আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ২০২৬ এর গ্রুপ ‘ডি’কে অনেকেই বলছেন এবারের আসরের সবচেয়ে বিপজ্জনক গ্রুপ। কারণ এই গ্রুপে এমন পাঁচটি দল রয়েছে, যাদের মধ্যে অন্তত তিনটি দল বর্তমান র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ দশে অবস্থান করছে। স্বাভাবিকভাবেই এই গ্রুপ থেকে অন্তত একটি শক্তিশালী দল গ্রুপ পর্বেই বিদায় নেবে, এটা প্রায় নিশ্চিত।
দক্ষিণ আফ্রিকা, নিউ জিল্যান্ড ও আফগানিস্তান- এই তিন দলের শক্তি, সাম্প্রতিক ফর্ম ও অভিজ্ঞতা এমন যে, গ্রুপ পর্বের প্রতিটি ম্যাচই হতে যাচ্ছে নকআউটের মতো চাপের। সঙ্গে রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কানাডা; যারা কেউই সহজ প্রতিপক্ষ নয় এবং বিশ্বমঞ্চে নিজেদের প্রমাণ করতে মরিয়া।
গ্রুপ ‘ডি’ এর দলসমূহ: দক্ষিণ আফ্রিকা, নিউ জিল্যান্ড, আফগানিস্তান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কানাডা।
শীর্ষ দশের তিন দল, এক গ্রুপ; এমন সমীকরণ আর নেই: চারটি গ্রুপের মধ্যে একমাত্র গ্রুপ ‘ডি’-তেই বর্তমান র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ দশে থাকা তিনটি দল একসঙ্গে পড়েছে। নিউ জিল্যান্ড চতুর্থ, দক্ষিণ আফ্রিকা পঞ্চম এবং আফগানিস্তান দশম স্থানে রয়েছে।
দুই বছর আগের বিশ্বকাপে আফগানিস্তান যে নাটকীয় যাত্রা শুরু করেছিল, তা এখনো ক্রিকেটবিশ্বে আলোচনার বিষয়। সেই আসরে তারা গ্রুপপর্বে নিউ জিল্যান্ডকে হারিয়ে সুপার এইটে ওঠে এবং বিশ্ব ক্রিকেটকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে আফগানিস্তান। ফলে এবারের আসরে এই দুই দলের পুনর্মুখোমুখি লড়াই ঘিরে বাড়তি উত্তেজনা থাকছেই।
গ্রুপ ‘ডি’-এর মূল সুর দক্ষিণ আফ্রিকা নিউ জিল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকার র্যাঙ্কিং কাছাকাছি হলেও এই গ্রুপের ভারসাম্য আপাতত দক্ষিণ আফ্রিকার দিকেই ঝুঁকে আছে। গত আসরে তারা ফাইনাল খেলেছিল এবং সেখানে ভারতের কাছে হারলেও পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে ছিল ধারাবাহিক ও আত্মবিশ্বাসী।
সম্প্রতি একটি প্রস্তুতি ম্যাচে ভারতের কাছে হারলেও, সেই হার দক্ষিণ আফ্রিকার শক্তি নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলে না। বরং অভিজ্ঞতা ও গভীরতা বিবেচনায় তারা আবারও শিরোপার দাবিদার।
:: নজরে থাকবেন যিনি ::
মিচেল স্যান্টনার (নিউ জিল্যান্ড): এই গ্রুপে সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলতে পারেন নিউ জিল্যান্ড অধিনায়ক মিচেল স্যান্টনার। এতদিন তাকে মূলত নিয়ন্ত্রিত স্পিন বোলার হিসেবেই দেখা হয়েছে। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে তার ইকোনমি বরাবরই ঈর্ষণীয়।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের বিপক্ষে পাঁচ ম্যাচের সিরিজে তার ব্যাটিং নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। নিচের দিকে নেমে তিনি যেভাবে চাপের মুহূর্তে দ্রুত রান তুলেছেন, তা নিউ জিল্যান্ডের জন্য বড় সম্পদ। যদি তিনি নিয়মিতভাবে বোলিংয়ে নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যাটিংয়ে কার্যকর ক্যামিও দিতে পারেন, তবে গ্রুপ ‘ডি’-তে তার প্রভাব সবচেয়ে বেশি হতে পারে।
:: দলভিত্তিক বিশ্লেষণ ::
দক্ষিণ আফ্রিকা: এবার কি অধরা শিরোপা দেবে ধরা? দক্ষিণ আফ্রিকাকে বলা হয় সবচেয়ে শক্তিশালী দলগুলোর একটি, যারা এখনো টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জিততে পারেনি। গত আসরে প্রথমবার ফাইনাল খেলে তারা ইতিহাস ছুঁয়েছিল। সম্প্রতি বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ জেতায় দলটির ওপর থাকা দীর্ঘদিনের শিরোপা-খরা মানসিক চাপ কিছুটা হলেও কমেছে।
অধিনায়ক এইডেন মার্করামের নেতৃত্বে দলে আছে ভয়ংকর সব ব্যাটসম্যান ও মানসম্মত পেস আক্রমণ। কুইন্টন ডি কক এখনো আগের মতোই বিধ্বংসী। সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক ম্যাচগুলোতে তার ব্যাট থেকে বড় ইনিংস এসেছে।
দলটির বড় শক্তি ব্যাটিং গভীরতা। যে কোনো মুহূর্তে ম্যাচ উল্টে দিতে সক্ষম একাধিক খেলোয়াড় রয়েছে। প্রশ্ন একটাই- স্পিন বিভাগে কেশব মহারাজের বাইরে পর্যাপ্ত সহায়তা তারা পাবে কি না, বিশেষ করে উপমহাদেশের কন্ডিশনে।
নিউ জিল্যান্ড: সাবধান না হলে শুরুতেই বিপদ দুই বছর আগে আফগানিস্তানের কাছে হারের পর নিউ জিল্যান্ডের বিশ্বকাপ যাত্রা দ্রুত শেষ হয়ে গিয়েছিল। এবারের আসরে তারা সেই ভুল আর করতে চায় না। তবে সূচির নির্মমতা প্রথম ম্যাচেই আফগানিস্তানের বিপক্ষে খেলতে হচ্ছে।
মিচেল স্যান্টনারের নেতৃত্বে দলটিতে আছে শক্তিশালী ব্যাটিং লাইনআপ এবং কার্যকর পেস ও স্পিনের মিশ্রণ। লকি ফার্গুসনের সেই ঐতিহাসিক চার ওভার চার মেডেন এখনো স্মরণীয়। এমন জাদু আবার দেখা গেলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
আফগানিস্তান: অবহেলা করলেই সর্বনাশ আফগানিস্তান এখন আর কোনোভাবেই ‘ডার্ক হর্স’ নয়। গত বিশ্বকাপে নিউ জিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে তারা প্রমাণ করেছে বড় ম্যাচে ভয় পায় না।
রহমানউল্লাহ গুরবাজ সাম্প্রতিক বিশ্বকাপে দলের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক ছিলেন। ইব্রাহিম জাদরান বর্তমানে দলের সেরা ব্যাটসম্যানদের একজন। বোলিংয়ে রশিদ খান ও মুজিব উর রহমান; এই জুটি যে কোনো ব্যাটিং লাইনআপের জন্য দুঃস্বপ্ন।
রশিদ খানের নেতৃত্বে আফগানিস্তান এবার আরও পরিণত। বড় মঞ্চে তারা জানে কীভাবে সুযোগ কাজে লাগাতে হয়।
সংযুক্ত আরব আমিরাত: ইতিহাস গড়ার স্বপ্ন তৃতীয়বারের মতো টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে খেলতে নামছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। আগের আসরে নামিবিয়ার বিপক্ষে একমাত্র জয় পেলেও, এরপর থেকে দলটির উন্নতি চোখে পড়ার মতো।
অধিনায়ক মুহাম্মদ ওয়াসিম এই দলের প্রাণভোমরা। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে তার ছক্কার সংখ্যা বিশ্বমানের ব্যাটসম্যানদের সঙ্গে তুলনীয়। যদি আমিরাত কোনো অঘটন ঘটাতে পারে, তার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবেন এই অধিনায়কই।
কানাডা: ফিরে আসা ও নতুন স্বপ্ন দুই বছর আগে অভিষেক বিশ্বকাপেই আয়ারল্যান্ডকে হারিয়ে চমক দিয়েছিল কানাডা। এবারের আসরে তারা এসেছে আরও আত্মবিশ্বাস নিয়ে।
নতুন অধিনায়ক দিলপ্রীত বাজওয়ার নেতৃত্বে দলটি বাছাইপর্বে ছিল অপরাজিত। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ম্যাচ দিয়েই তাদের বিশ্বকাপ শুরু; কঠিন চ্যালেঞ্জ হলেও, হারানোর কিছু নেই মনোভাবেই খেলবে তারা।
সবশেষে বলা যায়, গ্রুপ ‘ডি’ মানেই অনিশ্চয়তা, চাপ আর উচ্চমানের ক্রিকেট। এখানে প্রতিটি ম্যাচই হবে ফাইনালের মতো। দক্ষিণ আফ্রিকা, নিউ জিল্যান্ড ও আফগানিস্তান; এই তিন দলের মধ্যে অন্তত একটি দল যে গ্রুপ পর্বেই বিদায় নেবে, তা প্রায় নিশ্চিত। আর সেই নাটকীয় বিদায়ের সাক্ষী হতে যাচ্ছে পুরো ক্রিকেটবিশ্ব।