ঢাকা     মঙ্গলবার   ১৮ জুন ২০২৪ ||  আষাঢ় ৪ ১৪৩১

‘ভবিষ্যতে অন্য কোনোভাবেও ফুটবলের সঙ্গে থাকবো না’

সাইফুল ইসলাম রিয়াদ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৮:৫০, ২৯ মে ২০২৩   আপডেট: ১৯:১৮, ২৯ মে ২০২৩
‘ভবিষ্যতে অন্য কোনোভাবেও ফুটবলের সঙ্গে থাকবো না’

একুশ বছর বয়সে দক্ষিণ এশিয়ার শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট অর্জন। বাইশে এসে হঠাৎ অবসর। কিন্তু কেন? সিরাত জাহান স্বপ্না নিজেকে ও পরিবারকে সময় দেওয়ার কথা বললেও আড়ালে আছে না খেলতে পারার হতাশা, দাবি-দাওয়া আদায় না হওয়ার ক্ষোভ। ২০২২ সাফের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা স্বপ্না শুধু বুটজোড়া তুলে রাখেননি, স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন ভবিষ্যতে ফুটবলের সঙ্গে তাকে কোনোদিন দেখা যাবে না!

বাফুফের ক্যাম্প থেকে দুই দিনের ছুটি নিয়ে বাসস্থান রংপুর গিয়ে স্বপ্না চিরজীবনের জন্য বিদায় জানিয়ে দেন ফুটবলকে। কেন এমন সিদ্ধান্ত? ভবিষ্যতে পরিকল্পনা কি? রাইজিংবিডিকে একান্ত সাক্ষাতকারে সে-সব জানিয়েছেন স্বপ্না। পাঠকদের জন্য চুম্বক অংশ তুলে ধরা হলো।

অবসরের সিদ্ধান্ত হঠাৎ করে নেওয়া নাকি পরিকল্পনা করে ভেবে চিন্তে নিয়েছেন?

স্বপ্না: হঠাৎ করে তো এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। যে কেনো সিদ্ধান্ত নিতে গেলে ভেবে চিন্তে নিতে হয়। আমার সিদ্ধান্তটা খুব কঠিন ছিল। ফর্মে থাকা অবস্থায় এতবড় সিদ্ধান্ত সবাই নিতে পারে না।

আপনি যে এমন পরিকল্পনা করেছিলেন সতীর্থদের বলেছিলেন কখনো? তারা কি বিষয়টি আগে থেকেই জানতো?

স্বপ্না: আমি যেহেতু একজন প্রাপ্তবয়স্ক আমার বিষয়টি আমি নিজেই ভাববো। আমার ব্যক্তিগত বিষয় অন্যের সঙ্গে প্রকাশ খুব একটা পছন্দ করি না। যেহেতু আমার সিদ্ধান্ত নেওয়ার বয়স হয়েছে সেক্ষেত্রে আমি নিজে নিজেই ভেবেছি, মনে হলো অনেকতো খেললাম এবার একটু অবসর নেওয়া যাক।

এটাতো কথার কথা। কিন্তু আপনার এই সেরা সময়ে এমন সিদ্ধান্ত কেন?

স্বপ্না: আমার বয়স ২২ বছর। আমি চতুর্থ শ্রেণী থেকে খেলা শুরু করেছি। সেই হিসেবে আমি অনেক বছর ধরেই খেলছি। আমি খেলা নিয়েই ছিলাম, খেলাটাই আমার জীবনের সবকিছু ছিল। খেলাটাকে আমি সবসময় অগ্রাধিকার দিয়েছি। সেখানে মনোযোগ ছিল। ৯ বছর ধরে জাতীয় দলের ক্যাম্পে ছিলাম, বাসায় থাকা হয়নি। সারাবছর ক্যাম্পিংয়ের মধ্যে ছিলাম। এখন ভাবলাম বাসায় সময় দেওয়া উচিৎ, নিজেকেই সময় দেওয়া উচিৎ।

আপনি যেদিন অবসরের ঘোষণা দেন, ওইদিন আপনাদের কোচ ছোটনও পদত্যাগের ঘোষণা দেন। আপনাদের মাঝে কি কথা হয়েছিল?

স্বপ্না: প্রথমত আমি দুই দিনের ছুটি নিয়ে আসছি। তখন পুরোদমে অনুশীলন চলছিল। ভালো প্রস্তুতি চলছিল। আমার পরিকল্পনা ছিল ছুটি থেকে আর ফিরবো না। বিকেলের দিকে স্যারেরা বুঝতে পারে আমি আর ফিরবো না। কোচিং স্টাফের সদস্যরা আমাকে বুঝায়। আমার না খেলার বিষয়টা উনারা জানতো। যে আমি ছুটিতে গেলে আর ফিরবো না। 

টেকনিক্যাল ডিরেক্টর পল স্মলির সঙ্গে কোনো কথা হয়েছে অবসর নিয়ে? 

স্বপ্না: উনি (পল স্মলি) বলেছে, আমি প্রাপ্ত বয়স্ক, আমার জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আমার আছে।

অবসরের ঘোষণার পর বাফুফে থেকে কেউ আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে কি না?

স্বপ্না: সাধারণ সম্পাদক তুষার ভাইয়া ফোন দিয়েছিলেন। উনার সঙ্গে আমার কথা হয়েছে দুই মিনিটের মতো। এ ছাড়া কারো সঙ্গে কথা হয়নি।

কি বলেছেন সাধারণ সম্পাদক?

স্বপ্না: উনি (তুষার) বলেছেন যেহেতু আমার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত তাই অবসর নিয়ে কিছু বলতে চাচ্ছেন না। যদি আমার কোনো চাওয়া-পাওয়া থাকে বা কোনো প্রয়োজন থাকে তাহলে উনাকে যেন বলি। আমি বলছি আমার কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই, আমার জন্য দোয়া করবেন।

বাফুফের নারী বিভাগের প্রধান মাহফুজা আক্তার কিরণ কিংবা সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন অবসর নিয়ে জানতে চেয়েছিল?

স্বপ্না: না আমার সঙ্গে কারো কথা হয়নি।

আপনার দুই দিন পর আঁখি অবসরের ঘোষণা দেয়। আর কেউ আছে?

স্বপ্না: আমার বিষয়টি শুধু আমি বলতে পারবো। অন্য কারো বিষয়টা আমার বলা উচিৎ হবে না।

বিয়ে-সংসার নিয়ে ভাবছেন কি না?

স্বপ্না: এই মুহুর্তে বিয়ের চিন্তা মাথায় আনছি না। আমি ছোট থেকে ফুটবল খেলি। জীবনটা উপভোগের সময় পাইনি। আমরা একটা শৃংখলার মধ্যে ছিলাম। খেলা-ঘুম-খাওয়া এর বাইরে কিছু ছিল না। আমি নতুন জীবন শুরুর জন্য একদম প্রস্তুতি না। আমার আমার এখন ইচ্ছাও নেই।

ভারতে খেলা চুড়ান্ত ছিল, শেষ পর্যন্ত যাননি কেন?

স্বপ্না: আমার ওখানে যাওয়ার সবকিছু চূড়ান্ত হয়েছিল। আমার মায়ানমার থেকে (অলিম্পিকের বাছাই) সরাসরি ভারতে যাওয়ার কথা ছিল। ভারতে খেলার বিষয়টি চূড়ান্ত হওয়ার পর নারী সুপার লিগের বিষয়টা সামনে আসে। সুপার লিগ শুরু হওয়ার কথা ছিল মে’র ১ তারিখ থেকে। তখন সিদ্ধান্ত হয় দেশে যেহেতু লিগ হবে তাই বাইরেরটা বাদ দেওয়া হোক।

ভারত না যাওয়ার সিদ্ধান্ত কে দিয়েছে?

স্বপ্না: পল স্মলি স্যার। উনার সঙ্গেই ভারতের ক্লাবটি যোগাযোগ করেছে। ভারতের ক্লাব আমার সঙ্গে যোগাযোগের পর আমি পল স্মলির ইমেইল দিয়েছিলাম। তারা (ভারত) পজিটিভ ছিল আমাকে নেওয়ার জন্য। আগ্রহ ছিল।

ভারতে সুযোগ পেয়েও যেতে পারেননি। ভারতে খেলতে পারলে আপনি অবসরের সিদ্ধান্ত নিতেন?

স্বপ্না: সেটাটো বুঝতেই পেরেছেন। আমি আর না বলি। আমার আর কিছু বলার নেই।

সাফের পর আর কোনো টুর্নামেন্ট খেলেননি, বেতন ভাতা-বাড়েনি, দাবি দাওয়া আদায় হয়নি। সবমিলিয়ে এগুলো নিয়ে হতাশা থেকে সিদ্ধান্ত? 

স্বপ্না: অতীত নিয়ে আর ভাবতে চাই না। আমার কিছু বলার নেই, সবতো বলেছি (হাসি)।

আপনি বারবার এড়িয়ে যাচ্ছেন… 

স্বপ্না: আমিতো এখন সাবেক ফুটবলার। বলেও লাভ নেই (হাসি)।

সাফ জয়ের পর বাফুফের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দেওয়া পুরস্কারের কত টাকা পেয়েছেন?

স্বপ্না: সব মিলিয়ে থেকে ১৪ লাখ টাকার মতো পেয়েছি।

বেতন-ভাতা বাড়ানোর দাবিটা কেমন ছিল?

স্বপ্না: সাফ জিতে আসার পর এটা নিয়ে কথা হচ্ছিল। বছরের শুরুতে আমরা আবেদন করি। আমাদের দাবি ছিল ৫০ হাজার টাকা করে। স্যার বলেছেন (বাফুফে সভাপতি) আমাদের চাওয়া পাওয়া যৌক্তিক। উনি চেষ্টা করবেন পূরণ করার জন্য। 

বাফুফে থেকে আপনারা মাসিক কত টাকা করে পেতেন? 

স্বপ্না: অধিনায়ক সাবিনার ছিল ২০ হাজার টাকা। আর আমাদের বাকিদের ১০ হাজার টাকা করে ছিল।

সবশেষ বেতন কোন মাসের পেয়েছেন?

স্বপ্না: মার্চ। এপ্রিল এখনো পাইনি, আর মে’তো এখনো শেষ হয়নি।

আপনাদের পক্ষ থেকে বেতন ভাতা-বাড়ানোর দাবি ছিল। বাফুফে কি বলেছিল আপনাদের?

স্বপ্না: আমি যখন ছিলাম তখনতো বলছে। তারা এটা নিয়ে কাজ করছে। বাস্তবায়ান করবে দ্রুত।

প্রায় ৫ মাস চলে গেলো। এগুলা দাবি সহসাই পূরণ হবে বলে মনে হয়?

স্বপ্না: আর কিছু বলার নেই। আসলেই আর কিছু বলার নেই (হাসি)।

আপনার সিদ্ধান্ত কি চূড়ান্ত? আপনাদের দাবি-দাওয়া পূরণ করলে আপনি কি ফিরবেন?
স্বপ্না
: না, এটার আর কোনো সম্ভাবনা নেই। আমার থাকার হলে আমি থেকে যেতাম, আমি আসতাম না। আমি আর ফিরবো না।

আপনার ভবিষ্যতে পরিকল্পনা কি?

স্বপ্না: মাত্র খেলা ছাড়লাম। পরিবারকে সময় দেব। তারপর চিন্তার করবো ভবিষ্যতে নিয়ে।

খেলা ছেড়েছেন। ফুটবলের সঙ্গেতো থাকবেন নিশ্চয়?

স্বপ্না: খেলা ছেড়েছি, ফুটবলের সঙ্গে থাকার আর কোনো ইচ্ছা নেই। খেলোয়াড় হিসেবেতো না-ই, ভবিষ্যতে অন্য কোনোভাবেও ফুটবলের সঙ্গে থাকবো না।

পল স্মলি-গোলাম রাব্বানি ছোটন নিয়ে বাইরে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। আপনাদের কোচিংয়ে এর কোনো প্রভাব ছিল?

স্বপ্না: আসলে কোচদের মধ্যে কি ইস্যু সেটাতো আমরা বলতে পারবো না। তাদের ভেতরে কি আছে না আছে সেটা আমাদের জানার বিষয় না। কাজের দিক থেকে আমাদের কোনো সমস্যা হয়নি। এখন বড়দের (পল-ছোটন) মধ্যে কি চলছে আমি বলতে পারবো না।

ঢাকা/ইয়াসিন

আরো পড়ুন  



সর্বশেষ