মেদিনা, মরুভূমি আর তরল সোনার মরক্কো
এলিজা বিনতে এলাহী || রাইজিংবিডি.কম
রঙিন দরজা, মসলার গন্ধে ভরা সরু গলি, আর দূরে সাহারার অন্তহীন বালিয়াড়ি— মরক্কো যেন এক চলমান গল্প, যেখানে প্রতিটি মোড়ে অপেক্ষা করে নতুন বিস্ময়! ইতিহাস আর জীবনের ছন্দ এখানে মিশে গেছে একই সুরে। উত্তর আফ্রিকার প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা মরক্কো যেন এক রহস্যময় দরজা—যেখানে প্রবেশ করলেই খুলে যায় ভিন্ন এক জগত।
মারাকেশের কোলাহলময় বাজার, ফেজের প্রাচীন মেদিনা, শেফশাওয়েনের নীল রঙে মোড়া পাহাড়ি শহর কিংবা সাহারার নীরব বালিয়াড়ি— প্রতিটি স্থান নিজস্ব গল্পে সমৃদ্ধ। এখানে ভ্রমণ মানে শুধু স্থান দেখা নয়; বরং ইতিহাসের সঙ্গে আলাপ, সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয়, আর নিজের ভেতরের এক নতুন অনুভূতির জন্ম। পুরো ভ্রমণ গল্প একটি লেখায় তুলে ধরা কষ্টসাধ্য। তাই বিশেষ কিছু ভ্রমণ স্মৃতি তুলে ধরছি ।
বিশ্ব পরিব্রাজকের শহর তাঞ্জিয়ার একজন বিশ্ব পরিব্রাজকের নাম বলুন তো? ‘বিশ্ব পরিব্রাজক’ বললেই, ক্ষণকাল না ভেবেই যে কেউ প্রতিউত্তর দিবেন— ইবনে বতুতা। ভাবতেই শিহরিত লাগছে! বতুতার রাজ্যে যাবো। পরিব্রাজক যে পথ দিয়ে হেঁটেছেন, সেই পথ দিয়ে হাঁটবো। প্রায় মাস তিনেক ধরে নিজের মাঝে জল্পনাকল্পনা চলছে। মরক্কোর বিভিন্ন ট্রাভেল কোম্পানির সাথে নিয়মিত কথা চলছে। ইস্ সব কিছু নাগালের বাইরে! গুগল ম্যাপে দেখি মরক্কো একেবারে স্পেনের নিকটে। নিজের উপর রাগ হচ্ছিল কেন ইউরোপ বসবাস করবার সময়, এই সুযোগ হাতছাড়া করেছি। কেউ আবার ভাববেন না আমি ‘ডাবল পাসপোর্ট হোল্ডার’। ১৮ মাসের একটি শিক্ষাসফরে ছিলাম নেদারল্যান্ডসে।
ঢাকার মরক্কো দূতাবাস অফিস থেকে ভিসা পেতে পাক্কা ২১ দিন লেগেছে। দূতাবাসের সামনে পর্যটকের ভীড় নেই। কাকপক্ষীর অবস্থান দেখতে পাইনি ভিসা এপ্লিকেশন জমা দেবার সময়। পরিকল্পনা করতে করতে যাত্রার দিন এলো। প্রায় ভোর রাতে ফ্লাইট। ট্রানজিট আর আকাশে ভেসে বেড়ানোর সময় মিলে ২১ ঘণ্টা পর গিয়ে উপস্থিত হলাম কাসাব্ল্যাংকা ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে। সকাল ৭টায় গিয়ে উপস্থিত হলাম। ইমিগ্রেশন পার হতে একদম বেগ পেতে হয়নি। আমি ভেবেছি অযাচিত অনেক প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। ইমিগ্রেশন অফিসার কিছুই জিজ্ঞাসা করলেন না। ২ মিনিটে পার হলাম।
ছিমছাম সাদামাটা এয়ারপোর্ট। চারদিকে তাকিয়ে একটু দেখে নিলাম। লাগেজ হাতে পাবার সাথে সাথে ড্রাইভারের ক্ষুদেবার্তা ‘Welcome to Morocco, I am your Driver. My name is Ibrahim, I am in the parking area.’ বাইরে বেরিয়ে চোখে পড়লো এরাবিয়ান ঘোড়ার একটি দারুণ ভাস্কর্য! মোবাইল বের করে ছবি তুললাম। ইব্রাহিম এগিয়ে এসে অভিবাদন জানালো। আজকের গন্তব্য তাঞ্জিয়ার শহর। এয়ারপোর্ট থেকে সরাসরি রওনা করলাম তাঞ্জিয়ারের উদ্দেশ্যে। পথে কোথাও সকালের নাস্তা সেরে নেব, এমনটিই বলল ইব্রাহিম। আগামী ১০ দিন ইব্রাহিমের সাথেই পথ চলা। কোঁকড়া চুলের, ছোটখাট উচ্চতার, ফর্সা এক তরুণ। দেখে মনে হচ্ছিল, একেই বলে শঙ্কর জাতি!
তাঞ্জিয়ার শহর
এই ভূখণ্ডে প্রথম বসতি স্থাপনের ইতিহাস পাওয়া যায় খ্রিস্টপূর্ব ৮ হাজার বছর আগে। স্থানীয়রা খুব গর্ব করে বলে তাদের পূর্বপুরুষ র্যাবের আদিবাসি। ছেলেবেলা থেকে অফ্রিকা মহাদেশ বলতে ঘন জঙ্গল, হিংস্র প্রাণী আর কালো চামড়ার জনমানবের একটি চিত্র আমাদের মানসপটে গেঁথে দেওয়া হয়েছে। জঙ্গল আর প্রাণীর কথা কারো মনে থাকুক আর নাই থাকুক, কালো কিংবা বাদামি চামড়ার জনপদ আফ্রিকা মহাদেশ এটি কেউ ভোলে না। এই ভূখণ্ডে একেবারেই অনুভব করা যায় না, আপনি আফ্রিকার কোন জনপদে পরিভ্রমণ করছেন।
মরক্কোর রাউন্ড রোড ট্রিপ! ক্যাসাব্লাঙ্কা থেকে শুরু করে ৯টি শহর পেরিয়ে আবার ক্যাসাব্লাঙ্কা এসে শেষ হবে। মরক্কো শব্দের আরবি অর্থ ‘পশ্চিমের রাজ্য’ আর বার্বার ভাষায় স্রষ্টার দেশ।
লিখছি আর মনে মনে ভাবছি— বিশ্ব পরিব্রাজকের শহরকে আমার লেখনীতে আমি কতটুকু ফুটিয়ে তুলতে পারবো শব্দে! তারপর মনে হলো আরেক বিশ্ব পরিব্রাজক রামানাথ বিশ্বাসের কথা। ‘অন্ধকারের আফ্রিকা’ ভ্রমণ গ্রন্থে তিনি লিখেছেন: ‘আমার কাজ ভাষার পাণ্ডিত্য জাহির করা নয়, অভিজ্ঞতা বর্ণনা করা’—তাই তো!
গাড়ি ছুটছে। ক্যাসাব্লাঙ্কা এয়ারপোর্ট থেকে তাঞ্জিয়ার শহরের দূরত্ব ২৯০ কিলোমিটার এমনটাই বলল ইব্রাহিম। টুকটাক কথা হচ্ছে ইব্রাহিমের সঙ্গে। বেশ ভালো ইংরেজি বলে। পথিমধ্যে থামলাম সকালের নাস্তা করার জন্য। ইব্রাহিম জানতে চাইলো কী ধরনের নাস্তা করতে চাই ‘মরক্কান না কন্টনেল্টাল?’ যে কোনো ভূখণ্ডে ট্রাডিশনাল নাস্তা করবো অবশ্যই।
নাস্তা এলো দুই-তিন ধরনের রুটি, সবগুলো আমাদের মতো হাতে বেলা রুটি বলা যাবে না। একটি বেক করা, কিছুটা শক্ত মনে হলো আমার কাছে। সাথে চিজ, বাটার, ওলিভ ওয়েল, সিদ্ধ কালো অলিভ। আলাদা একটি বাটিতে সাদা তরল একটি পানীয়। ইব্রাহিম বললো স্যুপ। খেয়ে দেখলাম কোন স্বাদ নেই। আমার খাদ্য গ্রহনের ধীর গতি দেখে ইব্রাহিম বললো হরচা আর অলিভ ওয়েল দিয়ে মিশিয়ে খেতে। হরচা হলো শক্ত রুটিটা। রুটির সাথে ওলিভ ওয়েল! হায় আল্লাহ! বুঝলাম সামনে এগারো দিন বেশ কাটবে। কফি, পুদিনা চা আর কমলার জুস একসাথে দেওয়া হলো। কোনটা ছেড়ে কোনটা খাবো!
পথ বেশ মসৃণ। গাড়ি ১০০ কিলোমিটার বেগে ছুটছে। চারদিক দেখছি, ছবি তুলছি, ভিডিও করছি। ২১ ঘণ্টার ফ্লাইটে বেশ ক্লান্ত বোধ করছিলাম। চোখ বুজে আসছিল। চোখ খুললো ইব্রাহিমের ডাকে। ঘণ্টা তিনেক পর একটি উঁচু দেয়াল ঘেরা স্থানে এসে দাঁড়ালাম। ইব্রাহিম বললো, ‘এখন তোমাকে একা হেঁটে যেতে হবে। এর বেশি গাড়ি নেবার অনুমতি নেই। একটি মসজিদের কেন্দ্রে রয়েছে বতুতার সমাধি।’
এই কক্ষে রয়েছে পরিব্রাজকের সমাধি
ইব্রাহিম কথা বলার সময় ‘মকবরা’ শব্দটি বেশ কয়েকবার উচ্চারণ করলো। আর সে অবাক হচ্ছিল তাঞ্জিয়ারে আমার একমাত্র কিংবা প্রথম ইচ্ছে ইবনে বতুতার সমাধি পরিভ্রমণ। মকবরা শব্দটির অর্থ মাজার না কবর আমি জানি না। আমাদের দেশের লেখকরা ইবনে বতুতার সমাধিকে মাজার বলেই অভিহিত করেছেন। ইবনে বতুতার তৎকালীন বিশ্বের মুসলিম পণ্ডিতদের প্রতি অসীম আগ্রহ ছিল। বাংলাদেশের শ্রী-হট্ট (বর্তমান সিলেট জেলা) পরিভ্রমণ করেন হযরত শাহ জালালের সাথে দেখা করবার নিমিত্তে। বিশ্ব ঘুরে নিজেও পাণ্ডিত্য অর্জন করেছেন। কিন্তু তথাপিও আমি তাঁর সমাধিকে ‘মাজার’ বলতে চাই না।
আমার গাড়িটি আসলে তাঞ্জিয়ারের পুরনো শহরের প্রবেশ দ্বারে এসে দাঁড়িয়েছে।পুরনো শহরকে এরা বলে ‘মেদিনা’। শহরটি উঁচু দেয়াল দিয়ে ঘেরা। সেখান থেকে হেঁটে ইবনে বতুতা সড়কে যেতে হবে। গাইড নিয়েও যাওয়া যায়। কিন্তু নিজেই যাবো বলে সিদ্ধান্ত নিলাম। কেবলি এসেছি এই শহরে। একটু বোঝা দরকার শহরটিকে। গুগল ম্যাপ আর পথচারীরাই আমাকে পথ দেখালো। বেশ সরু একটি গলিতে প্রবেশ করলাম। চারদিকে দোকান, রেস্তরাঁ আর হোটেল। ভ্রমণরচনায় পড়েছি টিলার উপরে তাকে সমাহিত করা হয়েছিল। উঁচু-নিচু পথ দেখে অনুমান করতে পারছি টিলা কেটে পথ তৈরি হয়েছে। পথে যাকে জিজ্ঞাসা করছি, সে বলছে কিছুটা সামনে। অবশেষে এসে পৌঁছলাম একটি মসজিদের সামনে। মসজিদে প্রবেশের আগে দেয়ালের গায়ে ইবনে বতুতার নাম লেখা। সাদা আলখেল্লা পরিহিত একজন এসে আরবিতে কি যেন বললেন। আমি বোকার মতো তাকিয়ে থাকলাম। তারপর ভদ্রলোক নিজেই বললেন ‘নো এরাবিক, ইংলিশ! ইংলিশ!’
তর্জনি দিয়ে একটি বন্ধ ঘর দেখিয়ে দিলেন। ভেতরে প্রবেশ করতে নিষেধ করলেন। আমাকে ছবি তুলতেও নিষেধ করলেন ইশারায়। আর কোন পর্যটক দেখতে পেলাম না সেসময়। ছবি তোলা বারণ, এ রকম অনেক জায়গায় আমি অনুরোধ করে ছবি তুলেছি। কিন্তু এখানে কেন আমি চুপ থেকেছি জানি না। আসলে ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতিবন্ধকতা অনুভূত হচ্ছিল বোধ হয়। প্রিয় পরিব্রাজকের সমাধি দেখে ফিরে এলাম। ফেরার সময় সমাধির একটি ছবি তুলেছি। ইবনে বতুতার সমাধির মসজিদের ভেতরে এবং সবুজ কাপড়ে ঢাকা সমাধি দেখে হয়তো কেউ কেউ এটিকে মাজার বলে থাকেন।
পুদিনা চা
মরক্কোর উত্তরে তাঞ্জিয়ার শহরটিকে বলা যায় একেবারে আটলান্টিক আর ভূমধ্যসাগরের কোলে অবস্থিত। তাঞ্জিয়ার বেশ উন্নত আর পরিচ্ছন্ন শহর। যতটুকু দেখা হলো তাতে মনে হচ্ছিল ইউরোপেরই কোন শহরে আছি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ফ্রান্স আর স্পেনের অধিনে চলে যায় মরক্কো, তার উপর আদিবাসি বার্বার সংস্কৃতি ও মুসলিম সংস্কৃতির প্রভাব তো রয়েছেই, তাই এখানে মিশ্র সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে । প্রাচীন আর আধুনিকতার মিশেলে ভিন্ন একটি সাংস্কৃতিক আবহাওয়া বিরাজ করছে। ১৯৫৬ সালে রাজা পঞ্চম মোহাম্মদের নেতৃত্বে মরক্কো স্বাধীনতা লাভ করে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে আরবির পাশাপাশি ফরাসি ভাষা পড়ানো হয়। তবে সরকার এই আইন বদলে আরবির পাশাপাশি ইংরেজি শিক্ষার কথা চিন্তা করছে। কিন্তু উত্তরে স্প্যানিশ সংস্কৃতির প্রভাব বেশি।
আমার ব্যক্তিগত একটি অনুভূতি হলো তাঞ্জিয়ার শহরে গিয়ে– আমরা এশিয়ানরা ইবনে বতুতা নামটির প্রতি যতটা আবেগ ও শ্রদ্ধার মনোভাব পোষণ করি, অন্যান্য বিশ্ব পর্যটকদের মাঝে সে অনুভূতি একেবারেই কম।
তাঞ্জিয়ারের উঁচু পাহাড়ের ওপর অবস্থিত Kasbah of Tangier থেকে দেখা যায় বিস্তীর্ণ সমুদ্র আর শহরের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। একসময় এটি ছিল শাসকদের আবাস, আর এখন পর্যটকদের কাছে ইতিহাসের এক খোলা জানালা। শহরের বাইরে অবস্থিত বিখ্যাত Caves of Hercules নিয়ে রয়েছে নানা পৌরাণিক কাহিনি। বলা হয়, গ্রিক পুরাণের বীর Hercules এখানে বিশ্রাম নিয়েছিলেন। গুহার ভেতর থেকে সমুদ্রের দিকে তাকালে আফ্রিকার মানচিত্রের মতো এক প্রাকৃতিক দৃশ্য চোখে পড়ে— যা সত্যিই বিস্ময়কর।
ঢাকা/তারা//
কেরানীগঞ্জে কারাখানায় অগ্নিকাণ্ডে ৫ জন নিহত