Risingbd Online Bangla News Portal

ঢাকা     শনিবার   ২৪ জুলাই ২০২১ ||  শ্রাবণ ৯ ১৪২৮ ||  ১২ জিলহজ ১৪৪২

মালালা কি সত্যিই পশ্চিমাদের দালাল? 

মো. রায়হান কবির || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৫:০০, ৯ জুন ২০২১   আপডেট: ১৫:১২, ৯ জুন ২০২১
মালালা কি সত্যিই পশ্চিমাদের দালাল? 

আজ থেকে ঠিক অর্ধযুগ আগে রেহেমুল হক পাকিস্তানের ‘দ্য হেরাল্ড’ সাময়িকীতে লিখেছিলেন: ‘পাকিস্তানের অনেক মানুষ মনে করে মালালা ইউসুফজাই পশ্চিমাদের দালাল।’

পাকিস্তানে এমনিতেই যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিমাবিরোধী মনোভাব প্রবল। সেই পশ্চিমারা যখন মালালার প্রতি আগ্রহ দেখায় বা তার নারী শিক্ষার প্রতি  আগ্রহ দেখে মুক্তকণ্ঠে প্রশংসায় মেতে ওঠে তখন অনেক পাকিস্তানিই তা মেনে নিতে পারে না। কেননা অনেকে মনে করে মালালা ইসলামবিরোধী বলেই পশ্চিমারা তাকে নিয়ে এতো আহলাদ করে।

আবার অনেকে মনে করে মালালার ওপর আসলে কোনো হামলাই হয়নি, পুরোটাই সাজানো নাটক। মালালা পাকিস্তানে এমন এক চরিত্র যার পিঠের এক দিকে বাহবা, অন্যদিকে মেলে ‘দালাল’ উপাধি। পাকিস্তানের তরুণ প্রজন্ম এ নিয়ে স্পষ্টতই দুই ভাগে বিভক্ত। কেউ মনে করে মালালা আসলেই তরুণদের আদর্শ, আবার কেউ মনে করে মালালা পশ্চিমাদের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী কাজ করে। যার ফলশ্রুতিতে সে নোবেলও বাগিয়ে নিয়েছে। 

মালালা ইউসুফজাই, যিনি মাত্র ১৭ বছর বয়সে সর্বকনিষ্ঠ হিসেবে শান্তিতে নোবেল পেয়েছিলেন, তিনি নিজ দেশেই সবার কাছে সমাদৃত নন। এর পেছনে অবশ্য কারণও আছে। পাকিস্তানের বেশিরভাগ মানুষ রক্ষণশীল। তাদের সামাজিক বিশ্বাস কিংবা প্রথার বিরুদ্ধে কোনো কথা বা মন্তব্য তারা সহজে মেনে নিতে পারে না। সম্প্রতি বিখ্যাত মার্কিন ফ্যাশন মাগাজিন ‘ভোগ’-এর ব্রিটিশ সংস্করণের প্রচ্ছদ তারকা হয়ে ২৩ বছর বয়সি মালালা তার ব্যক্তিজীবন, বিশ্বাস, পড়াশোনা, টুইটার কর্মকাণ্ড এবং অ্যাপলটিভি প্লাসের সঙ্গে তার যুক্ত হওয়া নিয়ে কথা বলেন। এ সময় বিয়ে নিয়ে তিনি খোলামেলা মনোভাব ব্যক্ত করেন, যা অনেকের কাছেই ভালো লাগেনি। বিশেষ করে অধিকাংশ পাকিস্তানিদের কাছে এ ধরনের মন্তব্য হজম করা কঠিন! তার এই মন্তব্য নিয়ে রাজনৈতিক, ধর্মীয় নেতারা পর্যন্ত কথা বলছেন। আসলে কী বলেছিলেন মালালা?

মালালা বলেছেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবাই নিজেদের সম্পর্কের ঘটনা শেয়ার করছেন। এতে অনেকে উদ্বিগ্ন হন। কাউকে বিশ্বাস করা যাবে কি, যাবে না? তাছাড়া কীভাবে নিশ্চিত হওয়া যাবে? আমি একটি বিষয় বুঝতে পারি না- কেন মানুষকে বিয়ে করতে হবে? যদি জীবনে কোনো সঙ্গী চান তাহলে কেন আপনাকে কাগজে স্বাক্ষর করতে হবে? কেন এটি শুধু একটি পার্টনারশিপ হতে পারে না?’ 

পাকিস্তানিদের বা মুসলিমদের জন্য বিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আর মালালা ঠিক এই জায়গাটাতেই আঘাত হেনেছেন। যদিও অনেক মুসলিম তাকে সমর্থন করছেন। কিন্তু মালালার এই মন্তব্য পাকিস্তানে এক হিসেবে ‘শব্দবোমা’ হিসেবেই পতিত হয়েছে। যারা ধর্মীয় ভাবধারায় বিশ্বাসী তাদের কাছে মালালা কোনো কালেই ভালো ছিলেন না। আর পাকিস্তানে পশ্চিমাবিরোধী সেন্টিমেন্ট তো আছেই। সবাই ধরেই নেয়, মালালা পশ্চিমাদের খুশি করতেই ইসলামের এমন এক গুরুত্বপূর্ণ প্রথায় আঘাত হেনেছেন। কেননা মালালার মন্তব্য পশ্চিমাদের বিশ্বাসকেই সমর্থন করে। ইউরোপ-আমেরিকায় বিয়ে নিয়ে এতো মাতামাতি নেই। তারা লিভ টুগেদার বা লিভ ইন রিলেশনে বিশ্বাসী। বিয়ের মতো প্রথা ধর্মীয় ভাবাবেগে বিশ্বাসী এশিয়দের মধ্যেই গুরুত্ব বহন করে। পশ্চিমা সংস্কৃতি যারা মানতে পারেন না, তারা মালালার এই মন্তব্য স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যাখ্যান করেছেন। আর যারা উদারপন্থী, তাদের কথা- মালালা ঠিকই বলেছে। আর কতকাল বিয়ের মতো শৃঙ্খল মানুষকে আবদ্ধ রাখবে? মানুষ কেন জোর করে তার জীবনসঙ্গীর সাথে থাকবে? কেন শত অসুবিধা মেনে শুধু সামাজিক লোকলজ্জার ভয়ে একজন ঘৃণিত ব্যক্তির সঙ্গে জীবন কাটাতে হবে; তাও একই ছাদের নিচে? 

যারা মনে করেন, বিয়ে মানুষের ব্যক্তি স্বাধীনতা খর্ব করে, তারা মালালার এই মতবাদকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। অন্যদিকে যারা মনে করেন, বিয়ে সামাজিক সভ্যতা বজায় রাখে, মানুষের অবাধ বিচরণ নিয়ন্ত্রণ করে, তাদের কাছে মালালার এই মন্তব্য অনেক বেশি কষ্টদায়ক। কেননা মালালা একজন নারী এবং মুসলিম। মুসলিমরা মনে করেন, বিয়ে নারীকে সম্মানিত করে, দেয় সুরক্ষা এবং পরিচয়। 

বিয়ে নিয়ে নানা মানুষের নানা মত থাকতেই পারে। কিন্তু পাকিস্তানের তুলনামূলক সুবিধাবঞ্চিত এলাকার মানুষ হিসেবে মালালার এ মন্তব্য পাকিস্তানিরা ঠিক গ্রহণ করতে পারেনি। রক্ষণশীল পরিবারের মেয়ে হিসেবে বিয়েকেই সমর্থন করা উচিত এটা অধিকাংশ মানুষই মনে করেন। 

তবে মালালার মন্তব্য শুধু পাকিস্তানেই আটকে থাকেনি। ভারত এবং বাংলাদেশেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এর প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে। এর কারণ হলো এই অঞ্চলগুলোতে মুসলিমদের বসবাস অনেক। আর মালালা যেহেতু মুসলিম ঘরানার সেহেতু তার যে কোনো মন্তব্য অনেক বেশি সংবেদনশীল। আবার অন্যভাবে চিন্তা করলে এর একটি সাইকোলজিক্যাল ব্যাখ্যাও আছে। বলিউড নায়িকা সানা খান যেখানে রুপালি জগতের চাকচিক্য বিদায় জানিয়ে একজন মুফতিকে বিয়ে করে সংসার করছেন, সেখানে পাকিস্তানের সোয়াত উপত্যকার মেয়ে মালালার এমন মন্তব্য অনেকের কাছেই বিস্ময় হিসেবে আসবে এটাই স্বাভাবিক। তবে এটা ভুললে চলবে না, তালেবান হামলার পর মালালা আর পাকিস্তানের গণ্ডিতে আটকে নেই।  পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত মালালা পশ্চিমা সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হয়ে যেতেই পারেন। কিন্তু রক্ষণশীলরা কেন তা মেনে নেবেন? ঘোমটা আবৃত একটি মেয়ে মাথা নিচু করে ‘কবুল’ বলে বিয়ে করে চলে যাবে অচেনা-অজানা কোনো পুরুষের ঘরনি হয়ে এই দৃশ্যই যে মুসলিম সমাজের চিরচেনা রূপ। সেখানে মালালাদের স্থান কোথায়?

লেখক: ফ্রিল্যান্স রাইটার

ঢাকা/তারা

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়