ঢাকা     সোমবার   ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০ ||  আশ্বিন ৬ ১৪২৭ ||  ০৩ সফর ১৪৪২

বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে তারা বাংলাদেশকে হত্যা করতে চেয়েছিল 

এম মতিউর রহমান মামুন  || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০০:৩১, ১৫ আগস্ট ২০২০   আপডেট: ০৮:৪৪, ২৯ আগস্ট ২০২০
বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে তারা বাংলাদেশকে হত্যা করতে চেয়েছিল 

বঙ্গবন্ধু হত্যার পর ইন্দিরা গান্ধী বলেছিলেন, ‘আমি গোয়েন্দা প্রতিবেদনগুলো অগ্রাহ্য করেছি, কিন্তু তেমনটি আমি আর করতে পারি না। রাজীবের পুত্র রাহুল মুজিবের পুত্রের সমবয়স্ক। আগামীকাল তারও এমন হতে পারে। তারা আমাকে ও আমার পরিবারকে ধ্বংস করতে চায়।’

বঙ্গবন্ধুকেও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা বারবার সতর্ক করেছিল কিন্তু বাঙালির প্রতি বঙ্গবন্ধু এতটাই আত্মবিশ্বাসী ছিলেন যে, গোয়েন্দা রিপোর্ট আমলে নেননি। তারই খেসারতে শেষ পর্যন্ত প্রাণ দিতে হলো! 

ইয়াহিয়া-ভুট্টো পাকিস্তানের কারাগারে তাঁকে হত্যা করার সাহস পায়নি কিন্তু নিজ দেশের কিছু বিশ্বাসঘাতক নরপশু বঙ্গবন্ধুকে কীভাবে হত্যা করতে পারলো? কথাগুলো যখন ভাবছিলাম তখন বারবার মনে পড়ছিল, ‘আর যদি একটা গুলি চলে, আর যদি আমার লোককে হত্যা করা হয়...।’ এমন উচ্চারণ পাকিস্তানিদের মানসিকভাবে পরাজিত করছিল আর আমরা ধীরে ধীরে স্বাধীনতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। এই ভাষণের পরেই মূলত বাঙালি তাদের সব দ্বিধা মুছে ফেলে যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়। সে যুদ্ধে আমরা জয়ী হই। কিন্তু পরাজিতের চক্রান্ত থেমে থাকেনি। তারই সর্বশেষ ছোবল বঙ্গবন্ধু-হত্যা। পাকিস্তানি ভাবধারার কিছু মানুষের বিশ্বাসঘাতকতার ফলে স্বাধীনতার মহানায়ক জাতির পিতাকে সপরিবারে প্রাণ দিলে হলো!

অথচ কতটা আত্মবিশ্বাস নিয়ে সদ্য স্বাধীন দেশে কুমিল্লা সেনানিবাসে প্রথম ক্যাডেটদের উদ্দেশ্যে জাতির জনক বলেছিলেন, ‘একদল আছে যারা বিদেশির অর্থে বাংলার স্বাধীনতাকে নসাৎ করতে চায়। রাতের অন্ধকারে নিরাপরাধ মানুষকে হত্যা করে যারা বিদেশি আদর্শ বাংলার মাটিতে চালু করতে চায় তাদের বাংলার মাটিতে স্থান হবে না। কেমন করে একটা লোক নিজের দেশের মাতৃভূমিকে বিক্রি করতে পারে পয়সার লোভে ভেবে আমি শিউরে উঠি! ... মাতৃভূমিকে তোমরা ভালোবেসো। মনে রেখ তোমাদের মধ্যে যেন পাকিস্তানের মেন্টালিটি না আসে।’

নিজের দেশের মানুষের প্রতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মবিশ্বাস এতই দৃঢ় ছিল যে, তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্র হচ্ছে এমন পূর্বাভাস পেয়েও তিনি তা উড়িয়ে দিয়েছিলেন। বিভিন্ন তথ্যসূত্র ও গণমাধ্যমের প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার ষড়যন্ত্র সম্পর্কে আগেই তথ্য ছিল ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড ইন্টেলিজেন্স উইং, সংক্ষেপে ‘র’ এবং মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা ‘সিআইএ’-সহ একাধিক বিদেশি সংস্থার কাছে। সম্ভাব্য এই অভ্যুত্থানের বিষয়ে ‘র’-এর কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বঙ্গবন্ধুকে সতর্কও করেছিলেন ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। কিন্তু বঙ্গবন্ধু তা বিশ্বাস করতে নারাজ ছিলেন। অপর এক গবেষণাতে বলা হয়েছে, ‘র’-এর তৎকালীন প্রধান রামেশ্বর নাথ কাও ১৯৭৪ সাল থেকে মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র সম্পর্কে তথ্য পেয়েছিলেন। তাদের কাছে গোপন রিপোর্ট ছিল, বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা বাহিনীর মধ্যে বিদ্রোহ পাকিয়ে তোলা হচ্ছে। তিনি ব্যক্তিগতভাবে এ সম্পর্কে ইন্দিরা গান্ধীকে সংক্ষিপ্ত বর্ণনাও দেন। পরে ইন্দিরা গান্ধী ষড়যন্ত্র সম্পর্কে  বঙ্গবন্ধুকে অবহিত করার জন্য তাকে ঢাকা পাঠিয়েছিলেন। ৩২ নম্বরের বাড়িতে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখাও করেছিলেন তিনি। আর এন কাও- এর ভাষায়, ‘আমরা তখন বাগানের মধ্যে পায়চারি করছিলাম। আমি মুজিবকে বলি যে, তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র সম্পর্কে আমাদের কাছে তথ্য আছে, কিন্তু তিনি (বঙ্গবন্ধু) আনন্দিত ছিলেন। তিনি বলেন, আমার কিছুই হতে পারে না, তারা আমার লোক। এমনকি যদিও আমি সুনির্দিষ্ট তথ্যের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ তাকে দিয়েছি, আমরা যতটুকু জানতে পেরেছি। কিন্তু বঙ্গবন্ধু এসব বিশ্বাস করতে পারেননি। তাঁর বিশ্বাস ছিল কোনো বাঙালি তাঁকে মারতে পারে না।’

১৯৭৫ সালের মার্চ মাসে কাওয়ের কাছে আরও বিস্তারিত খবর পৌঁছে যায়। সেটা হলো, বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে মুজিবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র সংগঠিত হচ্ছে। ইন্দিরা গান্ধী দ্রুতবেগে মুজিবকে অবহিত করেন, কিন্তু তিনি এবারও বিশ্বাস করতে অসম্মত হন। তিনি তো বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা, তিনি তার আপন লোকজনের দ্বারা গুপ্তহত্যার শিকারে পরিণত হতে পারেন না। ‘র’-এর কাছে থাকা প্রতিবেদনগুলো ১৯৭৪ সালেও হালনাগাদ ছিল যে, বাইরের দেশের শক্তির মাধ্যমেই ষড়যন্ত্রের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন হবে।

বঙ্গবন্ধু খুব ভালো করেই জানতেন মুক্তিযুদ্ধে কারা পাকিস্তানের দালালি করেছিল। তাঁদের বিচার বঙ্গবন্ধু করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ঘাতকরা তা করতে যে দেবে না বঙ্গবন্ধু তা অনুমান করতে পারেননি। 

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনককে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে ঘাতকরা নবজাতক বাংলাদেশকেই হত্যা করেছে। অথচ তারা আজও বাংলাদেশের রাজনীতিতে বহাল তাবিয়তে আছে। এটা আমাদের আদর্শহীন রাজনীতি চর্চার করুণ পরিণতিই বলা যেতে পারে। বেগম খালেদা জিয়া ক্ষমতার লালসায় যুদ্ধাপরাধীদের গাড়িতে জাতীয় পতাকা দিয়েছিলেন। তার বিচার জাতী কি কখনও পাবে? এটা কি রাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতারণা নয়? আজ আমরা সেই বিচার তো চাইতেই পারি! বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর মেজর জিয়া ক্ষমতা দখলের পর ‘দালাল আইন’ বাতিল করে ঘাতক, দালালদের প্রতিষ্ঠিত করে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের সুরক্ষিত করেছে। জিয়ার উত্তরসূরী সেই দালালদের গাড়িতে পতাকা তুলে স্বাধীনতার ইতিহাস কলঙ্কিত করেছে। যখন বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী পালন করছি তখন সময় এসেছে সেইসব দালালদের খুঁজে বের করার। তাদের উত্তরসূরীরা নামে-বেনামে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীন বাংলায় ঘাপটি মেরে আছে কিনা? তারা সরকারের কর্মকর্তা-কর্মচারী সেজে আছে কিনা? এদের খুঁজে বের করতে না পরলে আরও একটা বড় ভুল হতে পারে। কেননা ৭৫ সালে যে ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছিল তার গন্ধ আজও পাই। 

লেখক: রবীন্দ্রস্মৃতি সংগ্রাহক ও গবেষক

ঢাকা/তারা

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়