ঢাকা     শুক্রবার   ২০ মে ২০২২ ||  জ্যৈষ্ঠ ৬ ১৪২৯ ||  ১৭ শাওয়াল ১৪৪৩

রক সাইন নাকি শয়তানের শিং

নাবীল অনুসূর্য || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১১:২৪, ১৬ জানুয়ারি ২০১৫   আপডেট: ০৫:২২, ৩১ আগস্ট ২০২০
রক সাইন নাকি শয়তানের শিং

রক চিহ্ন

নাবীল অনুসূর্য : রক কনসার্টে গেলে তিনটি কাজ করতেই হয়। গলা ছেড়ে গান গাওয়া, ছবি তোলা আর মাঝে মাঝে হাত তুলে রক সাইন দেখানো। রক সাইন, মানে তর্জনি আর কনিষ্ঠা উঁচিয়ে রেখে বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে মধ্যমা আর অনামিকা ধরে রেখে হাতের তালু দেখানো। অনেকেই অবশ্য সাইনটিকে শয়তানের শিংয়ের সাইনও বলে থাকে। কিন্তু এটা রক গানের প্রতীক হল কীভাবে?

এটা মূলত রক না, প্রচলিত হয়েছিল মেটাল গানের জন্য। সাইনটিকে বিখ্যাত করেন বিখ্যাত হেভি মেটাল ব্যান্ড ব্ল্যাক স্যাবাথ-এর ভোকাল রনি জেমস ডিও। তবে গানের জগতে এই প্রতীকটি আসে তারও আগে। আসে বিটলস আর কোভেন ব্যান্ড দুটির হাত ধরে।

১৯৬৬ সালে বিটলস-এর সিঙ্গেল ট্র্যাক ইয়েলো সাবমেরিন রিলিজ হয়। আর তার কাভারে লেননকে দেখা যায় প্রায় রক সাইনের মতো সাইন দিতে। প্রায় বলার কারণ, সেটা ঠিক পুরোপুরি রক সাইন ছিল না। পুরোপুরি রক সাইনসহ লেননকে দেখা যায় পূর্ণাঙ্গ ইয়েলো সাবমেরিন অ্যালবামের কাভারে। অবশ্য সেটা ছবি ছিল না, ছিল কার্টুন। অ্যালবামটা বের হয় ১৯৬৯-এর জানুয়ারিতে।

তবে লেনন যে কেন এই সাইন ব্যবহার করেছিলেন, সে এক রহস্য। অনেকের ধারণা, কুখ্যাত ব্ল্যাক ম্যাজিশিয়ান অ্যালিস্টার ক্রাওলি-র প্রতি আগ্রহ থেকেই লেনন হয়তো এই সাইন ব্যবহার করেছিলেন।

 

আবার সাইকাডেলিক ব্যান্ড কোভেন তাদের স্টেজ পারফর্মেন্সে এই সাইন ব্যবহার করত সম্ভবত ১৯৬৭ সাল থেকেই। ১৯৬৯ সালে রিলিজ হওয়া উইচক্র্যাফট ডেস্ট্রয়েজ মাইন্ডস এন্ড রিপস সোলস নামের লংপ্লের ব্যাক কাভারে ব্যান্ডটির দুইজন সদস্যকে এই সাইন দিতেও দেখা যায়। মজার বিষয় হল, লংপ্লের একটি ট্র্যাকের নাম ছিল ব্ল্যাক সাবেথ। আর রনি জেমস ডিও পরে যেই ব্ল্যাক সাবেথে যোগ দেন, সেই ব্যান্ডটিও এই বছরেই গঠিত হয়।

 

সংগীত জগতের সবচেয়ে জনপ্রিয় এই সাইনটি ডিও প্রথম ব্যবহার না করলেও, জনপ্রিয় করার কৃতিত্ব তারই। এতটাই যে, অনেকেরই এই ভুল ধারণা আছে যে, সাইনটি ডিও-র উদ্ভাবন। তবে ডিও সাইনটি লেনন বা কোভেন ব্যান্ডের কারও কাছ থেকে নেননি। তাকে এই সাইনটি শিখিয়েছিলেন তার দাদিমা।

ডিওর দাদিমা ছিলেন ইতালিয়ান। ইতালিয় সংস্কৃতিতে এই সাইনকে বলা হয় কর্না। কর্না সাইন অবশ্য অনেক প্রাচীন। প্রাচীন গ্রিসের কিছু চিত্রকর্মেও এই সাইন পাওয়া যায়। এই কর্না সাইন ব্যবহার করা হয় মূলত খারাপ আত্মা বা শয়তানের হাত থেকে বাঁচার জন্য। অবশ্য অনেকেরই ধারণা উল্টো। অনেকের মধ্যেই এই ভুল ধারণা প্রচলিত যে, এটি শয়তানের সাইন। সেই ধারণা থেকেই এটাকে শয়তানের শিংয়ের সাইন বলা হয়। প্রকৃতপক্ষে এটা শয়তানকে দূরে রাখার সাইন; শয়তানের হাত থেকে বাঁচার জন্যই মানুষ কর্না সাইন দেখাত।

ডিও ব্ল্যাক সাবেথে যোগ দেন ১৯৭৯ সালে, ওজি ওসবোর্ন ব্যান্ডটি ছেড়ে দিলে; কিংবা বলা যেতে পারে ওজিকে ব্যান্ড থেকে বের করে দিলে। ওজি ওসবোর্ন তখন রীতিমতো তারকা। ওজি স্টেজে উঠলে মেটালহেডরা যাকে বলে হুমড়ি খেয়ে পড়ত। ব্যান্ড থেকে সেই তারকা ওজিকে বের করে দিয়ে তার জায়গায় নেওয়া হয়েছে ডিওকে। ডিওর জন্য পুরো বিষয়টা ছিল এক বিশাল চ্যালেঞ্জ।


তবে ডিওর আত্মবিশ্বাসে ঘাটতি ছিল না। নিজের কণ্ঠের উপর তার ছিল পূর্ণ বিশ্বাস। কেবল একটা জিনিস নিয়েই ছিল ডিওর দুশ্চিন্তা- স্টেজ অ্যাপিয়ারেন্স। বিশেষ করে ওজির ডাবল পিস সাইন তখন ভীষণ জনপ্রিয়। ওজি স্টেজে উঠে স্রেফ দুই হাতে পিস সাইন দেখালেই শ্রোতারা তুমুল চিৎকার করে ওঠে। ডিও তেমন কিছু খুঁজছিলেন তার নিজের জন্যও। ডাবল পিস সাইন তখন ভীষণ জনপ্রিয়, কিন্তু সেটা তো ওজির নিজস্ব ভঙ্গি, তার অনুকরণ ডিও করতে চাইলেন না। আর তখনই ছোটবেলায় দাদিমার কাছে শেখা কর্না সাইনের কথা মনে পড়ে ডিও-র।

আর এভাবেই রনি জেমস ডিও-র হাত ধরে কর্না সাইন হয়ে গেল মেটাল সাইন। মেটালহেডরা, মানে মেটাল ফ্যানরাও এই সাইন লুফে নিল। আর কয়েক দশকের মধ্যেই সাইনটা আর মেটালহেডদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকল না। রক মিউজিশিয়ান আর রক ফ্যান, সবাই আপন করে নিল সাইনটাকে। এতটাই যে, সাইনটাকে এখন মানুষ যতটা মেটাল সাইন হিসেবে চেনে, তারচেয়ে বেশি চেনে রক সাইন হিসেবে।

ইদানিং তো এই সাইন কেবল রক মিউজিকেই সীমাবদ্ধ নেই। অ্যাভ্রিল তো বটেই, এমনকি ব্রিটনি স্পিয়ার্স, রিহান্নার মতো পপ মিউজিশিয়ানরাও এই সাইন ব্যবহার করতে শুরু করেছে। অনেক রক ভক্তেরই অবশ্য তাতে ভীষণ আপত্তি। কিন্তু বাস্তবতা হল, এখন সঙ্গীত জগতের সবচেয়ে জনপ্রিয় সাইন এই রক সাইন। মানে, তর্জনি আর কনিষ্ঠা উঁচিয়ে বুড়ো আঙুল দিয়ে মধ্যমা আর অনামিকা ধরে রেখে হাতের তালু দেখানো।

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৬ জানুয়ারি ২০১৫/নাবীল/রাশেদ শাওন

রাইজিংবিডি.কম

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়