ভ্রমণ

নেপালের সর্বোচ্চ ট্রেকিং পিক মেরা পর্বতে অভিযান

খুব সকালে ঘুম ভাঙলো। এখন পর্যন্ত ঠান্ডা সহনীয় পর্যায়ে। ব্যাগপ্যাক গুছিয়ে নাস্তার টেবিলে গেলাম। মেন্যুতে ডিম-রুটি-সবজি-চা। হাইলাক্স গাড়ির পিছনে আমাদের ব্যাগপ্যাক আর মালপত্তর বোঝাই হলো। পেছনের সিটে আমি, শাহনাজ,পাসাং এবং আরেকজন নেপালি। সামনে দুইজন, পাসাং আর একটা মেয়ে। নামচেবাজারে পার হয়ে আরো আগে যাবে সে। পাহাড়ি গ্রামের এক স্কুলে শিক্ষকতা করে।

গাড়িতে পাসাং আছে দুইজন। সামনে বসা আমাদের গাইড পাসাং আর পিছনে বসেছে আরেকজন পাসাং যে নাপালি তবে আমেরিকান বংশদ্ভূত। মাত্র গ্র্যাজুয়েশন শেষ করেছে রেডিওলোজিতে। তার পৈতৃক ভিটা সালেরি গ্রামে, তাই এখান থেকে জিপে চড়েছে।  সে লুকলা যাবে। মানে আমরা যেখানে নামবো তার থেকে আরো দুই ঘণ্টা হাঁটা পথ। তার গাইড লুকলাতে অপেক্ষা করছে। 

আমাদের সঙ্গে আমেরিকান উচ্চারণে কথা বলা শুরু করতেই বুঝেছিলাম সে হয়ত এ দেশে বড় হয়নি। পুরো রাস্তা যেতে যেতে এরপর আমরা তার বন্ধু বনে গেলাম। পাহাড়ে এই অল্প পরিচয়ের মানুষগুলোর সঙ্গে আমার কেমন জানি আত্মীক সম্পর্ক হয়ে যায়। এই ফাঁকে জানিয়ে রাখি, সালেরি থেকে সুরখে রাস্তাটুকু রীতিমতো রোলারকোস্টারে চড়ে যাত্রা। আমরা যেনো ঝালমুরি আর কৌটো হলো এই গাড়ি। 

সকাল নয়টায় চলা শুরু করে সুরখে পৌঁছাতে প্রায় সাড়ে ছয়টা বেজে গেলো। পাসাংকে নিতে তার গাইড অপেক্ষায় ছিল। একটু বিশ্রাম নিয়ে তারা লুকলার পথে রওনা হলো। পরে খবর পাঠিয়েছিল, সে দুই ঘণ্টাতেই পৌঁছে গেছে। আগামীকাল আমাদের সেই পথ পাড়ি দিতে হবে। লুকলাতে ইমতিয়াজ ভাইয়ের অপেক্ষায় থাকবো, এরপর আমাদের মেরা পর্বতের পথে পদযাত্রা শুরু হবে। আজকের আবহাওয়াও খুব সুন্দর! গোধূলি বেলায় আমাদের গাড়ি এক জায়গায় থামলে অপূর্ব এই আকাশপানে অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিলাম।

সুরখে থেকে রওনা হলাম সকাল সাড়ে ৯টায়। লুকলার পথ বেশি দূরে না, তাই একটু দেরি করেই বের হলাম। ব্যাগের ওজন ১৫কেজি হবে; নিজের ব্যগ নিজেই নিলাম। লুকলা থেকে পোর্টার পাবো, তখন ব্যাগের ওজন কমে যাবে। এই রাস্তাগুলো কিছুদিন আগেও মাটি আর পাথরের পথ ছিল। এখন সব সিঁড়ি হয়েছে। সিঁড়ি দিয়ে হাঁটতে কষ্ট হয়। ধীরে ধীরে চলেও আমরা দুই ঘণ্টায় পৌঁছে গেলাম লুকলা। এখানেই এভারেস্ট যাবার জন্য ছোট বিমানগুলো জড়ো হয়। লুকলা এয়ারপোর্টকে বিশ্বের ১০টি সবচেয়ে বিপজ্জনক এয়ারপোর্টগুলোর মধ্যে একটি ধরা হয়। 

২০১৯ এ থ্রি পাস ট্রেক থেকে ফেরার পথে লুকলা থেকে কাঠমান্ডুর পথ ধরেছিলাম। আজ অনেকদিন পর আবারও আসা হলো। লজে ব্যাগ রেখে, জিঞ্জার টিতে চুমুক দিয়ে এয়ারপোর্টের দিকে পা বাড়ালাম। হাই সিকনেস কাটাতে এই হাঁটাহাঁটির বিকল্প নেই। বিমান ওঠানামা দেখলাম কিছুক্ষণ। আজকের আকাশ কি ঝকঝকে পরিষ্কার! পেছনে হিমালয়ের চূড়াগুলো দেখা যাচ্ছে। হিমশীতল হাওয়ায় মন জুড়িয়ে গেলো। আরও কিছু দূর এগিয়ে গেলাম।

আমাদের হাতে সময় আছে, দুপুর দুইটায় খাবার সার্ভ হবে। আমেরিকান পাসাংয়ের ফোন এলো, সে এখনো লুকলা আছে। একটু পরে ‘ফাকদিং’র পথে রওনা হবে। তার লজে গেলাম দেখা করতে। সেও আমাকে আর শাহনাজকে দেখে খুশি হলো। আমরা তাকে খানিকটা এগিয়ে দিলাম। অল্প সময়ে খুব মায়া হয়েছে ছেলেটার জন্য। সে শাহনাজ আর আমার সঙ্গে কোলাকুলি করে বিদায় নিলো। হয়ত আর কখনো দেখা হবে না, বা হয়েও যেতে পারে। দুনিয়াটা সত্যি ছোট। 

লজে ফিরে ইমতিয়াজ ভাইয়ের খোঁজ নিলাম। তিনি ঢাকা থেকে বিমানে চড়েছেন কাঠমান্ডুর পথে। কাল সকালে লুকলাতে তাকে আমরা রিসিভ করবো। এরপর আসল চ্যালেঞ্জ শুরু হবে আমাদের মেরা পর্বত অভিযানের পথে। আজকের দিনটা ভালোই কেটে গেছে। আমি আর শাহনাজ নানা বিষয়ে গল্প করলাম। উচ্চতায় কি ধরনের শারীরিক অসুস্থতা হতে পারে তা নিয়ে পড়াশোনা করলাম। ব্রিদিং এক্সারসাইজ এবং মেডিটেশন করলাম। সামনের কঠিন দিনগুলো যেনো সহজ হয় তার কিছু প্রস্তুতি নিতেই হচ্ছে। শুভ দিনের অপেক্ষায় রাত গভীর হলো।

২০০৫ সাল। বাংলাদেশ থেকে প্রথম দল মেরা পর্বত অভিযানে গেলো। আমি ২০২৫ সালে এসে সেই দলের দুইজন পর্বতারোহীর দুটো লাঠি নিয়ে মেরা পর্বতের দিকে চলেছি। এক হাতে সাগর ভাই, আরেক হাতে রিফাত ভাইয়ের লাঠি। সেসময় মেরা পর্বতের অভিযান সফল হয়নি। দলের কেউ একজন অসুস্থ হলে সবাই হাই ক্যাম্প থেকে নেমে আসেন। তাদের স্মরণ করে ভাবলাম লাঠিগুলো মেরা পিকের চূঁড়ায় উঠুক। তাদের সাথে পর্বতে যাবার অনেক ইচ্ছে ছিলো, হয়ে ওঠেনি বলে লাঠিগুলো চেয়ে নিয়ে এলাম।

লুকলা থেকে চুতেংগা আজকের পথ বেশি ছিল না। তবে ইমতিয়াজ ভাই যেহেতু ফ্লাইটে এসেছেন তার জন্য উচ্চতার সঙ্গে মানানসই হতে সময় দিতে হয়েছে। লুকলাতে আমরা রেডি ছিলাম, ইমতিয়াজ ভাই পৌঁছালে সব ঠিকঠাক গুছিয়ে চলা শুরু করলাম। ‘খারে’ পর্যন্ত আমাদের প্রতিদিন উপরের দিকে উঠতে হবে। এই রাস্তায় কিছু জঙ্গল আবার উচ্চতা বাড়ার সাথে সাথে গাছপালার সাইজ ছোট হতে চলেছে। হিমালয়ের মায়া আর সৌন্দর্য দেখে বারবার থেমে ছবি তুলছি। এত কষ্ট করে হিমালয়ের কোলে আসা শুধু এর রূপ দেখব বলে। যত উপরের দিকে উঠে যাচ্ছি হিমালয়ের রূপলাবণ্য আরও ফুটে উঠছে।

আমাদের সঙ্গে দুই পাসাং আছে, গাইড পাসাং গুনগুন করে নেপালি গান গাইছে। পথে বসে কফি পান করলাম, সকালে কফি বানিয়ে ফ্লাক্সে ভরে চলা শুরু করেছি। আমরা সঙ্গে চুলা পাতিল কফি সবই রেখেছি। সকালে গরম পানি করতেও ব্যাপক কাজে দিচ্ছে। উপরের দিকে পানিতে হাত দেওয়া মুশকিল! তবুও চেষ্টা করেছি ঠান্ডা পানিতেই হাত-পা ধোয়ার। জুতার গন্ধে নিজেই দিশেহারা হয়ে গেলাম। ন্যাপথলিন একটা হ্যাক হতে পারে ৷ দুই জুতায় দুইটা রেখে দিলে অনেকটা রক্ষে পাওয়া যায়। ধীর পায়ে আমরা চুতেঙ্গা পৌঁছে গেলাম। এলিভেশন ৩০২০ মিটার। আকাশ একদম ঝকঝকে তকতকে। লজে ব্যাগ রেখে ইমতিয়াজ ভাইকে নিয়ে হাঁটতে বের হলাম। গ্লেসিয়ার গলা জলের ধারা ঝরনা হয়ে নদীতে মিশে যাচ্ছে। দূরে পর্বতমালা মেঘের উপর যেনো ঝিকিমিকি করছে। শেষ গোধূলির আলো পর্বতের চূড়ায় পড়লে অপরূপ লাগে, যে চোখ জোড়া দেখে শুধু তারাই এর সৌন্দর্য বুঝতে পারে। 

আমরা দুই নয়ন ভরে চেয়ে রইলাম। কিছুক্ষণ পরেই চারপাশ সাদায় ঢেকে গেলো। হিমহিম হাওয়ায় জানান দিলো চার দেওয়ালে ঢুকতে হবে। অনেক পানি পান করতে হবে, খানা খেতে হবে, বিশ্রাম নিতে হবে। ঘুম আসছে না ঠিকমত। অক্সিজেনের মাত্রা ধীরে ধীরে কমছে টের পাচ্ছি। মাথা কিছুটা ভনভন করছে। আগামী দিনে অনেক লম্বা পথ পাড়ি দিতে হবে জাতরালা পাস, ৪৬০০মিটার। (চলবে)

প্রথম পর্ব: নেপালের সর্বোচ্চ ট্রেকিং পিক মেরা পর্বতে অভিযান