[দ্বিতীয় পর্ব]
আমরা সকাল আটটায় বেরিয়ে পড়লাম লোয়ার ভ্যালির সওমুর শহরের দিকে। প্যারিস থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমে গিয়ে আমরা এ-১০ হাইওয়েতে প্রবেশ করলাম। তার আগে অতিক্রম করলাম প্যারিসের শহরতলির ঘিঞ্জি বহুতল আবাসিক এলাকা। প্যারিসের কেন্দ্রে যে মোহিনী চাকচিক্যের রূপ, তার ছিটেফোঁটাও নেই শহরতলিতে। শুধু মানুষের ভিড় বেশি তা নয়—দারিদ্র্য আর নিরানন্দ ম্লান করে রেখেছে প্রান্তিক এই জনপদ।
বেশ কিছুক্ষণ লাগল শহরতলি অতিক্রম করে খোলা জায়গায় আসতে। দুদিকে একতলা, দোতলা বাড়ি আর তাদের পেছনে সবুজ মাঠ দেখে বোঝা গেল আমরা কান্ট্রিসাইডে পৌঁছেছি। তারপর দেখা গেল রাস্তার দুপাশে শস্যক্ষেত। যন্ত্র দিয়ে চাষ করা হয়েছে এই বিশাল ক্ষেতগুলো। স্কট পাশের দিকে তাকিয়ে বলল, মাঠে এখন বার্লি আর গমের গাছ বড় হচ্ছে। দেখে মনে হচ্ছে ফলন ভালোই হবে।
ভিনইয়ার্ডের মালিক হওয়ার পর সে কৃষি-সংক্রান্ত ব্যাপারে আগ্রহী এবং ওয়াকিবহাল হতে শুরু করেছে—বুঝলাম। অনেকক্ষণ বাইরে তাকিয়ে সে বলল, এবারে স্প্রিং থেকে সামার পর্যন্ত সানশাইন বেশ ভালো যাচ্ছে। দিস ইজ গুড। আমি বললাম, গম আর বার্লি কি রোদের তেজের ওপর নির্ভর করে? স্কট বলল, না। তাদের ফলন বৃষ্টির ওপর নির্ভর করে। কিন্তু গ্রেপস ডিপেন্ড অন সানশাইন। রোদ কমবেশি হলেই ভিন্টেজ বদলে যায়। এ বছর সানশাইন ইজ বিহেভিং ওয়েল। আর একটা মাস এভাবে চললে রেকর্ড হারভেস্ট হবে। কথা বলতে বলতে আমরা বিশাল ফসলের মাঠের শেষে দিগন্ত দেখতে পেলাম। সারি দিয়ে পপলার গাছ দাঁড়িয়ে আছে যেন অতন্দ্র প্রহরায় অচঞ্চল। দূরে গ্রামের হলুদ, ধূসর একতলা বাড়ি, সাদা রঙের গির্জার চূড়া দেখা যায়।
এরপর আমরা এ-৮৫ হাইওয়ে দিয়ে যেতে থাকলাম। কিছু পর মেসি নামে এক ছোট শহর এল। স্কট জানাল, এটি মিডিয়েভাল পিরিয়ডের। যেতে যেতে একটা পুরোনো দুর্গ দেখতে পেলাম। এরপর এল অরলিঁ। আমি বললাম, জোয়ান অফ আর্কের শহর? স্কট বলল, হ্যাঁ। শহরের কেন্দ্রে তাঁর ভাস্কর্য আছে। বছরে একবার ভাবগম্ভীর পরিবেশে তাঁর স্মরণে উৎসব উদ্যাপিত হয়। শুনে আমি তন্ময় হয়ে গেলাম। ইতিহাস এসে যেন কানে কানে কথা বলে। সে কথা স্কটকে বলতে পারলাম না—সে হেসে আবার আমাকে সেন্টিমেন্টাল বলবে।
অরলিঁ শহরের পাশ দিয়েই লোয়ার নদী বয়ে গেছে। অদূরে দেখা যায় তার প্রশস্ত বিস্তার। সেইনের মন্দগতির তুলনায় এই নদী খরস্রোতা; মাঝে মাঝে চর দেখা যায়। এরপর এল ব্লোয়া—এক শ্যাটু-নগর। তার নিচ দিয়ে প্রবাহিত লোয়ার নদী। আমাদের গাড়ি আবার এ-১০-এ উঠল। কিছু পর পৌঁছালাম আম্বোয়াজে—রাজকীয় দুর্গনগরী। নদীর ওপারে টিলার ওপর শ্যাটু, যেখানে সম্রাট প্রথম ফ্রাঁসোয়া দরবার বসাতেন। এই তীরে ঐতিহাসিক শহর।
স্কট বলল, কাছেই ক্লো লুস যেখানে এক ম্যানর হাউসে সম্রাট প্রথম ফ্রাঁসোয়া দা ভিঞ্চিকে থাকতে দিয়েছিলেন। সেখানেই তিন বছর থাকার পর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। বাড়িটি এখন দা ভিঞ্চি মিউজিয়াম। দেখতে যাবে? শুনে আমি প্রায় লাফিয়ে উঠলাম। বললাম, অবশ্যই যাব! স্কট বলল, মিউজিয়াম দেখার পর আমরা ক্লো লুস গ্রামে লাঞ্চ করতে পারি। গ্রামীণ ব্রাসারি—নো ফ্রিল, কান্ট্রি রেসিপি। চলবে?
বিলক্ষণ চলবে। দা ভিঞ্চির গ্রামে গিয়ে নাক উঁচু করা যায় না। স্কট ব্রুনোকে ফরাসিতে নির্দেশ দিল। বুঝলাম, তাকে ক্লো লুস গ্রামে যেতে বলছে। ব্রুনো হেসে গাড়ি ঘুরিয়ে আম্বোয়াজ শহরের দিকে যেতে থাকল। রাস্তা এখানে অপরিসর—দুটো গাড়ি কষ্টেসৃষ্টে যাওয়া-আসা করতে পারে। কিছু পর আমরা আম্বোয়াজ শহর পার হয়ে ক্লো লুস গ্রামে পৌঁছালাম। সাইনবোর্ডে লেখা—মিউজে দ্য লিওনার্দো দা ভিঞ্চি। গ্রামের জন্য এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ স্থান। এখানে রেনেসাঁ শিল্পীর শেষ জীবনের স্মৃতিচিহ্ন দেখতে দেশ-বিদেশের পর্যটক আসে। এই মিউজিয়ামকে কেন্দ্র করে পাড়াগাঁ ক্লো লুস শুধু মর্যাদায় কুলীন হয়নি, আর্থিকভাবেও উপকৃত হয়েছে। পর্যটকদের থাকার জন্য গ্রামে কয়েকটি থ্রি-স্টার হোটেল হয়েছে; আছে কয়েকটি ক্যাফে আর ব্রাসারি। আমাদের মিউজিয়ামের দিকে যেতে দেখে গ্রামের কয়েকজন মানুষ হাত নেড়ে স্বাগত জানাল।
মিউজিয়ামের গেটের কাছে ব্রুনো গাড়ি থামাল। দেখলাম, আরও কয়েকজন ভিজিটর এসেছে। তারা ঘুরে ঘুরে দেখছে আর ক্যামেরা দিয়ে ছবি তুলছে। এই মিউজিয়ামে অরিজিনাল পেইন্টিং নেই, তাই ছবি তোলা নিষিদ্ধ নয়। আমরা প্রথমে মিউজিয়ামের প্রাঙ্গনে রাখা এক্সহিবিটগুলো দেখলাম। ধাতু দিয়ে তৈরি বিশাল আকারের, দেখতে অদ্ভুত কিছু মেশিন রাখা আছে। কেয়ারটেকার একটি দেখিয়ে বলল, হেলিকপ্টার। হ্যাঁ, লিওনার্দো দা ভিঞ্চিই প্রথম হেলিকপ্টারের নকশা এঁকেছিলেন। প্রাঙ্গণে একটি ফোল্ডিং ব্রিজের প্রোটোটাইপও দেখা গেল। সেই সময়ে এমন ব্রিজের ধারণা ছিল নতুন। দ্রষ্টব্যের মধ্যে আরও আছে বিভিন্ন ধরনের যুদ্ধজাহাজের নকশা ও মডেল।
দা ভিঞ্চি কি নিজে তৈরি করেছিলেন এসব মেশিন, প্রোটোটাইপ? আমাদের প্রশ্নের উত্তরে কেয়ারটেকার বলল, তিনি নোটবুকে ডিজাইন এঁকেছেন। সেই ডিজাইন দেখে পরে মেশিন, যানবাহন, ব্রিজ তৈরি করা হয়েছে। তিনি এখানে এসেছিলেন এক হাতে পক্ষাঘাত নিয়ে। তাঁর পক্ষে কেবল নোটবুকে লেখা আর ড্রয়িং করাই সম্ভব ছিল। তিনি তাই করেছেন। সম্রাট প্রথম ফ্রাঁসোয়া তাঁকে কোনো ফরমায়েশি কাজ করতে দেননি। হ্যাঁ, এটা আমাদের জানা ছিল।
এরপর আমরা দা ভিঞ্চির বাসভবনে প্রবেশ করলাম। পাথরখণ্ড দিয়ে তৈরি বাড়ি— যেমন গ্রামের অন্য সব দালান, দোকান আর স্থাপনা। ঢুকতেই যে বড় হলঘর, সেখানে কয়েকটি মাঝারি ও ছোট আকারের মেশিনারি আর জলযানের প্রোটোটাইপ দেখা গেল। এক পাশের দেয়ালে বড় ফায়ারপ্লেস। অন্য দেয়ালে ফ্রেমে বাঁধানো ছবির রিপ্রোডাকশন। বড় ছবিতে ক্লো লুসে আসার পর দা ভিঞ্চির জীবনযাপনের টাইমলাইন। শোবার ঘরে গিয়ে দেখা গেল খুব সাধারণ একটি খাট। পাশের স্টাডি রুমে কাঠের বড় টেবিলে অনেক খাতাপত্র কাচের নিচে রাখা। দা ভিঞ্চির যে নোটবুক একইভাবে রাখা আছে, সেটি অরিজিনাল কি না—কেয়ারটেকার নিশ্চিত করে বলতে পারল না।
ছোট মিউজিয়াম দেখার খুব বেশি কিছু নেই। কিন্তু রেনেসাঁর এত বড় প্রতিভা এই বাড়িতে জীবনের শেষ তিন বছর কাটিয়েছেন, নানা রকমের ডিজাইন করেছেন এ কথা মনে হতেই শিহরণ জাগে। শিল্পী, সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীদের কাছে এই বাড়ি নিঃসন্দেহে তীর্থস্থান। এখানে এসে সম্রাট প্রথম ফ্রাঁসোয়াকেও সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করতে হয়। তিনি গুণীর মর্যাদা বুঝেছিলেন এবং দা ভিঞ্চি ছবি আঁকতে না পারলেও তাঁর আরাম-আয়েশের সব ব্যবস্থা করেছিলেন। এমনকি লোয়ার নদীর ওপরে টিলায় তাঁর যে রাজকীয় শ্যাটু আম্বোয়াজ, সেখানে দা ভিঞ্চি যেন সহজে যেতে পারেন, তার জন্য তৈরি করিয়েছিলেন একটি আন্ডারগ্রাউন্ড টানেল। সেই শ্যাটুর চ্যাপেল প্রাঙ্গণে ভিঞ্চির মরদেহ সমাহিত।
প্রথমে অবশ্য তাঁকে সমাহিত করা হয়েছিল অন্য এক রাজকীয় সমাধিভূমিতে। ফরাসি বিপ্লবের সময় সেই চ্যাপেল ও সমাধিভূমি ধ্বংস হয়ে গেলে তাঁর অস্থি সংগ্রহ করে পুনরায় সমাধিস্থ করা হয় আম্বোয়াজ শ্যাটুর চ্যাপেলে। (চলবে)
সূচনা পর্ব : প্যারিস ও প্যারিসের বাইরে ১৯৮৪