ঢাকা     শুক্রবার   ০৯ জানুয়ারি ২০২৬ ||  পৌষ ২৫ ১৪৩২

Risingbd Online Bangla News Portal

নেপালের সর্বোচ্চ ট্রেকিং পিক মেরা পর্বতে অভিযান  

হোমায়েদ ইসহাক মুন  || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৪:৪৩, ৮ জানুয়ারি ২০২৬   আপডেট: ১৪:৪৫, ৮ জানুয়ারি ২০২৬
নেপালের সর্বোচ্চ ট্রেকিং পিক মেরা পর্বতে অভিযান  

অনেক দিন পর আবার হিমালয়ের দিকে পা বাড়ালাম। সাদা, শুভ্রতার সন্নিকটে। শেষবার এভারেস্ট থ্রি পাস ট্রেকে গিয়েছিলাম। এবার ৬,৪৭৬ মিটার উচ্চতার (২১,২৪৭ ফুট) পর্বত মেরা পিক অভিযানের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। নেপালের সর্বোচ্চ ট্রেকিং পিক এটি। হিমালয় প্রতিবারই পর্বতারোহীদের এক অনন্য অভিজ্ঞতা দেয়। কঠিন পরিশ্রম শেষে এক অপার্থিব আনন্দ অর্জনের সুযোগ করে দেয়। কষ্টসহিষ্ণু আর বিরুপ আবহাওয়ার সঙ্গে যুদ্ধ করে এগিয়ে যেতে হয় প্রতি পদক্ষেপে। 

মেরা পর্বতে আমার পথের সারথি হয়েছেন অনুপ্রেরণা আয়রনম্যান এবং নরসম্যান ইমতিয়াজ ইলাহী ভাই। যার অনুপ্রেরণায় আমি নিজেই আয়রনম্যানের মতো কঠিন চ্যালেঞ্জের আসরে চলে গিয়েছিলাম মালয়েশিয়া। পর্বতে একসঙ্গে পথ হেঁটে বেশ দারুণ কিছু অভিজ্ঞতা হয়েছে। মেরা পর্বত অভিযানের সেই গল্প বলব।  

কাঠমান্ডুতে নেমে ভেবেছিলাম শীতে কাঁপবো, কিন্তু তেমন একটা ঠান্ডা অনুভব হচ্ছে না। ছয় বছর পর আবার এলাম এই শহরে। থামেলের গলিগুলো কিছু কিছু চেনা ঠেকলো। শেরপা তাশি আর গাইড পাসাং ত্রিভুবন এয়ারপোর্টে নিতে এসেছিল। ওদের এজেন্সির নাম টেংবোচে ট্রেকিং প্রাইভেট লিমিটেড। উত্তোরিও পরিয়ে আমাকে বরণ করে নিলো। থামেলের ঝাম্পা হোটেলে পৌঁছাতে অনেকটা রাত হলো। সকালে বুফের জম্পেশ নাস্তাটা বেশ আয়েশ করেই খেলাম। নাস্তা শেষে তাশির স্কুটিতে করে গেলাম বৌধা; তাদের অফিসে। বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম গোলাকার বৌদ্ধ স্তুপা এখানে অবস্থিত। এটি ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট এবং তিব্বতি বৌদ্ধধর্মের প্রধান কেন্দ্র। 

গোল এই স্তুপাটি হিমালয়ের বৌদ্ধ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতীক, যা প্রতিদিন হাজার হাজার তীর্থযাত্রী ও পর্যটককে আকর্ষণ করে। আমি আর তাশি স্তুপার চারপাশে একটা চক্কর দিলাম। তাশি এক ফাঁকে মন্দিরে কিছু টাকা শ্রদ্ধার্ঘ্য দিয়ে হাত জোড় করে কুর্নিশ করে এলো। দুপুরে নেপালী থালি দিয়ে খানা খেলাম। থামেলে ফিরে আমার নেপালি বন্ধু দিভাস আর শিশিরের সঙ্গে আড্ডা দিলাম। এরপর মানাসলু পর্বত ফেরত তমাল আর হিমলুং হিমাল থেকে আসা মুজিব ভাইয়ের সাথে বাঙালি গলিতে দেখা হলো, সেখানেও আড্ডা হলো।

মেরা পিকের জন্য কিছু টিপস দিয়ে দিলো তারা। মেরা পিকে এবার নাকি বাংলাদেশিদের ঢল নেমেছে। এক দুই দিনের মধ্যেই রওনা হয়ে যাবো। শহর থেকে পাহাড়ের দিকে যাওয়াই উত্তম। সুতরাং আর দেরি কেন?

হিমালয়ের শহরে প্রথম প্রহরে আবহাওয়া বেশ চনমনে। ওয়ান্ডার থ্রাস্ট হোস্টেলের ছাদ থেকে শহরের মনোরম দৃশ্য দেখলাম। ছাদটাকে তারা বেশ অরগানাইজ করে কাচের দেওয়াল দিয়ে ইন্টেরিয়র করেছে; ব্যাগপ্যাকারদের থাকার জন্য সুন্দর জায়গা। ইন্ডিয়ান কয়েকজন ছেলেমেয়ের সাথে আলাপ পরিচয় হলো। 

হোস্টেল থেকে সব গুছিয়ে বের হয়ে বন্ধু দিভাসের  এয়ারবিএনবি অ্যাপার্টমেন্টে চলে এলাম। সকালে মাহি নিয়ে গেলো বিসমিল্লাহ হোটেলে। নান, নেহারি আর চা খেলাম। এখানে কক্সবাজার হোটেলও আছে। নেপালে এক টুকরো বাঙালি পাড়ায় যেন চলে এলাম।

বিকেল পর্যন্ত রুমেই কাটিয়ে দিলাম। এর মধ্যে কথা হলো কুশাল সাহির সাথে। সে মাউন্টেইনিয়ার এবং ফটোগ্রাফার। ব্যাচেলর করেছে মাউন্টেইনিয়ারিং বিষয়ে। এরপর মাস্টার্স করেছে মাউন্টেইন ইকোলজি নিয়ে। এখন থিসিস করছে মাউন্টেনের ট্রেকের সঙ্গে গ্লোবাল ওয়ার্মিংকে কেন্দ্র করে। মাউন্টেন নিয়ে কত ডিটেইল ভাবা যায়, একবার চিন্তা করলাম।

সাত হাজার মিটারের পর্বত হিমলুং অভিযান করে আজকে ফিরেছেন নিম্মি। তার সেলিব্রেশনের জন্য ফোন এলো ডাক্তার শাহনাজের। এসট্রেক পার্কে সবার সাথে দেখা হবে। এখানে এক সাথে ক্লাইম্বিং ওয়াল আছে, কফি শপ, বার, মাউন্টেন গেয়ারের দোকান। সুন্দর পরিপাটি সংগীত আবহ। কাকতালীয়ভাবে কুশালও আমাকে এখানেই আসতে বলেছিল। আমরা এক সাথেই কেক কেটে নিম্মির এই বিজয়ের সেলিব্রেশন করলাম।

পর্বতারোহণের জন্য প্রস্তুতি নিতে হয় অনেক অনেক দিন আগে থেকে ৷ কারণ অর্থনৈতিক, মানসিক আর শারীরিক প্রস্তুতির জন্য নিজেকে নিবেদিত করতে অনেকটা সময় চলে যায়। লম্বা সাধনার পরে পর্বতারোহণের জন্য ব্যাগ গোছানো শুরু হয়। পর্বতের জন্য এই ব্যাগ গোছানোও এক ধরনের আর্ট। এ ক্ষেত্রে পর্বতারোহী রিফাত ভাই গুরু, রুকসাকের মধ্যে যে জিনিস তিনি রাখেন না কেন, ঠিক ঠিক জায়গা থেকে হাত ঢুকিয়ে তিনি তা বের করে আনতে পারেন। হিমালয়ান মাউন্টেইনিয়ারিং ইন্সটিটিউট-এ আমাদের একদিন শুধু এই ব্যাগ গোছানোর উপরে ক্লাস নিয়েছিল। আজকে পর্বতে রওনা হওয়ার আগে রুকসাক গোছাতে গিয়ে হিমশিম খেয়ে গেলাম।

দুপুরে ‘ই’ আমাকে নিয়ে গেলো থামেলের সবচেয়ে পুরাতন তিব্বতি রেস্টুরেন্টে। ‘উৎসে’ নামে তিব্বতিরা এ রেস্টুরেন্ট শুরু করে ১৯৭১ সালে। ই আমাকে অথেনটিক ও সুস্বাদু ফিং-শায়া এবং স্পিনাচ ব্ল্যাক মাশরুম খেতে পরামর্শ দিল। খেয়ে বেশ ভালোই লাগলো। বিকেলবেলা রাস্তায় দেখা হলো শাকিল ভাই আর ভাবীর সঙ্গে। ২০১৩ সালে শাকিল ভাইসহ আমরা কেওক্রাডং বাংলাদেশের টিম কাঠমান্ডু থেকে চিতওয়ান সাইকেল চালিয়েছিলাম। কত কত স্মৃতি রয়েছে নেপালজুড়ে।  

শাকিল ভাই থামেলের অথেনটিক চাইনিজ রেস্টুরেন্ট ‘দংফাই প্যালেসে’ রাতের খাবারের জন্য আমন্ত্রণ জানালেন। এক বোল ভেড়ার মাংসের সুপ আর নুডুলস খেলাম। হাল্কা চাইনিজ মাসালা এবং সারাদিন থেকে জাল দেওয়া নরম মাংসের টুকরো উপরে ধনেপাতা এবং স্প্রিং ওনিওন। সুপে চুমুক দিয়ে মন তৃপ্ত হলো। ভোর পাঁচটায় আমাদের জীপ ছাড়বে চাবেইল থেকে। সন্ধ্যা নাগাদ পৌঁছে যাবো সালেরি। মাউন্ট এভারেস্টের দক্ষিণে সোলুখুম্বু জেলার কোশী প্রদেশের একটি পার্বত্য গ্রাম ও পৌরসভা হলো সালেরি। পর্বতের অভিযান এখান থেকে শুরু।

এই সফরে শুধু আমার আর ইমতিয়াজ ইলাহী ভাইয়ের যাওয়ার কথা ছিল। সেভাবেই সব পরিকল্পনা হয়েছিল। আমি কাঠমান্ডুতে পৌঁছানোর পরে হঠাৎ ডাক্তার শাহনাজের ফোন পেলাম। তারা লবুচে ইস্ট পর্বতারোহনের জন্য এসেছিল গত মাসে অর্থাৎ অক্টোবরে। আবহাওয়া বিরুপ হওয়ায় তাদের ফিরে আসতে হয়। আমাদের সাথে শাহনাজ মেরা পর্বতে যেতে চায়।  এভারেস্টোর শাকিল ‘সি টু সামিট’ অভিযানে যমুনা নদী পাড়ি দেওয়ার সময় ডাক্তার শাহনাজ আমার সাথে ছিল। ইমতিয়াজ ভাইয়ের সাথে পরামর্শ করে আমরা দু’জন সিদ্ধান্ত নিলাম শাহনাজকে আমরা দলে নিতে পারি। এরপর শাহনাজ, আমি এবং আমাদের গাইড পাসাং একসঙ্গে রওনা হলাম জিপে করে সালেরির পথে। ইমতিয়াজ ভাই আসবেন ফ্লাইটে কাঠমান্ডু থেকে লুকলা। 

অনেক ভোরে রওনা দিয়ে গোধূলি লগ্নে চলে এলাম সালেরি। সলোখুম্বু রিজিয়নের ছোট্ট এক গ্রাম। ছয় বছর আগে এই গ্রাম থেকেই হেঁটে এভারেস্ট বেইজ ক্যাম্পের থ্রি পাসের পথে গিয়েছিলাম। তখন মোটে কয়েকটা থাকার জায়গা ছিল। এখন দেখলাম অনেক পরিবর্তন হয়েছে। অনেক লজ, সাজানো দোকান, ভালো মানের রেস্টুরেন্ট, এটিএম বুথ, বিউটি পার্লার সবই আছে বাজারে। কাঠমান্ডু থেকে ভোরে রওনা হয়ে এখানে পৌঁছাতে প্রায় ৪টা বেজে গেলো। ব্যাগ রেখে পাড়া বেড়াতে বের হলাম। পর্বতে উচ্চতার সাথে নিজেকে মানাতে নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছে একটু হাঁটাহাটি করে নিতে হয়। আমরাও তাই করলাম। বাজার ছাড়িয়ে আমরা কিছুটা উঁচুতে স্কুলের কাছে চলে গেলাম। 

পাহাড়ের গায়ে অস্তমিত সূর্য অনেকবার দেখেছি। প্রতিবারই এই দৃশ্য অনন্য আর অসাধারণ লাগে। কম্ফোর্ট জোন থেকে বের হলেই এমন সুন্দরের খোঁজ মেলে। দুচোখ ভোরে দেখলাম পাহাড়ের গায়ে অস্তমিত সূর্যের লাল আভা। স্বর্গের দুয়ার যেনো আমার সামনে।

ফিরে গিয়ে চায়ে চুমুক দিলাম। নেপালি ভাষায় চা কে ‘চিয়া’ বলে। এরপর এলো মমো। পাহাড়ে গেলে মমো খেতেই বেশি ভালো লাগে। রাতের খাবারে অর্ডার করা হলো ভাত-ডাল-সবজি-মাংস। রাতের খাবার খেয়ে জলদি শুয়ে পড়লাম। (চলবে)

ছবি: লেখক

ঢাকা/তারা//

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়