সারা বাংলা

বরগুনায় ২০ দিনে ২২ মরদেহ উদ্ধার, আতঙ্ক 

বরগুনার বিভিন্ন এলাকা থেকে গত ২০ দিনে নারী-পুরুষ ও শিশুসহ ২২ জনের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। একের পর এক মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন জেলার বাসিন্দারা। স্থানীয়রা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি দাবি করলেও পুলিশ বলছে ভিন্ন কথা। 

গত ৩ জুন (বুধবার) বরগুনা জেলা পরিষদের ডাক বাংলোর মতো নিরাপদ স্থানের দুটি কক্ষ থেকে পৌর শহরের কালিবাড়ী এলাকার দুলাল চন্দ্র বিশ্বাসের স্ত্রী ইতি রানী (৩৪) ও তার দুই মেয়ে আরাধা বিশ্বাস (১২) ও অনুরাধা বিশ্বাসের (৩) মরদেহ উদ্ধার হয়। বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাদের মরদেহ উদ্ধার করে।

আরো পড়ুন: ঘুমিয়ে ছিলেন বাসায়, ভোরে মরদেহ মিলল সড়কের পাশে 

এ ঘটনার পাঁচদিন পর ৮ জুন (সোমবার) সকাল সাড়ে ১১টার দিকে বরগুনা সদর উপজেলার গৌরীচন্না ইউনিয়নের গৌরীচন্না বাজার সংলগ্ন ব্রিজের পশ্চিম পাশের খালের কচুরিপানার ভেতর থেকে গরু ব্যবসায়ী শামীম বেপারীর (৪০) মাথাবিহীন মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। মরদেহ উদ্ধারের ১০ দিন পরেও শামীমের মাথা উদ্ধার করতে ব্যর্থ হয়েছে তারা। শামীম একই এলাকার মনসুর বেপারীর ছেলে। 

১২ জুন (শুক্রবার) বিকেল ৫টার দিকে পাতাকাটা গ্রামে বদরখালী ইউনিয়ন পরিষদ প্যানেল চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তফাকে কুপিয়ে জখম করার ঘটনায় অভিযুক্ত কালু বাহিনীর প্রধান কালু ওরফে ইব্রাহিম হোসেন কালু ওরফে বস্তি কালু গ্রামবাসীর গণপিটুনিতে নিহত হন। এরপর সন্ধ্যায় পুলিশ গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। ওই এলাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করেন পুলিশ সুপার। 

আরো পড়ুন: প্যানেল চেয়ারম্যানকে কুপিয়ে জখম, গণপিটুনিতে সন্ত্রাসী নিহত 

গত ১৩ জুন বরগুনার পাথরঘাটায় মিজানুর রহমান (৪৫) নামে এক অটোরিকশা চালকের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। সেদিন ভোরে পৌরসভার পানি উন্নয়ন বোর্ড সড়ক থেকে তার মরদেহ উদ্ধার হয়।

ফাইল ফটো

স্বজনরা জানান, সেদিন রাতে নিজ বাসায় ঘুমিয়ে ছিলেন রিকশাচালক মিজান। সকালে তার রক্তাক্ত মরদেহ পাওয়া যায় বাসার সামনে। স্থানীয়রা খবর দিলে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে।

আরো পড়ুন: মা ও দুই মেয়ের মরদেহ উদ্ধারের ৭ দিন পর হত্যা মামলা

এইদিন ২৪ ঘণ্টায় জেলার তিন উপজেলা থেকে পাঁচজনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। 

পরের ২৪ ঘন্টা পাড় না হতেই ১৪ জুন (রবিবার) বরগুনার তালতলী থানায় কর্মরত কনস্টেবল ফারুক গাজীর লাশ উদ্ধার করা হয় পুলিশ ব্যারাক থেকে। 

পুলিশ জানায়, শনিবার রাতে ডিউটি শেষ করে ভোরের দিকে থানার ব্যারাকে এসে ফারুক গাজী ঘুমিয়ে পড়েন। সকাল ৯টার দিকে অর্ধমৃত অবস্থায় ব্যারাক থেকে সহকর্মীরা উদ্ধার করে তাকে তালতলী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানকার চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এসময় তার পাশে তিন পৃষ্ঠার একটি চিরকুট উদ্ধার করা হয়। চিরকুটে তিনি লিখে গেছেন, তিনি আত্মহত্যা করেছেন, তার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়।

আরো পড়ুন: বরগুনায় মাথাবিহীন মরদেহ উদ্ধার

বরগুনা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের তথ্য বলছে, চলতি মাসের ১৮ দিনে জেলার বিভিন্ন জায়গা থেকে ২১টি মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। স্থানীয়রা বলছেন, সন্ধ্যা নামলেই আতঙ্কে থাকেন তারা। প্রতিদিন সকাল থেকেই মেলে মরদেহ উদ্ধারের খবর। 

বরগুনার সচেতন মহলের নাগরিক ও সাবেক ফটো সাংবাদিক আরিফুর রহমান আরিফ বলেন, “প্রতিদিন মরদেহ উদ্ধারের খবরে জেলাজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে এক মাসের মধ্যে এত এত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা আগে কখনো হয়নি। মানুষ ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছে।” 

সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘দুর্বার’-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি খান নাঈম বলেন, “মানুষের নিরাপত্তা নেই। সন্ধ্যা হলেই জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কেউ আর বের হয় না ঘর থেকে। স্কুল কলেজগামী শিক্ষার্থীদের মধ্যেও আতঙ্ক বিরাজ করছে। পরিস্থিতি এমন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে যে, এখন সুস্থ্য মানুষের দম বন্ধ লাগে‌।”

বরগুনার সমাজকর্মী, প্রবীণ সাংবাদিক ও লোক বেতারের পরিচালক মনির হোসেন কামাল বলেন, “মানুষ ভয়ে আতঙ্কে দিন পার করছে, আর পুলিশ বলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক। পুলিশের বক্তব্য বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভেঙে পড়েছে গোটা জেলায়। বর্তমান পুলিশ প্রশাসন পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ব্যর্থতার প্রমাণ দিয়েছে।” 

এদিকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতিতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে রাতে কাজ করা শ্রমিকদের মধ্যে। বরগুনা সদরের ধুপতি এলাকার রিকশাচালক স্বপন মিয়া বলেন, “আমরা রাতে রিকশাচালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করি। দিনে যা আয় করি তাতে সংসার চলে না। এখন চারপাশে শুধু মৃত্যুর খবর। তাই রাতে রিকশা চালাতে ভয় লাগে।”

বুড়িরচর এলাকার মনিরুল ইসলাম মনির ২৭ বছর ধরে রিকশাচালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। তিনি বলেন, “রাতে বাসস্ট্যান্ড থেকে ঢাকা থেকে আসা যাত্রীদের গন্তব্যে পৌঁছে দেই। ২৭ বছরে কখনো ভয় কাজ করেনি। এমনকি ৫ আগস্টের পরেও নির্বিঘ্নে রিকশা চালিয়েছি রাতে। এখন রাতে দূরে যেতে ভয় পাই। প্রতিদিন শুধু লাশ উদ্ধারের খবর পাই। আমরা আমাদের নিরাপত্তা চাই।” 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বরগুনার পুলিশ সুপার কুদরত-ই-খুদা বলেন, “২২টি মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। ২২টি মরদেহ উদ্ধারের পর চারটি হত্যা মামলা হয়েছে। বাকি ঘটনায় অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করেছে পুলিশ বাদী হয়ে।” 

তিনি বলেন, “এরমধ্যে কিছু আছে দুর্ঘটনায় মৃত্যু, কিছু আছে আত্মহত্যা। তবে, তিনটি সরাসরি হত্যাকাণ্ড বলে নিশ্চিত হতে পেরেছি‌। সবকটি ঘটনায় তদন্ত চলছে।” 

সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, “আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়নি। সব কিছু স্বাভাবিক অবস্থায় আছে।” 

পুলিশ সুপার ৯টি ঘটনা আত্মহত্যা বলে উল্লেখ করেছেন। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট আসার আগেই আত্মহত্যা বলে উল্লেখ করায় পুলিশ সুপারকে প্রতিবেদক প্রশ্ন করেন- সরাসরি আত্মহত্যা বলা আইন সমর্থন করে কিনা? তিনি উত্তরে বলেন, “প্রাথমিকভাবে মনে হয়েছে আত্মহত্যা। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট আসলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”