ঢাকা     মঙ্গলবার   ২১ মে ২০২৪ ||  জ্যৈষ্ঠ ৭ ১৪৩১

বার বার প্রধানমন্ত্রী হয়ে ফিরে আসুন, উপকারভোগীদের চাওয়া

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৬:৩৯, ২২ মার্চ ২০২৩  
বার বার প্রধানমন্ত্রী হয়ে ফিরে আসুন, উপকারভোগীদের চাওয়া

অন্তহীন কষ্ট ভোগ করা মানুষগুলো জীবনের এই প্রান্তে এসে দুই শতক জমিসহ ঘর পাওয়া স্বপ্নের মত। জীবনের সাথে আজীবন লড়াই করা মানুষগুলো পেয়েছে শান্তির আশ্রয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপহার তাই তাদের কাছে শুধু একটি ঘর নয়, যেন একেকটি রাজপ্রসাদ। এভাবেই নিজেদের অনুভূতি ব‌্যক্ত করতে গিয়ে তারা বলছেন, দুখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে বার বার প্রধানমন্ত্রী হয়েই যেন ফিরে আসেন বঙ্গবন্ধুকন‌্যা শেখ হাসিনা।

বুধবার (২২ মার্চ) উপহারের এসব বাড়ি হস্তান্তরের অনুষ্ঠানে গণভবন থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যুক্ত ছিলেন বরিশাল জেলার বানারিপাড়া উপজেলার বানারিপাড়া পৌরসভার উত্তরপাড় আশ্রয়ণ প্রকল্পে। সেখানে ঘর পাওয়ার অনুভূতি ব‌্যক্ত করতে গিয়ে উপকারভোগী মনোয়ারা বেগম আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘একাত্তরে মিলিটারিতে ঘর পোড়ায় দেছে। পরে আমার মায় কোনও দখল পায় নাই। ভিক্ষা কইরা তার একটা ঘর উঠাইছে, হেউ ঘরও বন‌্যায় চইল‌্যা গেছে মা। আমাগো দুই বোন লইয়া বানারী পাড়া ওজাগায় এজাগায় টাক খাইছে মা।’

১৮ বছর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করতে তার বাড়ি যাওয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আপনার সাতে নামাজ পড়ছি, খানা খাইছি। নামাজের ঘরে বসে আপনি মিলাদ পড়ছেন। আপনি আমারে ঘর দিছেন মা।’

নিজের ঘর না থাকায় কষ্টের দিনগুলো কথা স্মরণ করতে গিয়ে চোখের কোণে জল আসে মনোয়ারার। বলেন, ‘আমি আপনার বাড়ি থেইক‌্যা আইসা যে ঘরে থাকতাম আমারে নামাই দিছে মা। পৌরসভার সামনে একটা পুরান হাসপাতালে সেই ঘরে মা-মাইয়া-পোলা আমার মায়রে নিয়া আমি আশ্রয় নিছি। সেই জাগায় আমার মা মারা গেছে, ছেলে মারা গেছে। আমি দশ বছর ছিলাম মা। তারপর সেহান থেকে আমারে উৎখাত করে দিছে। আমি কোথাও আশ্রয় পাই না মা। আমি যেখানে বইসা কথা বলতেছি সেইখানে আমি পাঁচ বার ঘর উঠাইছি, আমারে উৎখাত করছে।’

এখন ঘর পাওয়ার অনুভূতি ব‌্যক্ত করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত মনোয়ারা বলেন, ‘তয় এখন যে ঘর দিছে মা ১৫ জন আমার ঘরে মা। আপনি যা করছেন আমাগো বানারি পাড়া এই ঘর পাইয়া আমি খুশি মা। আপনারে কী করমু মা। আপনার সাথে ভাত খাইছি, আবার খামু হেই আশা। আপনি যদি একটু বানারী পাড়া আসতেন, বানারীপাড়া ধন‌্য হইতো।’

‘কতো গরিব-দুখী আপনার জন‌্য কানতেআছে। আপনারও মা-বাপ নাই মোরও নাই। জনম দুখী মা। আপনি একটু বানারীপাড়া আসেন মা, আপনার সাথে খানা খাই আর কিছু চাওয়ার নাই। আপনি যে ঘর দিছেন তা স্বপ্নে দেখতাম মা, এহন দেহি বাস্তবে। মা কী করমু আপনারে দিশা করতে পারি না।’

এসময় উপকারভোগী আরেক দিনমজুর বলেন, ‘আমার জন্মের আগে ঘর-বাড়ি নদীতে ভাইঙা গেছে। আমার বাবা রাস্তার ধারে খুপরি ঘর করে আমাদের লালন-পালন করতেন। বর্ষা মৌসুমে আমাদের ঘর পানিতে তলায় থাকতো। পানির ভেতরে বসবাস করতাম বর্ষাকালে। অনেক কষ্ট সহ‌্য করে আমাদের পিতা বিদায় নেছেন। আমাদের কোনও স্থায়ী বসবাসের ঠিকানা করতে পারেন নাই। আমার বৃদ্ধ মা আছে, একটা কন‌্যা সন্তান আছে। আমি কোনোদিন এরকম একটি স্বপ্নের ঘর তৈরি করে দিতে পারতাম না। আমি স্বপ্ন দেখতাম না একটা বিল্ডিং ঘরে থাকার। কারণ স্বপ্ন দেখার মত একটা পরিস্থিতি থাকা দরকার। আমার সেই পরিস্থিতি নাই। আমি দিনমজুর কাজ করি। আমার পক্ষে একটা জায়গা একটা ঘর তৈরি করা সম্ভব নয়।’

‘মমতাময়ী মা আপনি উপহার দিয়েছেন ঘর-জমি। দিয়েছেন পুকুর, বিশুদ্ধ পানি, বিদ‌্যুৎ। এই ঋণ আমরা শোধ করতে পারবো না। মা আমি রাস্তা থেকে রাজপ্রাসাদ দিয়েছেন। আমি যে কী খুশি হয়েছি। আমার পরিবার খুবই আনন্দিত। আনন্দ প্রকাশ করার মত ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। আপনি না হলে এমন একটি ভালো জায়গায় থাকার সৌভাগ্য হতো না। আপনি যদি একবার চোখে দেখে যেতেন আমাদের সুখের দিনগুলো। অসম্ভব দুঃখ-কষ্ট সহ‌্য করেছি, অনেক মানুষ অনেক কথা বলেছে। বর্ষার সময়ে ভাত রান্না করতাম সেই ভাত মাটিতে পড়ে নষ্ট হয়ে যেত মা। আজকে আপনার দেওয়া উপহার পেয়ে সব কষ্ট চলে গেছে। আমি দোয়া করি আল্লাহ আপনাকে দীর্ঘায়ু দান করুন।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তার কন‌্যা-মা দোয়া করেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার বৃদ্ধ মা আপনার জন‌্য সারাক্ষণ দোয়া করতে থাকে; যখন শুনেছে আপনি ঘর দিয়েছেন। আমার সন্তানও আপনার জন‌্য দোয়া করে। আপনি বার বার আমাদের মাঝে প্রধানমন্ত্রী হয়ে ফিরে আসুন। আপনি ভবিষ‌্যৎ তৈরি করে দিয়েছেন সন্তান আর বৃদ্ধ মাকে নিয়ে থাকার জন‌্য। এটা আমার কাছে রাজপ্রাসাদের সমান। আপনি রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে রাজপ্রাসাদ দিয়েছেন।’

এর আগে, দেশের সাতটি জেলা ও ১৫৯টি উপজেলাকে সম্পূর্ণরূপে ভূমি ও গৃহহীনমুক্ত হিসেবে ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর আগে, পঞ্চগড় ও মাগুরা জেলাকে ভূমিহীন-গৃহহীন হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী। আজকের গৃহ হস্তান্তরের পর দেশে ভূমিহীন-গৃহহীনমুক্ত জেলার সংখ্যা ৯টি এবং উপজেলার সংখ্যা হবে ২১১টি।

বুধবার দেশের সব উপজেলায় চতুর্থ ধাপে ৩৯ হাজার ৩৬৫টি গৃহহীন-ভূমিহীন পরিবারের মাঝে প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর হস্তান্তর করা হয়। এর আগে, প্রথম ধাপে ৬৩ হাজার ৯৯৯টি, দ্বিতীয় ধাপে ৫৩ হাজার ৩৩০টি এবং তৃতীয় ধাপে ৫৯ হাজার ১৩৩টি ঘর হস্তান্তর করা হয়েছে। বুধবারের পর হস্তান্তরিত মোট গৃহের সংখ্যা হবে দুই লাখ ১৫ হাজার ৮২৭টি।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালে দেশে প্রথম ভূমিহীনদের পুনর্বাসন কার্যক্রম শুরু করেন। বর্তমান লক্ষ্মীপুর জেলার রামগতি উপজেলার চরপোড়াগাছা গ্রামে একই বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি গুচ্ছগ্রাম প্রকল্প শুরু করেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৯৭ সালে আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে দেশে ভূমিহীন-গৃহহীন মানুষকে পুনরায় জমি ও ঘরের মালিকানা দিয়ে বঙ্গবন্ধুর অসম্পন্ন কাজ সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেন।

এ প্রকল্পের আওতায় ১৯৯৭ সাল থেকে এখন পর্যন্ত মোট সাত লাখ ৭১ হাজার ৩০১টি পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়েছে। পরিবারপ্রতি ৫ জন হিসেবে এ কার্যক্রমের উপকারভোগীর সংখ্যা ৩৮ লাখ ৫৬ হাজার ৫০৫ জন।

এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আশ্রয়ণ প্রকল্প সরাসরি পুনর্বাসন করেছে ৫ লাখ ৫৪ হাজার ৫৯৭টি পরিবারকে। ভূমি মন্ত্রণালয়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের সমান কার্যক্রমের আওতায় পুনর্বাসিত হয়েছে আরও দুই লাখ ১৬ হাজার ৭০৪টি পরিবার।

২০২০ সালে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী মুজিববর্ষে দেশের কোনও মানুষ ভূমিহীন-গৃহহীন থাকবে না বলে ঘোষণা করেন। তার এ ঘোষণা বাস্তবায়নের লক্ষে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় নিরলসভাবে কাজ করছে।

প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী শুধু মুজিববর্ষ উপলক্ষে ২০২০ সালের মার্চ মাস থেকে ২০২৩ সালের এ পর্যন্ত সারাদেশে ভূমিহীন-গৃহহীন পরিবার পুনর্বাসনের লক্ষে দুই লাখ ৩৭ হাজার ৮৩১টি ঘর দেওয়া হয়েছে। এই কার্যক্রমের আওতায় সারাদেশে পুনর্বাসন কার্যক্রমের মোট উপকারভোগীর সংখ্যা প্রায় ১৩ লাখ মানুষ।

পারভেজ/এনএইচ

আরো পড়ুন  



সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়