ঢাকা     শুক্রবার   ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০ ||  আশ্বিন ১০ ১৪২৭ ||  ০৭ সফর ১৪৪২

গল্প-হাসির হ‌ুমায়ূন আহমেদ

নাজমুল হক তপন || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ২৩:৪৬, ১৮ জুলাই ২০২০   আপডেট: ১০:৩৯, ২৫ আগস্ট ২০২০
গল্প-হাসির হ‌ুমায়ূন আহমেদ

হ‌ুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস আসলে কী? এ নিয়ে গত চার দশকের বেশি সময় ধরে কাগজ-মগজের যথেচ্ছাচার করেছেন মার্গীয় সাহিত্যবোদ্ধারা। কিন্তু কূল-কিনারা করতে পারেননি। হ‌ুমায়ূন আহমেদের সৃষ্টি কতখানি প্রাসঙ্গিক এমন সংশয়বাদীদের সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়। এটা করতে গিয়ে একটা বিষয় কখনোই বিবেচনায় নেননি সংশয়বাদীরা। এদেশের মানুষের সবচেয়ে প্রিয় গল্প। সবাই গল্প বলতে আর গল্প শুনতে পছন্দ করেন। কোনো তত্ত্ব দার্শনিকতার ধার ধারেন না সাধারণ মানুষ। আর আশপাশের ঘটে যাওয়া যেগুলো অন্যদের চোখ এড়িয়ে যায় সেগুলোকেই উপজীব্য করেছেন হ‌ুমায়ূন আহমেদ। তার এক একটি সৃষ্টি মানে অসংখ্য গল্পের সমাহার আর মানুষ যেন প্রাণ খুলে হাসতে পারে তারই অফুরান উপাদান।

ভালোবাসা প্রকাশের সঙ্গে আর্থিক সামর্থের বিষয়টি যে জড়িত এটা সবারই জানা। এই সহজ সত্যটিকে কি নিপূণ দক্ষতায়-ই না চিত্রিত করেছেন হ‌ুমায়ূন আহমেদ। ধারাবাহিক নাটক ‘বহুব্রীহি’র কথাই ধরা যাক। বিচিত্র সব কাজ করেন ফরিদ মামা। বোনের বাড়িতে থাকেন অনেকটা আশ্রিতের মতো। একদিন তার বাবার ব্যাংকে গচ্ছিত অনেক টাকা পেলেন তিনি। দুই সন্তানসহ ওই একই বাড়িতে থাকেন আনিস সাহেব। হাতে অনেক টাকা আসার পর, ওই দুটো বাচ্চাকে ফরিদ মামা ডেকে বললেন, বাচ্চারা তোমরা মনে হয় জানো না যে, আমি তোমাদের ভালোবাসি। কিন্তু এতদিন অর্থনৈতিক কারণে  আমি সেই ভালোবাসা প্রকাশ করতে পারিনি। বলো তোমরা কী চাও? বাচ্চারা মহা উৎসাহে আইসক্রিমের কথা জানাল। আইসক্রিম ভর্তি একটা গাড়ি কিনে দিলেন মামা।

পাড়া মহল্লার রকবাজদের অস্তিত্বকে শুধু অনুভবই করেননি হ‌ুমায়ূন আহমেদ, তুলে এনেছেন কেন্দ্রীয় চরিত্রে। দেশ কাঁপানো ‘কোথাও কেউ নেই’ ধারাবাহিক নাটকটি এখনো সবার স্মৃতিতেই উজ্জ্বল। রকবাজরা কথার মধ্যে ভুল ইংরাজি শব্দ মেশায়। হ‌ুমায়ূন আহমেদের চোখ এগুলো এড়ায়নি। রকবাজ গুরু বাকের ভাইয়ের কাছে মতি জিজ্ঞাসা করে, গায়ে হলুদের ইংরেজি কী? বাকের ভাই খুব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জবাব দেয়, বডি টারমারিক। মতি স্কুল জীবন শেষ করতে না পারলেও তার ওয়াইফ বিএ পাস। মতির বিয়ের পর নতুন বউকে দেখতে এসেছে মুনা ও তার ছোট বোন বকুল। প্রবল উৎসাহে মুনা বকুলকে দেখিয়ে তার বউয়ের দিকে ইঙ্গিত করে মতি বলে, এরা হচ্ছে গুডেস্ট গার্ল। খুব মজা পেয়ে নতুন বউ বলে ওঠে, এই যে গুডেস্ট গার্লরা আপনারা কিন্তু মিস্টিমুখ করে যাবেন।

বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ সামাজিকভাবে সন্তানদের কতটা বিপাকে ফেলে হ‌ুমায়ূন আহমেদ  দারুণভাবে দেখিয়েছেন ‘তোমাকে’ উপন্যাসে। লেখাটিতে যমজ বোন নীলু ও বিলু। এক বিয়ে বাড়িতে গেছে দুই বোন। ওই অনুষ্ঠানে এসেছেন ভার্সিটির গণিতের অধ্যাপক রাকিব সাহেব। বন্ধুদের সঙ্গে বাজি ধরে রকিব সাহহেবের কাছে গিয়ে নীলু বলে, ‘আপনার প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট দেন। বন্ধুদের সঙ্গে আমি বেট ধরেছি। রাকিব সাহেব বললেন, তোমার নাম নীলু, তাই না? কোনো ভনিতা না করেই নীলু জানতে চাইল, আপনার সঙ্গে তো আমার আগে কখনো পরিচয় হয়নি। তাহলে আমার নাম জানলেন কীভাবে? উত্তরে রাকিব সাহেব বললেন, তোমার অনেক সাহস। আর তোমার সাহসের গল্প শুনে তোমাকে আমি চিনতে পেরেছি। নীলুর তাৎক্ষণিক জবাব, আমি সাহসী বলে আপনি আমাকে চেনেন না। আমার মা তার গানের মাস্টারের সঙ্গে পালিয়ে গেছেন বলে আপনি আমাকে মনে রেখেছেন।’

হ‌ুমায়ূন আহমেদের হিমু চরিত্র নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নাই। হিমু অ্যান্টি লজিক চরিত্র। কিন্তু হিমুর কাজ আর গল্পগুলো যেন হাসির ঝরনাধারার মতো প্রবাহমান। বিয়ের কথার সময়, মেয়ের মা হিমুকে জিজ্ঞাসা করে, আমার মেয়েকে যে বিয়ে করবে তুমি তো কিছুই কর না। হিমুর জবাব, আপনাদের তো অনেক টাকা আছে। আপনাদের টাকায় আমি একটা ট্যক্সি কিনব। আর ট্যাক্সির উপরে লিখে রাখব ‘শাশুড়ীর দোয়া’। দেশে অনেক কিছুতেই লেখা আছে ‘মায়ের দোয়া’। কিন্তু শাশুড়ীর দোয়া কোথাও লেখা থাকে না।

কঠিন ধাঁচের মেয়েরাও হিমুর গল্পগুলোর মধ্যে মজার স্বাদ পায়। ‘হিমুর রুপালি রাত্রি’ উপন্যাসে তেমনি এক কঠিন ধাঁচের মেয়ে তামান্না। মেয়েদের বুদ্ধিমত্তা নিয়ে তামান্নাকে গল্প শোনায় হিমু। সংক্ষেপে গল্পটা,  তিন জেলে গেছে নদীতে মাছ ধরতে। সারাদিনেও মাছ পায়নি। রাতের দিকে এক জেলে তার জালে ভারী কিছু আটকেছে বুঝতে পারল। মাছ পাওয়া গেছে ভেবে ভীষণ খুশী জেলে। কিন্তু জাল টেনে ডাঙ্গায় তুলতেই মাথায় হাত! জালে মাছ ওঠেনি, জালে আটকেছে একটা মারমেইড (মৎস্যকন্যা)। শিক্ষিত মানুষদের কাছে মারমেইডের আবেদন অন্যরকম। কিন্তু গরিব জেলেদের কাছে বেঁচে থাকার প্রধান রসদ মাছ। স্বভাবতই জেলেদের মন খারাপ হলো। মৎসকন্যা জেলেদের মন খারাপ করার বিষয়টা অনুধাবন করতে পারল। বলল, তোমাদের মনের অবস্থা আমি বুঝতে পারছি। তোমাদের আমি ধন দৌলত এসব কিছু দিতে পারব না। এর বাইরে তোমরা যা চাও তা দিতে পারব। এটা শুনে প্রথম জেলে বলল, আমার বুদ্ধি দ্বিগুণ করে দাও। কথা রাখল মৎস্যকন্যা। দ্বিতীয় জেলের দাবি তার বুদ্ধি তিনগুণ করে দিতে হবে। দাবি পূরণ করল মৎস্যকন্যা। তৃতীয়জন বলল, আমার বুদ্ধি দশগুণ করে দিতে হবে। একটু আমতা আমতা করে মৎস্যকন্যা বলল, এতে কিন্তু একটা সমস্যা আছে। তৃতীয় জেলে তার দাবিতে অটল। মৎস্যকন্যা কি আর করবে! পূরণ করল তৃতীয় জেলের চাওয়া। আর অমনি তৃতীয় জেলেটি রূপান্তরিত হলো নারীতে।

আমাদের দেশের মানুষের জন্য আমেরিকা যাওয়াটা স্বপ্ন ছোঁয়ার মতো একটা ব্যাপার। ‘নক্ষত্রের রাত’ উপন্যাসে সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে রেবেকা পড়াশোনার জন্য আমেরিকা যাওয়ার সুযোগ পেয়েছে। রেবেকাকে নিয়ে তার মা প্রায় প্রতিদিনই শপিংয়ে যাচ্ছেন। অনেক জিনিসের দরদাম করছেন। জিনিসগুলো নাড়াচাড়া করছেন আর বলছেন, ‘এগুলো এখান থেকে নিয়ে আর কি করবি? আমেরিকাতে তো এই জিনিসগুলোই আরো ভালো কোয়ালিটির পাবি। ওখানে গিয়ে নেওয়াই ভালো হবে।’ রেবেকা বুঝতে পারছে যে তার মা আসলে তার আমেরিকা যাওয়ার গল্পটাই সবাইকে শুনাতে চাচ্ছেন।

হ‌ুমায়ূন আহমেদের ‘ছোট’, ‘বড়’র পর্যবেক্ষণ কতটা সূক্ষ্ম সেটা অনুধাবন করার জন্য প্রযোজন পড়ে না বিশেষজ্ঞ হওয়ার। ‘অয়োময়’ ধারাবাহিক নাটকটির কথাই ধরা যাক। অনেক দিন পর গ্রামে ফিরেছে পাগল। একটা সময় নতুন জমিদার কাশেমের সঙ্গে খুব ভালো সম্পর্ক ছিলো পাগলের। গ্রামের রাস্তায় কাশেমের মুখোমুখি হলো পাগল। কিন্তু নতুন জমিদারকে না দেখার ভাণ করে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে চাইল সে। এ অবস্থায় পাগলকে কাছে ডেকে নতুন জমিদার কাশেম বলে উঠল, ‘আজকাল চোখে মনে হয় এট্টু কম দেখ।’ পাগল জবাব দিলো, ‘আমরা ছোট মানুষ। চোহে ছোট ছোট জিনিস দেহি। বড় জিনিস কম দেহি।’

গ্রামের মেয়েরা কেন গাঢ় নীল শাড়ি পরে, টিনএজার মেয়েরা ঘন ঘন বেল বাজায়, বয়স্করা বেল বাজায় এক টানা, ভেজা ছাদে হাঁটা এগুলো আমাদের যাপিত জীবনের  অংশ। ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ উপন্যাসে  জমিদারের ছোট নাতনী বড় বোন শাহানাকে প্রশ্ন করে, গ্রামের মেয়দের মনে হয় নীল রং খুব প্রিয়। কেননা বেশিরভাগ মহিলাই গাড় নীল রঙের শাড়ি পরে। উত্তরে শাহানা জানায়, গ্রামের মহিলাদের অনেক কাজ করতে হয়। গাড় নীল রংয়ের শাড়িতে ময়লা কম ধরে মানে সহজে ময়লা হয় না।

ছোট আর বড়’র ধারণা খুব পরিষ্কার বলেই হ‌ুমায়ূন আহমেদ হয়ে উঠেছেন আমাদের সবার লেখক। সাধারণ মানুষ প্রাণ খুলে হাসতে চায়, গল্প শুনতে চায়, বলতে চায় নিজেদের গল্প, আর সেটিই দশকের পর দশক পরম নিষ্ঠার সঙ্গে পরিবেশন করে গেছেন হ‌ুমায়ূন আহমেদ।

 

ঢাকা/তারা

রাইজিংবিডি.কম

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়