ঢাকা     মঙ্গলবার   ২৫ জুন ২০২৪ ||  আষাঢ় ১১ ১৪৩১

মোহাম্মদ নাসিম: খাঁটি আওয়ামী নেতার বিদায়

অজয় দাশগুপ্ত || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১১:৩৩, ১৩ জুন ২০২০   আপডেট: ১০:৩৯, ২৫ আগস্ট ২০২০
মোহাম্মদ নাসিম: খাঁটি আওয়ামী নেতার বিদায়

করোনাকালে চলে যাওয়া প্রত্যেকটি মানুষকে আমি ‘হিরো’ সম্বোধন করতে চাই।  বলা দরকার পজিটিভ হোক আর নেগেটিভ, করোনার আঘাত সহজে কেউ এড়াতে পারছেন না। আন্ডার লাইনিং নামে নতুন যে শব্দবন্ধ তার মানে কী? খুব সহজ; আপনার যদি আরো কোনো সমস্যা থাকে করোনা আপনাকে কাবু করবেই- এটাই সারকথা।

আজ আমাদের দেশের বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ, নেতা, প্রাক্তন মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম পাড়ি জমালেন না-ফেরার দেশে। আওয়ামী লীগের এই নেতা আমাকে মনে করিয়ে দিতেন সৈয়দ অশরাফের কথা। ভবিষ্যতেও দেবেন। এরা দু’জনই পিতা হারানো পুত্র। আমরা এখন দেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের দাপট যতটা দেখি ততটা কি তখন ছিলো? মূলত পঁচাত্তর পরবর্তী যে আওয়ামী লীগ বা সরকারবিরোধী যে আওয়ামী লীগ তার তুলনা মেলা ভার। আমি মনে করি, সে আওয়ামী লীগই শক্তিশালী।

মূল কথায় আসি, মোহাম্মদ নাসিম বা তাঁদের মতো পিতা বা পরিবারের স্বজন হারানোদের আমরা এখন দেখি পাওয়ার গ্লাস চোখে লাগিয়ে। পাওয়ার গ্লাস মানে তারা যেন সারাজীবন গাড়িতে পতাকা উড়িয়ে দাপট দেখিয়ে ঘুরে বেড়াতেই অভ্যস্ত ছিলেন। আমরা ইতিহাসের নীরব দর্শক। আওয়ামী লীগের দুর্দিন আমরা দেখেছি। যতটা সম্ভব শরীকও হয়েছি। এতো বড় রাজনৈতিক দলে সুযোগভোগী মাস্তান সন্ত্রাসীসহ সবাই ভিড় করবে এটাই স্বাভাবিক। আম সাপোর্টার বা সাধারণ ভক্তদের কথা দূরে থাক ত্যাগীদেরও জায়গা নাই আজ। সেখানে ভিড় করে আছে নব্য মোশতাক আর সুযোগ সন্ধানীরা।

অথচ এই দেশ ও দেশের মানুষের মুক্তির জন্য এদের পরিবারের ত্যাগ ধীরে ধীরে যেন ফিঁকে হয়ে আসছে। আমরা ভুলে যাচ্ছি যৌবনের শুরুতে পিতা হারিয়ে এরা নিজদেশে কতটা নিগৃহীত হয়েছিলেন। বাংলাদেশকে পাকিস্তানে পরিণত করার চেষ্টা যখন ব্যর্থ, তখন ষড়যন্ত্রকারীরা নতুন পথ বেছে নিয়েছিল। ছায়া পাকিস্তান বানানোর খেলায় তারা মুছে দিতে চেয়েছিল আওয়ামী লীগ, বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতার নাম নিশানা। যেন এরাই ছিলেন স্বাধীনতা অর্জনের দায়ে অপরাধী। সে সময় আওয়ামী লীগ করা ছিলো বিপজ্জনক! এই বিপদের আভাস পেয়ে বাধ্য হয়ে বা স্বেচ্ছায় দলত্যাগ করেছিলেন প্রচুর বড়-ছোট-মাঝারি নেতা। এমন কি বঙ্গবন্ধুর আত্মীয়সম বা সেভাবে পরিচিত শেখ শহীদও চলে গেলেন এরশাদের বগল তলে। কিন্তু চার নেতার কোনো সন্তান তাদের পিতার রক্তের ওপর পা দিয়ে বেঈমানী করেননি। দল অনেক সময় তাঁদের ওপর সুবিচার না করলেও এই চার পরিবারের নামকরা কোনো পুত্র বা নেতা আওয়ামী লীগ ছেড়ে যাননি। এই যে দল ও রক্তধারার প্রতি আনুগত্য অন্তত সে কারণে আমি নাসিমকে জানাই অভিবাদন।

মোহাম্মদ নাসিম সেই নেতা যিনি সংসদে দাঁড়িয়ে কিছুদিন আগেই বলেছিলেন, এখন দেশে সবাই আওয়ামী লীগ। যেদিকে তাকাই সেদিকে শুধু আওয়ামী লীগ। সাবধান করে দিয়ে বলেছিলেন, আমরা আওয়ামী লীগার কিনা সেটাই হয়তো প্রশ্ন হবে এখন! তিনি সংসদে দাঁড়িয়ে স্পিকারকে সম্বোধন করে দেখিয়ে দিয়েছিলেন ওয়ান ইলেভেনের কোন কুশীলব এখন সাংসদ। মনে করিয়ে দিয়েছিলেন তাঁর মতো অনেকেই আওয়ামী লীগ করার কারণে এদের দ্বারা অত্যাচারিত হয়েছিলেন। নেতার সামনে এমন কথা বলতে যে ব্যক্তিত্ব আর ইমেজ লাগে সেটা নাসিমের ছিলো। মনে আছে কান ধরা সেই টিচার, সংখ্যালঘু টিচার শ্যামল কান্তির কথা। তখন মোহাম্মদ নাসিমই গিয়েছিলেন সেলিম ওসমানকে শাসাতে। ভিডিও দেখলেই বুঝবেন নারায়ণগঞ্জের গড ফাদার কেমন চুপসে ছিলেন তাঁর সামনে।

লেখার শুরুতেই বলেছিলাম তাঁর মৃত্যুর পেছনেও আছে করোনা। আমীর হোসেন আমুর কথাতেই তা স্পষ্ট। তিনি তাঁর মন্তব্যে বলেছেন, ‘করোনাভাইরাসের সঙ্কটেও সে নিজের হাতে ত্রাণ দেওয়া এবং সমস্ত কাজে যুক্ত ছিল বলেই অসুস্থ হয়ে গিয়েছিল। নাসিমের মৃত্যু মেনে নেওয়া আমাদের জন্য খুবই কষ্টকর।’

গত শতকের ষাটের দশকে ছাত্র ইউনিয়নের মাধ্যমে রাজনীতি শুরু করেন তিনি।  ছাত্র আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী নাসিম স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে যুবলীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হন। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর কারাগারে মনসুর আলীকেও হত্যা করা হলে আওয়ামী লীগে সক্রিয় হন নাসিম। তখন কারাগারেও যেতে হয়েছিল তাকে। ২০০৭ সালে জরুরি অবস্থা জারির পরও বন্দি করা হয়েছিল তাকে। ১/১১ এর সময় তাকে গ্রেপ্তার করলে জেলের মধ্যে তার স্ট্রোক হয়। শারীরিক এই অবস্থা নিয়ে সারা বাংলাদেশ সফর করে আওয়ামী লীগকে সংগঠিত করেন। বর্ণিল রাজনৈতিক জীবনে ১৯৮৬ সালে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন নাসিম। তখন সংসদে বিরোধীদলীয় প্রধান হুইপের দায়িত্বও পান তিনি। তখন তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক। শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালে সরকার গঠন করার পর ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান নাসিম। পরের বছর মার্চে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও তাকে দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নাসিম এক সঙ্গে দুই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন ১৯৯৯ সালের ১০ মার্চ পর্যন্ত। পরে তাকে করা হয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। ২০১৪ সালে শেখ হাসিনার সরকারে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ছিলেন তিনি। ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় যাওয়ার পর রাজপথে আন্দোলনে থাকা সদ্য সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নাসিমের উপর পুলিশের নিপীড়ন দেশে আলোচিত ঘটনা হয়ে আছে। তখন পুলিশের লাঠিপেটায় নাসিমের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর আরেক সদস্য মতিয়া চৌধুরীও রাজপথে লুটিয়ে পড়েছিলেন। তাদের সেই রুখে দাঁড়ানোর দৃশ্য পরবর্তী সময়ে আন্দোলনের শক্তি যুগিয়েছে বলে মনে করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।

সব মানুষের জীবনে নেগেটিভ কিছু দিক থাকে। তাঁরও ছিলো। তাঁর সময় মানুষের চাহিদামতো স্বাস্থ্য খাতের উন্নতি হয়নি। আজ যা অসঙ্গতি বা অব্যবস্থা হয়তো তার কিছুটা তখন তৈরি। কিন্তু এটাও মনে রাখা দরকার একজন মানুষ বা নেতা চাইলেও অনেক কিছু পরিবর্তন করতে পারেন না। আমাদের দেশের মতো আরজনৈতিক বাস্তবতায় তা অলীক। এ এক মৌচাকের মতো মাকড়সার জালের মতো ব্যবস্থা। যে ঢুকেছে সেই বেরিয়েছে গায়ে কালো দাগ নিয়ে। এর থেকে কোনো নিস্তার নাই। মোহাম্মদ নাসিম যত বলিষ্ঠ বা বড় নেতা ছিলেন না কেন তাঁর দ্বারাও অনেক কাজ করে যাওয়া সম্ভব হয়নি। কিন্তু তার মানে কি এই যে আমরা তাঁর চলে যাওয়া কামনা করবো?

আজ দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, সামাজিক মিডিয়ায় যে প্রতিক্রিয়া তা ছিলো জঘন্য আর কুৎসিত! একই সময় দু’জন বিশিষ্ট মানুষ করোনা সংক্রান্ত খবরের শিরোনাম। একজন গণস্বাস্থ্যের জাফরুল্লাহ চৌধুরী আরেকজন প্রাক্তন মন্ত্রী নেতা মোহাম্মদ নাসিম। যেহেতু তিনি সরকারী দলের নেতা আরো বিশেষ করে আওয়ামী লীগের; ব্যস শুরু হয়ে গেলো অপবাদ আর মৃত্যু কামনা। কেউ কেউ আগ বাড়িয়ে এ-ও লিখলেন: ‘শিখুন কাকে বলে প্রিয়তা।’ যেন এ দু’জনের একজন দেশের জন্য জান দিয়ে ফেলেছেন আর একজন কিছুই করেননি! আজকের বাংলাদেশে এটাই চরম সত্য। নির্মম বাস্তবতা। দেশের একটা অংশ আজ মুক্তিযুদ্ধ, ইতিহাস এবং স্বাধীনতার স্বপক্ষের মানুষদের নিয়ে এমনই ভাবে। আবার তা প্রকাশ করতেও লজ্জা বা ভয় পায় না।

কিন্তু সময় সবার ওপরে। সময়ের মতো বিচারক দ্বিতীয় নাই। সময়ের বুকে মোহাম্মদ নাসিমের জায়গা তাঁর প্রয়াত পিতা মনসুর আলীর মতোই চির স্মরণীয় হয়ে থাকবে। এটা কেউ মুছে ফেলতে পারবে না, বা কেড়ে নিতে পারবে না। বিদায় মোহাম্মদ নাসিম।

লেখক: সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক

 

ঢাকা/তারা

রাইজিংবিডি.কম

আরো পড়ুন  



সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়