ঢাকা     শুক্রবার   ১২ এপ্রিল ২০২৪ ||  চৈত্র ৩০ ১৪৩০

এখানে সবারই এক পরিচয়- শহীদ মুক্তিযোদ্ধা

সুমন্ত গুপ্ত || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১১:০৯, ২৬ মার্চ ২০২৪   আপডেট: ১১:২৩, ২৬ মার্চ ২০২৪
এখানে সবারই এক পরিচয়- শহীদ মুক্তিযোদ্ধা

একাত্তরে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে দেশের অন্য অঞ্চলগুলোর মতো সিলেটেও শত শত নিরীহ ও মুক্তিকামী বাঙালিকে ধরে নিয়ে হত্যা করে পাকিস্তানি সেনারা। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম শেষে বাংলার আকাশে যখন স্বাধীনতার সূর্য উঠেছে, তখনও অনেক স্বজন জানতেন না শহীদদের ঠাঁই হয়েছে কোথায়? অনেক গণকবরও ছিল অজানা। তেমনি একটি বধ্যভূমি সিলেট শহরতলির সালুটিকরে। 

মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসজুড়ে সিলেট ক্যাডেট কলেজের পেছনে পূর্বদিকের টিলায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ক্যাম্প ছিল। যেখানে মুক্তিকামী বাঙালিদের ধরে নিয়ে পাক-হানাদাররা চালাত নির্মম নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞ। এসব তথ্য জানা ছিল এখানকার প্রায় সবার। ছিল মুখে মুখে, বইয়ের পাতায়। কিন্তু শহীদদের স্মরণে ছিল না কোনো স্মৃতিচিহ্ন। সালুটিকরের এই গণকবর এতদিন পড়েছিল পরিত্যক্ত অবস্থায়। সেনানিবাসের সংরক্ষিত এলাকায় বধ্যভূমির অবস্থান হওয়ায় সাধারণের প্রবেশাধিকার ছিল না এতদিন। এমনকি এখানে কাদের হত্যা করা হয়, সেই তালিকাও ছিল না কোথাও। দীর্ঘ গবেষণা ও মাঠ পর্যায়ে অনুসন্ধানের পর সেখানে গড়ে তোলা হয় শহীদ স্মৃতি উদ্যান। 

স্বাধীনতা যুদ্ধে এ দেশের অসংখ্য মানুষকে নির্মম নির্যাতনে হত্যা করেছে পাক হানাদার বাহিনী। ঘর থেকে তুলে নিয়ে গেছে বুদ্ধিজীবীকে, মুক্তিযোদ্ধা সন্দেহে রাস্তা থেকে ধরে নিয়ে গেছে শ্রমিক বা ছাত্রকে। রাজাকার, আল-বদরেরা বাড়ি থেকে টেনেহিঁচড়ে তুলে নিয়ে গেছে কিশোরী বা তরুণীকে। রাজনীতির সাথে যুক্ত মুক্তিকামী অগ্রসর চিন্তার মানুষদের ধরে বন্দিশালায় আটকে রেখেছে দিনের পর দিন। তাদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন করা হয়েছে। পাশবিক নির্যাতন করা হয়েছে সববয়সী নারীদের। অল্প কিছু মানুষ এদের হাত থেকে মুক্তি পেলেও অধিকাংশই হয়েছেন নিষ্ঠুর হত্যার শিকার। বর্বরেরা হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি; চরম অবজ্ঞায় উন্মুক্ত স্থানে ফেলে রেখেছে শহীদদের লাশ। শহীদদের ছিন্নভিন্ন দেহ দেখে পরে চিহ্নিত করা হয় এ স্থানগুলো। যা ‘বধ্যভূমি’ হিসেবে পরিচিত। 

কর্নেল (অব) মোহাম্মদ আব্দুস সালাম বীরপ্রতীক ও মুক্তিযোদ্ধা  অধ্যাপক ডা. জিয়াউদ্দিন আহমদের উদ্যোগে এবং অর্থায়নে সালুটিকর বধ্যভূমিতে গড়ে উঠেছে ‘স্বাধীনতার শহীদ স্মৃতি উদ্যান’। আমি আর আমার তিন চাকার কাণ্ডারি সুজনদাকে নিয়ে এগিয়ে চলছি সেই উদ্যান পানে। গন্তব্য স্থল চিনি না, শুধু লোকমুখে শুনেছি সিলেট ক্যাডেট কলেজের পাশে। তাই আমরা সে পথে ধরেই এগিয়ে চলছি। স্বল্প সময়ের মধ্যে আমরা এসে পৌঁছলাম সিলেট ক্যাডেট কলেজের সামনে। কিন্তু সেখানে কোনো সাইন বোর্ড পেলাম না। অগত্যা পথচারীর সাহায্য নিতেই হলো। একজন বললেন, আরো সামনে গেলে সালুটিকর অভিমুখী রাস্তা পাবেন। এগিয়ে গেলে হাতের ডান দিকে ফলক পাওয়া যাবে। সে পথেই মিলবে আমাদের কাঙ্খিত গন্তব্যের দেখা। 

আমারা পথচারীর কথামত এগিয়ে চললাম। মূল সড়ক থেকে হাতের ডানদিকে ফলকের দেখা পেলাম আমরা। জ্বলজ্বল করছে ‘স্বাধীনতার শহিদ স্মৃতি উদ্যান’ লেখা। পিচঢালা পথ দিয়ে এগিয়ে চলছি, একদম নাগরিক কোলাহলবিহীন পথ। আমরা এসে থামলাম উদ্যানের প্রবেশ দ্বারে। লক্ষ্য করলাম আমাদের মতো অনেকে এসেছেন বীর শহীদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে। আমি নগ্ন পায়ে এগিয়ে চললাম। শহীদ পরিবারের সদস্যরা এসেছে, স্বজনদের শেষ চিহ্নটুকু দেখার জন্য। এখানে যারা শায়িত আছেন, প্রত্যেকে দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন। এখানে বাঙালি কর্নেল সাহেবের পাশে সৈনিক, চা বাগানের ম্যানেজার সাহেবের পাশে চা-শ্রমিক, হাজি সাহেবের পাশে ভট্টাচার্য্য মশাই, চক্রবর্তীর পাশে নমঃশুদ্র শায়িত আছে। বাঙালির পাশে মনিপুরি, পাত্র, উড়াং জাতিগোষ্ঠীর মানুষের এই সমাধী প্রাঙ্গণে দাঁড়ালে উপলব্ধি করা যায় অসাম্প্রদায়িক বাংলাকে। উদ্যানের প্রতিটি সমাধীতে একই মর্যাদার এপিটাফ। সকলের এক পরিচয়- শহীদ মুক্তিযোদ্ধা। 

দেখা হলো এ প্রকল্পের গবেষকদলের প্রধান মুক্তিযুদ্ধ গবেষক অপূর্ব শর্মা। তিনি জানালেন, ১৯৭১ সালে সালুটিকরে ক্যাম্প গড়েছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। মুক্তিযোদ্ধাসহ বাঙালিদের ধরে এনে হত্যা ও নির্যাতন করা হতো এখানে। হত্যার পর ক্যাডেট কলেজের পেছনেই গণকবর দেওয়া হয় তাদের। এখানে অন্তত ২০০ বাঙালিকে গণকবর দেওয়া হয় বলে ধারণা করা হয়। তিনি আরো জানালেন, দীর্ঘদিন থেকে এ গণকবর নিয়ে গবেষণার পর শহীদ ৬৬ জনের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। সালুটিকরের এই গণকবর সবার কাছে ‘বধ্যভূমি’ হিসেবে পরিচিত থাকলেও এত দিন এটি পড়েছিল পরিত্যক্ত অবস্থায়। ঘন জঙ্গলে পূর্ণ ছিল এই টিলাভূমি। ছিল না কোনো স্মৃতিচিহ্ন। স্বাধীনতার ৫২ বছর পর বধ্যভূমি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। শহীদ স্মৃতি উদ্যানের বিশাল চত্বরে নির্মাণ করা হয়েছে দুটি স্মৃতিস্তম্ভ। একটি স্তম্ভে রয়েছে এখানে শায়িত সব শহীদের নাম। এছাড়া সব শহীদের নামখচিত আলাদা স্মৃতিফলকও রাখা হয়েছে। পুরো চত্বরের বিভিন্ন স্থানে এই উদ্যান নির্মাণের পটভূমির সঙ্গে শায়িত সব শহীদের জীবনী লেখা রয়েছে। আমি বীর শহীদদের জীবনীগাথা পড়ে নিজেকে সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করলাম। 

স্বাধীনতার শহীদ স্মৃতি উদ্যানে যেতে হলে আপনাকে আসতে হবে সিলেট শহরে। সিলেট শহরের যে কোনো প্রান্ত থেকে আসতে হবে সিলেট ক্যাডেট কলেজের পূর্বপ্রান্তে।

তারা

আরো পড়ুন  



সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়