ঢাকা     শুক্রবার   ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ||  ফাল্গুন ১১ ১৪৩০

দুঃসহ বিগত বছর ও সম্ভাবনার নতুন বছর 

অজয় দাশগুপ্ত || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৮:২৬, ৩০ ডিসেম্বর ২০২০   আপডেট: ২০:০৩, ৩০ ডিসেম্বর ২০২০
দুঃসহ বিগত বছর ও সম্ভাবনার নতুন বছর 

আমরা যে বছরটি অতিক্রম করলাম তার মতো কঠিন নিদারুণ আর বিভীষিকাময় কোনো বছর আগে দেখিনি। ষাট পেরিয়ে যাওয়া আমরা বহু পতন দেখেছি! দেখেছি কঠিন সময়! মুক্তিযুদ্ধের মতো কঠিন সময় দেখেছি আমরা। সেসব ইতিহাস হত্যা নিপীড়ণ চোখে দেখার পরও বলবো- এমন সময় আসেনি আগে। শুধু কি বাংলাদেশ? পুরো দুনিয়া আজ আতঙ্কে-ভয়ে মুহ্যমান। আমি বিগত প্রায় আড়াই দশক পৃথিবীর উন্নত ও জীবনযাপনের মানে সেরা এক দেশের সেরা শহর সিডনিতে বাস করি। আজ সেখানেও আমরা ভালো নাই। কেউ ভালো নাই কোনো দেশে। গেলো বছরের নাম দু’হাজার বিশ না হয়ে ‘দু’হাজার বিষ’ হলেই ভালো হতো।

‘বিশ্ব মোড়ল’ নামে পরিচিত আমেরিকা আজ কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। তাদের দেশে এতো বিজ্ঞানী, এতো উন্নতি, এতো গবেষক তারপরও মারা গেছেন কয়েক লাখ মানুষ। আমেরিকায় কয়েক লাখ মানুষ মারা গেলো করোনায়, আর তাদের প্রেসিডেন্ট বললো- এ কোনো রোগই না! এমন পরিহাস আর উপহাসপ্রবণ নেতাদের হাতে চলছে বিশ্ব। চীন, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য কোনো দেশ পারেনি এই ঘাতকের হাত থেকে বাঁচতে। এ বছর ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশের আয়-উন্নতি ব্যাহত হয়েছে। আমাদের তথ্যপ্রবাহ অবাধ আর মুক্ত হলে আরো সত্য জানা যেত। সে সম্ভাবনা যেহেতু নেই, বলতেই হবে বাংলাদেশের উন্নয়ন কাগজে-কলমে যতোটা, ততোটা সঠিক কিনা এর একটি পরিসংখ্যান সরকারের স্বার্থেই থাকা উচিত।

এ বছরের শেষ দিকে আমরা কী খবর পেলাম? বিশ্বে জ্ঞান-বিজ্ঞান জানা দেশের সূচকে আমরা ১৩৮টি দেশের তালিকায় আছি ১২১ নম্বরে। যে পাকিস্তানকে আমরা আয়, টাকার মান, শিশুমৃত্যু, নারী উন্নয়নে হারিয়েছি বলে গর্ব করি, সেই পাকিস্তানও আছে আমাদের আগের সারিতে। এ কথা মানতে হবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও জড়িতরা বাদে লেখাপড়া নিয়ে সরকারের কোনো মাথাব্যথা নাই। একটি দেশের ভিত্তি যে মেধা সেটাই আজ নিদারুণ দুর্বিপাকে। কি ভয়াবহ কথা! আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এ দুঃসংবাদ নিয়ে আমরা প্রবেশ করছি আরেকটি নতুন বছরে। আপনি আমি আমরা যে দেশে, যে সমাজে বাস করি না কেন, একটি বিষয় পীড়াদায়ক, তা হলো আমাদের দেশের লেখাপড়া আছে সবার নিচে। এই যে স্কুল কলেজ বন্ধ, অনলাইনে কোনোরকমে কাজ সারা, এর প্রতিকার নিয়ে কেউ মাথা ঘামায়? সবাই ব্যস্ত ভাস্কর্য আর মূর্তি নিয়ে।

করোনার এই ভয়াবহতার পর ও দেশে হত্যা, জখম, খুন, ধর্ষণ কমেনি। বেড়েছে অনাচার। সেসব কিছু বাদ দিয়ে একদল মানুষ নেমেছে দেশ ও জাতিকে পেছনে টানার কাজে। তাদের মাথায় এক চিন্তা এক ভাবনা। কীভাবে আমাদের সব অর্জন নষ্ট করে অসাম্প্রদায়িক সমাজ গুঁড়িয়ে দেশ ও জাতিকে উগ্র করে তোলা যায়, সে ধান্দায় এরা গেল বছর নেমেছে ভাস্কর্য ভাঙার কাজে। হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টানদের ওপর হামলা করতে করতে হাত পাকানো এরা এবার হাত দিয়েছে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যে। জাতির জনকের কন্যার শাসনামলে তারা আওয়ামী লীগের তোয়াক্কা না করেই ভেঙেছে তাঁর ভাস্কর্য। কি ভয়ংকর কথা! আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাদের সঙ্গে আপোসে সমাধান করার জন্য বৈঠকও করেছেন। একবার ভাবুন, সরকারবিরোধী কোনো রাজনৈতিক দল মাঠে নামতে পারে না, আর এরা বঙ্গবন্ধুকে ভেঙ্গেও মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে পারে! আরো একটি বিষয় বলি- যে ভাষায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বলা উচিত, সে ভাষায় কথা বললেন পুলিশ প্রধান, পুলিশ সুপারেরা। তাঁদের স্যালুট জানাই। এতে প্রমাণিত হয় আমাদের রাজনীতি কতো দুর্বল আর ভঙ্গুর এখন।

এ বছর দেশের পাশাপাশি বিদেশের অর্থনীতির অবস্থাও খারাপ। কেউ কাউকে সাহায্য করার জায়গায় নেই। তারপরও বাংলাদেশের যেসব মেধাবী মানুষ পরিশ্রমী মানুষেরা অর্থনীতিকে সচল রাখেন তাদের খবর নাই কোথাও। জাতির সেরা সন্তান কৃষক শ্রমিক পোশাক শিল্পীদের কোনো খবর থাকে না মিডিয়ায়। তাঁরা সামনে থাকলে মানুষ এসব আজেবাজে নেতাদের মুখ দেখা থেকে মুক্তি পেতেন। সে কাজটি মিডিয়া করে না। করতে চায় না।

গত বছর দুনিয়াজুড়ে করোনার যে তাণ্ডব তার কোনো ব্যাখ্যা কিংবা সমাধান মেলেনি। সবাই জানি, শুরুতে চীনের একটি প্রদেশকে দায়ী করে উৎসভূমি বলাটা চালু হলেও পরে সে বিষয়ে আর কোনো ব্যাখ্যা মিললো না। যে কারণে যেভাবেই হোক এই মহামারির আক্রমণে ছোট-বড় সব দেশের জীবন কাহিল! এমনকি সম্প্রতি এন্টার্কটিকার মতো বরফঢাকা নির্জন মহাদেশেও পাওয়া গেছে করোনা রোগী। অনেকে মনে করেন দুনিয়ায় বসবাসরত দীর্ঘায়ু বয়স্কজনের চাপ আর নিতে রাজী নয় ধনী দেশের সরকার। তাই আমেরিকা, ইউরোপে তাদের বিদায়ে বা মৃত্যুতে রাষ্ট্রের ভূমিকা ছিল নির্বিকার। এমনকি একসময় বয়স্ক মানুষদের মুখ থেকে শ্বাসযন্ত্র খুলে তাদের চলে যাবার ব্যবস্থা দ্রুত নিশ্চিত করেছিল অনেক দেশের সরকার।

এ ধরনের অমানবিক নিষ্ঠুর আচরণ আমরা আর দেখতে চাই না। যদি বাংলাদেশের কথা বলি, সেখানে এমন কাণ্ড হয়নি। তবে আসলে করোনা রোগীর সংখ্যা কতো আর কারা রোগী, কারা নয়- এসবই মূলত রহস্যময়। এখন পর্যন্ত উন্নয়নের নামে ভাসমান জাতি এই জরুরি কাজ শেষ করতে পারেনি। বরং আমরা সাহেদের মতো করোনা ব্যবসায়ীদের চেহারা দেখে জেনেছি মহামারিও তার সার্টিফিকেট ও ব্যবসার উপাদান হতে পারে।

সবশেষে বলবো, আমাদের সমাজ ও বাংলাদেশীদের জীবনে এখন প্রধান বৈরী মূলত মৌলবাদের থাবা। জাতি জাতীয়তা ও আমাদের ভবিষ্যতের ওপর এই থাবা নতুন করে আধিপত্য বিস্তার করছে। এমন না যে এগুলো আগে ছিল না। কিন্তু এখন তারা মূলত অপ্রতিরোধ্য। সমাজে তাদের সংখ্যা এখন বেশি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সরকারের কঠোরতা না থাকলে কবেই গিলে খেতো তারা। এখনও খাবে। কারণ সমাজে সত্তর-আশি শতাংশ মানুষের মগজ ধোলাই করার কাজ শেষ। তারা মনে মনে এসব মৌলবাদের হয় প্রচ্ছন্ন, নয়তো কড়া সমর্থক। আগামী বছর তো বটেই, তার পরের বছরগুলোতে বাংলাদেশের বড় চ্যালেঞ্জ হবে এর মোকাবিলা। ব্যর্থ হলে দেশ পতাকা সংগীতসহ বহু মৌলিক বিষয়ে যে পরিবর্তন ঘটবে তা কেউ ঠেকাতে পারবে না।

বিশ্বায়নের অপব্যাখ্যা আর ভুল প্রয়োগ এজন্য কম দায়ী নয়। সঙ্গে আছে প্রতিবেশী দেশের জন্য যৌক্তিক ও অযৌক্তিক প্রেম এবং বিরোধিতা। হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ও প্রগতিশীল বাঙালি মুসলমানের জন্য এমন কঠিন সময় আগে আসেনি। কারণ আগে রাষ্ট্র ও সরকারে থাকা মানুষেরা গোরা হলেও মানুষ ছিলেন উদার আর প্রগতিশীল। এখন উল্টো এবং কে যে কোথায়, কোন অবস্থানে কেউ জানে না।

তবু আশাকরি, আগামী বছর নতুন এক স্বদেশ, নবীন তারুণ্য আর নব আন্তর্জাতিকতা মিলে রচিত হবে নতুন ভুবন। জয় হোক মানুষের। জয় হোক মানবিক বিশ্ব ও বাংলাদেশের।

লেখক: প্রাবন্ধিক, সিডনি থেকে

আরো পড়ুন  



সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়