ঢাকা     শুক্রবার   ২০ মে ২০২২ ||  জ্যৈষ্ঠ ৬ ১৪২৯ ||  ১৭ শাওয়াল ১৪৪৩

কিটো ডায়েট শুরুর আগে যা জানা উচিত

এস এম ইকবাল || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৬:৪৯, ১২ ডিসেম্বর ২০২১   আপডেট: ১৬:৫০, ১২ ডিসেম্বর ২০২১
কিটো ডায়েট শুরুর আগে যা জানা উচিত

হালের ক্রেজ এখন কিটো। নামীদামী তারকা থেকে সাধারণ মানুষ- অল্প সময়ে অধিক ওজন কমাতে অনেকেই ঝুঁকছে কিটো ডায়েটের দিকে। কিন্তু পুষ্টি সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা না থাকলে এ ডায়েট হিতে বিপরীত হতে পারে।

কিটো ডায়েটের ক্ষেত্রে অবশ্যই ম্যাক্রোনিউট্রিয়েন্ট সম্পর্কে জানতে হবে, যেমন- ফ্যাট, প্রোটিন ও কার্বোহাইড্রেট। কিটো ডায়েটে কার্বোহাইড্রেট কমিয়ে ফ্যাটের পরিমাণ বাড়ানো হয়, যা শরীরকে কিটোসিস নামক মেটাবলিক স্টেটে নিয়ে যায়- যেখানে শরীর শক্তি/জ্বালানির জন্য কার্বোহাইড্রেটের পরিবর্তে ফ্যাট পোড়াতে থাকে।

কিটো ডায়েটের সূচনা হয়েছিল মূলত মৃগীরোগীদের জন্য। বর্তমান সময়ে দ্রুত ওজন কমানো ক্ষেত্রে সবার মাঝে এই ডায়েট জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। কিন্তু ওজন কমানোর জন্য এ ডায়েট সবার জন্য আদর্শ নয় বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। কেউ কেউ টাইপ ২ ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণেও এ ডায়েটে ঝুঁকছেন। আপনি যে লক্ষ্যেই কিটো ডায়েট শুরু করেন না কেন, কিছু চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হবে। এখানে কিটো ডায়েট সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়া হলো, যা স্মরণে রাখলে ঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে।

* বদহজম

বিশেষজ্ঞদের মতে, কিটো ডায়েটের সবচেয়ে প্রচলিত পরিপাকতান্ত্রিক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলো ডায়রিয়া, অ্যাসিড রিফ্লাক্স, বমিভাব ও কোষ্ঠকাঠিন্য। কেননা এ ডায়েটে গোটা শস্য ও শ্বেতসারযুক্ত সবজির স্থান নেই এবং কম কার্বোহাইড্রেটের ফল অল্প পরিমাণে রাখা হয়। এসব খাবারে প্রচুর ফাইবার থাকে, যা মলকে সহজে অতিক্রম করায়। কিটো ডায়েটে এসব খাবার নিয়ন্ত্রণ করা হয় বলে কোষ্ঠকাঠিন্য হয়। সাধারণত কিটো ডায়েটে মোট ক্যালরির ৭০-৯০ শতাংশ ফ্যাট, প্রতি কেজি শারীরিক ওজনের জন্য ১ গ্রাম প্রোটিন এবং অবশিষ্ট ক্যালরি (১০০ থেকে ২০০ ক্যালরি) বা ৫০ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট থাকে। তবে ব্যক্তিভেদে অনুপাতে তারতম্য হতে পারে।

দ্য ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটি ওয়েক্সনার মেডিক্যাল সেন্টারের ডায়েটিশিয়ান ডা. এমিলি ভ্যান্ডেনবার্গ বলেন, ‘কেউ কেউ যতদিন কিটো ডায়েটের ওপর থাকেন, ততদিন পর্যন্ত এসব পরিপাকতান্ত্রিক উপসর্গে ভুগেন। অন্যদের শরীর এই ডায়েটের সঙ্গে মানিয়ে নেয় এবং উপসর্গসমূহ চলে যায়।’

* কিটো ফ্লু

কিটো ডায়েট শুরুর প্রথম সপ্তাহে কিছু লোক কিটো ফ্লুতে ভুগেন। কিটো ফ্লু হলো কিছু উপসর্গের সমষ্টি। এসব উপসর্গের অনেকগুলো প্রচলিত ফ্লু সংক্রমণের অনুরূপ। কিটো ফ্লুর উল্লেখযোগ্য উপসর্গ হলো- মাথাব্যথা, বমিভাব, বমি, দুর্বলতা, খিটখিটে মেজাজ, মাথা ঘোরানো, পেশি ব্যথা, চিন্তাভাবনায় অসঙ্গতি ও ঘুমাতে সমস্যা।

নিউ ইয়র্ক সিটিতে অবস্থিত হ্যাপিয়া নিউট্রিশনের ফাউন্ডার ডা. পাউলা ডেবরিচ বলেন, ‘কিটো ফ্লু নিয়ে চিন্তার কিছু নেই। কার্বোহাইড্রেট কমানোতে সৃষ্ট এসব পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার স্থায়িত্ব সাময়িক। সাধারণত এক সপ্তাহ পর কিটো ফ্লু দূর হয়ে যায়।’ এসব উপসর্গের তীব্রতায় না ভুগতে ডা. ভ্যান্ডেনবার্গ ধীরে ধীরে কয়েক সপ্তাহ ধরে কার্বোহাইড্রেট কমাতে ও প্রচুর পানি পান করতে পরামর্শ দিয়েছেন।

* শক্তির মাত্রা

বিশেষজ্ঞদের মতে, কিটো ডায়েট শুরুর দিকে সাময়িক দুর্বলতা অনুভব করা স্বাভাবিক। এর কারণ হলো, শরীর ধীরে ধীরে ভিন্ন মেটাবলিক স্টেটের সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছে, যেখানে শরীর জ্বালানি/শক্তির জন্য কার্বোহাইড্রেটের ওপর নির্ভরশীল নয়। ডা. ডেবরিচ জানান, ‘শরীর জ্বালানির জন্য কার্বোহাইড্রেটের পরিবর্তে ফ্যাট ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে পড়লে শক্তির মাত্রা পুনরায় স্বাভাবিকে চলে আসতে পারে। সাধারণত এক থেকে তিন সপ্তাহে দুর্বলতা কেটে যায়।’

* রক্ত শর্করার মাত্রা

শরীরে কার্বোহাইড্রেট ভেঙ্গে শর্করায় পরিণত হয়। যার মানে হলো বেশি কার্বোহাইড্রেট খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়বে, বিশেষত সরল কার্বোহাইড্রেট খেলে। কিটো ডায়েটে কার্বোহাইড্রেট নিয়ন্ত্রণ করা হয় বলে রক্ত শর্করাও নিয়ন্ত্রণে থাকে। এটা টাইপ ২ ডায়াবেটিস রোগীদের উপকারে আসে। টাইপ ১ ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য কিটো ডায়েট সুপারিশকৃত নয়। কারণ কিটোসিস কিছু জটিলতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে, যেমন- ডিসলিপিডেমিয়া, হাইপোগ্লাইসেমিয়া, ডায়াবেটিস কিটোঅসাসিডোসিস ও ডায়াবেটিক কোমা।

* হার্টের স্বাস্থ্য

কিটো ডায়েট ও হার্ট সম্পর্কিত গবেষণার ফলাফল মিশ্র প্রকৃতির। কিছু গবেষণা বলছে, এটি অপকারী কোলেস্টেরল এলডিএলের মাত্রা বাড়াতে পারে- যা হার্ট ও রক্তনালী (কার্ডিওভাস্কুলার) রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। অন্যান্য গবেষণামতে, কিটো ডায়েটের ওপর থাকলে স্থূলতার মতো কার্ডিওভাস্কুলার রিস্ক ফ্যাক্টর কমে। কিটো ডায়েট অনুসরণকারীরা প্রচুর ফ্যাট খেয়ে থাকেন। এসব ফ্যাটের মধ্যে স্যাচুরেটেড ফ্যাট (যেমন- লাল মাংস, পনির, মাখন ও নারকেল তেল) বেশি খেলে এলডিএল কোলেস্টেরল বেড়ে যেতে পারে। তাই ডা. ভ্যান্ডেনবার্গ ঝুঁকি কমাতে আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটকে প্রাধান্য দিতে পরামর্শ দিয়েছেন, যেমন- জলপাই তেল, বাদাম ও বীজ।

* ক্ষুধার ব্যথা

কিটো ডায়েট শুরুর দিকে হাঙ্গার পাঙ্গস/পেইনসের (ক্ষুধার ব্যথা) অভিজ্ঞতা হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। হাঙ্গার পাঙ্গস হলো পাকস্থলির জোরালো সংকোচন, যা ব্যথার উদ্রেক করে থাকে। এই ব্যথা আমাদেরকে জানান দেয় যে, পাকস্থলি খালি হয়ে গেছে।কিছু খাওয়ার প্রয়োজন আছে। কিন্তু হাঙ্গার পাঙ্গস যে সবসময় ক্ষুধার নির্দেশক তাও নয়। আরো কিছু কারণে এমন ব্যথা হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, শরীর যেসব খাবারে অভ্যস্ত তা হঠাৎ করে না খেয়ে অন্য খাবারকে প্রাধান্য দিলেও হাঙ্গার পাঙ্গস হতে পারে। এই অস্বস্তি কমাতে কিটো ডায়েট অনুসারে যত বেশি পারেন, প্রোটিন ও ফাইবার খান। পর্যাপ্ত পানি পানেও ভুলবেন না।

* পুষ্টির ঘাটতি

কিটো ডায়েট অনুসরণ করলে শস্য জাতীয় খাবারের পাশাপাশি প্রচুর ফল ও সবজিও বাদ দিতে হয়। তাই পুষ্টির ঘাটতিতে ভোগার ঝুঁকি আছে।ডা. ডেবরিচ বলেন, ‘কিটো ডায়েটে ভিটামিন সি, পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, ক্যালসিয়াম ও ফোলেট কম থাকে।’ তিনি আরো জানান, ‘ফাইবারের অভাবে আন্ত্রিক অণুজীবের (উপকারী ব্যাকটেরিয়া) ভারসাম্যও নষ্ট হতে পারে। এসব অণুজীব সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই, হরমোন নিঃসরণ, প্রদাহজনিত প্রক্রিয়া ও মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।’ পুষ্টির ঘাটতি এড়াতে কিটো ডায়েট অনুসারে যতটা সম্ভব সবজি, ফল ও প্রোটিনে বৈচিত্র্য আনুন। এছাড়া ডা. ভ্যান্ডেনবার্গ এসব সাপ্লিমেন্টের পরামর্শ দিয়েছেন: মাল্টিভিটামিন, ফাইবার, ক্যালসিয়াম (প্রতিদিন ৫০০ থেকে ১০০০ মিলিগ্রাম/দুই ডোজে), ভিটামিন ডি (১০০০ থেকে ২০০০ আইইউ) এবং পটাশিয়াম সাইট্রেট (এটার প্রয়োজনীয়তা নিরূপণে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন)।

* হাড়ের ক্ষয়

২০২০ সালের একটি গবেষণায় কিটো ডায়েট অনুসরণকারী এলিট অ্যাথলেটিসদের হাড়ে বেশি ক্ষয় দেখা গেছে। এমনকি হাড় সেরে ওঠার ক্ষমতাও কমে গেছে। কিটো ডায়েট ও হাড় সংক্রান্ত অধিকাংশ গবেষণাই অ্যাথলেটিসদের ওপর চালানো হয়েছে। সবখানে প্রায় একই ফল- হাড়ের অবনতি। তাই কিটো ডায়েট শুরুর পর হাড়ের ভগ্নদশা এড়াতে যথেষ্ট ভিটামিন ডি ও ক্যালসিয়াম গ্রহণ করছেন কিনা নিশ্চিত হোন। এসব পুষ্টি হাড়কে মজবুত করে।

যাদের জন্য কিটো ডায়েট প্রযোজ্য নয়

কিটো ডায়েট সকলের জন্য নয়। ডা. ভ্যান্ডেনবার্গ ও ডা. ডেবরিচের মতে, এসব সমস্যা থাকলে কিটো ডায়েট অনুসরণ করবেন না: ইটিং ডিসঅর্ডার, টাইপ ১ ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি রোগ, কিডনি পাথর, হৃদরোগ, রক্তনালীর রোগ, অগ্ন্যাশয় সমস্যা, হাড়ের ক্ষয়রোগ, রোগাপাতলা শরীর ও উচ্চ কোলেস্টেরল। ডা. ডেবরিচ বলেন, কোনো অ্যাথলেটিস কিটো ডায়েট শুরু করলে যথেষ্ট সচেতনতার প্রয়োজন আছে। যারা হাই-ইনটেনসিটি এক্সারসাইজ করেন তাদের জন্যও একই কথা প্রযোজ্য। আপনি নিয়মিত কঠোর শরীরচর্চা করলে কিটো ডায়েট শুরুর পূর্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

ঢাকা/ফিরোজ

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়