সেই আব্দুল গাফফার সাকলায়েনের হাত ধরেই আসল মাহেন্দ্রক্ষণ। যাকে রাজশাহী ওয়ারিয়র্স বলেছিল, ‘ট্র্যামকার্ড।’ তার স্লোয়ারে মুকিদুল টাইমিং মেলাতে না পেরে ক্যাচ দিলেন ডিপ মিড উইকেটে। মেহরবের হাতের মুঠোয় বল জমা হওয়ার আগেই রাজশাহীর ডাগআউট থেকে খেলোয়াড়রা ঢুকে গেলেন মাঠে।
সাকলায়েন করলেন চিরাচরিত ‘সিউ’ উদযাপন। মুশফিকুর দৌড়ে এসে ভেঙে দেন স্টাম্প। আর কী বলতে হবে? ওহ হ্যাঁ। নাজমুল হোসেন শান্তর দুই হাত ছড়িয়ে দেওয়া ভৌ-দৌড়। এরপর পুরো দল সেন্টার উইকেটে গোল হয়ে করলেন আনন্দ উৎসব।
সব উদযাপনের কারণ একটাই, রাজশাহী জিতে গেল বিপিএলের দ্বাদশ আসরের শিরোপা। একপেশে ফাইনালে চট্টগ্রাম রয়্যালসকে ৬৩ রানে হারিয়ে রাজশাহীর ঘরে গেল বিপিএলের ২৫ হাজার ডলারের হিরাখচিত শিরোপা।
আনন্দের রেশ ছড়িয়ে পড়েছিল চট্টগ্রামের ইনিংসের অর্ধেকতম ওভারের আগেই। ফাইনালে ১৭৫ রানের লক্ষ্য তাড়ায় চট্টগ্রাম ছিল বেসামাল। ৭২ রান তুলতেই ৫ উইকেট নেই তাদের। সেখান থেকে লেজের ব্যাটসম্যানরা আর কতদূরই বা যাবেন? ১১১ রানে থেমে যায় চট্টগ্রামের নিষ্প্রাণ লড়াই। ৬৩ রানের বিশাল ব্যবধানে জয়টাই বলে দেয়, মিরপুর শের-ই-বাংলায় রাজশাহী ছিল কতটা অপ্রতিরোধ্য, কতটা দুর্বার, কতটা অনমনীয়।
তাদেরকে এই উপলক্ষ্য এনে দিয়েছেন ওপেনার তানজিদ হাসান। বাঁহাতি ওপেনার চার-ছক্কার ফুলঝুরিতে ১০০ রানের দৃষ্টিনন্দন ইনিংস খেলেন। যা গড়ে দেয় ফাইনাল ম্যাচের ব্যবধান। ৬ চার ও ৭ ছক্কায় ৬২ বলে শতরানের ইনিংসটি সাজান তিনি। তিন অঙ্ক ছোঁয়া ইনিংসটি খেলে তানজিদ পেয়েছেন ম্যাচসেরার পুরস্কার।
চট্টগ্রাম এই ম্যাচে বোলিংয়ে লড়াই করলেও ব্যাটিং ছিল একেবারে ছন্নছাড়া। বিশেষ করে তাদের ফিল্ডিং ছিল দৃষ্টিকটু। ৫৪ ও ৮৮ রানে তানজিদের দুইটি সহজ ক্যাচ ছাড়েন মুকিদুল ইসলাম মুগ্ধ ও মাহেদী হাসান। এছাড়া গ্রাউন্ড ফিল্ডিংয়ে শিরোপা জেতার মতো জোশ ছিল না। ম্যাচটা রাজশাহী খেলল, তারাই জিতল।
চট্টগ্রাম টস জিতে রাজশাহীকে ব্যাটিংয়ের আমন্ত্রণ জানায়। ওখানেই কী তারা ভুলটা করলো? যেভাবে তানজিদ ও শাহিবজাদা ব্যাটিং করলেন তাতে মনেই হচ্ছিল, ২২ গজে রান আছে। একেবারে সতেজ নতুন উইকেটে অনুষ্ঠিত হয় ফাইনাল। ব্যাটসমানরা অনায়েসেই শট খেলতে পারছিলেন। বিশেষ করে তানজিদ উইকেটের সুবিধা আদায় করে নেন দুহাত ভরে। স্পিনার ও পেসারদের যেভাবে শাসন করেছেন পাওয়ার প্লে’তে তাতে মনে হচ্ছিল বড় রানই আসবে তার ব্যাটে।
শুরুটা তেমনই হয়েছিল। ২৯ বলে ৫০ রানে পৌঁছতে ৬টি ছয় ও ২টি চার হাঁকান তিনি। বাঁহাতি ব্যাটসম্যান সেঞ্চুরিতে পৌঁছতে সময় নেন। ধীর হয়ে আসে তার ব্যাটিং। পরের ৩২ বলে পৌঁছান তিন অঙ্কের মাইলফলকে। বিপিএলে তানজিদের এটি তৃতীয় সেঞ্চুরি। ২০২৪ সালে প্রথম সেঞ্চুরি পেয়েছিলেন চট্টগ্রাম চ্যালেঞ্জার্সের জার্সিতে। খুলনার বিপক্ষে করেছিলেন ১১৬ রান। গত আসরে ঢাকা ক্যাপিটালসের হয়ে ১০৮ রান করেছিলেন রাজশাহীর বিপক্ষে। এবার রাজশাহীর জার্সিতে কাটায়-কাটায় একশ করলেন তানজিদ।
বিপিএলে তৃতীয় ক্রিকেটার হিসেবে তানজিদ সেঞ্চুরি করলেন। এর আগে ক্রিস গেইল ও তামিম ইকবাল বিপিএল ফাইনালে সেঞ্চুরি করেছিল। দুজনই সেঞ্চুরি করেছিলেন ঢাকা ডায়নামাইটসের বিপক্ষে পৃথক দুই আসরে। গেইল ও তামিম সেঞ্চুরির সঙ্গে শিরোপাও জিতেছিল। তানজিদ অনুসরণ করলেন তাদের পথই।
তানজিদ বাদে রাজশাহীর ইনিংসে অবদান রাখেন শাহিবজাদা (৩০) ও কেন উইলিয়ামসন (২৪)। শান্তর ব্যাট থেকে আসে ১১ রান। জিমি নিশাম অপরাজিত থাকেন ৭ রানে।
চট্টগ্রামের হয়ে ২টি করে উইকেট নেন শরিফুল ও মুকিদুল।
লক্ষ্য তাড়ায় চট্টগ্রামের ওপেনার মির্জা বেগ বাদে রান পাননি কোন ব্যাটসম্যান। ৩৬ বলে ২ চার ও ১ ছক্কায় ৩৯ রান করেন। স্থানীয় ক্রিকেটাররা হতাশ করেন। কোটি টাকার নাঈম শেখ ৯ রানে ফেরেন সাজঘরে। মাহমুদুল হাসান জয় খুলতে পারেননি রানের খাতা। হাসান নওয়াজ (১১), জাহিদুজ্জামান (১১) ও মাহেদী (৪) দ্রুত আউট হন। শেষ দিকে আসিফ আলীর ২১ রানে শতরান পেরোয় চট্টগ্রাম। নয়তো তাদের পরাজয়ের ব্যবধান আরো বড় হতো।
রাজশাহীর বোলার বিনুরা ফার্নান্দো ছিলেন দুর্দান্ত। ৩ ওভারে ৯ রানে ৪ উইকেট উইকেট নেন। নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে শুরুতে তিনি রানের চাকা থামিয়ে রেখেছিলেন। এছাড়া জিমি নিশাম ২ ও হাসান মুরাদ ৩ উইকেট নেন।
রাজশাহী টুর্নামেন্ট জুড়ে ছিল দুর্দান্ত। বিগ বাজেটে বড় তারকা ক্রিকেটারদের দলে ভেড়ানোর পাশাপাশি মাঠের ক্রিকেটে তারা ছিল বেশ গোছানো। স্থানীয়রা পারফর্ম করেছেন তালে তাল মিলিয়ে। মাঠে ভালো ক্রিকেট খেলায় সমর্থকদের সমর্থনও ছিল বেশ। মিরপুর শের-ই-বাংলা আজ রাজশাহীর জার্সিই ছিল বেশ। শোনা যায়, গত রাতেই ২২টি বাসে রাজশাহীর সমর্থকরা এসেছেন ঢাকায়। মাঠে পেশাদারিত্ব ও বাইরে গোছানো প্রতিটি পদক্ষেপেই রাজশাহীর ঘরে গেল বিপিএল শিরোপা। এখন শুধুই উৎসবের পালা। মিরপুরের ২২ গজেই যা শুরু হয়েছে।