ঢাকা, সোমবার, ১ পৌষ ১৪২৬, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

নতুন পথচলায় মুশফিকের তিন ঘণ্টার নেট সেশন

ইন্দোর থেকে ইয়াসিন হাসান : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১১-১২ ১০:২০:৫২ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১১-১৩ ১২:২২:২৭ পিএম
মুশফিকুর রহিম। ছবি: মিলটন আহমেদ

রোজকার মতো পুবের সূর্যরশ্নি ছড়িয়ে যাচ্ছিল ইন্দোরের সবুজ গালিচায়। চিকচিক করা সবুজ ঘাস স্বাগত জানাচ্ছিল বাংলাদেশের সাদা পোশাকের বিশাল বহরকে।

চার-ছক্কার টি-টোয়েন্টি ছেড়ে ক্রিকেটের শুভ্রতম ফরম্যাটে বাংলাদেশ। নতুন অধিনায়ক মুমিনুল হকের নেতৃত্বে বাংলাদেশ মাঠে নামার অপেক্ষায়। এর আগে ‘সেকেন্ড লাস্ট ডে’তে নিজেদের ঝালিয়ে নেওয়ার পালা। শুরুতেই হয়ে গেল টিম মিটিং। এরপর চলে ফিটনেস ট্রেনিং। স্কিল অনুশীলন শুরু হয় ফিল্ডিং দিয়ে।

নেট সেশন শুরু হতেই দৌড় মুশফিকুর রহিমের। সময় তখন সকাল সাড়ে দশটা ছুঁইছুঁই। রোজকার মতো এদিনও সবার আগে ব্যাট-প্যাড নিয়ে নেটে হাজির বাংলাদেশের সাবেক টেস্ট অধিনায়ক। চলে দীর্ঘক্ষণের অনুশীলন। নেট থেকে বেরিয়ে পাশের খোলা জায়গায় ঠুকঠাক চলতেই থাকে। এরপর খানিকটা বিশ্রাম।

ব্যাট-প্যাড নিয়ে মুশফিক এবার চলে যান আউটার নেটে। সেখানে শুধুমাত্র ভারতীয় নেট বোলারদের সামলেছেন ডানহাতি ব্যাটসম্যান। প্রায় ৪৫ মিনিট আউটার নেটে সময় দিয়ে ক্লান্ত মুশফিক ফিরে আসেন মূল মাঠে। সেখানে মিটিয়েছেন এক ডজন সেলফির বায়না।

সূর্য তখন মধ্যগগণে। প্রখর রোদ। বিশ্রাম শেষে মুশফিক আবার উঠে দাঁড়ান। আবার প্যাড পরেন। আবার গ্লাভস হাতে নেন। এবার কিপিং অনুশীলনের পালা? নাহ! এবার কিপিং গ্লাভস কিংবা কিপিং প্যাড নয়। মুশফিকের হাতে ব্যাটিং হ্যান্ড গ্লাভস, পায়ে ব্যাটিং প্যাড। মুশফিক তাহলে আবার নেটে যাচ্ছেন? তেমনটাই হলো।

ভারতীয় দল তখন মাঠে প্রস্তুতি নিচ্ছিল। বিরাট কোহলি একচোট ব্যাটিং সেরে ফেলেছেন। সেখান থেকে যোগ দেন সতীর্থদের সঙ্গে ফিটনেস ট্রেনিংয়ে। কিন্তু একপাশের নেটে ব্যাটিংয়ে নিজেকে ঝালিয়ে যাচ্ছিলেন মুশফিক। পাশের নেটেই ছিলেন মুমিনুল হক। তাদের দুজনকে নেটের পেছনে দাঁড়িয়ে পরখ করেছেন ব্যাটিং কোচ নিল ম্যাকেঞ্জি।

দুপুর দেড়টার পর মুশফিক ফেরেন ড্রেসিংরুমে। ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি রোজ কিপিং অনুশীলন করেন মুশফিক। কিন্তু আজ সূচিতে পরিবর্তন! কিপিং গ্লাভসহীন একটি দিন কাটিয়েছেন টেস্টে ১০৩টি ক্যাচ নেওয়া ও ১৫টি স্টাম্পিং করা মুশফিক।

এর পেছনে বড় কারণও আছে। ক্যারিয়ার দীর্ঘায়িত করার লক্ষ্যে টেস্টে উইকেটকিপিং ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ভারতে দুই টেস্টের সিরিজে উইকেটের পেছনে গ্লাভস হাতে দেখা যাবে না তাকে। কিপিংয়ে থাকবেন লিটন দাস। সেই মোতাবেক আজ ইন্দোরে অনুশীলনও করেছেন লিটন।

হুট করে মুশফিক এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তা নয়। টিম ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে আলোচনার পরই মুশফিক এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। মুশফিকের সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিয়েছে টিম ম্যানেজমেন্টও। দলের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যানের ওপর ওয়ার্কলোড কমাতে চায় টিম ম্যানেজমেন্ট।

‘মুশফিক অবশ্যই আমাদের সেরা ব্যাটসম্যান। নিজ থেকে আগ্রহ দেখিয়েছে কিপিং ছেড়ে দিতে। আমরা অবশ্যই তার সিদ্ধান্তকে সম্মান করি। এতে সে মানসিকভাবে স্বস্তি পাবে। পাশাপাশি ব্যাটিংয়ে আরও মনোযোগী হতে পারবে। ওয়ার্কলোড কমাতে অবশ্যই তার সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিতে হবে’- মুঠোফোনে রাইজিংবিডিকে বলেছেন প্রধান নির্বাচক মিনহাজুল আবেদীন নান্নু। 

৬৭ টেস্টে মুশফিক উইকেটের পেছনে দাঁড়িয়েছেন ৫৫ ম্যাচে। কিপিং করে ৫৫ ম্যাচে রান করেছেন ৩৫১৫, কিপিং ছাড়া ১২ ম্যাচে ৫১৪। কিপার ব্যাটসম্যান হিসেবে কমপক্ষে ৫০ টেস্ট খেলা খেলোয়াড়দের মধ্যে ব্যাটিং গড়ে মুশফিকের ওপরে আছেন শুধু তিনজন। অ্যান্ডি ফ্লাওয়ার, অ্যাডাম গিলক্রিস্ট ও ম্যাট প্রায়রের পরই আছেন মুশফিক।

কিপিং ছাড়া ব্যাটিংয়ে তার বড় সাফল্য নেই। ক্যারিয়ারের ছয় সেঞ্চুরিই (যার দুটি ডাবল) পেয়েছেন কিপিং করে। কিপিং ছাড়া সর্বোচ্চ রান করেছেন ৯২। ভাবনার বিষয়, কিপিং ছাড়া মুশফিকের ব্যাটিং গড় খুবই কম। কিপিং করে ব্যাটিং গড় ৩৭, কিপিং ছাড়া ২৪.৪৭। 

মুশফিকের অভিষেকের পর তাকে ছাড়া টেস্টে কিপিং করেছেন খালেদ মাসুদ, এরপর লিটন দাস, নুরুল হাসান সোহান। খালেদ মাসুদ অবসরে যাওয়ার পর মুশফিকের হাতে উঠে উইকেটের পেছনটা সামলানোর দায়িত্ব। আর মুশফিকের অনুপস্থিতিতে লিটন দক্ষিণ আফ্রিকা সফর ও শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ঘরের মাটিতেও উইকেটকিপার ছিলেন, আর ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে ছিলেন নুরুল।

এবার পাকাপাকিভাবে নেই মুশফিক। ফিল্ডার মুশফিক ব্যাটিং করবেন চার নম্বরে। ফলে বাড়ছে বাড়তি দায়িত্ব। বাড়ছে চাপ। তবে ফাইটার মুশফিক সব সময় এমন চাপ নিতেই পছন্দ করেন। নিজের প্রতিভা, সামর্থ্য, পরিশ্রম দিয়ে মুশফিক আরও একধাপ এগিয়ে যাবেন, এমনটাই প্রত্যাশা ক্রিকেটপ্রেমীদের।

মুশফিকের জন্য অনুপ্রেরণা হতে পারেন শ্রীলঙ্কান গ্রেট কুমার সাঙ্গাকারা। ১৩৪ টেস্টে ১২ হাজার ৪০০ রান করা সাঙ্গাকারা কিপিং করে ৪৮ ম্যাচে করেছেন ৩ হাজার ১১৭। এ সময়ে পেয়েছেন ৭ সেঞ্চুরি। আছে ২৩০ রানের ইনিংসও, ব্যাটিং গড় ছিল ৪০.৪৮। আর কিপিং ছেড়ে দিয়ে সাঙ্গাকারার রান ৮৬ ম্যাচে ৯ হাজার ২৮৩। ৩১ সেঞ্চুরি পেয়েছেন কিপিং ছাড়ার পর। ব্যাটিং গড় লাফিয়ে ওঠে ৬৬.৬৮ তে। মুশফিকের জন্যও কি এমন কিছু অপেক্ষা করছে? নতুন পথচলায় মুশফিক সেই প্রস্তুতিই আজ নিয়েছেন ইন্দোরে।


ইন্দোর/ইয়াসিন/পরাগ

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন