ঢাকা     বুধবার   ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ||  মাঘ ২৫ ১৪২৯

‘মেয়ে তো মরে গিয়ে বেঁচে গেছে, আমরা ধুঁকে ধুঁকে মরছি’

মামুন খান || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১১:২১, ৪ নভেম্বর ২০২২   আপডেট: ১১:২২, ৪ নভেম্বর ২০২২
‘মেয়ে তো মরে গিয়ে বেঁচে গেছে, আমরা ধুঁকে ধুঁকে মরছি’

নিবেদীতা। ছবি সংগৃহীত

ভালোবাসতেন নাচ, গান আর অভিনয়। দেখতেও সুন্দরী। আর এটাই করেছে তাকে আরও উচ্চবিলাসী। পথ চলতে গিয়ে পরিচয় হয় বিসিএস ক্যাডার পরিচয় দেওয়া এক যুবকের সঙ্গে।এরপর আবেগ আর ভালোবাসার বেড়াজালে বন্দি হয়ে ধর্মান্তরিত হয়ে বিয়ে করেন তাকে। 

নিবেদীতা থেকে হন নুসরাত জাহান। আর এরপর ফাঁস হয় সবকিছু। পরিবার ও ধর্ম ত্যাগ করেছে জীবন দিতে হয় তাকে। নিবেদীতাকে হারিয়ে এখনো কান্না থামছে না পরিবারটির।

নিবেদীতার বাবা আক্ষেপ করে বলেন, ‘মেয়ে তো মরে গিয়ে বেঁচে গেছে, আমরা ধুঁকে ধুঁকে মরছি’।

গত বছর ১২ জুন রাজধানীর আগারগাঁয়ে সংসদ সচিবালয় কোয়ার্টারে নুসরাত জাহান আত্মহত্যা করেন। এ ঘটনায় নুসরাতের বাবা রত্ম কান্তি রোয়াজা ওইদিনই শেরেবাংলা নগর থানায় আত্মহত্যার প্ররোচনায় মামলা করেন।

মামলাটি তদন্ত করে গত বছরের ২৫ অক্টোবর মিল্লাত মামুন ও তার মা মোছা. এয়না বেগমকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দাখিল করেন। সর্বশেষ গত ২ অক্টোবর ঢাকার অ্যাডিশনাল চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হাসিবুল হকের আদালতে মামলাটি চার্জশুনানির জন্য ধার্য ছিল। কিন্তু ওই দিন আসামিপক্ষ সময় আবেদন করে। আদালত সময় আবেদন মঞ্জুর করে আগামী ২২ জানুয়ারি চার্জশুনানির পরবর্তী তারিখ ধার্য করেন।

মামলা সম্পর্কে নুসরাতের বাবা রত্ম কান্তি রোয়াজা বলেন, মামলা দিয়ে আর কি হবে। মেয়েকে তো আর ফিরে পাবো না। সে তে মরেই গেছে। বিষয়টি নিয়ে আমরা মানসিকভাবে এখনো চিন্তায় আছি। মেয়ে তো মরে গিয়ে বেঁচে গেছে। আমরা ধুঁকে ধুঁকে মরছি। ওর মা অর্ধেক পাগল হয়ে গেছে। আমি পুরুষ মানুষ এখানে সেখানে ঘুরে সময় চলে যায়। দুঃখ ভোলার চেষ্টা করি। ওর মা তো ঘরে থাকে, মেয়ের কথা চিন্তা করতে করতে অসুস্থ হয়ে পড়েছে।

তিনি বলেন, মেয়ে ছোট থেকে নাচ, গান নিয়ে থাকতো। বিভিন্ন প্রোগ্রামে এখানে সেখানে যেতো। আমরা ভাবতাম ও প্রোগ্রামে যায়। এরকম হবে বিশ্বাস করি নাই। ও ছিলো আদরের মেয়ে। মা ছাড়া অন্য কিছু বলে ওকে ডাকতাম না। মেয়েটা ওদের কারণে আত্মহত্যা করেছে। আমি এর বিচার চাই।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শেরেবাংলা নগর থানার এসআই জামিল হোসাইন বলেন, ‘মামলার তদন্ত শেষে মামুন মিল্লাত ও তার মা ময়না বেগমকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দিয়েছি।’

কেন আত্মহত্যা করেছে জানতে চাইলে এ তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, তদন্তে উঠে এসেছে, নুসরাত ও মামুন মিল্লাতের মধ্যে সম্পর্ক ভালো ছিল না। এ কারণে আত্মহত্যা করেছে। আত্মহত্যার আগে নুসরাত সুইসাইড নোটে মা-ছেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ লিখে গেছেন। সেটা তার লেখা কি না পরীক্ষা করা হয়। এটা প্রমাণিত যে নুসরাতই সুইসাইড নোট লিখে গেছেন। মা-ছেলের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে সুইসাইড করেন নুসরাত। সুইসাইড নোটেও তাই লিখে গেছেন।

এ সম্পর্কে জানতে আসামিপক্ষের আইনজীবী খাদিজান লিমার সাথে যোগাযোগ করা হয়। তবে এ বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

১৫ জুন সকালে রাজধানীর কল্যাণপুর এলাকা থেকে র‌্যাব-২ এর একটি দল মিল্লাত মামুনকে গ্রেপ্তার করে। পরদিন আদালত তার একদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

নুসরাতের মৃত্যুর ঘটনায় তার বাবা রত্ম কান্তি রোয়াজা ১২ জুন শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা করেন।

মামলায় অভিযোগ করা হয়, মামুন মিল্লাত নিজেকে বিসিএস ক্যাডার পরিচয় দিয়ে নুসরাত জাহানকে ২০১৯ সালে ফুঁসলিয়ে বিয়ে করে ধর্মান্তরিত করে। বিয়ের কিছুদিন পর থেকে মিল্লাত নুসরাতকে শারীরিক আঘাত ও মানসিকভাবে নির্যাতন করতো।  যা নুসরাত তার বাবাকে জানায়। মিল্লাত জুয়া, নেশা এবং বিভিন্ন পরকীয়ায় আসক্ত ছিল। ১২ জুন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে নুসরাত তার বাবাকে ফোন দিয়ে জানায়, মিল্লাত তাকে শারীরিক নির্যাতনসহ অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেছে। তাকে বাসা ছেড়ে চলে যেতে বলেছে। না গেলে হত্যার হুমকি দেয়। বেলা দেড়টার দিকে পুলিশ রত্ম কান্তি রোয়াজাকে নুসরাতের মৃতদেহ উদ্ধারের কথা জানায়।

বগুড়ার ধরমপুর পূর্বপাড়ার আবু বক্কও সিদ্দিকের স্ত্রী মোছা. এয়না বেগম (৪৯) এবং ছেলে মিল্লাত মামুন। তারা দুজনে এখন মামলায় জামিনে আছেন।

/মামুন/সাইফ/

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়