ঢাকা     সোমবার   ১৫ জুলাই ২০২৪ ||  আষাঢ় ৩১ ১৪৩১

‘বাংলার ফুসফুস’ সুন্দরবন এক বিস্ময়ের নাম 

আঁখি সিদ্দিকা || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১২:৩৬, ৮ জুন ২০২৩   আপডেট: ১২:৪৮, ৮ জুন ২০২৩
‘বাংলার ফুসফুস’ সুন্দরবন এক বিস্ময়ের নাম 

সুন্দরবনের ইতিহাস বলছেন গৌতমচন্দ্র

(ইতিহাস পর্ব)

হিমাংশুদা ফোকলা দাঁতে হেসে বললেন দিদি, ইতিহাস কি এত মনে থাকে? তোমরা বইপুস্তক পড়েছ, তোমরাই না বাইর করবা ইতিহাস-ঐতিহ্য। আমি কেবল আমার এই দাঁতের ইতিহাস জানি। বলেই জোরে জোরে ফোঁকলা দাঁত বের করে আবারও হাসলেন।

সুন্দরবনের এই প্রাচীন মানুষটি মুক্তিযুদ্ধের সময় শরণার্থী হতে চাননি। না-হতে চাওয়ার গোর্য়াতুমিতে দাঁত হারান তিনি। সে অন্য গল্প বা ঘটনা। সুন্দরবনের ইতিহাস তার কাছে সুন্দর আর সবুজের জঙ্গল নয় কেবল, এটা তার কাছে প্রাণেরও অধিক। ‘বাংলার ফুসফুস’ লোকে বলে। কিন্তু আমরা বলি ‘আমাদের প্রাণে বেঁচে থাকার ভগবান এই বাদাবন’।

বিজ্ঞান আর ইতিহাস না জানলেও এটা বোঝেন হিমাংশুদা বংশ পরম্পরায় এই বন তারা পুজো করে আসছেন, এই বনের বিবিই তাদের জীবন বাঁচিয়ে রেখেছেন। চান্দের জোয়ার ভাটার জন্য এর নাম ‘চন্দ্রদ্বীপ’ হলেও পরে সুন্দরী গাছের জন্য সুন্দরবন হয়েছে। কিন্তু গাছ কই? সুন্দরী গাছ কি আর আগের মতো আছে? ‘কত খেলছি এই সুন্দরী গাছের আবডালে, বান্দরের মতো লাফাইছি এ ডালে ও ডালে। সেই বন-প্রাণীর সাথে মিত্রতা আগের মতো নাই রে বুনডি?’ বলতে বলতে তার নাতি অমিতকে ডেকে বলল তোমরা ইতিহাস নিয়ে কথা কও আমি তো আছিই। 

অমিত বেশ জানাশোনা মনে হলো। গত ১৫ বছর ধরে আমি নিজেই সুন্দরবনে আসা-যাওয়ার মধ্যে থাকলেও, সুন্দরবনকে ভালোবাসলেও অমিতরা সুন্দরবন অন্তঃপ্রাণ। আফসোস করেই জানালো দাদু ঠিকই বলেছে যে- সুন্দরী গাছের বদলৌতে আজকের সুন্দরবনের নাম। সেই সুন্দরী গাছ ১৯৮৯ সালে ছিল বনের এক লাখ ৬৬ হাজার ৬৪৫ হেক্টরজুড়ে। ২০১৪ সালে তা কমে গিয়ে এক লাখ ১২ হাজার ৯৯৫ হেক্টর হয়ে যায়। গাছ মরে যাওয়ায় বিগত ২৫ বছরে এখানে ২৫ শতাংশ বন ফাঁকা হয়ে গেছে। এতে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। ফলে অবস্থা করুণ হচ্ছে দিনকে দিন।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি ডিপার্টমেন্টে পড়ুয়া সুন্দরবনের ঢেংমারী গ্রামের অমিত জানালো, পরম্পরা রয়েছে সুন্দরবনের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য বিবর্তনে। আমাদের দুজনের আলাপে সুন্দরবনের একটি শব্দচিত্র গাঁথা হলো সংক্ষিপ্ত আকারে। 

ভারতীয় উপমহাদেশের ‘বাংলার ফুফুস’খ্যাত সুন্দরবন সমুদ্র উপকূলবর্তী নোনা পরিবেশের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বনভূমি হিসেবে অখণ্ড বন যা বিশ্বে সর্ববৃহৎ অববাহিকার সমুদ্রমুখী সীমানা। সুন্দরবনের আক্ষরিক অর্থ ‘সুন্দর জঙ্গল’ বা ‘সুন্দর বনভূমি’। সুন্দরী গাছ থেকে সুন্দরবনের নামকরণ হয়ে থাকতে পারে, যা সেখানে প্রচুর জন্মায়। অন্যান্য সম্ভাব্য ব্যাখ্যা এরকম হতে পারে যে, এর নামকরণ হয়তো হয়েছে ‘সমুদ্র বন’ বা ‘চন্দ্র-বান্ধে’ (প্রাচীন আদিবাসী) থেকে। ‘বৃক্ষ বিস্ময়’ বলা হয় সুন্দরবনকে। প্রচলিত ধারণা মতে, সুন্দরী গাছের নামানুসারে এই বনের নামকরণ করা হয়েছে। কারও মতে এটি ‘বাদাবন’।

সুন্দরবনের উৎপত্তি সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য পাওয়া যায় না। তবে ধারণা করা হয়, হিমালয়ের ভূমিক্ষয়জনিত পলি, বালু ও নুড়ি হাজার বছর ধরে বয়ে চলা পদ্মা ও ব্রহ্মপুত্র কর্তৃক উপকূলে চরের সৃষ্টি করেছে। অন্যদিকে, সমুদ্র তীরবর্তী হওয়ায় লবণাক্ত জলের ধারায় সিক্ত হয়েছে এ চর এবং জমা হয়েছে পলি। কালাতিক্রমে সেখানে জন্ম নিয়েছে বিচিত্র জাতের কিছু উদ্ভিদ এবং গড়ে উঠেছে ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট বা লবণাক্ত পানির বন। 

হিমাংশু। সুন্দরবন যার কাছে প্রাণেরও অধিক

সম্ভবত ১২০৩  সালে মোগল এক রাজা পুরো সুন্দরবন ইজারা নেন। ঐতিহাসিক আইনী পরিবর্তনগুলোয় কাঙ্ক্ষিত যেসব মৌলিক পরিবর্তন হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে বিশ্বের প্রথম ম্যানগ্রোভ বন হিসেবে স্বীকৃতি পেয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক তত্ত্বাবধানের অধীনে আসা। ১৭৫৭ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সুন্দরবনসহ পুরো বাংলার দায়িত্ব নেওয়ার আগে মোগল রাজাদের অধীনে ছিল এই বন। এই কোম্পানিই প্রথম সুন্দরবনের মানচিত্র তৈরি করে। এই বনভূমি গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের মোহনায় অবস্থিত এবং বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে বিস্তৃত। বনাঞ্চলটি সাংগঠনিক ব্যবস্থাপনার আওতায় আসে ১৮৬০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে ভারতের তৎকালীন বাংলা প্রদেশে বন বিভাগ স্থাপনের পর থেকে। অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরুতে সুন্দরবনের আয়তন বর্তমানের প্রায় দ্বিগুণ ছিল। বনের উপর মানুষের অধিক চাপ ক্রমান্বয়ে এর আয়তন সংকুচিত করেছে।
 ১৮২৮ সালে ব্রিটিশ সরকার সুন্দরবনের স্বত্ত্বাধীকার অর্জন করে। এল. টি হজেয ১৮২৯ সালে সুন্দরবনের প্রথম জরীপ কার্য পরিচালনা করেন। ১৮৭৮ সালে সমগ্র সুন্দরবন এলাকাকে সংরক্ষিত বন হিসাবে ঘোষণা দেয়া হয় এবং ১৮৭৯ সালে সমগ্র সুন্দরবনের দায় দায়িত্ব বন বিভাগের উপর ন্যস্ত করা হয়। 

সুন্দরবনের প্রথম বিভাগীয় বন কর্মকর্তার নাম এম. ইউ. গ্রীন। তিনি ১৮৮৪ সালে সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেন। সুন্দরবনের উপর প্রথম বন ব্যবস্থাপনা বিভাগের আইনগত অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৬৯ সালে। ১৯৬৫ সালের বন আইন (ধারা ৮) মোতাবেক সুন্দরবনের একটি বড় অংশকে সংরক্ষিত বনভূমি হিসেবে ঘোষণা দেয়া হয়  ১৮৭৫-৭৬ সালে। পরবর্তী বছরের মধ্যেই বাকি অংশও সংরক্ষিত বনভূমির স্বীকৃতি পায়। এর ফলে দূরবর্তী বেসামরিক জেলা প্রশাসনের কর্তৃত্ব থেকে তা চলে যায় বন বিভাগের নিয়ন্ত্রণে। 

পরবর্তীতে ১৮৭৯ সালে বন ব্যবস্থাপনার জন্য বন বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হয় যার সদর দপ্তর ছিল খুলনায়। সুন্দরবনের জন্য ১৮৯৩-৯৮ সময়কালে প্রথম বন ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা প্রণিত হয়। 

১৯১১ সালে সুন্দরবনকে ট্র্যাক্ট আফ ওয়াস্ট ল্যান্ড হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়। তখন হুগলী নদীর মোহনা থেকে মেঘনা নদীর মোহনা পর্যন্ত প্রায় ১৬৫ মাইল এলাকাজুড়ে এর সীমানা নির্ধারিত হয়। একই সাথে চব্বিশ পরগনা , খুলনা ও বাকেরগঞ্জ এই তিনটি জেলা অনুযায়ী এর আন্তঃসীমা নির্ধারণ করা হয়। জলাধারসহ পুরো এলাকার আয়তন হিসেব করা হয় ৬,৫২৬ বর্গমাইল (১৬,৯০২ কি.মি)।

১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের সময় দশ হাজার বর্গ কিলোমিটার জুড়ে গড়ে সুন্দরবনের ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার বাংলাদেশ অংশে পড়ে, যা বাংলাদেশের আয়তনের প্রায় ৪.২ শতাংশ সমগ্র বনভূমির ৪৪ শতাংশ। ১৯৯৬ সালে সুন্দরবনে তিনটি অভয়ারণ্য ও ২০১২ সালে তিনটি ডলফিন অভয়ারণ্য প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯৯২ সালের ২১ শে মে সুন্দরবন রামসার স্থান হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। ১৯৯৭ সালে সুন্দরবনের ১ লাখ ৩৯ হাজার ৭০০ হেক্টর বন্য প্রাণী অভয়ারণ্য এলাকাকে ৭৯৮তম বিশ্ব ঐতিহ্য ঘোষণা করে ইউনেসকো। মোট বনভূমির ৩১.১ শতাংশ, অর্থাৎ ১,৮৭৪ বর্গকিলোমিটারজুড়ে রয়েছে নদীনালা, খাঁড়ি, বিল মিলিয়ে জলাকীর্ণ অঞ্চল। বনভূমিতে স্বনামে বিখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগার ছাড়াও নানা প্রজাতির পাখি, চিত্রা হরিণ, কুমির ও সাপসহ অসংখ্য প্রজাতির প্রাণীর আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত। 

গাঢ় সবুজ রঙের সুন্দরবন  যার উত্তর দিকে ঘিরে আছে হালকা সবুজ রঙের কৃষি জমি, তামাটে রঙের দেখা শহর এবং নদীগুলো নীল রঙের। পুরো পৃথিবীর মধ্যে সর্ববৃহৎ তিনটি ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের একটি হিসেবে গঙ্গা অববাহিকায় অবস্থিত সুন্দরবনের বাস্তুসংস্থান যথেষ্ঠ জটিল। দুই প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশ এবং ভারতজুড়ে বিস্তৃত সুন্দরবনের বৃহত্তর অংশটি (৬২ শতাংশ) বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে অবস্থিত। দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর; পূর্বে বালেশ্বর নদী আর উত্তরে বেশি চাষ ঘনত্বের জমি বরাবর সীমানা। উঁচু এলাকায় নদীর প্রধান শাখাগুলো ছাড়া অন্যান্য জলধারাগুলো সর্বত্র বেড়ি বাঁধ ও নিচু জমি দ্বারা বহুলাংশে বাঁধাপ্রাপ্ত। 

প্রকৃতপক্ষে সুন্দরবনের আয়তন হওয়ার কথা ছিল প্রায় ১৬ হাজার ৭০০ বর্গকিলোমিটার। কমতে কমতে বর্তমান রূপ নিয়েছে। সুন্দরবনের নদীগুলো নোনা পানি ও মিঠা পানির মিলন স্থান। সুতরাং গঙ্গা থেকে আসা মিঠা পানির বঙ্গোপসাগরের লোনা পানি হয়ে ওঠার মধ্যবর্তী স্থান হলো এ এলাকাটি। এটি সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, পটুয়াখালী অঞ্চলজুড়ে রয়েছে বাংলাদেশে। সুন্দরবনের প্রধান বৈচিত্র্যের মধ্যে রয়েছে প্রচুর সুন্দরী, গেওয়, গরান ও কেওড়া গাছ। ১৯০৩ সালে প্রকাশিত প্রেইনের হিসাব মতে, সর্বমোট ২৪ শ্রেণী এবং ৩৩৪টি প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে সুন্দরবনে।

বরাবর সুন্দরবন আমাদের সাথে মাতৃসুলভ আচরণ করছে। গত বছর ঝড় আম্ফানের আঘাত হানার আগে তার প্রবল শক্তি হ্রাস করে গতিমাত্রা কমিয়ে দিয়েছিল এই সুন্দরবন। সুন্দরবন যে কতবার ঘূর্ণিঝড়সহ প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে আমাদের রক্ষা করেছে, তার কোনো পরিসংখ্যান নেই। অত্যন্ত শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় ‘ফনী’ থেকে রক্ষা করার জন্য আবার বুক পেতে দিলো সুন্দরবন। বিশেষ করে ২০০৭ সালের ১৫ নভেন্বর ঘূর্ণিঝড় সিডর এবং ২০০৯ সালের ২৫ মে’র ঝড় আইলার তাণ্ডব থেকে এ বন উপকূলবাসীকে রক্ষা করেছে। তবে গাছপালার কিছু ক্ষতি হচ্ছে। অবশ্য বন্যপ্রাণীদের ওপর তেমন কোনো প্রভাব পড়েনি। বেশ কয়েকটি ঝড়ের সময় বাতাসের তীব্রতা বেশি থাকায় উপকূলীয় এলাকায় জলোচ্ছ্বাস দেখা দেয়। জোয়ারের লবণাক্ত পানিতে সুন্দরবনের অভ্যন্তরের গাছপালা ডুবে যায়। বনের ভেতরের মিষ্টি পানির পুকুরগুলো লবণাক্ত পানিতে ভরে গিয়েছিল। এতে ক্ষতি হয়েছে বেশি।

সুন্দরবন দেশের সব উপকূলকে ইতিহাসের কালাপাহাড়ের মতো আগলে রেখেছে সবসময়। দিয়েছে সুন্দরী, গেওয়াসহ নানা বৃক্ষের মজবুত বেষ্টনী। আর অসংখ্য নদীনালা এখানে বছরের পর বছর ধরে প্রাণী ও সম্পদ রক্ষা করে আসছে। সুন্দরবন নিজে ক্ষতবিক্ষত হয়ে উপকূলবাসীকে রক্ষা করেছে। এ বনের কারণে বিগত পাঁচ-ছয়টি ভয়াবহ ঝড়ের গতিবেগ কমে যায়। ভয়ঙ্কর ঝড় এ বনের উপর আঘাত করার পর দুর্বল হয়ে পড়ে। উপকূল রক্ষায় এ বন তাই ঢাল হিসেবে কাজ করছে। 

পৃথিবীর রক্ষাকবচ বা ফুসফুস খ্যাত আমাজন বন। আর সমগ্র বাংলার ফুসফুস সুন্দরবন। অর্থাৎ সুন্দরবন আমাদের রক্ষাকবচ। সুন্দরবনের জন্ম হয়েছে আমাদের রক্ষা করার জন্য। এ বন আমাদের কাঠসম্পদ দেবে, এ জন্য এর জন্ম হয়নি। এগুলো আমাদের বাড়তি পাওনা। তাই সুন্দরবনকে যত্নের সাথে রক্ষা করার দায়িত্বও আমাদের। (চলবে)
 

তারা//

আরো পড়ুন  



সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়