কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে আবারো জমতে শুরু করেছে অস্থিরতার ছায়া। দীর্ঘদিন তুলনামূলক শান্ত থাকার পর হঠাৎ করে আন্তর্জাতিক জঙ্গি যোগাযোগ ও অভ্যন্তরীণ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে, এমনটাই বলছে একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র।
রোহিঙ্গারা জানান, তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)-এর সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে মোহাম্মদ উল্লাহ (১৯) নামে এক রোহিঙ্গা তরুণের গ্রেপ্তার ৩৩টি ক্যাম্পজুড়ে নতুন করে নাড়া দিয়েছে পরিস্থিতিকে। ক্যাম্পবাসীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে আশঙ্কা, বাড়ছে আতঙ্ক।
আরো পড়ুন: ক্যাম্পে শৃঙ্খলা মানছে না রোহিঙ্গারা, বাড়ছে উদ্বেগ
রোহিঙ্গাদের ভাষ্য, অস্ত্রের ঝনঝনানি থেমে গিয়েছিল, সেখানে আবারো শোনা যাচ্ছে উত্তেজনার শব্দ। জঙ্গি তৎপরতা, গোলাগুলি ও খুনোখুনির বিচ্ছিন্ন ঘটনা ফের মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে বলে তাদের অভিযোগ। বিশেষ করে ক্যাম্পের অভ্যন্তর থেকে উঠতি তরুণদের ধরে নিয়ে গিয়ে সশস্ত্র সংগঠনে যোগদান করার চাপ প্রয়োগ রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বসবাসকারীদের হতাশায় ফেলেছে।
কুতুপালং ১ নম্বর (ওয়েস্ট) ক্যাম্পের বাসিন্দা ফাতেমা তুজ জোহরা জানান, ক্যাম্পভিত্তিক কয়েকটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী তার স্বামীকে জোরপূর্বক তাদের দলে ভেড়ানোর চেষ্টা করে। দলে যোগ না দিলে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়। একপর্যায়ে জীবন বাঁচাতে তার স্বামী ক্যাম্প ছেড়ে পালিয়ে যান।
জোহরার মতো আরো অনেক পরিবার একই ধরনের আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে বলে জানা গেছে। ক্যাম্পজুড়ে সক্রিয় বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর জোরপূর্বক সদস্য সংগ্রহ, হুমকি ও সহিংসতার ভয়ে অনেকেই ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে সাধারণ রোহিঙ্গাদের মধ্যে চরম নিরাপত্তাহীনতা বিরাজ করছে এবং পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেকোনো সময় বড় ধরনের সহিংসতার আশঙ্কা করছেন ক্যাম্পে বসবাসকারীরা। নীরব এই অস্থিরতা এখন তাদের দৈনন্দিন জীবনের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ।
তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে গ্রেপ্তার মোহাম্মদ উল্লাহ
গত সোমবার (৪ মে) টেকনাফের ২৪ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তানের (টিটিপি) সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে মোহাম্মদ উল্লাহকে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তিনি টেকনাফের লেদা ২৪ নম্বর আন রেজিস্টার রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা আব্দুল করিমের ছেলে।
টেকনাফ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সাইফুল ইসলাম বলেন, “গ্রেপ্তার মোহাম্মদ উল্লাহ টিটিপির সমর্থক বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে জঙ্গি সংগঠনটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে তার সক্রিয় উপস্থিতির প্রমাণ মিলেছে। এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে টেকনাফ থানায় সংশ্লিষ্ট আইনে মামলা করা হয়েছে।”
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, মোহাম্মদ উল্লাহ গত ৫ মে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে পাকিস্তানভিত্তিক নিষিদ্ধ সন্ত্রাসী সংগঠন টিটিপি (তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান)-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ‘হাকিকত নিউজ’ নামে একটি গ্রুপে সদস্য হয়ে যোগাযোগ রক্ষা করছিলেন। তিনি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনার উদ্দেশ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় ছিলেন। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ৪ মে তাকে তার বসতঘর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তার ব্যবহৃত একটি মোটো জি৭৩ ৫জি মডেলের কালো রঙের অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়।
এজাহারে আরো বলা হয়, মোহাম্মদ উল্লাহ রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠী আরসার ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে জড়িত এবং সংগঠনটির সামরিক শাখার সঙ্গেও তার সম্পৃক্ততা রয়েছে। তার ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরটি পাকিস্তানের দুই সন্ত্রাসী নেতার পরিচালিত ‘হাকিকত নিউজ’ গ্রুপের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত পাওয়া গেছে।
তিনি টিটিপির পক্ষে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার লক্ষ্যে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে প্রচার-সমর্থন দেওয়ার উদ্দেশ্যে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে জনগোষ্ঠীকে উদ্বুদ্ধ করছিলেন এবং নিষিদ্ধ সংগঠনের কার্যক্রমকে গতিশীল করতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছিলেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এছাড়া, সহযোগীদের নিয়ে দেশ-বিদেশে অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার প্রেক্ষিতে তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯-এর ৯/১৩ ধারায় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে।
এই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা উপ-পরিদর্শক শুভ সৌমিত্র তালুকদার বলেন, “বুধবার (৬ মে) বিজ্ঞ আদালতে মাহমুদুল্লাহ বিরুদ্ধে রিমান্ডের আবেদন করা হয়েছে। এ ব্যাপারে আদালতের নির্দেশনার অপেক্ষায় আছি।”
এই ঘটনার একদিন পর, মঙ্গলবার (৫ মে) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে উখিয়ার ক্যাম্প-৭ এলাকায় আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (আরসা) হামলায় আরাকান রোহিঙ্গা অর্গানাইজেশনের (এআরও) নেতা কেফায়েত উল্লাহ হালিম ওরফে আব্দুল হালিম (৪০) নিহত হন। এ ঘটনায় আরো দুজন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। ঘটনাটি নৌকার মাঠ পুলিশ ক্যাম্পের আওতাধীন এলাকায় ঘটে। একজন শীর্ষ রোহিঙ্গা নেতাকে গুলি করে হত্যা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় রোহিঙ্গা নেতারা।
বুধবার (৬ মে) দুপুর আড়াইটার দিকে উখিয়ার ক্যাম্প-৮ ইস্ট এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে গুলিতে আরেক রোহিঙ্গা নেতা নিহত হয়েছেন। নিহত ব্যক্তি আরাকান রোহিঙ্গা আর্মি (এআরএ) ও নবী হোসেন গ্রুপের প্রধান নবী হোসেনের ছোট ভাই মোহাম্মদ কামাল।
একাধিক রোহিঙ্গা নেতা জানান, ক্যাম্পে আগের চেয়ে অনেক বেশি অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। নতুন নতুন সন্ত্রাসী গোষ্ঠী মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। তারা নিজেদের আধিপত্য বিস্তারে মরিয়া হয়ে উঠেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রোহিঙ্গাদের এক শীর্ষ নেতা বলেন, সাধারণ যুবকদের টার্গেট করা হচ্ছে। নানা প্রলোভন দেখিয়ে সন্ত্রাসী দলে ভেড়ানোর চেষ্টা চলছে। কেউ না মানলে হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পের কয়েকজন মাঝি (নেতা) বলেন, আগে যেটুকু নিরাপত্তা ছিল, এখন সেটাও কমে গেছে। রাত হলেই ভয় কাজ করে। কারা কখন কোথায় হামলা করবে, কেউ বলতে পারে না।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, বিদেশি সংযোগ, চরমপন্থি সংগঠনের প্রভাব এবং অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এই তিনটি বিষয় রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোকে ক্রমেই অস্থিতিশীল করে তুলছে। দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
কক্সবাজার নাগরিক ফোরামের সভাপতি আ.ন.ম হেলাল উদ্দিন বলেন, “রোহিঙ্গা ক্যাম্পকেন্দ্রিক বর্তমান পরিস্থিতি স্থানীয় জনগণের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সংকটে স্থানীয়দের নিরাপত্তা, জীবিকা ও পরিবেশ- সবকিছুই চাপে পড়ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় আরো সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের পাশাপাশি অপরাধীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সক্রিয় ভূমিকা এবং টেকসই সমাধান হিসেবে দ্রুত প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করা জরুরি।”
কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা বলেন, “রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেখানে খুনোখুনি, অপহরণ এবং আধিপত্যকে বিস্তার করে যে বিশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরি হয়েছে তা অবশ্যই অশনি সংকেত।”
শরণার্থী অপরাধ বিষয়ক গবেষক রাফি আল ইমরান বলেন, “মিয়ানমার সীমান্তঘেঁষা ভৌগোলিক অবস্থান ও সমুদ্রপথের সহজলভ্যতা অপরাধী চক্রকে সহায়তা করছে। পাশাপাশি রাষ্ট্রহীনতা ও আইনি পরিচয়ের অভাব অনেকের মধ্যে আইনের ভয় কমিয়ে দিচ্ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় শক্তিশালী আইন প্রয়োগ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং দীর্ঘমেয়াদী নীতিগত পদক্ষেপ প্রয়োজন।”
উখিয়া আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (১৪ এপিবিএন) অধিনায়ক অতিরিক্ত উপ-মহাপরিদর্শক সিরাজ আমিন বলেন, “ইতোমধ্যে ক্যাম্পভিত্তিক গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। সন্ত্রাসী তৎপরতা দমনে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।”
মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে বর্তমানে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি ক্যাম্পে বসবাস করছে।