ঢাকা     শনিবার   ২২ জুন ২০২৪ ||  আষাঢ় ৮ ১৪৩১

পাঠ প্রতিক্রিয়া

নিঃসঙ্গ, একাকী এক মানুষের কথা 

সন্দীপন ধর || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৬:১৯, ৩ জুন ২০২৪   আপডেট: ১৬:২১, ৩ জুন ২০২৪
নিঃসঙ্গ, একাকী এক মানুষের কথা 

রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনাবসান হলো আজকের দিনে (৩ জুন ১৯৬১), তাঁর পরিচয়ের পৃথিবী, মানুষ ও ভালোবাসার ভুবন থেকে অনেক দূরে, পাহাড় ঘেরা দেরাদুনের নিভৃত দূরত্বে, নিঃসঙ্গ অভিমানে। ঠাকুর বাড়ির সবচেয়ে বিতর্কিত ও বিয়োগান্তক চরিত্র কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ। কবির অতি প্রিয়, কিন্তু নানা অপ্রিয় ঘটনায় তিনি বিড়ম্বিত। সকলের মধ্যে থেকেও তিনি সঙ্গীহীন এবং সম্পূর্ণ নির্জন। বইটি অনেকদিন আমার সংগ্ৰহে ছিল, পড়বো পড়বো করেও পড়া হয়ে ওঠেনি। শেষ করলাম দিনকয়েক আগে। 

রবীন্দ্রভুবনে উপেক্ষিত চরিত্র রথীন্দ্রনাথকে, পরপর সাজানো কিছু তথ্যের আলোয় নীলাঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় পাঠকের চোখের সামনে এনেছেন। অল্প হলেও কিছুটা পরোক্ষ বিশ্লেষণ আছে, তবে বিচার এবং সিদ্ধান্তের ভার তিনি পাঠকের ওপরে ছেড়ে দিয়েছেন।

রথীন্দ্রনাথ বাবামশাইয়ের জীবদ্দশায় পিতৃ আজ্ঞার বাইরে এক পা যাননি, অবাধ্য হননি কোনোদিন, তাঁর আজ্ঞাবহ ও অনুমতি নির্ভর জীবন কাটিয়েছেন। ৭৩ বছরের জীবনের প্রায় ৫৩টি বছর বিশ্ববিখ্যাত 'বাবামশাই'-এর বিশাল ব্যক্তিত্বের চাপ নীরবে বয়েছেন অথবা সয়েছেন রথীন্দ্রনাথ। তাঁর ইচ্ছে জানতে চাননি কবি, নিজের ইচ্ছে পূরণ করতে তাঁকে বিদেশে কৃষিবিজ্ঞান পড়তে পাঠিয়েছেন। তাঁরই ইচ্ছেয় শিলাইদহ ও শ্রীনিকেতনের কৃষি প্রকল্পে তাঁকে পুরোটা সময় দিতে হয়েছে, সাজিয়ে তুলতে হয়েছে শ্রীনিকেতনকে বাবামশাইয়ের আজ্ঞা অনুসারে। তাঁর নির্দেশে বিয়ে করেছেন তাঁরই পছন্দের পাত্রী, বিধবা প্রতিমা দেবীকে। পড়াশোনা, কাজ বা ভবিষ্যৎ জীবনসঙ্গী- কোনো বিষয়েই নিজের সামান্যতম ইচ্ছেটুকুও ব্যক্ত করার সুযোগ বা স্বাধীনতা পাননি রথীন্দ্রনাথ। পিতৃ নির্দেশেই কবির অনুগামী হয়ে কবির সঙ্গে ঘুরে বেড়িয়েছেন দেশ দেশান্তরে, তাঁর স্বাধীন ইচ্ছা, স্বাতন্ত্র্যের বাসনা, আত্ম অনুসন্ধান ও নিজস্বতা নির্মাণের কোনো প্রয়াস পিতার প্রশ্রয় পায়নি কোনোদিন। বিশাল বৃক্ষের পাদদেশে ছায়া লালিত লতাগুল্মের মতো বিনত জীবন কাটিয়েছেন। 

পত্নী প্রতিমা তাঁর বাবামশাইয়ের সেবায়, তাঁরই নিত্য পরিচর্যায় নিযুক্ত থেকেছেন। স্বামী রথীন্দ্রনাথের প্রতি আলাদা করে মনোযোগ দেওয়ার অবকাশ তাঁর হয়নি। অবিরাম কবির সান্নিধ্যে থাকার ফলে, স্বামীর নৈকট্য লাভের সুযোগও তেমন পাননি। রথীন্দ্রকে চিঠিতে বাবামশাই বলেই দিয়েছেন প্রতিমাকে ‘কেবল গৃহিণী এবং ভোগের সঙ্গিনী’ হিসেবে না দেখতে, বরং ‘ওর চিত্তকে জাগিয়ে তোলা’ই হবে রথীন্দ্রের কাজ, যাতে ‘ওর মধ্যে যে বিশেষ শক্তি আছে তার কোনোটা’ অনাদরে যেন নষ্ট না হয়।  ফলে প্রতিমা দেবীর প্রতি পিতৃ আজ্ঞা পালন করতে গিয়ে রথীন্দ্রনাথ জীবনভর থেকে গেছেন নির্জন এক দূরত্বে, অভিমানের আশ্রয়ে, নির্বাসনের নিভৃতে। আর প্রতিমা দেবীও কোনোদিন তাঁর সম্পূর্ণ স্ত্রী হয়ে ওঠেননি, সময়, সেবা ও সঙ্গ দিয়েছেন শুধু বাবামশাইকে।

নীলাঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের বইখানি এই নির্জন ও একাকী রথী ঠাকুরকে মঞ্চপ্রদীপের আলোয় নিয়ে এসেছে। রথীন্দ্রনাথের ব্যথাতুর নিঃসঙ্গতার প্রতি গ্ৰন্থ রচয়িতার সংযত সহানুভূতির পরিচয় মিলবে বইটিতে।

প্রতিমা দেবীকে চিরকাল নিজের পরিচর্যায় নিযুক্ত রাখায় কবির মনে কোনো অপরাধবোধ ছিল কিনা জানা না গেলেও স্নেহের রথীকে লেখা একটি চিঠি থেকে অনুমান করা অসঙ্গত নয় যে পুত্রের নিঃসঙ্গতা তাঁর দৃষ্টি এড়ায়নি। কবি তাঁর পুত্রকে লিখেছেন:
‘তুই বৌমাকে বলিস তিনি যেন আমাকে তার একটা অসুস্থ শিশুর মত দেখেন এবং মনে জানেন আমি এই অবস্থায় যা কিছু করেছি তার জন্যে আমি দায়ী নই।’

কবির মৃত্যর পর, বৃহৎ বনস্পতির দীর্ঘ ছায়া সরে গেলে, রথী স্বাধীন এবং স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব হিসেবে শান্তিনিকেতনে সকলের সামনে এসে দাঁড়ালেন বটে, তবে অনেক অপ্রীতিকর এবং অবাঞ্ছিত বিতর্কের মালিন্য গায়ে মেখে। স্বভাবশান্ত, স্বল্পবাক, সজ্জন ও সদা সৌজন্যশীল এ-মানুষটি তাঁর জীবনের কঠিনতম এবং বেদনাময় পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে চিরকালের মতো আশ্রম ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হলেন। বিশ্বভারতীর দায়িত্বে থেকেও সুনাম এবং সাফল্য জোটেনি রথীর, স্ত্রী প্রতিমার সঙ্গে সম্পর্কের শীতলতাও কমেনি একচুল।

স্বামী-স্ত্রীর সেই আলগা, অসংলগ্ন সম্পর্কের মধ্যে স্থান করে নিয়েছেন অধ্যাপক নির্মল চট্টোপাধ্যায়ের বিদূষী, রূপবতী স্ত্রী মীরা চট্টোপাধ্যায়। বয়সের ব্যবধান সত্তেও, এঁরা দুজনেই নিজের নিজের বিয়ের বন্ধন লঙ্ঘন করে, সমাজ স্বীকৃত সম্পর্কের স্বাভাবিকতা উপেক্ষা করে পরস্পরের অন্তরঙ্গতায় আকৃষ্ট হন। অবশেষে মীরাকেই অবশিষ্ট জীবনের সঙ্গী করে, নিন্দা, অপবাদ ও কলঙ্ক মাথায় নিয়ে নীরব অভিমানে, এক বস্ত্রে, একদা একরাত্রে, আশ্রমের প্রথম ছাত্র, কৃষি বিজ্ঞানের শিক্ষক, বিশ্বভারতীর উপাচার্য, আশ্রমগুরু রবীন্দ্রনাথের জ্যেষ্ঠ পুত্র, রথীন্দ্রনাথ সারা জীবনের মতো আশ্রম ছেড়ে দূর দেরাদুনে পার্বত্য শীতলতায় চির নির্বাসনে চলে গেলেন। 

পত্নী প্রতিমার দায় দায়িত্ব তিনি কাঁধ থেকে ঝেড়ে ফেলেননি। নিয়মিত খবর নিয়েছেন, টাকা পাঠিয়েছেন, তাঁর লেখার গ্ৰন্থসত্বও তাঁকেই দিয়ে গেছেন। কিন্তু আর কোনোদিন প্রতিমা দেবীর মুখোমুখি এসে দাঁড়াননি। অভিমানে, অদর্শনে, অনেক অবলা কথা ও অজ্ঞাত ব্যথা নিয়ে রথীন্দ্র-প্রতিমা উভয়েরই জীবনাবসান হয়েছে। বিশ্ববিজয়ী পিতা রবীন্দ্রনাথের শতবার্ষিক উৎসবের আয়োজনেও তিনি ছিলেন ব্রাত্য, অনিমন্ত্রিত, হয়তো-বা অবাঞ্ছিতও। আমৃত্যু একলা এবং দূরেই থেকে গেলেন তিনি।
এই সব কথা নিয়েই এই বইটি। নীলাঞ্জন ‘আপনি তুমি রইলে দূরে : সঙ্গ নিঃসঙ্গতা ও রথীন্দ্রনাথ’-এ রথীন্দ্রনাথের ১২৭টি চিঠি, একটি টেলিগ্রাম, তিনটি শংসাপত্র, পৌরকর্তৃপক্ষের কাছে লেখা একটি চিঠির অনুলিপি এবং খানকয়েক চিরকুট অন্তর্ভূক্ত করেছেন। ৫১টি ছবি ও চিঠিপত্রের অনুলিপিও আছে । তাঁর নিজস্ব সংকলন-ভূমিকাটি তথ্যপূর্ণ, বিশ্লেষণাত্মক এবং মূল্যবান। নীলাঞ্জন রথীন্দ্রনাথকে ‘আশ্চর্য এক বিষণ্নতায় আবৃত’ দেখেছেন। অপার নিঃসঙ্গতায় যেন চির উদাসী তিনি। স্বভাবত নীরব, নিন্দা ও অপবাদে নত এবং নিভৃতে নির্বাসিত রথীন্দ্রনাথের বিষণ্ণতায় নিমগ্ন জীবনের বিষাদময় পরিণতির প্রাঞ্জল ভাষ্য এই বই। বইটি প্রকাশ করেছে দেজ পাবলিশার্স। 
 

তারা//

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়