সূচনা পর্ব
প্যারিস ও প্যারিসের বাইরে ১৯৮৪
হাসনাত আবদুল হাই || রাইজিংবিডি.কম
ব্যবসা করে স্কট এখন নভঁ রিশ (nouveau riche), নব্য ধনীদের একজন হয়ে গিয়েছে। এভিনিউ ভন ক্লেবারের ভাড়া করা পুরোনো অ্যাপার্টমেন্ট ছেড়ে সে কিনেছে প্যারিসের পশ্চিমে নেউলি-সুর-সেইন এলাকায় নতুন তৈরি বহুতল ভবনে এক বিশাল অ্যাপার্টমেন্ট। বিয়ে করেছিল এক প্যারিসিয়ান মেয়েকে। তার বউ যে হেটেরোসেক্সুয়াল, জানা ছিল না তার। জানার পর ঝগড়া-ঝাটি হয়েছে দুজনের মধ্যে; মিথ্যা বলার অভিযোগ তুলেছে সে। তারপর এক সকালে স্যুটকেসে কাপড়চোপড় গুছিয়ে চলে গিয়েছে ম্যারি-এন, তার লেসবিয়ান বন্ধুর সঙ্গে থাকতে। সেই থেকে স্কটের বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্টে একাই থাকছে সে। একাধিক মেয়েবন্ধু হয়েছে তার; কিন্তু সে ঘরপোড়া গরুর মতো বিয়ের কথা এলেই পেছনে সরে আসে। আমার মতোই চল্লিশের ঘরে বয়স তার। সে মনে করে, বিয়ে করে সংসার করার বয়স পার হতে এখনও দেরি আছে।
আমি রোমে এফএওর কনফারেন্স শেষে লন্ডনে কয়েক দিন কাটিয়ে প্যারিসে এসেছি। Food and Agriculture Organization -এর কনফারেন্স ছিল রোমে। Charles de Gaulle Airport-এ শোফেয়ার ব্রুনোকে দিয়ে স্কট তার পিউজো গাড়ি পাঠিয়েছিল আমাকে নিয়ে যেতে। সে যে এলাকায় থাকে, সেটি নতুন আবাসিক এলাকা; প্যারিসের ২০টি অ্যারোঁদিসমঁ (ডিস্ট্রিক্ট)-এর মধ্যে পড়ে না। কমিউন হিসেবে এর পরিচিতি। কমিউনের নিজস্ব স্থানীয় সরকার বা মিউনিসিপ্যালিটি আছে। ট্যাক্সের বিনিময়ে সিভিক সার্ভিস পরিবেশনের দায়িত্ব পালন করে মিউনিসিপাল কর্তৃপক্ষ। রাস্তা-ঘাট রক্ষণাবেক্ষণ থেকে স্কুল পরিচালনা—সব দায়িত্ব কমিউনের। এ দিক দিয়ে অ্যারোঁদিসমঁর মিউনিসিপাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নেউলি-সুর-সেইন কমিউনের মেয়রের দায়িত্বের মধ্যে কোনো তফাত নেই।
স্কটের অ্যাপার্টমেন্ট যে বাড়িতে, সেটি এভেন্যু দ্য গলের ওপর, মানে পাশেই। ড্রাইভার ব্রুনো জানাল, এই রাস্তা পূর্ব দিকে পোর্ত মাইয়োর কাছে প্যারিসের ১৬ নম্বর অ্যারোঁদিসমঁতে গিয়ে মিলেছে। সে আরও জানাল, নেউলি-সুর-সেইনেরও প্যারিসের অ্যারোঁদিসমঁগুলোর মতো নিজেদের নির্বাচিত মেয়র আছেন; কিন্তু তিনি প্যারিসের অন্য অ্যারোঁদিসমঁর মেয়রদের মতো প্যারিসের মেয়রের অধীনে নন।
স্কটের বাড়ির লাউঞ্জে ঢুকে মনে হলো আধুনিক কোনো হোটেলের লবি। রিসেপশন ডেস্কে শোভা পাচ্ছে ফুলদানিতে তাজা ফুল। ডেস্কের ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে সুসজ্জিতা, পরিমিত প্রসাধনচর্চিত মুখ নিয়ে হাস্যনন্দিতা এক তরুণী। অনুমান করলাম, সেই এই বাড়ির অন্যতম কনসিয়ের্জ। তার সঙ্গে স্কটের এভেনিউ ভন ক্লেবারের বাড়ির কনসিয়ের্জের তুলনা করলে যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য দেখা দেবে, তা সেই প্রৌঢ়ার প্রতি সুবিচার করবে না। প্রকৃতপক্ষে এই তরুণীকে কনসিয়ের্জ বলা হলেও, সেই নামের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তুলনা না করে তাকে ফেলতে হয় আধুনিক রিসেপশনিস্টদের শ্রেণীতে। দে আর এ ব্রিড অ্যাপার্ট—সেই জন্য অতুলনীয়।
তরুণীর সঙ্গে আমার কথা হলো না; সে ‘বঁজুর’ বলার পর ড্রাইভার ব্রুনোই তার সঙ্গে কথা বলে আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে আমাকে নিয়ে লিফটের কাছে গেল। দেখলাম, কনসিয়ের্জের মতো লিফটও আধুনিক। কলাপসিবল গেট টেনে বন্ধ বা খুলতে হয় না। লিফটের ভেতরে যে সুরভিত গন্ধ, তাও ডিওডোরেন্ট স্প্রে করার ফলে—বয়স ও কৌলিন্যের জন্য নয়। লবি দেখে আর লিফটে উঠে বনেদি প্যারিসে এসেছি—এ কথা মনে হলো না আমার। ‘লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট অ্যান্ড সাউন্ড’ বলতে যা বোঝায়, তা হলো না এবার প্যারিসে এসে।
রাতে তার পাড়াতেই এক ব্রাসারিতে ডিনার খাওয়াতে নিয়ে যেতে চেয়েছিল স্কট। আমি বললাম, সাঁজে-লিজেতে জর্জ দ্য ফিফথ কাফেতে ‘মাদাম স্যান্ডউইচ’ খেতে চাই। শুনে স্কট অবাক হয়ে বলল, সাঁজে-লিজেতে নাম করা অনেক ক্যাফে আছে। তাদের মধ্যে কাফে জর্জ দ্য ফিফথ পড়ে বলে শুনিনি। তুমি ওখানে যেতে চাও কেন? আর ডিনারে মাদাম স্যান্ডউইচ খেতে চাওয়ার মানে কী? আমি বলি, মনে নেই—প্রথমবার প্যারিস এসে ওই কাফেতেই আমি রাত কাটিয়েছি, তুমি সকালে বাসায় ফিরবে তার অপেক্ষায়। তারপর ১৯৭২ সালে এসে সেখানে গিয়েছি। তুমি তখন প্যারিসে ছিলে না। গিয়েছিলাম এমিলি নামে এক মেয়ের সঙ্গে। এবারও একবার যেতে চাই।
স্কট হেসে বলল, Now I remember. সেই ক্যাফেতো তাহলে তোমার জন্য তীর্থস্থান হয়ে গিয়েছে। এব (আমার আবদুল নামের অপভ্রংশ), তুমি বড় সেন্টিমেন্টাল। এত পুরোনো স্মৃতি আঁকড়ে রেখেছ। কোনো মানে হয় না এ ধরনের সেন্টিমেন্টের। নতুন অভিজ্ঞতা পেতে হবে—জীবনের নিয়ম তাই। তারপর সে বলল, বেশ, নিয়ে যাব তোমাকে সাঁজে-লিজের কাফে জর্জ দ্য ফিফথে। You can indulge in your remembrance of things past. শুনে আমি বললাম, ক্যাফেতে বসেছিলেন কি না জানি না। কিন্তু তিনি সাঁজে-লিজেতে হাঁটতে যেতেন।
জানি। তা তুমিও কি সেখানে গিয়ে কিছু দেখে পুরনো স্মৃতি ফিরে পাও? ইনভলান্টারি মেমরি রিকলেকশন? প্রুস্তের মতো—যেভাবে কম্ব্রে গ্রামে মাদেলিন কেক খাওয়ার সময় তাঁর পুরনো স্মৃতি ফিরে এসেছিল? আমি বলি, অ্যাসোসিয়েশন ইফেক্ট একটা নিশ্চয়ই হয়।
সাজেঁ-লিজেঁতে গিয়ে ক্যাফে জর্জ দ্য ফিফতে বসার খালি টেবিল পেতে সময় লাগল। আমি তাকিয়ে দেখলাম, সব ক্যাফের একই অবস্থা। যারা বসে আছে, তাদের মধ্যে বোরকা পরা মেয়ে রয়েছে কয়েকজন। তাদের সঙ্গের পুরুষরা আরবিতে একটু জোরেই কথা বলছে। স্কট বলল, ট্যুরিস্ট অ্যাট্রাকশন হয়ে জায়গাটা দিন দিন ওভারক্রাউডেড হচ্ছে। এ ভার্চুয়াল ট্যুরিস্ট ট্র্যাপ। এখানে রিল্যাক্স করার পরিবেশ নেই। তুমি আসতে চেয়েছিলে, তাই নিয়ে এলাম। আমি বললাম, জায়গাটা দেখা হলো। আমরা এখন অন্য কোথাও যেতে পারি। স্কট বলল, তার উপায় নেই। ব্রুনো গাড়ি পার্ক করতে গেছে। তাকে আমি এক ঘণ্টা পর আসতে বলেছি।
একটু পর একটা টেবিল খালি হলে আমরা সেখানে গিয়ে বসলাম। স্কট তাকিয়ে বলল, এই ভিড়ের মধ্যে বলতে গেলে ফরাসিরা প্রায় নেই। আমি বললাম, কেন নেই? ভিড় এড়াতে? স্কট বলল, এখন সামার। প্যারিসিয়ানরা দক্ষিণে সমুদ্রতীরে গেছে হলিডে করতে—সাঁ ত্রপে, কান—এইসব ফ্রেঞ্চ রিভিয়েরা সি-বিচে। আমি বললাম, তুমি যাবে না? স্কট বলল, যাব। তবে রিভিয়েরায় না। লোয়ার নদীতীরে এক ভিনইয়ার্ডে—আঙুরের বাগান আর মদ তৈরির শ্যাটুতে। তারপর বলল, ‘ভাইন’ না বলে ‘ভিন’ বলে ফরাসিতে। হঠাৎ সেখানে কেন? আমি জিজ্ঞাসা করলাম।
স্কট বলল, আমি এ বছর লোয়ার নদীতীরের ভিনইয়ার্ড আর শ্যাটু কিনেছি। আঙুরের ফলন আর ভিন্টেজ দেখতে যাব। শুনে আমি বললাম, দারুণ! তুমি ওয়াইনমেকার হয়ে গেলে! স্কট বলল, হোয়াইল ইন রোম। আমি বললাম, কবে যাবে? স্কট বলল, আগামীকাল সকালে। আমি অবাক হয়ে বললাম, কাল সকালে? আমি এলাম আর তুমি চলে যাবে—এটা কেমন হয়?
স্কট বলল, তুমিও যাবে আমার সঙ্গে। ফ্রান্সের গ্রামাঞ্চল দেখোনি। এবার দেখবে। এক দিনের ট্রিপ। সেখানে গিয়ে রাতে থাকতে পারি, ফিরেও আসতে পারি। অবশ্য ফিরতে রাত হবে। তুমি যা চাও। এই ট্রিপ আমি তোমার জন্যই ঠিক করেছি। না হলে তুমি চলে যাওয়ার পরও যেতে পারতাম। কী, যেতে মন চায়? আমি উচ্ছ্বসিত হয়ে বললাম, অবশ্যই! চান্স অফ আ লাইফটাইম। কে মিস করবে?
আমাদের কথার মধ্যে পাশের টেবিলে ঝগড়া শুনতে পেলাম। আরবিতে উচ্চস্বরে কথা বলছে দুজন। অন্য টেবিল থেকে দুজন এসে যোগ দিল তাদের সঙ্গে। কোলাহল বেড়ে গেল। স্কট বলল, আলজেরিয়ানরা। প্যারিসে তারা ভরে গেছে। কালচার ক্ল্যাশ। এ দেশের কালচারের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারেনি। মনে হয় চায়ও না। এসো, তাড়াতাড়ি খেয়ে আমরা কেটে পড়ি। উই হ্যাভ আ লং ট্রাভেল বাই রোড টুমরো। তারপর সে বলল, আচ্ছা তুমি ‘মাদাম স্যান্ডউইচ’ খেতে চাইলে কেন? আরও ভালো খাবার আছে এখানে। হোয়াই স্যান্ডউইচ?
আমি শরমিন্দা হয়ে বললাম, ওই যে প্রথম রাতে এক ফরাসিনীকে নিয়ে এসেছিলাম। সে এই স্যান্ডউইচের অর্ডার দিয়েছিল। শুনে স্কট হো হো করে হাসল। হাসি থামিয়ে বলল, ইউ আর রিয়েলি সেন্টিমেন্টাল। স্যান্ডউইচ দেখলে তোমার প্রুস্তের মতো ইনভলান্টারি মেমরি ফিরে আসে। আরেন্ট ইউ সামথিং? আমেরিকান স্ল্যাং। বাংলা করলে দাঁড়ায়—তুমি একটা চিজ বটে।
আমার যে স্যান্ডউইচ এল, সেটায় রুটির সঙ্গে চিজ আর বিফ। এক ঘণ্টা পর ব্রুনো সাজেঁ-লিজেঁর নির্ধারিত স্থানে গাড়ি নিয়ে এল। ভেতরে ঢুকে পিছনের সিটে বসে স্কট বলল, দ্য ট্রাফিক ইজ অ্য ফুল। প্রতি মাসেই গাড়ি বাড়ছে। আমি বললাম, বেশি মানুষ গাড়ি কিনছে? তাদের স্ট্যান্ডার্ড অফ লিভিং বেড়েছে? হ্যাঁ। সেটা একটা ফ্যাক্টর। আমেরিকান পদ্ধতিতে ইনস্টলমেন্ট পেমেন্টে গাড়ি কেনার সুযোগ অনেক মধ্যবিত্তকে সাহায্য করছে। আর প্যারিসে গাড়ির সংখ্যা বাড়ার তৃতীয় কারণ হলো—অনেক ট্যুরিস্ট গাড়ি নিয়ে আসছে যাতায়াত খরচ কমাতে। ইংল্যান্ড, ইউরোপের বিভিন্ন দেশ তো আছেই, আমেরিকা থেকেও গাড়ি নিয়ে আসছে ট্যুরিস্টরা। সামার আর অটামে তাদের গাড়ির ভিড়ে রাস্তায় ট্রাফিক জ্যাম এখন নৈমিত্তিক ব্যাপার। সবচেয়ে বড় সমস্যা দেখা দিয়েছে পার্কিং নিয়ে। দেখলে না, ব্রুনোকে পাঠিয়ে দিতে হলো দূরে পার্কিংয়ের জন্য? পাঁচ বছর আগে সাজেঁ-লিজেঁতেই গাড়ি পার্ক করা যেত।
নিউলি-সুর-সেইনে এসে স্কটের বাড়ির লাউঞ্জে ঢুকে দেখি রিসেপশন ডেস্কে আরেক তরুণী ডিউটি করছে। একই তার সাজসজ্জা আর প্রসাধন। মডার্ন অ্যাপার্টমেন্টে কনসিয়ের্জের ভূমিকা স্ট্রিমলাইনড হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের আচরণও স্ট্যান্ডার্ডাইজড হয়ে গেছে। একজনের থেকে অন্যজনের পার্থক্য শুধু নামে, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে নয়। আমি স্কটের এভেন্যু ভন ক্লেবারের বাড়ির প্রৌঢ়া কনসিয়ের্জকে মিস করি। তাঁর সেই আর্দ্র, সওয়ার্দি উপস্থিতি আর মেলোড্রামাটিক আচরণ তাঁকে রক্তমাংসের মানুষ হিসেবে দেখিয়েছিল। তুলনায় এই বাড়ির পলিশড কনসিয়ের্জরা যেন রোবটের মতো যান্ত্রিক—বড্ড বেশি ভদ্র এবং এফিসিয়েন্ট। (চলবে)
ঢাকা/তারা//