ঢাকা, বুধবার, ৩ আশ্বিন ১৪২৬, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

বঙ্গবন্ধুর লক্ষ্য ছিল শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা

হাসান মাহামুদ : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৮-১৮ ৬:৫২:১৮ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৮-১৮ ৬:৫২:১৮ পিএম
বঙ্গবন্ধুর লক্ষ্য ছিল শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা
Walton E-plaza

হাসান মাহামুদ : বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতির জনক। একই সঙ্গে তিনি সমাজতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্যে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থারও জনক। তিনি জার্মানির হিটলার বা ইতালির মুসোলিনির মতো একনায়কতান্ত্রিক মনোভাব নিয়ে রাজনীতিতে আসেননি। তিনি রাজনীতিতে এসেছিলেন জনগণকে গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক মুক্তি দিতে।

তিনি স্বল্পতম সময়ে শ্রেষ্ঠ বিশেষজ্ঞদের দিয়ে সংবিধান রচনা করেছেন। শ্রেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞদের দিয়ে প্রথম পঞ্চবর্ষ পরিকল্পনা তৈরি করেছেন, যার মূল কথা দারিদ্র্য দূর।

বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন গণতন্ত্র আর অর্থনৈতিক মুক্তিকে সমন্বয় করে কাজ করতে। এই ধারণা নব্বই দশকের পর পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে উচ্চারিত হয়। সে ধারণা বঙ্গবন্ধু প্রবর্তন করেছিলেন সত্তরের দশকেই। শেখ মুজিবুর রহমান গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় দেশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। পুরাতন সমাজব্যবস্থা উপড়ে ফেলে বৈজ্ঞানিক সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন তিনি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এ বিষয়ে ঘোষণা দিয়ে কাজও শুরু করেছিলেন তিনি। এমনকি বঙ্গবন্ধুর সরকারব্যবস্থায়ও এ বিষয়ের উল্লেখ ছিল। 

বাংলাদেশের প্রথম স্বাধীনতা দিবস পালিত হয় ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ। সেদিনের ভাষণে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ‘কেমন বাংলাদেশ চাই’ প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘আমার সরকার অভ্যন্তরীণ সমাজ বিপ্লবে বিশ্বাস করে। এটা কোনো অগণতান্ত্রিক কথা নয়। আমার সরকার ও পার্টি বৈজ্ঞানিক সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। একটি নতুন ব্যবস্থার ভিত রচনার জন্য পুরাতন সমাজব্যবস্থা উপড়ে ফেলতে হবে। আমরা শোষণমুক্ত সমাজ গড়ব।’

বঙ্গবন্ধু রাজনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে চেয়েছিলেন গণতন্ত্র, আর অর্থনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে চেয়েছিলেন সমাজতন্ত্র কায়েম করতে। অর্থনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে ‘সমাজতন্ত্র’ কীরূপ হবে, সেটাও পরিষ্কার করে বলেছিলেন জাতির জনক। তিনি বলেন, ‘আমি গণতন্ত্রে বিশ্বাসী, জনসাধারণের ভোটের অধিকারকে বিশ্বাস করি। আমরা বিশ্বাস করি সমাজতন্ত্রে, যেখানে শোষণহীন সমাজ থাকবে। শোষক-শ্রেণী আর কোনোদিন দেশের মানুষকে শোষণ করতে পারবে না। এবং সমাজতন্ত্র না হলে সাড়ে সাতকোটি মানুষ ৫৪ হাজার বর্গমাইলের মধ্যে বাঁচতে পারবে না। সেইজন্য অর্থনীতি হবে সমাজতান্ত্রিক’।

সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা বঙ্গবন্ধু আরো বলেছিলেন, ব্যক্তিমালিকানা, সমবায় ও রাষ্ট্রীয় মালিকানা ক্ষেততমজুর–কৃষকরা সমবায়ে যোগ দেবে। রাষ্ট্র কৃষিকাজে সহায়তা দেবে। জমির মালিক, কৃষক যার যার মতো ফসলের ভাগ পাবে।

১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি টাঙ্গাইলের জনসভার ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা করা হবে। শোষকদের আর বাংলাদেশে থাকতে দেয়া হবে না। কোনো ভুঁড়িওয়ালা এদেশে সম্পদ লুটতে পারবে না। গরীব হবে এই রাষ্ট্র এবং এই সম্পদের মালিক, শোষকরা হবে না'। সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির একটা বড় উপাদান হল সমবায়। জনগণকে সমবায়ে উদ্বুদ্ধ করতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সেদিন বলেছিলেন, ‘আপনারা পারস্পরিক সহযোগিতা দিয়ে এগিয়ে আসুন। পাশের লোকেরা যদি ঘরবাড়ি না থাকে আপনারা সকলে মিলে সাহায্য করে তার ঘরবাড়ি করে দেবেন। পয়সা নেই সরকারের, আপনাদের নিজেদের করতে হবে, রক্ত দিয়ে এদেশ গড়তে হবে। মরুভূমিকে নতুন করে সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা করে গড়ে তুলতে হবে’।

১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ বেতার ও টেলিভিশনে প্রদত্ত ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষে মানুষে ব্যক্তিতে বৈষম্য থাকবে না। সম্পদের বণ্টন ব্যবস্থায় সমতা আনতে হবে। নিম্নতম আয়ও নিম্নতম উৎপাদনের ক্ষেত্রে যে আকাশচুম্বী বৈষম্য এতদিন ধরে বিরাজ ছিল তা দূর করার ব্যবস্থাদি উদ্ভাবনের জন্য আমি একটা বিশেষ কমিটি গঠন করার কথা বিবেচনা করছি’।

একটি ‘শোষণ অবিচারমুক্ত’ সমাজ ও রাষ্ট্র গঠন করতে বঙ্গবন্ধু সরকার নানা পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। ব্যাংকসমূহ বিদেশি ব্যাংকের শাখাসমূহ বাদে সাধারণ ও জীবন বীমার কোম্পানিসমূহ বিদেশি বীমা কোম্পানি ও শাখাসমূহ বাদে, সকল পাটকল, সকল বস্ত্র ও সুতাকল, সকল চিনিকল, আভ্যন্তরীণ ও উপকূলীয় নৌযানের বৃহৎ অংশ, ১৫ লাখ টাকা মূল্যের অনূর্ধ্ব সকল পরিত্যাক্ত অনুপস্থিত মালিকানাভুক্ত সম্পত্তি বাংলাদেশ, বিমান ও বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনকে সরকারি হিসেবে স্থাপন করা হয়। সমগ্র বহির্বাণিজ্যকে রাষ্ট্রীয়করণের লক্ষ্য নিয়ে সাময়িকভাবে বহির্বাণিজ্যের বৃহৎ অংশকে তখন রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।

বঙ্গবন্ধু বিশ্বাস করতেন, চাষী সমাজ ভালো থাকলে, বাংলাদেশ ভালো থাকবে। তাইতো সে কঠিন সময়েও সুদূরপ্রসারী কল্যাণের কথা ভেবে ২৫ বিঘার কম জমি আছে এমন চাষীদের খাজনা চিরদিনের জন্য মওকুফ করে দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। এর আগেই সমস্ত বকেয়া খাজনা মাফ করে দেয়া হয়। কৃষিঋণ বাবদ ১০ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়, ১৬ কোটি টাকার টেস্ট রিলিফ বিতরণ করা হয়, লবণের ওপর থেকে কর তুলে নেয়া হয়। সারাবছর ধরে সেচের কাজ চালানো, উন্নতমানের বীজ বপন, সার কীটনাশক ওষুধ, সব চাষীকে পর্যাপ্ত ঋণদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

১৯৭২ সালের এপ্রিল মাসে ঠাকুরগাঁওয়ে এক ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আমার বড় বড় কলকারখানা, ব্যক্তিগত সম্পত্তি যা ছিল সেগুলোকে জাতীয়করণ করে সাত কোটি লোকের সম্পত্তি করেছি। যতগুলো চটকল ছিল সব এখন বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষের সম্পত্তি। আমি জাতীয়করণ করে বাংলার মানুষকে দিয়েছি। ফসল উৎপাদন করেন, চেষ্টা করেন’।

একটি স্বাবলম্বী অর্থনীতির মালিক হতে হলে যে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে সেটিও শক্তভাবে বলে গেছেন বঙ্গবন্ধু। ১৯৭২ সালের ৫ এপ্রিল বাংলাদেশ বেতারে ‘দেশ আমার মাটি আমার’ অনুষ্ঠানে বক্তৃতায় তিনি বলেন, ‘বৎসরে ত্রিশ লক্ষ লোক আমার নতুন বাড়ে। আজকে আমাদের পপুলেশন প্ল্যানিং করতে হবে। পপুলেশন কন্ট্রোল করতে হবে। না হলে বিশ বৎসর পরে ১৫ কোটি লোক হয়ে যাবে ২৫ বছর পরে। ৫৪ হাজার স্কয়ার মাইল বাঁচতে পারবে না। যেই ক্ষমতায় থাকুক বাঁচার উপায় নেই। একটা পপুলেশন কন্ট্রোল আমাকে করতেই হবে।…প্রোডাকশন বাড়াতে হবে।, না হলে মানুষ বাঁচতে পারবে না এবং বাঁচার জন্য তাকে শৃঙ্খলাবদ্ধ হতে হবে। বিশৃঙ্খল জাতি কোনদিন বড় হতে পারে না'।

পরবর্তী পাঁচ বছর কীভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতি সুগঠিত হবে, সে পরিকল্পনা ব্যক্ত করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। তিনি বলেছিলেন, ‘গ্রামে গ্রামে বহুমুখী কো-অপারেটিভ করা হবে। পাঁচ বৎসর প্ল্যানে বাংলাদেশের ৬৫ হাজার গ্রামে একটা করে কো-অপারেটিভ হবে। এই কো-অপারেটিভে জমির মালিকের জমি থাকবে। কিন্তু তার অংশ বেকার প্রত্যেকটা মানুষ। যে মানুষ কাজ করতে পারে, তাকে সেই কো-অপারেটিভের সদস্য হতে হবে এবং বহুমুখী কো-অপারেটিভ হবে। আলটিমেটলি ৬৫ হাজার ভিলেজে একটা করে কো-অপারেটিভ করা হবে। তা না হলে দেশকে এগুনো যাবে না। আপনার জমির ফসল আপনি নিবেন। একটা অংশ যাবে কো-অপারেটিভে, ঐ অংশ গভর্নমেন্টের হবে। দ্বিতীয় অংশে থানায় থানায় একটি করে কাউন্সিল হবে'।

বাংলাদেশের ‘সমাজতন্ত্র’ নিয়ে বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের ৭ জুন রেসকোর্স ময়দানে দেয়া এক ভাষণে মহাশক্তিশালী এক মন্তব্য করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘বাংলার বুকে বাঙালি জাতীয়তাবাদ থাকবে। এ হলো আমার এক নম্বর স্তম্ভ। দ্বিতীয় স্তম্ভ, বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র। এ সমাজতন্ত্র দুনিয়া থেকে ভাড়া করে আনতে চাই না। এ সমাজতন্ত্র হবে বাংলার সমাজতন্ত্র। এ সমাজতন্ত্র বাংলার মানুষের সমাজতন্ত্র, তার অর্থ হলো শোষণহীন সমাজ, সম্পদের সুষম বণ্টন। বাংলাদেশে ধনীদের আমি আর ধনসম্পদ বাড়াতে দেব না। বাংলার কৃষক, মজদুর, বাংলার বুদ্ধিজীবী, শ্রমিক এ দেশে সমাজতন্ত্রের সুবিধা ভোগ করবে’।


রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৮ আগস্ট ২০১৯/হাসান/এনএ

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন
       
Marcel Fridge