ঢাকা     মঙ্গলবার   ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২ ||  আশ্বিন ১২ ১৪২৯ ||  ০১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

সুলতানের নড়াইলে

ফয়সাল আহমেদ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৬:০৬, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২২   আপডেট: ১৫:১২, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২২
সুলতানের নড়াইলে

বিশ্ববরেণ্য চিত্রশিল্পী এস এম সুলতান শিল্পবোদ্ধাদের কাছে তাঁর বিস্ময়কর শিল্পকর্মের জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন, বাস্তবেও তাঁর গোটা জীবন ছিল এক বিস্ময়! পরিব্রাজকের মতো দুনিয়া ঘুরে এসে শেষ জীবনে শিল্প সাধনার জন্য সুলতান বেছে নেন নড়াইল সদরে অবস্থিত নিজ গ্রাম মাছিমদিয়া। জীবিত অবস্থাতেই নড়াইল ও সুলতান নাগরিক মধ্যবিত্তের কাছে আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন। এজন্য অবশ্য আহমদ ছফার ‘বাঙলার চিত্র ঐতিহ্য: সুলতানের সাধনা’র মতো দীর্ঘ গবেষণালব্ধ প্রবন্ধ শিক্ষিত মধ্যবিত্তকে সুলতানের মতো জাত শিল্পীকে চিনিয়েছে। প্রখ্যাত চিত্রপরিচালক তারেক মাসুদের ‘আদম সুরত’ও সুলতানকে জানা-বোঝার জন্য চমৎকার একটি তথ্যচিত্র। সুলতানের প্রতি মধ্যবিত্তের ব্যাপক আগ্রহ দেখা যায় হাসনাত আব্দুল হাইয়ের ‘সুলতান’ উপন্যাসের কাটতি দেখেও। 

ব্যক্তিগতভাবে আমি বহুবার নড়াইল যেতে চেয়েছি, বলাবাহুল্য সুলতানের কারণেই। পরবর্তীতে নড়াইলের প্রতি আরো আকর্ষণ তৈরি হয়েছে যখন জেনেছি এখানেই জন্মেছেন এবং গানের সাধনা করেছেন বিচ্ছেদী গানের অমর শিল্পী কবিয়াল বিজয় সরকার। বিশ্ববিখ্যাত নৃত্যশিল্পী উদয় শঙ্কর এবং সেতার বাদক রবিশঙ্কর নড়াইলের সন্তান জেনে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলাম কবে যাবো নড়াইল এবং তার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের স্মৃতিবিজড়িত স্থানে। 

নড়াইল ভ্রমণে এসে জানতে পারি আরো কয়েকজন বিখ্যাত ব্যক্তি সম্পর্কে। এর মধ্যে রহস্য-রোমাঞ্চ উপন্যাসের জনপ্রিয় লেখক নীহাররঞ্জন গুপ্ত এবং ১৯৭১ এর সালে শহীদ বীরশ্রেষ্ঠ নুর মোহাম্মদ শেখ নড়াইলের সন্তান। চিত্রা নদীর তীরের শহরটি যে সত্যি খুব সুন্দর তা ছবি দেখেই অনুমান করা যায়। দীর্ঘ অপেক্ষার পর অবশেষে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ উপস্থিত হলো। আমরা নড়াইল যাত্রা করি এইতো সেদিন, ২০২২ সালের ৩ সেপ্টেম্বর।   

অরুনিমা কান্ট্রিসাইড রিসোর্ট

সকাল ৭টায় আরামবাগ থেকে সোহাগ পরিবহনের নন-এসি গাড়িতে চড়ে যাত্রা শুরু। বন্ধু সুজন গুলিস্তান ঘুরে আবার আরামবাগ আসে নড়াইলের বাসের সন্ধানে। গুলিস্তান থেকে সরাসরি বিআরটিসিসহ কয়েকটি বাস নড়াইল যায়। তথ্য নিয়ে খানিকটা বিভ্রান্তি তৈরি হয় আমাদের। অবশেষে খুলনাগামী ‘সোহাগ’-এ সমাধান হলো। সকাল ৭:১০ মিনিটে যাত্রা শুরু হয় আমাদের। প্রথমবারের মতো পদ্মাসেতু পাড়ি দেবো তাই একটু বাড়তি উত্তেজনা ছিল আমাদের মধ্যে। ভোর সকাল হওয়ায় খুব দ্রুত মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে পাড়ি দিয়ে আমরা উপস্থিত হই স্বপ্নের পদ্মাসেতুতে। বাসটি খুব দ্রুত অতিক্রম করে যায় বহুল আলোচিত এবং বিশাল কর্মযজ্ঞের মধ্য দিয়ে তৈরি হওয়া সেতু। মাসচারেক পূর্বে স্পিডবোটে পদ্মা পাড়ি দিয়ে গোপালগঞ্জ গিয়েছিলাম। মাওয়া থেকে কেওড়াকান্দি। আবার ফিরতি পথে কেওড়াকান্দি থেকে মাওয়া লঞ্চযোগে পাড়ি দিয়েছিলাম। 

চলতি পথে সেতুর দুটি বাঁক চোখে পড়ে। আমরা পদ্মাসেতুর উপর দিয়ে দক্ষিণে ছুটে চলেছি। দূরে নদীর বাঁক ঘুরে বেশ কিছু ছাউনি দেওয়া বাজারের মতো কেওড়াকান্দির দিকে দৃষ্টি যায়। ভাবছি, এপার-ওপারের কত ব্যস্ততা ছিল, কতো হৈ চৈ, বিভিন্ন যানবাহনের শ্রমিক, যাত্রী, স্পিডবোট, লঞ্চ, বহুসংখ্যক  ছোট ছোট রেস্টুরেন্ট, অসংখ্যা বিচিত্র পসরা সাজিয়ে বসা হকার, ক্রেতা-বিক্রেতা, ঠগ-প্রতারক, বিচিত্র পেশা আর বিচিত্র গল্পের মানুষগুলো এখন কোথায় হারিয়ে গেলো? নিশ্চয় অনেকে পেশা বদল করে অন্য কোনো পেশায় যুক্ত হয়েছেন। অথবা নতুন কোনো পথের সন্ধান হয়তো করছেন কেউ কেউ। জীবন তো আর থেমে থাকে না। জীবন আর নদীর প্রবাহমানতা নিত্যনতুন পথ করে সামনের দিকেই এগিয়ে যায়। 

আমরা পদ্মা পাড়ি দিয়ে এবার ‘ভাঙ্গা’ এক্সপ্রেসওয়ে ধরে ছুটেছি। পদ্মাসেতুর মধ্য দিয়ে যেন গতির রাজ্যে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশ। এক তেলেসমাতি কারবার শুরু হয়েছে দক্ষিণবঙ্গের সাথে ঢাকা এবং অন্যান্য অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায়। বরিশাল ও যশোরের ফ্লাইট বর্তমানে অর্ধেকে নামিয়ে আনা হয়েছে। ঢাকা থেকে এখন বরিশালে ৪ ঘণ্টায় যাওয়া যাচ্ছে। খুলনাও পৌঁছে যাওয়া যাচ্ছে ৪ ঘণ্টার আশেপাশে সময়ে। যশোর সাড়ে ৩ ঘণ্টা থেকে ৪ ঘণ্টায় যাওয়া যাচ্ছে। বিস্ময়করভাবে মাত্র সাড়ে ৩ ঘণ্টায় নড়াইলে সুলতানের বসতভিটায় পৌঁছে, গতির কথা ভাবতে গিয়ে আমাদেরও এক অন্যরকম বিস্ময়ানুভূতি সৃষ্টি হয়! 

বাসটি আমাদের মাত্র আড়াই ঘণ্টায় ভাটিপাড়া মোড়ে পৌঁছে দেয়। ভাটিপাড়া থেকে অটোযোগে কালনা ফেরী ঘাট মাত্র ৫ কি.মি পথ। কিছুদিনের মধ্যে মধুমতি নদীর উপর বাংলাদেশের প্রথম ৬ লেন বিশিষ্ট কালনা সেতু উদ্বোধন হতে যাচ্ছে। তখন এই ফেরিও আর থাকবে না। এখানকার জীবনচিত্রও পাল্টে যাবে। আমরা খেয়া নৌকায় মধুমতি পাড়ি দিয়ে ওপার থেকে আরেকটি অটোতে চড়ে যাশোর রোড ধরে ২০কি.মি. দূরের নড়াইল শহরের কাছে চিত্রানদীর তীরে সুলতানের বসতবাড়ি মাছিমদিয়া পৌঁছে যাই। যেতে যেতে অটোওয়ালাকে জিজ্ঞেস করি এই অঞ্চলের সংসদ সদস্য তো ‘নড়াইল এক্সপ্রেস’খ্যাত এক সময়ের বাংলাদেশের ক্রিকেট দলের ক্যাপ্টেন মাশরাফি। তিনি কী এলাকায় কাজ করছেন? 

উদয় শঙ্করের পারিবারিক বাসস্থানের স্মৃতিচিহ্ন

অটোওয়ালর জবাব, মানুষ তো ভালো। কাজও করতে আন্তরিক কিন্তু একজন-দুইজন ভালো থাকলে কী আর কাজ হয়? পথিমধ্যে দেখতে পাই বিপুলসংখ্যক গাছ কেটে ইতোমধ্যে চিরে ফেলে সারিবদ্ধ করে রাখা হয়েছে। রাস্তা বড়ো করা হবে তাই এই মহাযজ্ঞ। এটি সেই বিখ্যাত যশোর রোড। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের শরণার্থীদের সবচেয়ে বড়ো সারি এই রোড ধরে দীর্ঘ এবং চরম কষ্টের মধ্য দিয়ে পায়ে হেঁটে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন স্থানে এবং কলকাতায় প্রবেশ করেছিল। পথিমধ্যে ঘটেছে কতো শত বিপর্যয়। সেই সময়ে প্রখ্যাত মার্কিন কবি এ্যালেন গিন্সবার্গ লিখেছিলেন: ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ নামক বিখ্যাত কবিতা। কবিতাটি পরে গানে রূপান্তরিত হয়। কবিতার প্রথম কয়েকটি লাইনে সেই সময়ে বাংলাদেশের চিত্র উঠে আসে এভাবে:
“শত শত চোখ আকাশটা দেখে, শত শত শত মানুষের দল,
যশোর রোডের দুধারে বসত বাঁশের ছাউনি কাদামাটি জল।
কাদামাটি মাখা মানুষের দল, গাদাগাদি করে আকাশটা দেখে,
আকাশে বসত মরা ঈশ্বর, নালিশ জানাবে ওরা বল কাকে।
ঘরহীন ওরা ঘুম নেই চোখে, যুদ্ধে ছিন্ন ঘর বাড়ি দেশ,
মাথার ভিতরে বোমারু বিমান, এই কালোরাত কবে হবে শেষ।
শত শত মুখ হায়, একাত্তর যশোর রোড যে কত কথা বলে,
এত মরা মুখ আধমরা পায়ে পূর্ব বাংলা কলকাতা চলে।”
(অনুবাদ: খান মোহাম্মদ ফারাবী)

এমন একটি ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ সড়কের সেই সময়কার সাক্ষী বৃক্ষগুলোকে নিধন না করে বিকল্প চিন্তা করা যেতো না? যেনো কিছুই করার নেই আমাদের! গতির চকচকে তলোয়ারে কাটা পড়ছে সকল ইতিহাস ও ঐতিহ্য! কালনা সেতু উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে নড়াইল, যশোর এবং বেনাপল স্থলবন্দর ঢাকার আরো কাছে চলে আসবে। যানবাহনের গতি আরো তীব্র করার জন্য রাস্তা চার লেনে উন্নীত করার কাজ শুরু হয়েছে ইতোমধ্যে। তাই এই বৃক্ষনিধন। বিস্ময়করভাবে বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটানো হচ্ছে। মানুষ এখন রকেট গতিতে ছুটতে থাকবে একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। গতি বাড়বে ঠিকই কিন্তু মানুষের অবকাশ আর থাকবে না। মানুষ ছুটন্ত যন্ত্রের ঘোড়া হয়ে দাপিয়ে বেড়াবে গোটা বাংলাদেশ। এই অস্থির ছোটাছুটির মধ্যে, প্রকৃতিহীন, ভালোবাসাহীন, ইতিহাস-ঐতিহ্যহীন, অবকাশহীন এই জীবনে কী কালোত্তীর্ণ কোনো গল্প সৃষ্টি হতে পারে? ভালো কোনো নাটক কিংবা গান? ছুটতে ছুটতে মাঝে মাঝে থেমে, এই প্রশ্নের উত্তরওতো আমাদের খোঁজা দরকার?

অটোওয়ালা পূর্বে কখনো সুলতানের বাড়িতে আসেননি। তাই আমরা এস এম সুলতান সেতু অতিক্রম করার আগে ও পরে স্থানীয়দের জিজ্ঞেস করে করে অনায়াসেই চলে আসি ‘লাল মিয়া’র স্মৃতিবিজড়িত মাছিমদিয়া গ্রামে। গ্রামে শিশু-কিশোরের দল বিপুল উৎসাহে একেবারে বাড়ির গেট পর্যন্ত আমাদের দেখিয়ে দিয়ে বলে, এইতো সুলতান সাহেবের বাড়ি। যাওয়ার পথে প্রথমেই চোখে পড়বে সুলতানের বিখ্যাত সেই বজরা। আরেকটু সামনে এগিয়ে গেলে পড়বে বাড়ির মূল গেট। যেটি এখন এস এম সুলতান স্মৃতি সংগ্রহশালা।

১০ টাকা দিয়ে টিকেট কেটে আমরা সুলতানের বাড়ির আঙ্গিনায় প্রবেশ করি। ডানদিকের দোতলা ভবনে সংরক্ষিত কিছু চিত্রকর্ম দেখা শেষে ফিরে এসে দেখি গেটের সামনে কালিয়া থেকে মোটরবাইক নিয়ে আমাদের বন্ধু ইনু ভাই হাজির। বয়সে খানিকটা বড়ো হওয়ায় ভাই’ই বলি আমরা। আগের রাতেই নড়াইলের মানুষ ইনু ভাইকে বলে রেখেছিলাম, কাল নড়াইল আসছি। ইনু ভাইয়ের কর্মস্থল খুলনা। জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে একটি বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থায় কর্মরত। কাজ থাকা সত্ত্বেও আমাদেরকে সঙ্গ দেয়ার জন্য সারাদিনের জন্য থেকে যান।   

কবিয়াল বিজয় সরকারের বাড়ি 

বহু বছর পর ইনু ভাইয়ের সাথে আমাদের দেখা। প্রায় ২০-২২ বছর পূর্বে একটি ভ্রমণের ক্লাব করে আমরা বাংলাদেশের অনেক জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছি। তখনো ফেসবুক আসেনি আমাদের জীবনে। তাই ভার্চুয়াল যোগাযোগ থেকে সরাসরি যোগযোগটাই বেশি হতো। শিল্পী সুলতানের সমাধির পাশে বসে ইনু ভাইয়ের সাথে এস এম সুলতানের বোহিমিয়ান জীবনের নানা গল্পে মেতে উঠি আমরা। প্রসঙ্গ আসে সুলতানের পৃথিবীর পথে বেড়িয়ে যাওয়া, কলকাতায় বিখ্যাত শিল্প সমালোচক শাহেদ সোহরাওয়ার্দীর সান্নিধ্য এবং তাঁর মাধ্যমে সুলতানের একাডেমিক যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও কলকাতা আর্ট কলেজে ভর্তি, আবার ড্রপআউট হয়ে ভারতবর্ষের পথে পথে ঘুরে বেড়ানো, বিশেষত কাশ্মীর চলে যাওয়া ইত্যাদি প্রসঙ্গ। 

কাশ্মীরে সুলতানের শিল্পচর্চা ও প্রথম চিত্র প্রদর্শনী হয়। আবার ইউরোপ-আমেরিকা ঘুরে বেড়ানো, নিজের আঁকা ছবি বিক্রি করে জীবনধারণসহ বিচিত্র প্রসঙ্গ আসে আমাদের আলোচনায়। সুলতানের বাড়িতে সাপখোপ ও বেজি থেকে শুরু করে বিচিত্র প্রাণীর বিচরণক্ষেত্র ছিল। তিনি নিজে অনেক প্রাণী পুষতেন। জানতে পারি, সুলতান অর্থাভাবে পেইন্টিয়ের জন্য দামী রং ক্রয় করতে পারতেন না। ফলে নিজেই বানাতেন বিভিন্ন ধরনের রং। আরো প্রসঙ্গ আসে সুলতানের বাঁশী বাজানো প্রসঙ্গে। সুলতানের বাঁশী বাজানোও ছিলো বিশ্বমানের। তারেক মাসুদের ‘আদম সুরতে’ ধরা আছে সুলতানের সেই রহস্যময় বাড়িটির ছবি।

বর্তমানে শিল্পকলা একাডেমীর অধীনে সুলতানের বাড়ি সংরক্ষণ করা হচ্ছে। এখানকার সব কর্মচারীগণ বেতন নয়, যৎসামান্য সম্মানী পান। আমাদের গ্যালারীগুলো ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখান এখানকার একজন তত্ত্বাবধায়ক গোলাপ কাজী। দেখে মনে হলো খুবই হতদরিদ্র অবস্থা! তাঁর মাসিক সম্মানী মাত্র ৬ হাজার টাকা। তিনি জানালেন, এখানকার কিউরেটর পান মাত্র ১৫ হাজার টাকা। সর্বত্র অপব্যায়ের ছড়াছড়ি অথচ যারা শিল্প-সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত থেকে জীবিকা নির্বাহ করেন তাদের ক্ষেত্রেই অর্থের টান পড়ে যায় এই দেশে!

চিত্রা নদীর পাড়ে সংরক্ষিত সুলতানের বজরা দেখে আমরা রওয়ানা হয়ে যাই নড়াইল শহরের উদ্দেশ্যে। পথিমধ্যে ইনু ভাই চিত্রা নদীর তীরে বাঁধানো একটি ঘাটে নিয়ে যান। এর নামও বাঁধা ঘাট। স্থানীয়ভাবে অনেকে ‘রাজবাড়ির ঘাট’ও বলেন। দুইশ বছরের পুরনো তৎকালীন জমিদারদের সময়ে নির্মিত এটি। রোমান স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত ঘাটটির সৌন্দর্য সত্যি দারুণ। অনুভব করি, নদী থেকে অথবা ওপাড় থেকে দেখলে এর সৌন্দর্য দারুণ লাগবে। এই ঘাটটির তীরে একটি দুর্গামন্দির রয়েছে।   

শহরের একটি রেস্টুরেন্টে দুপুরের আহার শেষে আমরা যাত্রা করি কবিয়াল বিজয় সরকারের ডুমদী গ্রামের উদ্দেশ্যে। দীর্ঘ মোটরসাইকেল যাত্রায় একটি বিশাল বিলের শেষ প্রান্তে, গ্রামের অনেককে জিজ্ঞেস করার মধ্য দিয়ে আমরা পৌঁছাতে পারি বিজয় সরকারের বাটিতে। “এই পৃথিবী যেমন আছে তেমনি ঠিক রবে/ সুন্দর এই পৃথিবী ছেড়ে একদিন চলে যেতে হবে” মনের গভীরে শূন্যতা সৃষ্টিকারী এমন অসংখ্য গানের স্রষ্টা কবিয়াল বিজয় সরকার। এখানে পরিচয় হয় স্থানীয় তিনজন তরুণের সঙ্গে। বিজয় সরকারের মতো প্রতিভার বসতবাড়ি এবং মন্দির এমন অযত্ম-অবহেলায় ফেলে রাখার জন্য হতাশা প্রকাশ করেন এক তরুণ। বিজয় সরকারের নামে একটা স্মৃতি সংসদ আছে বটে। তবে তারা বাৎসরিক কিছু আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া তেমন কোনো কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেনি এই পর্যন্ত। অথচ বিজয় সরকারের গানের বাণী বৃহত্তর বাঙলার মানুষের কাছে বিপুল জনপ্রিয়। সৃষ্টিশীল মানুষের মূর্তি গড়ে, ভাস্কর্য গড়ে, তাঁর স্মৃতিবিজড়িত বিভিন্ন অনুষঙ্গ নিয়ে জাদুঘর গড়ে আনুষ্ঠানিকভাবে সংরক্ষণ করাটা জরুরি বটে। এমন অনেক বিখ্যাত মানুষের স্মৃতিবিজড়িত স্থানে দায়সারাভাবে নানা রকম স্থাপনা করাও হয়েছে। কিন্তু সত্য হলো এই, বিজয় সরকারের মতো স্রষ্টা তো জীবিত থাকেন মানুষের হৃদয়ে কাল থেকে কালান্তরে। আবার অনেক ব্যক্তির বিশাল বিশাল সংরক্ষিত স্মৃতিস্তম্ভ ধ্বংসের মধ্য দিয়ে তাঁরাও হারিয়ে যান চিরতরে।

ফিরতি পথে দীর্ঘ মোটরসাইকেল যাত্রায় কালিয়া উপজেলা শহরের খানিকটা আগে পড়ে নবগঙ্গা নদী। ইঞ্জিন নৌকায় মোটরবাইকসহ পার হয়ে আসি আমরা। কালিয়া উপজেলা শহরের কেন্দ্রস্থলে বিশ্ববিখ্যাত নৃত্যশিল্পী উদয় শঙ্করের পারিবারিক একটি বাড়িতে নিয়ে যান ইনু ভাই। এটি এখন উপজেলা সদরের ডাকবাংলো হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বাড়ির কম্পাউন্ডের ভেতরেই পানের পাইকারী বাজার দেখতে পাই। এক হুলস্থুল অবস্থা! ইনু ভাই জানালেন, উদয় শঙ্করদের মূল বাড়ির চিহ্ন আর নেই। টিকে আছে জ্ঞাতিদের এই বাড়ি। তারপরও তো স্মৃতি হিসাবে এটি সংরক্ষণ করা যায়! যথারীতি নামেমাত্র ভবন সংরক্ষণজনিত সতর্কতা বার্তা দিয়ে লেখা প্রত্মতত্ত্ব অধিদপ্তরের একটি ছোট্ট সাইনবোর্ড চোখে পড়েছে আমাদের! আর কতোকাল এমন দায়সারা কাজ চলবে কে জানে?

আবার যাত্রা। বেশ পুরনো, বিশাল জায়গাজুড়ে, পলেস্তরা খসে যাওয়া পুরনো ইট বের হওয়া একটি বাড়ির সামনে ইনু ভাই বাইক থামান। মোটর বাইক থেকে নামতে নামতে ভাবছিলাম, ইনু ভাই বোধ হয় আরেকটি প্রত্মতাত্ত্বিক গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নিয়ে এসেছেন আমাদের। একটু পরেই ভুল ভাঙ্গে। আসলে এটি ইনু ভাইদেরই বাড়ি। বিশাল জায়গাজুড়ে বাড়িটি। যদিও ইনু ভাইদের গ্রামের বাড়ি কালিয়া উপজেলারই অন্য একটি গ্রামে। পরিচয় হয় ইনু ভাইয়ের মা এবং দুই বোনের সাথে। খালাম্মার সম্প্রতি স্ট্রোক করাতে বেশ অসুস্থ তিনি। ঠিকমতো কথা বলতে পারেন না। স্মৃতিরও সমস্যা হচ্ছে। তারপরও তিনি আমাদের কাছে এসে বসেন। ইতোমধ্যে বিভিন্ন ধরনের খাবার হাজির হয়ে যায়। কথাপ্রসঙ্গে ইনু ভাই জানান, রহস্য-রোমাঞ্চ উপন্যাসের লেখক নীহারঞ্জন গুপ্তের বাড়ি তাঁদের বাড়ির পাশেই ‘ইতনা’ গ্রামে। সময় থাকলে নিশ্চয়ই যাওয়া যেতো গোয়েন্দা কিরিটি রায়ের স্রষ্টার বাড়িতে। মনে পড়ে কিশোর বয়সে কালোভ্রমর, মৃত্যুবাণ, কালনাগ, উল্কা, উত্তর ফাল্গুনী, রাতের রজনীগন্ধা ইত্যাদি রোমাঞ্চকর গোয়েন্দা কাহিনীতে কীরকমভাবে ‘বুঁদ’ হয়ে থাকতাম। ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়ি সিলেটে রেলযাত্রায় নীহাররঞ্জনের গোয়েন্দা কীরিটি রায় গোয়েন্দাগিরি করতে করতে আমাদের সাথে সাথেই যেতো। একসময় রেলস্টেশনগুলোতে দেদারসে বিক্রি হতো নীহারঞ্জন গুপ্তসহ অনেক লেখকের রহস্য-রোমাঞ্চ এবং প্রেমের উপন্যাস। ইস, এই লেখকের বাড়ি না দেখাটা খুব মিস করলাম এবার! রাস্তা উন্মুক্ত এবং ঝড়োগতির। সুতরাং খুব বেশি সময় না নিয়ে শ্রীঘ্রই আবার আসবো নড়াইলে।

এবার বিদায় নেয়ার পালা। অবশ্য আমাদের শেষ গন্তব্য অরুনিমা কান্ট্রিসাইড রিসোর্ট। এটি কালিয়াতেই অবস্থিত। ইনু ভাইদের বাড়ি থেকে প্রায় ১৮ কি.মি. দূরে ‘পানিপাড়া’ নামক একটি নিভৃত পল্লীতে এর অবস্থান। ইনু ভাই খুলনা যাবেন। আমরা অরুনিমা রিসোর্ট দেখে ঢাকার পথ ধরবো। ভাড়া করা একটি মোটরসাইকেলে আমরা পৌঁছে যাই রিসোর্টে। রিসোর্টের স্বত্ত্বাধিকারী আমার পূর্ব পরিচিত। তাঁকে ফোন দিয়ে জানতে পারি তিনি ঢাকায়। আমরা ভিতরে প্রবেশ করে ঘুরেফিরে দেখি ৫০ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশেল বৃহৎ এবং পুরনো একটি রিসোর্ট। বিশাল লেক, অনেকগুলো পুকুর, গাছপালা ঘেরা রিসোর্টের নীরবতা মুগ্ধ করার মতো। কিন্তু সংস্কারের অভাবে এখন এর জীর্ণদশা। অবশ্য সংস্কারের কাজ শুরু হয়েছে ইতোমধ্যে। স্টাফদের সঙ্গে কথা বলে বুঝতে পারলাম, একসময় দেশী-বিদেশী পর্যটকদের পদচারণায় মুখরিত রিসোর্টটি করোনার সময় থেকে দৈন্যদশায় পতিত হয়েছে। এখন আর তেমন গেস্ট আসে না। সংস্কার করলে এবং পর্যটনের নুতন নতুন আইডিয়া যুক্ত করলে রিসোর্টটি আবার তার হারানো সৌন্দর্য ফিরে পেতে পারে। 

রিসোর্টের গেটে এসে একটি ভ্যান নিয়ে আমরা যাত্রা করি মধুমতি নদীর ঘাটের উদ্দেশ্যে। খেয়া নৌকায় নদী পাড়ি দিয়ে ওপার থেকে আরেকটি ভ্যানে চড়ে চলে আসি গোপালগঞ্জের চন্দ্রদীঘালিয়া বাসস্ট্যান্ডে। সেবা গ্রীনলাইন নামক একটি বাসও পেয়ে যাই খানিকক্ষণের মধ্যে। যথারীতি ঝড়ের বেগে ছুটে চলে বাস। খুব দ্রুতই ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে ধরে রাতের আলো ঝলমল পদ্মাসেতু পাড়ি দিয়ে চলে আসি মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে। রাত ৮টায় রওয়ানা দিয়ে আমরা সাড়ে ১০টায় পৌঁছে যাই সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে।

নগরকেন্দ্রিক সবকিছুতে এখন তীব্র গতি। ঊর্ধ্বশ্বাস ছোটাছুটি। গ্রামকেও এখন গতির আওতায় নিয়ে আসার চেষ্টা চলছে। খুব বেশিদিন নেই গ্রাম ও শহরের পার্থক্য ঘুঁচে যাবে মনে হয়। আসলে শেষপর্যন্ত গতি আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে জানি না! গতি কি সৃষ্টিশীলতার হন্তারক? আমাদের অস্থির ছোটাছুটি কি সৃষ্টির জন্য প্রতিবন্ধক নয়? আবার গতি ছাড়া উন্নতিও সম্ভব নয়! উন্নয়ন বা উন্নতির জন্য যা ইচ্ছে তাই করার নামও তো জীবন হতে পারে না। সবকিছুর একটা ভারসাম্য থাকা উচিত। অথচ কী ক্ষুদ্রই না আমাদের এই জীবন! বিজয় সরকারের গান শেষ পর্যন্ত জীবনেরই গান। পৃথিবীকে সুন্দর করার অন্তর্নিহিত কথা ও সুর। ছোট্ট এই জীবনের বেঁচে থাকার স্বার্থকতা শেষ পর্যন্ত অনাগত মানুষের জন্য প্রকৃত সুন্দর একটি পৃথিবী রেখে যাওয়া। যেহেতু প্রকৃতির অপরূপ সুন্দর এই পৃথিবী ছেড়েই যেতে হবে তাই পৃথিবীকে মানুষের বসবাসের জন্য ‘প্রকৃত সুন্দর’ করাটাই হবে মনুষ্য জীবনের সৌন্দর্য। শিল্পী সুলতানের তুলি, বিজয় সরকারে বাণী কিংবা উদয় শঙ্করের নৃত্যকলা সেই সুন্দর পৃথিবীর জন্যই শিল্পিত প্রয়াস ছাড়া আর কিছুই নয়।  

/তারা/ 

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়