Risingbd Online Bangla News Portal

ঢাকা     সোমবার   ১৪ জুন ২০২১ ||  জ্যৈষ্ঠ ৩১ ১৪২৮ ||  ০২ জিলক্বদ ১৪৪২

দিদি দিদিই, কিন্তু তারপর?

অজয় দাশগুপ্ত || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৬:২৯, ৬ মে ২০২১   আপডেট: ১৬:৪৫, ৬ মে ২০২১
দিদি দিদিই, কিন্তু তারপর?

দিদি আবারো মুখ্যমন্ত্রী পদে শপথ নিয়েছেন। টানা তিনবারের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর আগে ২৩ বছর একটানা মুখ্যমন্ত্রীর পদে আসীন ছিলেন কমিউনিস্ট নেতা জ্যোতি বসু। তবে এবারের মতো ঘটনাবহুল সহিংস বিতর্কিত নির্বাচন আগে দেখেনি ওপার বাংলা!

এখন ডিজিটাল যুগ। দুনিয়া বলতে গেলে হাতের মুঠোয়। সুদূর সিডনি শহরে থেকেও আমি রোজ নির্বাচনের খবর দেখতাম। সরাসরি নির্বাচন, ফল ঘোষণা এবং দেখার অভিজ্ঞতা হয়েছে। তাই গোড়াতেই বলি, ফল যাই হোক তাদের গণতান্ত্রিক আচরণ আর মেনে নেবার সংস্কৃতি মুগ্ধ করার মতো! দিনরাত যুদ্ধ আর নির্বাচনী প্রচারে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি মমতাকে একবিন্দু ছাড় দেননি। খেই হারানো মোদির ‘দিদি’, ‘ও দিদি’ ডাকার যে সার্কাস তাও প্রভাব ফেলেছে এবারের নির্বাচনে।

অন্যদিকে মমতাও কম যাননি। তুই তোকারি থেকে নানা ব্যঙ্গে জমজমাট নির্বাচন, কিন্তু ফল বেরুনোর পরপরই প্রধানমন্ত্রী তাঁর শুভেচ্ছা বার্তা পাঠিয়ে দিয়েছেন। মমতা ব্যানার্জী নিজেও নন্দীগ্রামে তাঁর আপাত পরাজয় মেনে নিয়ে বলেছেন- রায় নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে যাবেন তাঁরা।

প্রথমবার রাজভবনের ময়দানে বিরাট মঞ্চ তৈরি করে বৃহৎ জনসমাগমে হয়েছিল মমতার মুখ্যমন্ত্রীর শপথগ্রহণ। ওই অনুষ্ঠানে তৎকালীন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি চিদাম্বরম উপস্থিত ছিলেন। দ্বিতীয়বার মমতার শপথ হয়েছিল রেড রোডে; দেশের বিজেপিবিরোধী সব নেতাদেরও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। কিন্তু এবার কোভিড সংক্রমণের পরিস্থিতিতে সব পরিকল্পনা বাতিল করতে হয়েছে। প্রথমবারের মতোই এবারও মমতা বিধায়ক না হয়েই মুখ্যমন্ত্রীর শপথ নিচ্ছেন।

২০১১ সালে সরকার ক্ষমতায় এলে ভবানীপুর উপনির্বাচনে জিতে সাংবিধানিক নিয়মরক্ষা করেন মমতা। ২০১৬ সালে অবশ্য সাধারণ নির্বাচনে দাঁড়িয়ে ভবানীপুর থেকে জিতে দ্বিতীয়বারের জন্য বিধায়ক হয়ে মুখ্যমন্ত্রী পদে শপথ নেন তিনি। এবার নন্দীগ্রামে পরাজিত হয়েও তৃতীয়বারের জন্য মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। তবে  উপনির্বাচনে তাকে জয়ী হতে হবে। বিধানসভা নির্বাচনের ফলে দেখা যায়- গতবারের চেয়ে শক্তি বাড়িয়ে ২১৫টি আসন নিয়ে ক্ষমতায় এসেছেন মমতা।

এই যে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান, সেখানেও গণতন্ত্রের নজীর আছে। রাজ্যপাল মানে গর্ভণর ধনকড় গোড়া থেকেই মমতাবিরোধী। তৃণমূলের ব্যাপারে কঠিন রাজ্যপাল প্রায়ই ট্যুইট করে তাঁর রাগ ঝাড়েন। এমনকি নির্বাচনের পরও তিনি তাঁর জায়গা থেকে সরে আসেননি। শপথ গ্রহণের দিন কিন্তু সৌজন্যের ঘাটতি ছিলো না কোথাও। রাজ্যপাল ও মুখ্যমন্ত্রী হাতজোড় করে পরস্পরকে নমস্কার জানানোর পাশাপাশি পুরো শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে ছিলেন আন্তরিক। কিন্তু তার পরপরই দুজন কথা বলেন ভিন্ন ভাষায়। রাজ্যপাল তার রাগ ঝাড়তেও কসুর করেননি। এটুকু আমাদের জন্য এক বিরাট বিষয়। জন্মের পর থেকে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশে ছোটখাটো দু’একটা ছাড়া এমন কোনো উদাহরণ নাই। স্বৈরাচার এরশাদ আমলে দুই নেত্রী দু’একবার একত্রিত বা সৌজন্যবশত মিলিত হলেও কোনো নির্বাচনেই কেউ কাউকে অভিনন্দন জানানো বা স্বাগত জানানোর উদারতা দেখাতে পারেননি। বরং আমরা তখন জানতাম আমাদের দেশের নেতাদের না কি দুই ধরনের পোশাক তৈরি থাকতো। একটি জয়ী হলে গণভবন বা বঙ্গভবনে যাবার, আরেকটি সোজা প্রেসক্লাবমুখী। যেখানে থাকবে অভিযোগ আর কারচুপি বা ষড়যন্ত্রের তালিকা।

মমতার কথায় ফিরে আসি। মমতা ব্যানার্জীকে পছন্দ করার পাশাপাশি তাঁকে অপছন্দ করারও যথেষ্ট কারণ আছে। তিনি সহজ সরল সাদামাটা জীবন যাপন করেন। তাঁর জয়ের পর কালীঘাটের সরু গলি দিয়ে যাওয়া পুলিশ কমিশনারসহ কর্তাদের গাড়ি যাচ্ছিল তাঁর বাড়ির দিকে। দেখলেই বোঝা যায় গাড়িগুলো সহজে যেতে পারছিল না। তখনই মাথায় দুটো বিষয় ঢুকলো আমার। প্রথমত সিকিউরিটি বা নিরাপত্তার বেড়াজালে আবদ্ধ নয় তাঁর জীবন। বাড়িতেই থাকতে পারেন ওপার বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। পরের বিষয়টি আমাদের দেশের নেতাদের, শীর্ষ নেতাদের ঘেরটোপের জীবন। তাঁরা চাইলেও বাড়িতে থাকতে পারেন না। কড়া নিরাপত্তা পাহারায় থাকতে হয়  তাঁদের।

মমতা ব্যানার্জীকে কখনো স্থির হয়ে বসে বা দাঁড়িয়ে কথা বলতে দেখেনি। মনে হতেই পারে তিনি হাইপার একটিভ কোনো মানুষ। মঞ্চে এক কোণ থেকে আরেক কোণে ছুটে ছুটে কথা বলা দিদির মেজাজ চরমে পৌঁছাতে সময় লাগে না। প্রায়শই তাঁর মেজাজ হারানো চোখে পড়ে। কিন্তু তারপরও তাঁকে, তাঁর দলকে এতোটা সমর্থন আর ভালোবাসার কারণ কোথায় ? দু’এক কথায় বলতে গেলে বলবো- ভারতের যে জায়গায় বা রাজ্যে যাই হোক, পশ্চিম বাংলার বুদ্ধিজীবী ও সংস্কৃতি মহল চিরকাল অসাম্প্রদায়িক। তাঁরা শত অপপ্রচার আর নির্যাতনেও পথ হারান না। আজ বাংলাদেশে প্রায় উধাও সেই ধারা। এই মহল এবং সাধারণ বাঙালি বিজেপিকে মেনে নেয়নি। তারা জানে মুসলিম বিরোধিতা আর গুন্ডাতন্ত্রের বিরোধিতা এক বিষয় না। তারা এও জানে বিজেপি মানে আরো বেশি চাপ, আরো বেশি সাম্প্রদায়িকতা। হিন্দুবাদী রাজনীতির লোভ ও প্রলোভন থেকে এবার বেঁচে যাওয়া ওপার বাংলা কিন্তু এক গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দাঁড়িয়ে আছে। মমতা যদি তাঁর ভুল ত্রুটি শোধরানোসহ সন্ত্রাসের রাজনীতি, সংখ্যালঘু তোষণের নামে মৌলবাদ উস্কে দেয়ার রাজনীতি বন্ধ না করেন, তবে আগামীবার কি হবে ভাবার জন্য খুব বেশি মেধার দরকার পড়ে না।

দিদির রাজনীতি যাই হোক, আমাদের সঙ্গে অমীমাংসিত সমস্যা বিশেষ করে সীমান্ত হত্যা বন্ধ ও  নদীর পানি বন্টন যেন আলোর মুখ দেখে। প্রতিবেশী বিশেষত এক ভাষা, এক পোশাক, এক সংস্কৃতির নিকটতম প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন না করলে নিজে একা হবার বিকল্প থাকবে না।

শুরুতে বলছিলাম জ্যোতি বসু ও কমিউনিস্ট পার্টির কথা। ৩০ বছরের বেশি সময় শাসন করা বাম ও কংগ্রেস এবার উধাও! বলা উচিত লুপ্ত হয়ে গেছে তাদের ভবিষ্যৎ। মমতার তৃণমূল যদি সাবধান না হয় সাম্প্রদায়িক রাজনীতির করাল গ্রাসে তার বিলুপ্তির দুর্ভাবনা থেকেই যায়। সেই দুর্ভাবনা আপাতত তুলে রেখে একথা অন্তত বলা যায়- দিদি আবারো প্রমাণ করেছেন দিদি দিদিই। তাঁর কোনো বিকল্প নেই।  

সিডনি, অস্ট্রেলিয়া, ৫ মে, ২১
 

ঢাকা/তারা

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়