RisingBD Online Bangla News Portal

ঢাকা     মঙ্গলবার   ১৯ জানুয়ারি ২০২১ ||  মাঘ ৫ ১৪২৭ ||  ০৪ জমাদিউস সানি ১৪৪২

নক্ষত্রে বিলীন বাংলার জ্যোতির্ময় তারকা

অজয় দাশগুপ্ত || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৯:২১, ১৫ নভেম্বর ২০২০   আপডেট: ১৯:৫৪, ১৫ নভেম্বর ২০২০
নক্ষত্রে বিলীন বাংলার জ্যোতির্ময় তারকা

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জ্ঞাপন

খুব বেশি দিনের কথা না ভরাট গলায় শুনছিলাম তাঁর আবৃত্তি। মৃত্যুকে নিয়ে লেখা সে কবিতাটি ছিল, ‘মৃত্যু আয় তিন পাত্তি খেলি।’ কণ্ঠ শুনে বোঝা যাবে মৃত্যুকে তিনি ভয় পান না। হয়তো পেতেন না। কিন্তু মৃত্যু তো কাউকে ছেড়ে কথা বলে না। যাঁর কথা লিখছি তাঁর প্রিয়তম কবি রবীন্দ্রনাথ নিজেই লিখেছেন, ‘মরণ বলে আমি তোমার জীবন তরী বাই।’ সময়ের এটাই নিয়ম। জীবন তরী বাইতে বাইতে একসময় মানুষকে তীরে পৌঁছে দেয় মরণ। আজ তেমনি শেষ প্রান্তে চলে গেছেন কিংবদন্তি অভিনেতা, বাচিক শিল্পী, নায়ক, অসাধারণ মানুষ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়।

নতুন প্রজন্ম তাঁকে কতটা জানে জানি না। তাঁদের জন্য কিছু তথ্য তুলে ধরা জরুরি মনে করছি।

১৯৩৫ সালে ১৯ জানুয়ারি নদীয়ার কৃষ্ণনগরে এক সাংস্কৃতিক পরিবারে তার জন্ম। বাবা মোহিত কুমার চট্টোপাধ্যায় একজন আইনজীবী ও মঞ্চঅভিনেতা। মা আশালতা চট্টোপাধ্যায়ও যুক্ত ছিলেন মঞ্চনাটকে; তিনি স্থানীয় নাটকের দল ‘প্রতিকৃতি’র প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন। সৌমিত্রর স্কুলজীবন কেটেছে কৃষ্ণনগরের সেন্ট জোনস বিদ্যালয়ে। কলকাতা সিটি কলেজ থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতক এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর করার ফাঁকেই নির্দেশক অহীন্দ্র চৌধুরীর হাত ধরে মঞ্চনাটকে তার অভিষেক।

উইলিয়াম শেক্সপিয়রের ‘কিং লেয়ার’ অবলম্বনে সুমন মুখোপাধ্যায়ের ‘রাজা লিয়র’ নাটকে নামভূমিকায় অভিনয় করে দারুণ প্রশংসিত হন সৌমিত্র। অনেকের বিচারে সেটাই ছিল মঞ্চে তার সেরা অভিনয়। সৌমিত্রকে মনে ধরেছিল সত্যজিতের। ১৯৫৯ সালে অপু ট্রিলজির শেষ চলচ্চিত্র ‘অপুর সংসার’-এ তরুণ অপুর চরিত্রে সৌমিত্রকেই তিনি বেছে নেন। সত্যজিতের ৩৪টি সিনেমার মধ্যে ১৪টিতেই অভিনয় করেছেন সৌমিত্র। অপুর পর সত্যজিতের সৃষ্টি আরেক চরিত্র ফেলুদাকে সিনেমার পর্দায় সৌমিত্র নিয়ে গেছেন অন্য মাত্রায়।

সাত পাকে বাঁধা, চারুলতা, বাক্স বদল, আকাশ কুসুম, মণিহার, কাঁচ কাটা হীরে, ঝিন্দের বন্ধী, অরণ্যের দিনরাত্রি, সোনার কেল্লা, জয় বাবা ফেলুনাথ, হীরক রাজার দেশে, ঘরে বাইরে, আবার অরণ্যের মতো সিনেমার মধ্য দিয়ে সৌমিত্র স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন দর্শকের হৃদয়ে। অভিনয় ছাড়াও নাটক ও কবিতা লিখেছেন তিনি, যুক্ত হয়েছেন মঞ্চ নাটকের নির্দেশনায়, দ্যুতি ছড়িয়েছেন আবৃত্তির মঞ্চেও। চলচ্চিত্রে ভারতের সর্বোচ্চ সম্মাননা দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার ছাড়াও ফ্রান্স সরকারের ‘লিজিয়ন অব দ্য অনার’ পদকে ভূষিত হয়েছেন এই অভিনেতা। ২০০৪ সালে তাকে ‘পদ্মভূষণ’ খেতাবে ভূষিত করে ভারত সরকার।

এই যে বর্ণাঢ্য মানুষটি তাঁর নিজের ভাষায় শুরুতে মঞনাটকেই ছিল তাঁর আগ্রহ। তাঁর ধারণা ছিল, সিনেমা অভিনয়ের জায়গা না। অভিনয় করতে হয় মঞ্চে। কিন্তু তাঁর এই ধারণা ভেঙেছিল সত্যজিতের পথের পাঁচালী দেখার পর। তিনি তখন-ই ঠিক করেছিলেন সিনেমা বা চলচ্চিত্রেই হবে তাঁর বিচরণ। ভাগ্যিস তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন । নয়তো আমরা কিংবদন্তি এই অভিনেতাকে পেতাম না। পেতাম না কবি ও অভিনেতাকে একসঙ্গে। আজকের প্রজন্ম জানে না তিনি একজন গভীরতম অনুভবের কবি। তাঁর ১৪টি কবিতার বই আছে। শুধু কি তাই? জীবনের এক পর্যায়ে তিনি ছিলেন এক দুঁদে সম্পাদক। নির্মাল্য আচার্যের সঙ্গে সম্পাদিত এক্ষণ বাংলা সাহিত্যের সম্পদ। সুনীল, শক্তির মতো কবিরাও তাঁকে সমীহ করতেন। কবি বলে মেনে নিয়েছিলেন। আজ আমরা সেই অভিনেতা, কবিকেও হারিয়ে ফেললাম।

সেরার সেরা পুরস্কার পাবার পর বলেছিলেন, ‘আমি তো এমন কেউ না বা এমন কিছু করি নি যে আমার গর্ব থাকবে। আমি যা জানি তাই করে যাই। আশীর্বাদ করবেন যেন শেষদিন পর্যন্ত তাই করে যেতে পারি।’ সে অনুষ্ঠানে মঞে বসা কবি শঙ্খ ঘোষ দর্শক সারিতে শীর্ষেন্দুর মতো লেখকেরা শুনছিলেন মুগ্ধ হয়ে। অসাধারণ মানুষের মুখে কি সাধারণ উক্তি। যিনি ইতোমধ্যে সবকিছু জয় করেছেন দেশ ও দেশের বাইরের সিনেমায় এক অবিস্মরণীয় নাম তিনি বলছেন তাঁর যা কিছু অর্জন সব-ই বাংলা ও বাঙালির দেওয়া। মনে রাখতে হবে ফরাসি দেশের লিজেন্ড অব নর পেয়েছিলেন তিনি। যা অভিনেতা ও চলচ্চিত্রের মানুষের জন্য এক বিশাল প্রাপ্তি। অথচ তিনি বলছেন, সবকিছু বাংলা ও বাঙালির। আর্শীবাদ চাইছিলেন যেন জীবনের শেষদিন পর্যন্ত এই পথে চলতে পারেন। তাঁর ভাষায়, যতদিন দেহ মন সচল তিনি যেন পারেন অভিনয় করে যেতে। তাই করে গেছেন। করোনার কঠিন সময়ে সবাই যখন ঘরবন্দি তিনি এক সময় তাও মানেন নি। এই সেদিনও এসেছিলেন স্টার জলসায়। নেচে গেয়ে মাতিয়ে গেলেন। অনলাইনে যুক্ত থাকা অভিনেত্রী সাবিত্রী বলছিলেন, সৌমিত্রের সাহসের কথা। মিটমিট করে হাসতে থাকা সেই সাহসী মানুষটি আজ আকাশের মিটিমিটি তারার দেশে চলে গেলেন।

রাজনীতি সচেতন এই অভিনেতা ছিলেন ঘোষিত বামপন্থী। ধর্মের নামে গোঁড়ামি ও বিভাজনের রাজনীতির বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ভারতের প্রাচীন রাজনৈতিক দল কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়ার (মাক্সবাদী) সমর্থক ছিলেন, তিনি ছিলেন বিজেপি সরকারের কড়া সমালোচকদের একজন। দুর্গাপূজার সময় তিনি হাসপাতালে থাকা অবস্থায় সিপিএম-এর মুখপাত্রের শারদ সংখ্যায় তার শেষ লেখাটি প্রকাশিত হয়।  

সেখানে সৌমিত্র লেখেন, বামপন্থীদের নিয়ে সংশয় থাকলেও এখনো বামপন্থাকেই বিকল্প হিসেবে দেখেন তিনি। সিপিআইএম-এর নেতা, ভারতের ইতিহাসের দীর্ঘমেয়াদে মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব সামলানো জ্যোতি বসুর সঙ্গেও সখ্যতা ছিল সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের; ছেলেবেলায় কাকার হাত ধরে জ্যোতি বসুর বিভিন্ন সভায় হাজির হওয়ার স্মৃতি বিভিন্ন লেখায় তিনি তুলে ধরেছেন।

কি দিয়ে শেষ করব? কোথায় থামব? তাঁর অভিনয় তো বাঙালির জীবন যে এক ও অভিন্ন। তিনি মনে করতেন সহজ ঠান্ডা অতি অভিনয়হীন অভিনয়-ই আসল অভিনয়। আবার এও মনে করিয়ে দিয়েছেন কিছু তো করতেই হবে অভিনয়ে। নাহলে তা অভিনয় হবে কোন কারনে? সে কিছু করাটার জন্য চাই প্রচুর পাঠ মেধার অনুশীলন আর ঐকান্তিক বিনয়। আপনি যতবার তাঁকে দেখবেন তাঁর কথা শুনবেন বুঝতে পারবেন বিনয় কাকে বলে। উদ্ধত বাঙালি সমাজের বিনয়ী অভিনেতা বেলাশেষের সৌমিত্র আজ হারিয়ে গেলেন অন্ধকারের আলোয়। যেখান থেকে দ্যুতি মিললেও দেখা মিলবে না।

তাঁর বিশ্বাস ছিল ক্রিয়েটিভ জীবন-ই হচ্ছে জীবন। থেমে যাওয়াকে তিনি মনে করতেন শাীরিকভাবে বেঁচে থাকা কোনো বাঁচা না। বাঁচতে হলে মানুষকে তাঁর নিজের জায়গায় সচল থাকতে হয় আজীবন। আজ আমরা যদি কিং লিয়র সৌমিত্রকে দেখি মনে করব মঞ্চনাটকের উৎকর্ষ কোথায় পৌঁছে গিয়েছিল সে সময়। সত্যজিতের অপু, হীরক রাজার সেই মাস্টার মশাই, জনারণ্যের পাগল ভাইটিকে আমরা আর কোথাও পাব না। বসু পরিবার মনে গেঁথে থাকবে আমাদের। শেষ বেলায় ময়ূরাক্ষীতে আলজাইমার রোগী পিতাকে বাঙালি কোনোদিন ভুলতে পারবে না। কি অসাধারণ মনোবল আর সাবলীল শেষ চিন্তা তাঁর।

একবার বলেছিলেন, যদি যেতে হয় তো সঙ্গে নেবেন গীতবিতান আর মহাভারত। শেষদিকে এসে মত পাল্টে ছিলেন তিনি। বললেন, গীতবিতান তো নিতে হবেই এ ছাড়া বাঁচা অসম্ভব। তবে মহাভারতের বদলে নেবেন সুকুমার রায়ের আবোল তাবোল। কি অসাধারণ ভাবনা। শেষ অবদি মানুষ যে শিশু সেটাই প্রমাণ করেছিলেন সুকুমার রায়ের আবোল তাবোল সঙ্গে নেবেন বলে। এই ছড়ার বইটিতে যে অসাধারণ জীবন আছে, সেটাই হয়তো তাঁর পছন্দ ছিল। নিশ্চয়  আবার শিশু হয়ে জন্ম নেবেন কোনো মাতৃক্রোড়ে। বাঙালির টানে বাংলার টানে ফিরে আসবেন ধানসিঁড়ি নদী তীরে।

বিদায় কিংবদন্তি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। প্রণাম।

ঢাকা/শান্ত

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়