শেপসাউয়েন— নীল শহরের কাব্য
‘দ্যা ব্লু পার্ল’ স্থানীয়রা এই নামে ডাকে ও ভীষণ গর্ব করে বলে। মরক্কোর উত্তরে শেপসাউয়েন ছোট্ট একটি শহর। মাত্র ৪৩ হাজার লোকের বসবাস এখানে। সন্ধ্যে নামার কিছু আগে এসে পৌঁছলাম শেপসাউয়েনে। একটি নির্দিষ্ট স্থানে ইব্রাহিম গাড়ি পার্ক করে কাউকে ফোন দিল এবং আমাকে বলল, ‘এলিজা অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই তোমাকে নিতে এখানে একজন আসবে।’
ইব্রাহিমের সঙ্গে দাঁড়িয়ে সকালের প্ল্যান করছি। এ সময় পেছন থেকে একজন এসে অভিবাদন জানাল। ইব্রাহিম আগন্তুকের কাছে আমাকে সঁপে দিয়ে বলল, ‘কাল সকালে তোমার সঙ্গে দেখা হবে।’ আগন্তুক আমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। বেশ উপরে উঠতে হচ্ছে সিঁড়ি ভেঙে। আমার লাগেজ তার হাতে; বেশ খারাপ লাগছে! কী করবো বুঝে উঠতে না পেরে, সিঁড়ি দিয়ে উপরে যেতে যেতে চারপাশের নীল রঙ আমাকে সব দ্বিধা ভুলিয়ে দিলো। উঁচু টিলার উপরে বসতি দেখে আমার এভারেস্ট বেজ ক্যাম্পে যাবার পথে নামচে বাজারের কথা মনে পড়ল। মনজগতের এ রকম শিহরিত সময়ে, কখন হোটেলের সামনে এসে পৌঁছেছি টের পাইনি। হোটেলের সামনে এসে আগন্তুকের নাম জানলাম—স্টিফান।
শেপসাউয়েনের যে হোটেলে আছি মনে হচ্ছে, সেই প্রাচীন শেপসাউয়েনের একটি বাড়ি। আসলে এগুলো এক একটি বাড়ি, কেউ কেউ ভাড়া দিচ্ছে। বুকিং ডটকম থেকেই ঠিক করেছি। দারুণ বসন্ত আবহাওয়া! তাঞ্জিয়ার আর শেপসাউয়েন শহরের চারদিকে আটলান্টিক আর সাদা মানুষ। মনে হয় না আফ্রিকাতে আছি।
হোটেলে বাক্স-পেটরা রেখে, ক্ষণকাল বিলম্ব না করে শহর দেখতে বের হলাম। কারণ দিনের কিরণ তখনও রয়েছে। সময়টুকু পুরোপুরি কাজে লাগাতে হবে। একা ভ্রমণের মজাই এটি, যেমন ভাবা নিজের মতো তেমনি কাজ করা যায়। প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই রয়েছে পর্যটকদের আবাসস্থল আর সুভেনির শপ। অসংখ্য অলিগলি পথ। কিছুটা আমাদের পুরোনো ঢাকার বাহান্ন বাজার তিপ্পান্ন গলির মতো। কোনো কোনো সুভেনির শপ সিঁড়িতেই সাজানো। টিলার উপরে শহরের এই স্থানকে বলা হয় ‘মেদিনা’। মেদিনা শব্দের অর্থ হলো পুরোনো শহর।
জানতে ভীষণ আগ্রহ হয়েছিল, শহর কেন নীল হলো? স্থানীয়রা খুব ভালো ইংরেজি বলতে পারে না, আমি আরবি, ফ্রেঞ্চ, স্প্যানিশ জানি না। তাই যা কিছু বুঝেছি, না বোঝা কথপোকথন থেকে, সেটি সম্বল করে লেখা। উত্তরের এই অংশে স্প্যানিশ নাম, ভাষার প্রচলন এখনো রয়েছে। মরক্কোর উত্তরে স্প্যানিশ কলোনী ছিল।
ইবনে বতুতার সমাধি
আসলে শেপসাউয়েন শহরের নীল শহর ছিল একটি দুর্গ, নির্মাণকাল ১৪৭১ অব্দ। পুর্তগিজ, স্প্যানিশদের প্রতিহত করার জন্য তৈরি এই দুর্গ। মরক্কোর গোমারা আদিবাসী, বার্বার, ইহুদীরা দখল করে একসময়। তারপর স্পেন ১৯২০ সালে এই শহর পুরোপুরি নিজেদের আয়ত্বে নেয়। স্পেনের কাছে মুক্তি পায় শেপসাউয়েন ১৯৫৬ সালে। এই শহরে মুসলিম, ইহুদী, খ্রিস্টান, বার্বার আদিবাসীদের বসবাস সেই প্রাচীন সময় থেকেই, যা এখনও বিদ্যমান।
আর নীল শহরের নীল হবার কিংবদন্তীগুলো হলো: এখানকার স্থানীয়রা বিশ্বাস করে নীল রং মশার উপদ্রব থেকে বাঁচায়। ইহুদীরা বিশ্বাস করে নীল আকাশের রং। আকাশ বিধাতার তৈরি। বিধাতা আর ধরণীর সামান্য যোগাযোগ রঙের মাধ্যমে। সর্বোপরি নীল রং শহরের পর্যটনকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে। হাজার হাজার পর্যটক এদের বাড়িগুলোতে থাকছে, সুভেনির শপ, স্থানীয় খাবার দোকান— সব মিলে দারুণ এক রোমাঞ্চকর পরিবেশ এই নীলকে কেন্দ্র করে। বাড়ির সিঁড়িগুলোতেও সুভেনির সাজানো বিক্রির জন্য। চারদিকে ছোট ছোট পর্বতমালা আরও রহস্যময় করেছে নীল শহরকে। নীল সবসময় বেদনার রং নয়।
ধীরে ধীরে আঁধার নেমে এলো চারদিকে। পরদিন সকালে ইব্রাহিম নিয়ে গেল নীল শহরের ভিন ভিন্ন স্থান ঘুরে দেখার জন্য। শেপসাউয়েন শহরের প্যানারমিক ভিউ দেখব বলে একটি স্থানে পৌঁছেছি। পরিচয় ঘটলো উত্তর মরক্কোর নারী পোশাকের সাথে। সেখানে কয়েকজন মহিলাকে দেখলাম শেপসাউয়েনের নারীদের পোশাক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পর্যটকদের জন্য। আমাকে দেখে ঘিরে ধরল।
‘এরাবিক! এরাবিক!’ এ অবধি মরক্কোতে প্রথম দেখাতে সবাই আমার সাথে আরবিতে কথা বলা শুরু করে। ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করে ‘এরাবিক? নো এরাবিক?’ আমি না সূচক মাথা নাড়ালে তারা আবার জানতে চায় ‘ইন্ডিয়ান?’ ‘ফ্রম বাংলাদেশ’ আমার উত্তর। আমার গায়ের রঙের জন্য ধরেই নেয় আমি আফ্রিকান।
চৌয়ারা ট্যানারি
তারপর পোশাক পরে ছবি তোলা হলো। নারী পোশাকের তিনটি অংশ। টুপিকে বলা হয় সিসিয়া। নিচের লাল স্ট্রাইপ অংশকে বলা হয় তারাজা। গায়ে জড়ানো শালটিকে বলা হয় মেনডিল। পুরো পোশাকটিকে অনেকে ‘তারাজা’ বলে। উত্তরের এই পোশাক মরক্কোর অন্য অংশের থেকে ভিন্ন।পুরুষদের পোশাককে বলা হয় ‘জেলাবা’। পুরুষরাও হ্যাট মাথায় দেয়। অনেক সময় জেলাবার সাথেই হ্যাট যুক্ত থাকে একই কাপড়ের। বর্তমান সময়ের ফ্যাশনেবল শীত পোশাক হুডির মতো। নীল শহরকে বিদায় জানানোর সময় এলো। পরের গন্তব্য ঐতিহাসিক ফেজ শহর!
সাড়ে নয় হাজার গলির ফেজ শহর, যেন এক জীবন্ত জাদুঘর। পার হচ্ছি ছোট গ্রাম ও শহর। ইচ্ছে হচ্ছে পায়ে হেঁটে ঘুরে ঘুরে দেখি প্রতিটি গ্রাম, শহর। সেটি সম্ভব নয়। সময়ের সাথে চলতে হবে। কিছুক্ষণ পরপর আমার ড্রাইভার ও গাইড ইব্রাহিম বলছে ‘Eliza, it is another small town.’ মাঝে ঘণ্টা তিনেকের বিরতি দিয়েছি রোমান ধ্বংসাবশেষ দেখবার জন্য। রোমান এই শহরের নাম ভলুবিলিস। শহরটিকে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট ঘোষণা করা হয়েছে ১৯৯৭ সালে।
শেষ বিকেলের কিছু আগে ফেজ শহরে উপস্থিত হলাম। গন্তব্য ফেজ শহরের মেদিনা। একটি প্রাচীন গেট দিয়ে প্রবেশ করার সাথে সাথে ইব্রাহিম বলল, আমরা নতুন শহর থেকে পুরোনো শহরে এলাম। উঁচু দেয়াল ঘেরা স্থানটি ফেজ শহরের মেদিনা। নবম শতকের একটি শহরে প্রবেশ করলাম। জানি না কী কী বিস্ময় অপেক্ষা করছে ভেতরে! একটি নির্দিষ্ট স্থানে গাড়ি রেখে হেঁটে ভেতরে যেতে হবে।
শুনেছি মরক্কোর প্রতিটি শহরে মেদিনা রয়েছে। তবে ফেজ শহরের মেদিনার আয়তন আর সমৃদ্ধির বিচারে সব থেকে বড়। ১৭ কিলোমিটারের দারুণ বৈচিত্রময় এক শহর। এত উঁচু দেয়াল দেখে সে সময়ের পারিপার্শ্বিক অবস্থা অনুধাবন করতে অসুবিধা হয় না। এক চেঙ্গিস খানের ভয়ে চায়নার গ্রেট ওয়াল নির্মিত হয়েছিল। মেদিনারও এরকম একাধিক কারণ নিশ্চয়ই রয়েছে।
নীল শহরের একটি গলি
ঢাকার বায়ান্ন বাজার তিপ্পান্ন গলি আমি দেখেছি। ইউরোপের ছোট ছোট শহরের সরু গলিতেও আমি হেঁটেছি। কিন্তু ১৭ কিলোমিটারের একটি শহরে ৯ হাজার পাঁচশ অলিগলি! ‘It is very easy to lost here.’ এক আমেরিকান পর্যটক মেদিনা শহর সম্পর্কে বলছিল। একদম সঠিক। আমার থাকার ব্যবস্থা মেদিনার অভ্যন্তরে একটি হোটেলেই হয়েছে। হোটেল নয় রিয়াদ। ইস্ মরক্কোর সব কিছুতেই গল্প। এই বাড়িগুলোকে রিয়াদ বলা হয়।
রিয়াদের বৈশিষ্ট্য হলো, বাড়ির ভেতরে উঠানের মতো একটি স্থান, তাতে একটি জলাধার আর বাগান থাকতে হবে। তবেই সেটিকে রিয়াদ বলা হবে। রিয়াদ ছোট-বড় যে কোনো আয়তনের হতে পারে। আমি অপেক্ষাকৃত ছোট রিয়াদে ছিলাম। সেটির ভেতরের কারুকাজ দেখে আমি মুগ্ধ! তাহলে বড় রিয়াদের জৌলুস হয়তো আমার চিন্তার বাইরে।
যেমনটি বলছিলাম, মেদিনার অলিগলির কথা, কোথা দিয়ে এই ভ্রমণ শুরু করব— বোঝাই মুশকিল। যেহেতু এটিই ছিল প্রাচীন ফেজ শহর। মেদিনাতে প্রবেশের ৯টি গেট রয়েছে। ভেতরে পায়ে হেঁটে চলা ছাড়া উপায় নেই। অবাক হয়েছি মরক্কোর বিভিন্ন শহরে গাধা, ঘোড়া, মিউলের ব্যবহার মালামাল স্থানান্তর ও গণমানুষের বাহন হিসেবে দেখে। কি নেই মেদিনাতে—কোরআন স্কুল, মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয়, আবাসিক হোটেল, হাজার হাজার খাবার দোকান, রং-বেরঙের সুভেনির শপ, হস্ত শিল্পের কারখানা, ট্যানারি। দেশি বিদেশি পর্যটকের আনাগোনা, দোকানির হাঁক— সব মিলিয়ে মেদিনার পরিবেশ দেখলে মনে হয় প্রতিদিন উৎসব লেগেই রয়েছে।
হারশাসহ নানা পদের শক্ত রুটি
গাইড ছাড়া মেদিনাতে ঘুরে বেড়ানো বেশ কষ্টকর। একদিন আধ বেলার জন্য গাইড নিলাম। গাইড ঘুরে দেখাল আমায় ১৩ শতকের মাদ্রাসা আর কারাউইন বিশ্ববিদ্যালয়। (চলবে)
পড়ুন প্রথম পর্ব : মেদিনা, মরুভূমি আর তরল সোনার মরক্কো