খেলাধুলা

গ্রুপ ‘সি’ বিশ্লেষণ: শিরোপাধারীদের ভিড়ে অভিষেকের উত্তাপে ইতালি

আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ২০২৬ এর গ্রুপ ‘সি’ নিঃসন্দেহে টুর্নামেন্টের সবচেয়ে আকর্ষণীয় গ্রুপগুলোর একটি। এখানে একদিকে আছে দুইবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ড ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ, অন্যদিকে রয়েছে প্রথমবার বিশ্বমঞ্চে পা রাখা ইতালি। যাদের অভিষেক ম্যাচই হতে যাচ্ছে উত্তেজনায় ঠাসা প্রতিদ্বন্দ্বিতার গল্প। সঙ্গে শক্তি, উদ্দীপনা ও লড়াকু মানসিকতায় ভরপুর নেপাল ও বাংলাদেশের পরিবর্তে সুযোগ পাওয়া স্কটল্যান্ড। সব মিলিয়ে গ্রুপ ‘সি’ মানেই অনিশ্চয়তা আর রোমাঞ্চ।

এই গ্রুপে প্রতিটি ম্যাচই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এখানে শুধু শিরোপাধারীদের আধিপত্য নয়, বরং রয়েছে নতুন গল্প লেখার সুযোগ।

গ্রুপ ‘সি’-এর দলসমূহ: ইংল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ইতালি, নেপাল ও স্কটল্যান্ড।

শিরোপাধারীদের গ্রুপে নতুনদের চ্যালেঞ্জ: ইংল্যান্ড ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ- এই দুই দলই দু’বার করে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জিতেছে। একসময় এই দুই দলের মধ্যকার লড়াই মানেই ছিল টুর্নামেন্টের হাইভোল্টেজ ম্যাচ। এবারের আসরেও সেই ঐতিহ্যের ছাপ স্পষ্ট।

তবে এই গ্রুপের বৈশিষ্ট্য এখানেই শেষ নয়। ইতালি প্রথমবার বিশ্বকাপে খেলতে নামছে, আর তাদের অভিষেক ম্যাচই হচ্ছে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে। যা বাছাইপর্বের পুরনো দ্বন্দ্বের পুনরাবৃত্তি। অন্যদিকে নেপাল, যাদের সমর্থকদের উন্মাদনা এবং মাঠের ভেতরের আগ্রাসন বরাবরই বড় দলের জন্য অস্বস্তির কারণ।

:: নজরে থাকবেন যিনি ::

আদিল রশিদ (ইংল্যান্ড): ভারত ও শ্রীলঙ্কার কন্ডিশনে স্পিনাররা বরাবরই বড় ভূমিকা রাখে। সেই বাস্তবতায় ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বড় অস্ত্র নিঃসন্দেহে অভিজ্ঞ লেগস্পিনার আদিল রশিদ। সাম্প্রতিক সময়ে তিনি দুর্দান্ত ছন্দে আছেন এবং রানের লাগাম টানার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে উইকেট তুলে নেওয়ার ক্ষমতা তাকে আলাদা করে তোলে।

অধিনায়ক হ্যারি ব্রুক চাপের মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি ভরসা করবেন রশিদের ওপরই। বড় দলগুলোর বিপক্ষে ম্যাচের ভাগ্য ঘুরিয়ে দেওয়ার সামর্থ্য তার আছে।

:: দলভিত্তিক বিশ্লেষণ ::

ইংল্যান্ড: ভারসাম্য ও শক্তির নিখুঁত মিশেল ইংল্যান্ড এসেছে শক্তিশালী ও গভীর স্কোয়াড নিয়ে। ব্যাটিং, বোলিং ও অলরাউন্ড সামর্থ্য; তিন বিভাগেই ম্যাচ জেতানোর মতো ক্রিকেটার আছে। অধিনায়ক হ্যারি ব্রুক দায়িত্ব নেওয়ার পর দলটি আরও আক্রমণাত্মক হয়েছে।

জস বাটলার, ফিল সল্টদের ব্যাটে দ্রুত বড় রান তোলার ক্ষমতা আছে। বোলিং বিভাগে আদিল রশিদের সঙ্গে জোফরা আর্চারের গতি ইংল্যান্ডকে বাড়তি ধার দিচ্ছে। অলরাউন্ডার স্যাম কারান অতীতে বড় টুর্নামেন্টে ম্যাচ ঘুরিয়ে দেওয়ার নজির রেখেছেন। সব মিলিয়ে ইংল্যান্ড যে শিরোপার অন্যতম দাবিদার, তা বলাই বাহুল্য।

ওয়েস্ট ইন্ডিজ: ভয়ংকর সামর্থ্য, প্রশ্ন ধারাবাহিকতা ওয়েস্ট ইন্ডিজ শেষবার বিশ্বকাপের নকআউট খেলেছিল ২০১৬ সালে। সেবার তারা শিরোপাও জিতেছিল। এরপর থেকে সময়টা তাদের জন্য সহজ ছিল না। তবে ক্যারিবীয়দের বড় সমস্যা কখনোই প্রতিভার অভাব নয়, বরং ধারাবাহিকতার সংকট।

অধিনায়ক শাই হোপের নেতৃত্বে টপ অর্ডার যদি নিয়মিত রান পায়, তবে তারা যেকোনো দলকে চাপে ফেলতে পারে। ব্র্যান্ডন কিং ও শিমরন হেটমায়ার আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে সক্ষম। প্রশ্ন একটাই- ওয়েস্ট ইন্ডিজ কি পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে নিজেদের সেরা খেলাটা খেলতে পারবে?

ইতালি: অভিষেকে বিশ্বমঞ্চের আলো ইতালির জন্য এবারের বিশ্বকাপ শুধুই একটি টুর্নামেন্ট নয়, এটি ইতিহাস গড়ার মঞ্চ। বাছাইপর্বে নাটকীয় পারফরম্যান্সের পর তারা প্রথমবার বিশ্বকাপে জায়গা করে নিয়েছে।

৪২ বছর বয়সী অভিজ্ঞ ওয়েন ম্যাডসেনের নেতৃত্বে দলটি নামছে আত্মবিশ্বাস নিয়ে। বাছাইপর্বের ফাইনালে হ্যারি মানেন্তির পাঁচ উইকেট ইতালিকে বড় স্বপ্ন দেখাচ্ছে। সবচেয়ে বড় আকর্ষণ তাদের অভিষেক ম্যাচই স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে, যাদের হারিয়েই তারা বিশ্বকাপে এসেছে। এই ম্যাচ ঘিরে তাই আলাদা উত্তেজনা থাকছেই।

স্কটল্যান্ড: শেষ মুহূর্তের সুযোগ, বড় কিছু করার তাগিদ শেষ সময়ে সুযোগ পাওয়া স্কটল্যান্ড টানা পঞ্চমবার বিশ্বকাপে খেলছে। অভিজ্ঞ অধিনায়ক রিচি বেরিংটনের নেতৃত্বে দলটি নিজেদের প্রমাণ করতে মরিয়া।

ব্র্যান্ডন ম্যাকমুলেনের ব্যাটিং এবং মার্ক ওয়াটের স্পিন স্কটল্যান্ডকে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাখবে। বাংলাদেশ বাদ পড়ার পর পাওয়া এই সুযোগকে কাজে লাগাতে তারা সর্বোচ্চটা দেবে এতে কোনো সন্দেহ নেই।

নেপাল: সমর্থকদের উন্মাদনা ও তরুণদের সাহস নেপাল মানেই গ্যালারিভর্তি আবেগ, মাঠে নির্ভীক ক্রিকেট। বড় টুর্নামেন্টে সুযোগ পেলে তারা বরাবরই নিজেদের প্রমাণ করার চেষ্টা করে।

সহ-অধিনায়ক দীপেন্দ্র সিং আইরির ব্যাটিং এবং সন্দীপ লামিছানের স্পিন নেপালকে বিপজ্জনক করে তুলতে পারে। অভিজ্ঞ কোচিং সেটআপের অধীনে দলটি এবারও বড় দলের জন্য অস্বস্তির কারণ হতে প্রস্তুত।

সবশেষে বলা যায়, গ্রুপ ‘সি’ মানে শুধুই শিরোপাধারীদের লড়াই নয়, বরং নতুন ইতিহাস লেখার সম্ভাবনাও। ইংল্যান্ড ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের অভিজ্ঞতা, ইতালির অভিষেকের আবেগ, স্কটল্যান্ডের প্রত্যাবর্তনের তাগিদ আর নেপালের নির্ভীকতা; সব মিলিয়ে এই গ্রুপ থেকেই আসতে পারে বিশ্বকাপের কিছু সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্ত।