Risingbd Online Bangla News Portal

ঢাকা     বৃহস্পতিবার   ০৯ ডিসেম্বর ২০২১ ||  অগ্রহায়ণ ২৫ ১৪২৮ ||  ০৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৩

বাজলো তোমার আলোর বেণু

অজয় দাশগুপ্ত || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১২:১৮, ৬ অক্টোবর ২০২১   আপডেট: ১২:১৯, ৬ অক্টোবর ২০২১
বাজলো তোমার আলোর বেণু

আমার মতো সন্দেহপ্রবণ মানুষদের জন্য শাস্ত্র রহস্যময়। ঈশ্বরের কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের জন্য প্রস্তুত ভক্ত ব্যতীত সবার জন্য এটা কঠিন। কিন্তু কিছু নিয়ম, কিছু ঘটনা, কিছু দিন, কিছু কিছু বিষয় আছে যা শাস্ত্র বা নিয়মের ঊর্ধ্বে উঠে পরিণত হয় আনন্দ-বেদনার কাব্যে।

বাঙালির জীবনে বিশেষত বাঙালি হিন্দুর জীবনে মহালয়ার দিনটি এমনই এক দিন। আমার বিশ্বাস এবং প্রতীতি সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে থাকা হিন্দুধর্মের গান-বাদ্য-পাঠ এসব মিলেই তৈরি হয়েছে এমন মায়াময় জগৎ। মহালয়ার আদি ইতিহাস খুঁজলে তাকে যতোটা পাওয়া যাবে তারচেয়ে বেশি পাবো পিতৃপুরুষ, মাতৃকূলের হারিয়ে যাওয়া মানুষ, এমনকি অজানা অচেনা আত্মা আহ্বান করে নিয়ে আসার উদারতায়। সামান্য মানুষ আমরা। অথচ মহালয়ার তর্পণে ডাক পাঠাই সেই সব জীবাত্মাদের যাদের না কেউ আছেন না ছিলেন। এই স্পর্ধা বা উদারতার জন্য আমি মহালয়াকে সম্মান করি।

শাস্ত্র বলছে: দুর্গোৎসবের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। এক- মহালয়া, দুই- বোধন, তিন- সন্ধিপূজা। মহালয়া তিথিটিকে বলা হয়েছে দুর্গোৎসবের প্রস্তুতিপর্ব। হিন্দুধর্মে যে কোনো শুভ কাজে যেমন বিয়ে উপনয়ন ইত্যাদিতে কাজের আগে নান্দীমুখ শ্রাদ্ধ করতে হয়, তেমন মাতৃ আরাধনার আগে পূর্বপুরুষদের স্মরণ করে তিলজল নিবেদন করতে হয়। এর মূলে রয়েছে বিশ্বাস— কেউ মারা গেলেও তাঁর আত্মার মৃত্যু হয় না। আত্মার বিনাশ বা ক্ষয় নেই। পিতৃপুরুষের আত্মার তৃপ্তি সাধনের জন্য মহালয়ার তর্পণ-শ্রাদ্ধ। তর্পণ-শ্রাদ্ধ শেষ করেই দেবী পক্ষের দিকে এগিয়ে যাওয়া। মহালয়া হলো পিতৃপক্ষের শেষ ও দেবীপক্ষের শুরুর সন্ধিক্ষণ। বলা যায় মহালয়া দেবীপক্ষের শুরু।

এই মহালয়ার তর্পণের ইতিহাসও বেশ কৌতূহল জাগানীয়া। মহাভারত অনুযায়ী, কর্ণের মৃত্যু হলে তাঁর আত্মা স্বর্গে গমন করছিল। সেখানে তাঁকে সোনা ও রত্ন খাদ্য হিসেবে দেওয়া হয়। কর্ণ ইন্দ্রকে এর কারণ জিজ্ঞাসা করলে ইন্দ্র বলেন, ‘তুমি সারা জীবন সোনা দান করেছ। পিতৃগণের উদ্দেশ্যে কোনো খাদ্য প্রদান করোনি। তাই স্বর্গেও তোমাকে সোনা খেতে দেওয়া হয়েছে।’ 

তখন কর্ণ বলেন, ‘আমি পিতৃগণের সম্পর্কে জানতাম না। তাই ইচ্ছা করেই তাঁদের খাদ্য প্রদান করিনি।’ এই কথা শুনে বিষয়টির সত্যতা অনুধাবন করে কর্ণকে ১৬ দিনের জন্য ফের মর্ত্যে যাওয়ার অনুমতি দেন ইন্দ্র। তারপরই কর্ণ সেখানে গিয়ে পিতৃলোকের উদ্দেশ্যে অন্ন ও জল প্রদান করেন। এই ১৬ দিনকেই পিতৃপক্ষ বলা হয়। অনেকে আবার বলেন, ইন্দ্র নয়, যম কর্ণকে মর্ত্যে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছিলেন।

কারণ যাই হোক এই অনুষ্ঠানে আছে ধর্ম ও মানবতার মিশ্রণ। কিন্তু শুধু তর্পণে সীমাবদ্ধ থাকলে মহালয়া বাঙালি হিন্দুর মনের বাইরে পা ফেলতে পারতো না। মহালয়ার ডাইমেনশান সংজ্ঞা বদলে দিয়ে গেছেন কয়েকজন মানুষ। মূলত বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। এই মানুষটির উদাত্ত কণ্ঠ আর ভক্তিরসে বিগলিত ধারাবর্ণনা বা চণ্ডীপাঠে জেগে ওঠা মহালয়ার ভোর মানেই এক অনিন্দ্যসুন্দর সকাল। এই পরিণত বয়সে চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পাই— সকালের আলো তখনো ফোটেনি। আবছা অন্ধকারে মা জেগে উঠে ঘর মুছে পরিষ্কার করে স্নান সেরে এসেছেন। বাবাও উঠে গেছেন ঘুম থেকে। ঘরের দুয়ারগুলোতে মাটির প্রদীপ জ্বলছে। সব মিলিয়ে কেমন এক শান্ত সমাহিত সুন্দর আবহ। আর ইথারে ভেসে আসছে সেই মায়াবী কণ্ঠ, আশ্বিনের শারদ প্রাতে.... কী আশ্চর্য সে বাণী, সে সুরে বারান্দার সঙ্গে লাগোয়া শিউলি ফুলের গাছ থেকে ঝরে পড়তো অসংখ্য ফুল। মনে হতো ফুলে ফুলে রচিত হয়েছে এক মায়াপথ। যেন দেবীর আগমনের তোরণ। 

এই মহালয়া আজ ইতিহাস। আজ তা আমাদের সকলের কাছে সহজে পৌঁছে যাচ্ছে। একসময় তা ছিল কঠিন। আকাশবাণীতে ১৯৩১ সাল থেকে এই অনুষ্ঠান প্রচারের শুরু। গোড়াতে সেখানকার নাক উঁচু পণ্ডিত হিন্দুরা বাধ সেধেছিল এই বলে, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র যেহেতু ব্রাহ্মণ নন চণ্ডীপাঠে তাঁর অধিকার নাই। সে বাধা ধোপে টিকল না। এবার শুরু হলো অপপ্রচার। অত ভোরে কে শোনে এই ধরনের পাগলামি? দেবী দুর্গাকে ভোর চারটায় জাগানোর কোনো মানে নাই। কিন্তু মহালয়ার সমন্বয়ক লেখক বাণী কুমার, তখনকার নামজাদা সুরকার স্বনামধন্য পঙ্কজ কুমার মল্লিক নাছোড়বান্দা। তাঁরা এই অনুষ্ঠান করবেনই। শুরুর দিকে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রকে গাড়িতে করে নিয়ে যাওয়া হতো। পরে এমন হয়ে গেল তিনি আকাশবাণীর ষ্টুডিও ছেড়ে আসতেন না। ভোরের আগেই স্নান সেরে ধুতি পাঞ্জাবি পরিধান করে তৈরি হয়ে যেতেন। এই মহালয়ার রেকডিং-এর বেলায়ও যথেষ্ট বাধা দেয়া হয়েছে। যারা বামুন না হলে চণ্ডীপাঠ করতে দিতে নারাজ তাঁরা মানবেন মুসলিম সেতার বাদক বা যন্ত্রশিল্পীদের? সে নিয়েও হয়েছিল গণ্ডগোল। কিন্তু সব বাধার বিরুদ্ধে দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন অধিকর্তা গায়ক পঙ্কজ কুমার মল্লিক, সঙ্গে বাণী বাবু আর বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র।
সব বাধা পেরিয়ে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ নামে মহালয়া যখন বাংলার ঘরে  ঘরে বাঙালির মনে মনে তখনই এসেছিল আরেক আঘাত। সে আঘাত কৌশল আর পরিকল্পনায় এতোটাই নিঁখুত ছিল যে একবার তা প্রতিষ্ঠা পেলে আজ এই লেখারও দরকার পড়তো না। হয়তো মহালয়ার পুণ্যময় করে তোলা ভোরবেলাটি হারিয়ে যেতো, নয়তো নিতে পারতো বিকৃত কোনো রূপ। ঘটনাটিতে জড়িয়ে আছেন বাংলার বহু কৃতী মানুষ। তাঁদের নিয়ে আসা হয়েছিল। তাঁদের মাধ্যমে মূল মহালয়া ও বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রকে অপমান করার চক্রান্ত ব্যর্থ করে দিয়েছিলেন শ্রোতা ভক্ত আর আপামর বাঙালি। ইতিহাস বলছে: 

১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দে সরকার মহলের চাপে আকাশবাণী মহিষাসুরমর্দিনীর পরিবর্তে ধ্যানেশ নারায়ণ চক্রবর্তী রচিত দেবীং দুর্গতিহারিণীম্ নামে একটি ভিন্ন অনুষ্ঠান মহালয়ার দিন একই সময়ে সম্প্রচার করে। যেখানে অনুষ্ঠানে শ্লোকপাঠ করেন মহানায়ক উত্তমকুমার, সংগীত পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। অনুষ্ঠানে মান্না দে, লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলে, আরতি মুখোপাধ্যায়, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় প্রমুখ বিখ্যাত সংগীত শিল্পীদের দিয়ে গান গাওয়ানো হয়। কিন্তু বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠস্বর এবং মহিষাসুরমর্দিনীর অনুষ্ঠানের বিপুল জনপ্রিয়তার কারণে সনাতন বাঙালি নতুন অনুষ্ঠানটিকে মেনে নেননি। অনুষ্ঠান শেষ হতেই বিশাল জনতা আকাশবাণীর সামনে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করে। তৎকালীন আকাশবাণীর একজন জনপ্রিয় উপস্থাপক মিহির বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘দেবী দুর্গতিহারিণীম্’ অনুষ্ঠানটি সম্প্রচারের মধ্যপথেই টেলিফোনে শ্রোতাদের অবর্ণনীয় গালিগালাজ আসতে শুরু করে অকথ্য ভাষায়। অনুষ্ঠান শেষ হতে না হতেই আকাশবাণী ভবনের সামনে সমবেত হয় বিশাল জনতা। ফটকে নিয়োজিত প্রহরীরা সামাল দিতে হিমশিম খেয়ে যান। ফটকের গেট ভেঙে ঢুকে পড়তে চায় উত্তাল মানুষের দল।’

এই জনরোষ সামলাতে না পেরে এবং জনগণের দাবিতে আকাশবাণী সেই বছরই দুর্গাষষ্ঠীর দিন পুনরায় বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে অনুষ্ঠিত পূর্বের মহিষাসুরমর্দিনী সম্প্রচার করে এবং ১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে আজ পর্যন্ত নির্ধারিত সময়েই মহিষাসুরমর্দিনী সম্প্রচারিত হয়ে আসছে। 

এই কাহিনি মনে করিয়ে দেয় ষড়যন্ত্র যেমন যুগে যুগে সচল, ঈর্ষা যেমন সক্রিয়, তেমনি সবল প্রতিরোধও। তখন উত্তম কুমার মানে এক আকাশের নাম। সঙ্গে হেমন্ত, মান্না দে, লতাজী, আশাজী, আরতির মতো গায়ক গায়িকা। কিন্তু মানুষের মন যে মৌলিক। সে জানে কোনটা আসল কোনটা মেকী। তারা বুঝতে পারেন কোনটা টিকবে আর কোনটা সাময়িক। সে কারণেই টিকে গেছে আসল মহালয়া। 

প্রতি বছর পদ্মশ্রী বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে শারদপ্রাতে ভেসে আসে দুর্গার মুখ। কানে কানে মনে বাজে—বাজলো তোমার আলোর বেণু ...। 

জয়তু মহালয়া

সিডনি, অস্ট্রেলিয়া
 

ঢাকা/তারা

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়