ঢাকা     সোমবার   ১৫ জুলাই ২০২৪ ||  আষাঢ় ৩১ ১৪৩১

সুবিধাবঞ্চিত নারীদের স্বপ্ন দেখাচ্ছে ‘অনিন্দিত নারী’

এম মাহফুজুর রহমান || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১১:০২, ৯ নভেম্বর ২০২০   আপডেট: ১১:৪৫, ৯ নভেম্বর ২০২০
সুবিধাবঞ্চিত নারীদের স্বপ্ন দেখাচ্ছে ‘অনিন্দিত নারী’

মা শ্রেষ্ঠ শিক্ষক। মা এ সংসারের নোঙ্গর। তাইতো নেপোলিয়নের বহুল প্রচলিত উক্তি- তোমরা একজন শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাদের একটি শিক্ষিত জাতি উপহার দেব। কিংবা দার্শনিক মিচ অ্যালবোম’র উক্তি কি মিথ্যে?- তোমার সকল গল্পের পেছনে রয়েছে তোমার মায়ের গল্প, কারণ সেখান থেকেই তুমি শুরু করেছো! কিন্তু সেই মা যদি সুবিধাবঞ্চিত বা অশিক্ষিতা হন! তিনি যদি হন দারিদ্র্যের নির্মম কষাঘাতে জর্জরিত! তাহলে মায়ের সন্তানের ভভিষ্যৎ যে আর থাকে না।

কেউ স্বামী হারা। কোনো মা পোশাক কারখানায় কাজ করতেন করোনাভাইরাস বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ার আগ পর্যন্ত। কেউ বাসা-বাড়িতে কাজ করতেন। কেউ মিরপুরের বেনারসি পল্লীর কোনো শাড়ির শোরুমে কাজ করে দুমুঠো খাবার জোগাড় করেন। কারো বাসায় সদস্য সংখ্যা ৫ থেকে ১০ জন!  এতগুলো মুখে খাবার যোগাতে হয়। অনেকের আবার স্বামীর পাশাপাশি নিজেরও কাজে নামতে হয়।

বিশ্বব্যাপী চলমান মহামারি অবস্থায় সেই পূর্বের কাজগুলো নেই। অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটে। করোনা যেন অভিশাপ নিয়ে এলো। গত্যন্তর না দেখে শিশু সন্তানদেরও তাই কাজে নামিয়ে দেন একসময়। ফলে এসব শিশুর মানবেতর জীবনযাপন করতে হয়। হারিয়ে ফেলে কচি মনের স্কুলের বারান্দার গল্পগুলো। ছোট্ট জীবনকে হারিয়ে ফেলে শহরের বাঁকে। ধুলোয় ঢাকা পড়ে অবিকশিত মেধা আর সঞ্জিবনী শক্তি!

‘অনিন্দিত নারী’তে কর্মসংস্থানের খোঁজে আসা প্রতিটি নারী আর তাদের সন্তানের গল্প এমনই। এখানকার প্রতিটি নারীর জীবন যেন একই সুরে কোথাও বাঁধা।

সুবিধাবঞ্চিত এবং কর্মহারা-সর্বহারা এসব নারীদের স্বাবলম্বী করতে কাজ করছে ‘অনিন্দিত নারী’। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সম্ভাবনার একটি সফল উদ্দ্যোগ ‘অনিন্দিত নারী’। সম্ভাবনার এই প্রকল্পে সুদক্ষ প্রশিক্ষকের মাধ্যমে এসব নারীদের বিনামূল্যে সেলাইয়ের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। পাশাপাশি তাদের খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়। তাদের তৈরি বিভিন্ন পোশাক বাজারজাত করার মাধ্যমে এসব নারীর নিজস্ব উপার্জন নিশ্চিত করা হয়।

যার মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত নারী বা মায়ের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। পাশাপাশি শিশুর শিক্ষা নিশ্চিত করা হয়। মায়ের সন্তানকে আর পথশিশু থাকতে হয় না। শিশুশ্রম থেকে মুক্তি পায় কোমলমতিরা। বেঁচে যায় শিক্ষা বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকি থেকে। এভাবে মা-শিশুর জীবনের গল্পটা নতুন স্বপ্নে সাজিয়ে দেয় ‘অনিন্দিত নারী’র আনসান হিরো স্বপ্নদ্রষ্টারা।

‘অনিন্দিত নারী’ ২০১৭ সাল থেকে পথ শিশুদের শিক্ষা, চিকিৎসাসহ বিভিন্ন সুবিধা নিয়ে কাজ করছে। সুবিধাভোগী শিশুর মায়েদের স্বাবলম্বী করার প্রচেষ্টাই হল ‘অনিন্দিত নারী’। তাদের ভাষ্য মতে- পারিবারিক অভাব-অনটন আর চাপেই এক সময় শিশুরা স্কুল ছেড়ে কাজে যোগ দেয়। বেশির ভাগ শিশুরই আবার বাবা থাকে না। মায়ের কাছেই বড় হয়। অন্যদিকে মায়ের উপার্জনও বেশি থাকে না। ফলে সন্তানকে ভিক্ষাবৃত্তি বা অন্যান্য কাজে ঠেলে দিতে বাধ্য হন মা।

ওসব শিশুই ‘অনিন্দিত নারী’র লক্ষ্য। তারা সাধ্যমতো চেষ্টা করছে এসব শিশুর মায়েদের দক্ষতা অনুসারে কাজ দিতে। প্রত্যেক মাকে হ্যান্ডি ক্রাফ্টস, সেলাই, ব্লক, বাটিক ও হাতের কাজ শেখানো হয়। এছাড়াও ক্ষুদ্র কুটির শিল্প তৈরির প্রশিক্ষণ দিচ্ছে তারা। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে। প্রশিক্ষণ চলাকালে নির্দিষ্ট হারে দেওয়া হয় ভাতা। প্রতি মাসে দেওয়া হয় ২০ কেজি করে চাল।

এসব মায়েদের পাশে দাঁড়ানোর উদ্দেশ্য একটাই। শর্তও একটাই- কাজের বিনিময়ে মায়েরা তাদের সন্তানদেরকে স্কুলে পাঠাবেন। সন্তানদের যেন শিশুশ্রমে না দেন সেটি নিশ্চিত করা। আর এই পুরো প্রক্রিয়াটি সম্ভাবনার তত্ত্ববাধায়নে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। মায়েদের উৎপাদন করা প্রতিটি পণ্য থেকে প্রাপ্ত অর্থের পুরোটাই তাদের কাজের পারিশ্রমিক হিসেবে ব্যয় করা হয়। ব্যয় করা হয় শিশুদের শিক্ষাসহ অন্যান্য উন্নয়নে।

৩০ বসন্ত পেরিয়ে এসেছেন সনিয়া। তার জীবনের ওই শীত-বসন্তের অধিকাংশ সময়ই কেটেছে রাজধানীর গুদারাঘাট বস্তিতে। ২ ছেলের মা সনিয়া। রিকশাচালক স্বামীর আয়ে সংসার চালানো দায়। এদিকে মাস গেলেই ১৫০০ টাকা বাসা ভাড়া! নগরীর বাসাবাড়িতে কাজ করে সংসারের জন্য অতিরিক্ত আয় করতে হয় তাকে। কিন্তু মহামারি করোনা কেড়ে নিয়েছে সেই কাজও। সংসার নিয়ে পড়েন অকূল পাথারে।

দুই ছেলে সম্ভবানার ‘পুষ্পকলি স্কুল’-এ বিনা বেতনে পড়ছে। সেখান থেকেই অনিন্দিত নারীর সঙ্গে তার যোগাযোগ হয়। সনিয়া জানান, ৪-৫ মাস ধরে এখানে পোশাক তৈরির কাজ করছেন। যে উপার্জন হচ্ছে তা দিয়ে ভালোভাবেই চলছে সংসার। পাশাপাশি সন্তানের পড়াশোনা নিয়েও তার আর কোনো চিন্তা নেই।

চলতি বছরের এইচএসসি পরীক্ষার্থী ছিলেন সেলিনা। ৩ বোন আর ১ ভাইসহ ৬ সদস্যের পরিবার। বাবার স্যানিটারির কাজে কষ্টে চলে সংসার। গুদারাঘাট বস্তিতেই ছোট্ট একটা বাসায় গাদাগাদি করে বসবাস। অভাব দেখেই বড় হন সেলিনারা। চারদিকে যেন শুধু নাই আর নাই! 

সেলিনা বলেন, ‘যখন দেখলাম করোনার কারণে পরীক্ষা পেছাচ্ছে, তখন সিদ্ধান্ত নিলাম আর বসে থাকা যাবে না। কিছু একটা করতে হবে। এখনতো শুনছি পরীক্ষাই হবে না। এখানে এসে যোগাযোগ করলে অনিন্দিত নারী আমাকে কাজের সুযোগ করে দেন। প্রথমে ট্রেইনিং নিয়েছি। এখন যা আয় করছি তা দিয়ে সংসারেও সাহায্য করতে পারছি। নিজের জন্যও কিছু করতে পারছি। এটাই বড় আনন্দের।

কথা হয় সম্ভবানার সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও অনিন্দিত নারীর সিওও আরিফুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, একজন মা কিংবা একজন নারীকে স্বাবলম্বী, আত্মবিশ্বাসী আর কর্মমুখী করার মাধ্যমে তার সন্তানকে শিক্ষার আলো যোগান দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য। প্রতি বছর তিনটি ব্যাচে সুবিধাবঞ্চিত নারীদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছি আমরা। এই প্রকল্পের আওতায় এ পর্যন্ত ১৫ জনেরও বেশি নারীর কর্মসংস্থান হয়েছে। সন্তানরা পাচ্ছে শিক্ষার সুবিধা। কিছু  হৃদয়বান ব্যক্তির ডোনেশন আর সম্ভাবনার খরচেই চলে এসব কার্যক্রম।

একজন স্বাবলম্বী মা দেশকে উপহার দিতে পারেন একটি সম্ভাবনাময় শিশু। শিশুর ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত করতে এবং শিশু শ্রম থেকে রক্ষা করতে তার পরিবারকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার কোনো বিকল্প নেই। শিশুর পরিবারকে স্বাবলম্বী করতেই আমাদের এই উদ্যোগ। শিক্ষা থেকে শিশুর ঝড়ে পড়া রোধে এর বিকল্প আর কি হতে পারে, বলছিলেন অনিন্দিত নারীর চিফ কমিউনিকেশন্স অফিসার মুশফিকা জান্নাত নিশাত।

‘বঞ্চিত শিশু ও আগামীর সম্ভাবনা’ শ্লোগান নিয়ে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সম্ভাবনার পথ চলা শুরু হয় ২০১১ সালে। সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য ‘পুষ্পকলি স্কুল’ নামে একটি অবৈতনিক স্কুল পরিচালনা করে আসছে সম্ভাবনা। বর্তমানে স্কুলের দুইটি শাখা রয়েছে- মিরপুর স্টেডিয়াম ও মিরপুর কালশী বস্তি শাখা। এছাড়াও মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থান শাখার কার্যক্রম শিগগিরই শুরু হবে। সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শীতবস্ত্র বিতরণ, বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরীক্ষা, চিকিৎসা সেবা, বিভিন্ন উৎসবে শিশুদের মাঝে পোশাক বিতরণের মতো সেবামূলক কাজ পরিচালনা করছে সম্ভাবনা।

যেভাবে কাজ পাবেন নারীরা

একটি নির্দিষ্ট ফর্ম পূরণের মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত নারীরা অনিন্দিত নারীতে প্রশিক্ষণের সুযোগ পাচ্ছেন। যারা সফলভাবে প্রশিক্ষণ শেষ করবেন, তারাই পাবেন কাজের সুযোগ। এ ক্ষেত্রে নারীরা যোগাযোগ করতে পারেন https://www.facebook.com/Oninditonaree/ এই ফেসবুক পেজের মাধ্যমে। যোগাযোগ করা যাবে http://sombhabona.org/ এই ওয়েবসাইট ব্যবহার করেও। কিংবা সরাসরি যোগাযোগ করুন: বাসা-৪০, রোড-৩৩, ব্লক-ই, সেকশন-১২, মিরপুর, ঢাকা-১২১৬।

এগিয়ে আসুন নারীর সহায়তায়

অনিন্দিত নারীতে বিভিন্ন নারীর কর্মসংস্থান হচ্ছে। বিভিন্ন ধরনের পোশাক তৈরি করছেন তারা। এখানে অনলাইন টেইলরিং পদ্ধতিতে গ্রাহকদের কাছ থেকে পোশাকের অর্ডার নেওয়া হয়। আপনার প্রয়োজনীয় পোশাক অর্ডার করতে পারেন অনিন্দিত নারীতে। এছাড়া অনিন্দিত নারীতে দিতে পারেন আপনার যাকাতের অর্থ। এর মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত নারীদের উন্নয়নে অংশগ্রহণ করতে পারেন আপনিও। যেকোনো বিষয়ে সরাসরি যোগাযোগ করা যাবে ০১৬২৭৫৬৫৬০৮ এবং ০১৭৩৭২৪৩৪৪৭ এ নম্বরে।

লেখক: সাংবাদিক ও ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর, ওয়ালটন গ্রুপ
 

মাহফুজ/সাইফ

আরো পড়ুন  



সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়