বলে যেতে পারেননি। এ ছাড়া এবার আমাদের সঙ্গে যারা ছিলেন তারা হচ্ছেন ক্যাপ্টেন কাওসার মোস্তফা, খুলনার ডা. উজ্জল কুন্ডু, তিমু হোসেন, মিজানুর রহমান এবং সাদ মনি। কিছুক্ষণ স্মৃতিচারণ করার পর শুরু হয় মূল্য অধ্যায়।

ফরিদী ভাই ব্যাগ থেকে তার লেখা ‘সুন্দরবনে বাঘের মুখোমুখি’র কয়েকটি কপি বের করে সবার হাতে তুলে দেন। সবাই বইটি যার যার বুকের কাছে তুলে ধরেন, সঙ্গে সঙ্গে জ্বলে ওঠে ক্যামেরার লাইট। বই প্রকাশনার আনন্দ উপচে পড়ে সেই আলোয়। নৌকায় খাবারের ব্যবস্থা ছিল না। জাহাজের ক্যাপ্টেন কাওসার ভাই ব্যাগ থেকে খুরমা আর ডা. উজ্জল কুন্ডু চকলেট বের করে সবার হাতে তুলে দিয়ে মিষ্টি মুখ করালেন। এভাবে বইটির মোড়ক উন্মোচন হলো। 

বাঘের দর্শন পাওয়ার অভিজ্ঞতা উল্লেখ না করলেই নয়। সুন্দরবনের বেঙ্গল টাইগারের ছবি তোলার সৌভাগ্য খুব কম ফটোগ্রাফারেরই আছে। হ্যাঁ, এটা সত্যি ভাগ্যের বিষয়। অনেকেই শতবার গিয়েও বাঘের ছবি তুলতে পারেনি। এটা যেমন সত্যি, একইভাবে প্রথমবার গিয়েই বাঘ দেখেছেন- এটাও সত্যি। আমাদের বাঘ দেখা এবং ছবি তোলার অভিজ্ঞতার কিছুটা প্রসঙ্গক্রমেই পুনরাবৃত্তি করছি। সেদিন ছিল ৩১ মার্চ, স্বাধীনতার মাসের শেষ দিন। এর আগে সুন্দরবনে আমাদের যাত্রা শুরু হয় ২৮ মার্চ। এবারই শুধু নয়, আমাদের অনেকেই বহুবার সুন্দরবন ভ্রমণে গেছেন। উদ্দেশ্য একটাই বিশ্বখ্যাত বেঙ্গল টাইগারের দেখা পাওয়া বা ছবি তোলা। যারা ওয়াইল্ড লাইফ ফটোগ্রাফি করেন তারা সুন্দরবনের বাঘের ছবি তোলার স্বপ্নটাকে মাথায় রেখেই ঝুঁকিপূর্ণ এই নেশায় আত্মনিয়োগ করেন। অন্তত আমার অনুভূতি তাই বলে।

সে যাই হোক, ২৯ মার্চ ভোরে আমাদের বহনকারী  জাহাজ এমভি গাঙচিল সুন্দরবনের উদ্দেশ্যে মোংলা ছাড়ে। দীর্ঘপথ চলার পর সরকারি রাজস্ব পরিশোধ এবং জাহাজে নিরাপত্তার জন্য একজন বনরক্ষী সঙ্গে নেওয়ার বিধান রয়েছে। সেটা সম্পন্ন করতে কিছুটা সময় লেগে যায়। এরপর আমাদের যাত্রা শুরু হয়। রাতের অন্ধকার নেমে এলেই আমরা জাহাজে ফিরে আসতাম। এ ছাড়া পুরো সময় কখনো জাহাজে আবার কখনো দেশী নৌকায় সুন্দরবনের এক নদী থেকে আরেক নদী, এ খাল থেকে আরেক খালে ছুটে বেড়িয়েছি।

সমমনা না হলে এ ধরনের ট্রিপ সফল করা খুব কঠিন। বিশেষ করে গাইডের নির্দেশনা মেনে না চললে যে কোনো সময় সমস্যা দেখা দিতে পারে। আমাদের ৯ সদস্যের টিমটাও সেভাবেই নির্বাচন করা হয়েছিল। এর মধ্যে ওয়াইল্ড লাইফ ফটোগ্রাফার ফরিদী নোমান, ইমদাদুল ইসলাম বিটু, আদনান আজাদ আসিফ, আদনান হোসেন সম্রাট, সাইফুল ইমলাম, আরটিভি’র শেরপুর প্রতিনিধি মুগনিউর রহমান মনি ছিলেন। এ ছাড়াও হাবিগঞ্জের চুনারুঘাটের বন্ধু মোমেনুল ইসলাম এবং ফরহাদ চৌধুরী আমাদের টিমের সদস্য ছিলেন। ওই ট্রিপেই আমরা নিজ চোখে বাঘ দেখেছিলাম এবং ছবি তুলে দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ করেছিলাম। সেই অনুভূতি বই লিখে প্রকাশ করলেন ফরিদী নুমান।  
 

হাসনাত/তারা

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়