ঢাকা     সোমবার   ২৮ নভেম্বর ২০২২ ||  অগ্রহায়ণ ১৪ ১৪২৯ ||  ০২ জমাদিউল আউয়াল ১৪১৪

বাংলাদেশি সেলিম এখন খুঁজে বেড়ান অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটের প্রতিভা

সাইফুল ইসলাম রিয়াদ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১২:৪৭, ২১ জুন ২০২২   আপডেট: ১৪:০৯, ২১ জুন ২০২২
বাংলাদেশি সেলিম এখন খুঁজে বেড়ান অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটের প্রতিভা

অস্ট্রেলিয়ার কোচ জ্যাস্টিন লাঙ্গারের পাশে বাংলাদেশি সেলিম (বাঁ থেকে প্রথম)

‘সেলিম রহমান ইজ দ্য হেড কোচ অ্যান্ড ফাউন্ডার অব দ্য পার্থ ক্রিকেট মেন্টরিং’- বাক্যটি অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট অ্যাকাডেমির প্রতিষ্ঠাতার পরিচয় দিতে গিয়ে তাদের ওয়েবসাইটে লিখেছে। পাঁচ-পাঁচটি বিশ্বকাপজয়ী দেশ অস্ট্রেলিয়া, ডন ব্র্যাডম্যানের এই দেশে গিয়ে ক্রিকেটার গড়ার কারিগর বনে যাওয়া সেলিম রহমান একজন বাংলাদেশি। সাবেক এ ক্রিকেটার জাতীয় দলের হয়ে খেলেছেন একটি আন্তর্জাতিক ম‌্যাচ। এখন পুরোদমে অস্ট্রেলিয়ায় কোচিং পেশায় যুক্ত।

পার্থ ক্রিকেট মেন্টরিংয়ের প্রতিষ্ঠাতা সেলিম রহমানের আসল নাম মাহবুবুর রহমান। দেশের ক্রিকেটে অনেক সাবেক ক্রিকেটার অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত থাকলেও সেলিম সব কিছুর ইতি ঘটিয়ে ঘাঁটি গড়েছেন বিদেশ বিভূঁইয়ে। তাই অনেকের কাছেই তিনি অচেনা এক নাম। যিনি জন্মস্থান থেকে প্রায় ৯ হাজার মাইল দূরে বসে ক্রিকেটের সর্বোচ্চ সাফল্য পাওয়া দেশটির জন্য ক্রিকেটার তৈরি করছেন।

কে এই সেলিম? কেনই বা অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমিয়েছেন? কীভাবে একাডেমি প্রতিষ্ঠা করেছেন? মনে উঁকি দেয় এমন অনেক প্রশ্ন। রাইজিংবিডিকে সব খোলাসা করেছেন সেলিম নিজেই। এর আগে একটু ফ্ল্যাশব্যাকে যাওয়া যাক।

পার্থ ক্রিকেট মেন্টরিংয়ের মাঠে চলছে অনুশীলন

সেলিমের জন্ম ১৯৬৯ সালে, ময়মনসিংহে। নির্মাণ স্কুল ক্রিকেটের মাধ্যমে ক্রিকেটার জীবনের শুরু। এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি। আকরাম খান-আমিনুল ইসলাম বুলবুল কিংবা নাঈমুর রহমান দুর্জয়দের সতীর্থ হয়ে ঢাকার মাঠে খেলেছেন। তিনি ছিলেন অলরাউন্ডার। ডানহাতে ব‌্যাটিং করতেন। বোলিংয়েও তাই। আর ফিল্ডিংয়ে ছিলেন তুখোড়।

১৯৯৯ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সেলিমের আন্তর্জাতিক অভিষেক, যা তার খেলোয়াড়ি জীবনের প্রথম ও শেষ ম্যাচ। ক্লাব ক্রিকেট খেলেছেন দীর্ঘদিন। সেটাও আবাহনীর মতো বড় ক্লাবে। ১৯৯৯ বিশ্বকাপ দলে ছিলেন স্ট্যান্ডবাই হিসেবে। মূল দলে সুযোগ না পেয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ক্যারিয়ারের শেষ দেখে ফেলেন সেখানেই।

যেই ভাবা সেই কাজ। এর বছর কয়েক পর পাড়ি জমান অস্ট্রেলিয়াতে। ক্রিকেটের সঙ্গেই থাকবেন এ জন্য বেছে নিয়েছেন ক্রিকেট খেলুড়ে দেশ। জন্মভূমি ছেড়ে যাওয়া কি সেলিমের বিসর্জন ছিল? তার উত্তর, ‘না না, বিসর্জনের কিছু না। বদলানোর জন্য। এটা আসলে ওভাবে বলা যাবে না, দেশ ছেড়ে দিয়েছি উন্নত জীবনের জন্য, এমন কিছু না। উত্তর এটাই, দেশ ছেড়েছি আসলে পরিবর্তনের জন্য।’

পরিবার নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় থিতু হয়েছেন সেলিম

শুধু নিজের কথা নয়, পরিবারের কথাও ভেবেছেন সেলিম। সপরিবারেই এখন অস্ট্রেলিয়াতে বসবাস। তার স্ত্রী একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ডিসিপ্লিন লিড হিসেবে কাজ করেছেন। এ ছাড়া ১৮ বছর বয়সী মেয়ে ও সাড়ে ছয় বছর বয়সী ছেলে রয়েছে তার। সেলিম বলেন, ‘আসলে অস্ট্রেলিয়াতে এখন থাকা এবং আগে আসা এটা আসলে পরিবারের জন্য। যেন আমি পরিবারকে ভালো পরিবেশ, শিক্ষা ও সুস্বাস্থ্য দিতে পারি।’

অস্ট্রেলিয়ার মতো সুশৃংখল ও কড়া নিয়ম কানুনের দেশে এভাবে ঘাঁটি গড়া সহজ ছিল না। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার বেঁধে দেওয়া নানা ধাপ পেরিয়ে সেলিম আজকের এই জায়গায়। লেভেল টু কোচিং সম্পন্ন করেছেন। তৃণমূল ক্রিকেট নিয়ে কাজ করেছেন। ক্লাব ক্রিকেটে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। তারপর পাঁচ বছর আগে প্রতিষ্ঠা করেছেন পার্থ ক্রিকেট মেন্টরিং।

সেলিম বলেন, ‘আমি যখন বাংলাদেশ ছেড়ে অস্ট্রেলিয়াতে আসি, আমার মাইগ্রেট হওয়ার একটা মাত্র উদ্দেশ্য ছিল, আমি ক্রিকেট খেলুড়ে একটা দেশে যাচ্ছি, সেখানে গিয়ে আমার যে মেধাটা (কাজে লাগাবো)। কারণ আমি বাংলাদেশে যখন ক্রিকেট খেলেছি ঘরোয়াতে খুবই ভালো পারফরম্যান্স করতাম। কিন্তু দেখা গেছে জাতীয় দলে খেলার ব্যাপারে ওভাবে আমি জায়গা করতে পারিনি। একটা জায়গায় গিয়ে যে লিডটা দরকার, পারফরম্যান্সের সঙ্গে সুযোগ, এটা আমি পাইনি।’

‘আমি এখানে (অস্ট্রেলিয়া) এসে লেভেল টু কোচিং করি। তারপর হাইপারফরম্যান্স কোচ হই। লেভেল টু নেওয়ার জন্য তৃণমূলে কাজ করতে হয়েছে। সরাসরি তারা লেভেল টু দেয়নি। তারপর হাইপারফরম্যান্স কোচ হই। দীর্ঘদিন সেখানে কাজ করি এবং পরে ক্লাবে যোগ দেই। ক্লাবে কাজ করতে করতে তারপর ওয়াকাতে (ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন) যোগ দেই জুনিয়র লেভেলে। তারপর অ্যাকাডেমি প্রতিষ্ঠা করি।’

অস্ট্রেলিয়ার চায়নাম্যান ব্র্যাড হগের সঙ্গে সেলিম

প্রধান কোচ হিসেবে কাজ করলেও মূলত তার কাজ প্রতিভা খুঁজে বের করা। তারপর তাদের হাতে কলমে শেখানো। এখানে ব্র্যাড হগের মতো অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটারও বিশেষ প্রোগ্রাম করে থাকেন। বিভিন্ন বয়সী শতাধিক ক্রিকেটার তার অ্যাকাডেমিতে ক্রিকেট শিখে থাকেন।

নিয়মিত বাংলাদেশের খেলা দেখতে না পারলেও সেলিম খোঁজখবর রাখেন। এই যেমন ওয়েস্ট ইন্ডিজে বাংলাদেশের খেলা টিভিতে না দেখানোর বিষয়টি জানেন তিনি। তবে বাংলাদেশের মাটিতে খেলা হলে স্থানীয় সময়ের সঙ্গে কম পার্থক্য থাকায় দেখে থাকেন।

কথা প্রসঙ্গে বাংলাদেশের ক্রিকেটের বর্তমান অবস্থা নিয়েও মতামতক দিয়েছেন সেলিম। তার মতে বাংলাদেশ ওয়ানডেতে অনেক শক্তিশালী। এ জন্য সাধুবাদ জানিয়েছেনে। আর টেস্ট ও টি-টোয়েন্টিতে উন্নতির জন্য সময় লাগবে একটু। টেস্টে ব্যর্থতার কারণ হিসেবে বলেছেন মানসিকতা-আবেগের অভাব আর টি-টোয়েন্টিতে পাওয়ার হিটিংয়ের। কিন্তু বিভিন্ন দেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেট কিংবা ক্রিকেটার গড়ার যে প্রক্রিয়া, সেটা অনেক পিছিয়ে থাকার কারণও স্পষ্টভাবে সেলিম।

তার মতে, ‘এখানে যে অবকাঠামো এবং তৃণমূল ক্রিকেটে যে সুযোগ সুবিধা, আপনি মাঠ বলেন, লজিস্টিকস সাপোর্ট বলেন, কোচিংয়ের সুযোগ সুবিধা বলেন সব সর্বোচ্চ পর্যায়ের। এগুলো একদম তৃণমূল ক্রিকেট পর্যন্ত আছে। তৃণমলে বিশেষজ্ঞরা কাজ করে। আমাদের দেশে তৃণমূল ক্রিকেটটা আরও শক্তিশালী করা দরকার। আমি জানি না এখন কী অবস্থা! আমাদের সময়ে তো তৃণমূলে এসব কিছু ছিলই না। এই যে স্কুল ক্রিকেট করছে এখন, আমি বলবো এটা একটা দারুণ প্ল্যাটফর্ম।’

সময় জীবনে মানুষকে কতভাবে কতকিছুই না দেয়। তেমনই দেশের বিশ্বকাপ দলে সুযোগ না পাওয়া সেলিম এখন খুঁজে বেড়ান অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটের প্রতিভা!

ঢাকা/ফাহিম

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়