ঢাকা     বুধবার   ৩০ নভেম্বর ২০২২ ||  অগ্রহায়ণ ১৬ ১৪২৯ ||  ০৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪১৪

‘ডেথ ওভারে বোলিং উপভোগ করি’

সাইফুল ইসলাম রিয়াদ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৪:১২, ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২২  
‘ডেথ ওভারে বোলিং উপভোগ করি’

বিপিএলের অভিষেকেই হ্যাটট্রিক, তামিম-নাঈমের বিরুদ্ধে ডেথ ওভারে দারুণ বোলিং করে শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচ জেতানো। মৃত্যুঞ্জয় চৌধুরী যেন নিজেকে প্রমাণ করেই যাচ্ছেন বারবার। অথচ ইনজুরিতে ক্যারিয়ারই ছিল হুমকির মুখে। নানা বাধা পেরিয়ে, ইনজুরিকে জয় করে এখন ২২ গজে রাজত্ব করে চলছেন মৃত্যুঞ্জয়। তার নামইতো বলে দেয়, তাকে কোনো কিছু দিয়েই দমে রাখার নয়!

রাইজিংবিডির সঙ্গে খোলামেলা আলাপনে চট্টগ্রাম চ্যালেঞ্জার্সের এই অলরাউন্ডার তুলে ধরেছেন ডেথ ওভারে দুর্দান্ত বোলিংয়ের রহস্য থেকে ক্যারিয়ারের বাঁক বদলের কাহিনি।

ঢাকার বিপক্ষে ডেথ ওভারে বোলিং করে সফল। ডেথ ওভালে বোলিং করার বিষয়টি আগে থেকেই কি ঠিক করা ছিল? 

মৃত্যুঞ্জয়: আমাকে ডেথ ওভারে বোলিং করতে পাঠানো আগে থেকেই ঠিক করা ছিল। আমি আর শরিফুল করব। দুজনে আমরা ডেথ ওভারে ভালো করে আসছিলাম, করছিও। অধিনায়কও পরিকল্পনা করে রেখেছিলন ১৯তম ওভার শরিফুল করবে আর শেষ ওভার আমি। পরিকল্পনা অনুযায়ী আমরা বোলিং করেছি।

তামিমের মতো ব্যাটসম্যান ক্রিজে ছিল। পরে আসেন মোহাম্মদ নাঈমও। যিনি জাতীয় দলের ওপেনার। আলাদা কোনো চাপ ছিল কি না?

মৃত্যুঞ্জয়: শেষ ওভারে তখন ৯ রান লাগতো। তেমন একটা চাপ ছিল না। ডেথ ওভারে বোলিং করে আমি তেমন চাপ অনুভব করি না। তবে যখন শেষ বলটা নো হয় তখন চাপটা বেড়ে যায়। সবার চাপ যেন আমার ওপর এসে পড়ছিল। আমি চাপটা কাটিয়ে বোলিং করেছি এবং সেটা কাজে দিয়েছে জয়ের ক্ষেত্রে।

নো বলটা কি বাড়তি চাপের কারণেই?

মৃত্যুঞ্জয়: আসলে নো বলের আগ পর্যন্ত চাপ ছিল না। আমি ইয়র্কার করতে চেয়েছিলাম। অনেক সময় ইয়র্কার করতে গিয়ে বোলারদের এমন হয়। আমার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। ব্যাটসম্যান জায়গা পরিবর্তন করছিল এজন্য ইয়র্কারটা ঠিক মতো খাপ খাওয়াতে পারিনি। বলটা নো হয়ে যায়। চাপেও পড়ে যাই। 

১২ বলে প্রয়োজন ছিল ২০। ১৯তম ওভারের প্রথম বলে ৬ হাঁকান শুভাগত। পরের বলেই আউট হন তিনি। আপনিও শেষ ওভারের প্রথম বলে উইকেট নিয়েছেন। ম্যাচের মোমেন্টাম ছিল কোনটা?

মৃত্যুঞ্জয়: শরিফুলের ওভারটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তামিম ভাইও স্ট্রাইক পেয়েছিলেন। ও খুব ভালো বোলিং করেছিল। তবে আমার কাছে মনে হয়েছে শেষ ওভারের পঞ্চম বলটায় মোমেন্টাম বদলে যায়। আমি ইয়র্কার দিয়েছিলাম। তামিম ভাই বাই থেকে ১ রান নেন। তখনো যদি বাউন্ডারি হতো কিছু করার ছিল না। আবার শেষ বল নো ছিল, তামিম ভাই স্ট্রাইকে থাকলে ভিন্ন কিছুই হতো।

ডেথ ওভারে বোলিং… পুরোনো বলে বোলিং…

মৃত্যুঞ্জয়: আমাকে যে কোনো জায়গায় দেওয়া হোক না কেন আমি সবসময় প্রস্তুত। তবে আমি সবসময় ডেথ ওভারে বোলিং করাটা উপভোগ করি। আমি ডেথ ওভারে কখনোই চাপ অনুভব করি না। তবে আজ বোলিং শুরুর আগে একটু চাপ মনে হয়েছিল। বোলিং শুরুর পর থেকে খুব ঠাণ্ডা ছিলাম। এটা হয়েছে ডেথ ওভারে বোলিংয়ের সময় আত্মবিশ্বাসের জন্য। অনেক সময় ধরে আমি ডেথ ওভারে বোলিং করে আসছি। ওই আত্মবিশ্বাসটা আমার আছে। কখন কী করতে হবে সেটা আমি জানি। আরো বলতে গেলে ডেথ ওভারের প্রক্রিয়া আমি জানি। যখন বোঝা যাবে না কী করতে হবে, তখন চাপটা বেশি হবে।

শন টেইটের কাছ থেকে কী শিখছেন? 

মৃত্যুঞ্জয়: এসব টুর্নামেন্টে ওনারা এক মাসের জন্য নতুন একটা ক্রিকেটার পায়। এই একমাসে নতুন কিছু শেখাতে পারেন না। তবে যতটুকু দেখিয়ে দেন, শেখান সেটা খারাপ না। শন টেইট একজন পেস বোলারের মানসিক দিক নিয়ে কাজ করেন বেশি। কী করা উচিত, কীভাবে পরিকল্পনা করা উচিত এগুলোতে জোর দেন উনি। প্রতিটা ক্রিকেটারকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলতে পছন্দ করেন তিনি।

বল হাতে ভিন্ন কিছুর চেষ্টা… 

মৃত্যুঞ্জয়: ঢাকার বিপক্ষে ম্যাচে আমি দুইটা লেগ কাটার করেছি। ইনজুরির পর থেকে আমি যেটা কখনো করিনি। তামিম ভাইকে আমি দুইটা লেগ কাটারের চেষ্টা করেছি। এখন এটা ভিন্ন জিনিস হলেও আমার কাছে মনে হয়েছে এটা আরো আয়ত্তে নিয়ে আসতে পারব। এ বিষয়টাও হয়েছে শন টেইটের কারণে। তার যোগানো আত্মবিশ্বাস থেকেই চেষ্টা করেছি।

লেগ কাটার কি আগেও করা হতো?

মৃত্যুঞ্জয়: যুব দলে থাকতে কিছুটা করতাম। তবে কাঁধের ইনজুরির পর বন্ধ করে দিয়েছিলাম। এখন যেহেতু ফিট আছি, নতুন করে আবার চেষ্টা শুরু করেছি। বিপিএলের মতো ফরম্যাটে এগুলো নিয়ে চেষ্টা করা ঝুঁকির। তবে এ ক্ষেত্রে আমি সাধুবাদ দেব টেইটকে। একজন পেসারের মনোবলের জন্য যেটা প্রয়োজন সেটা উনি দিতে পেরেছেন।

বোলিংয়ে কী শেখায় জোর দিচ্ছেন?

মৃত্যুঞ্জয়: আসলে কাটার-ইয়র্কার আমার স্বভাবজাত বোলিং বলা যায়। বলে এক্সট্রা বাউন্স, ভেতরে ঢোকানো এগুলো নিয়ে কাজ করছি এখন আলাদাভাবে।

আপনি অলরাউন্ডার। কিন্তু বারবার লাইম লাইটে আসছেন বোলিং নিয়ে। ব্যাটিং নিয়ে কতটুক কী কাজ চলছে? 

মৃত্যুঞ্জয়: সত্যি কথা বলতে বোলিংয়ের চেয়েও আমি ব্যাটিংটা নিয়ে বেশি কাজ করি। বোলিং নিয়ে যে কাজ করি না, তা না। এটা নিয়ে আমার একটা সন্তুষ্টির জায়গা আছে। বোলিং নিয়ে সবার কাছ থেকে পরামর্শ নেই না। কারো কাছ থেকে কোনো পরামর্শ নেওয়ার থাকলে তখন চেষ্টা করি নিতে। তবে ব্যাটিং নিয়ে চেষ্টা করি সবার থেকে নেওয়ার জন্য, শেখার জন্য। আমার খুব ইচ্ছা ব্যাটিংটা আরো উন্নতি করা। বোলিং আমি উপভোগ করি কিন্তু তার চেয়েও বেশি ব্যাটিং উপভোগ করি।

তার মানে আপনার বোলিং জন্মগত প্রতিভা আর ব্যাটিং পরিশ্রমের ফসল!

মৃত্যুঞ্জয়: হ্যাঁ, ঠিক এমনটাই! 

আপনি যাকে আইডল মনে করেন সেই মাশরাফিকে বোল্ড করেছেন। তার উইকেট নেওয়া নিয়ে যদি কিছু বলেন…

মৃত্যুঞ্জয়: আসলে অপ্রত্যাশিত ছিল। আমি নতুন বলে রাউন্ড দ্য উইকেটে খুব কম আসি। মাশরাফি ভাই যখন আসেন তখনও এসেছিলাম। আমার তখন মনে হয়েছিল মাশরাফি ভাই মারবে। পরে আমার কাটারে উনি বোল্ড হন। উনি যেহেতু আমাকে আগে খেলেননি, আমার কাটার সম্পর্কে ওনার ধারণা থাকার কথা না। সেটাই কাজ করেছে।

দীর্ঘ সময় ইনজুরিতে ছিলেন। এরপর এমন প্রত্যাবর্তন। কখনো মনো হয়েছিল আর ফিরতে পারবেন না?

মৃত্যুঞ্জয়: ইনজুরি নিয়ে আমি কিছু কিছু সময় ভেঙে পড়েছি। কিছু কিছু সময় অনেক শক্ত ছিলাম। পরিবার-কোচরা অনেক সমর্থন দিয়েছেন। তবে আশপাশের অনেকের সন্দেহ ছিল, শঙ্কা ছিল আমার ফেরা নিয়ে। আমি ফিরতে পারব কি না এসব নিয়ে অনেক কথা হতো। তখন একটু খারাপ লাগতো। ইনজুরি বিষয়ে অনেকে জানে। কিন্তু দীর্ঘ সময় দেড়-দুই বছর ইনজুরি থাকলে ক্যারিয়ার হুমকিতে পড়ে। আমার কাছে আশপাশের মানুষদের কানাঘুষা বেশি কষ্টের ছিল। এসব ক্ষেত্রে সমর্থনটা বেশ প্রয়োজন। আমিও পেয়েছি তবে আমার ক্ষেত্রে নেতিবাচকতা বেশি ছিল।

ফিরে আসার ক্ষেত্রে কাদের সমর্থনটা বেশি কার্যকর ছিল? 

মৃত্যুঞ্জয়: বিসিবির ফিজিওরা আমাকে সবচেয়ে বেশি সমর্থন দিয়েছেন। তারা মানসিকভাবে আমাকে শক্তিশালী রাখার চেষ্টা করেছেন। সবসময় বলে গেছেন, ফিরতে পারব। নিয়মিত খোঁজ রেখেছেন। সাহস দিয়ে গেছেন। এই সমর্থনটা আমার খুব কাজে দিয়েছে, ভালো লেগেছে।

জাতীয় দলের জন্য নিজেকে প্রস্তুত মনে হয় কি না?

মৃত্যুঞ্জয়: আমি আসলে সবকিছুর জন্যই মানসিকভাবে প্রস্তুত। আমার সামনে যা আছে, ভবিষ্যতে কী হবে না হবে সব কিছুর জন্য আমি মানসিকভাবে প্রস্তুত আছি। সেটা পজিটিভ-নেগেটিভ দুটোই। আমার আত্মবিশ্বাসটা আছে নিজের প্রতি। এতে আমি অনেকের থেকে এগিয়ে থাকি। তবে আমি কেমন সেটা যাচাই বাছাইয়ের জন্য নির্বাচকরা আছেন। ওনারা যেটা ভালো মনে করবেন সেটাই। আমি সমর্থ কি না সেটা উনারাও ভালো বলতে পারবেন। আমার দিক থেকে আমি আত্মবিশ্বাসী। আসলে মাঠের খেলা আর বাইরের মধ্যে অনেক পার্থক্য। বাইরে থাকলে বোঝা যায় কোথায় উন্নতি করতে হবে। মাঠে থাকলে, খেললে সেটা হয় না। এখন আমি প্রস্তুত হতে পারি কিন্তু নির্বাচকরা আমাকে সেটা মনে নাও করতে পারেন।

ঢাকা/ফাহিম

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়