ঢাকা     বুধবার   ১৮ মে ২০২২ ||  জ্যৈষ্ঠ ৪ ১৪২৯ ||  ১৬ শাওয়াল ১৪৪৩

শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ কোনো সমাধান নয়

নিজামুল হক বিপুল || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৯:২৬, ২৫ জানুয়ারি ২০২২   আপডেট: ১৯:২৯, ২৫ জানুয়ারি ২০২২
শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ কোনো সমাধান নয়

এই মুহূর্তে টক অব দি কান্ট্রি হচ্ছে কোভিড-১৯ এর নব্য সংস্করণ অমিক্রন। অমিক্রন ঠেকাতে ইতোমধ্যে সরকার বিধিনিষেধ আরোপ করেছে দুই দফায়। অফিস আদালতেও জনবল অর্ধেক করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। 

প্রথম দফায় ১১টি বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে, দ্বিতীয় দফায় ছয়টি। যেখানে স্পষ্টভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দুই সপ্তাহের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু খোলা রয়েছে বাণিজ্য মেলার মতো বড় আয়োজন। সেখানে হাজার হাজার মানুষ একই চত্বরে ঘুরপাক খাচ্ছে। গণপরিবহন ব্যবস্থা চলছে আগের মতোই। দেশের অন্যতম পর্যটন স্পট কক্সবাজার, সাগরকন্যা কুয়াকাটা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের সাজেক, বান্দরবানসহ অধিকাংশ পর্যটন স্পটে পর্যটকদের উপস্থিতিও চোখে পড়ার মতো। সব মিলিয়ে একটা ডাবল স্ট্যান্ডার্ড অবস্থা!

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বারবার বলছেন, অমিক্রন এবং ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্তের সংখ্যা ধাপে ধাপে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। এ বিষয়ে কিছুটা হলেও চিন্তিত, আতঙ্কিত। হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। আগে যেখানে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টে এক মাসে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ২৯ শতাংশ। সেখানে গত ২০ দিনে অমিক্রনে আক্রান্তের সংখ্যা ৩২ শতাংশের উপরে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী এভাবে যদি লাফিয়ে লাফিয়ে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ে তাহলে এক দেড় মাসের মাথায় হাসপাতালে জায়গা দেওয়া যাবে না। তখন চিকিৎসা দেওয়া কষ্টসাধ্য হয়ে পড়বে। তার এই বক্তব্য থেকে এটা স্পষ্ট যে, সামনে কঠিন সময় অপেক্ষা করছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে কোভিডের যে তৃতীয় ঢেউ এসেছে সেটি ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে বা মার্চের শুরুর দিকে চূড়ায় উঠবে। তাই যদি হয় তাহলে আমাদের সামনে সত্যিই কঠিন সময় অপেক্ষা করছে। ঠিক এই অবস্থায় সরকারের পক্ষ থেকে দেশবাসীর প্রতি বারবার অনুরোধ করা হচ্ছে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার। অন্যথায় আইনানুগ শাস্তির কথাও বলা হচ্ছে। কিন্তু বাণিজ্য মেলার মতো একটি বড় মেলা রাজধানীর পাশে মাসব্যাপী চললেও এটি বন্ধ তো দূরের কথা, এ নিয়ে তেমন নির্দেশনা নেই। শুধু বারবার বলা হচ্ছে মাস্ক পরে ও টিকা সনদ দেখিয়ে মেলায় প্রবেশ করতে হবে। কিন্তু সত্যিই কি লোকজন টিকা সনদ দেখিয়ে এবং শতভাগ মাস্ক পরিধান করে মেলায় ঢুকছেন? এটি এখন কোটি টাকা মূল্যের প্রশ্ন?

এই প্রশ্ন আরো বড় হয়ে দেখা দিয়েছে অমর একুশে গ্রন্থমেলা আপাতত দুই সপ্তাহ পিছিয়ে দেয়ায়। শুধু তাই নয়, দেশজুড়ে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন হতেও আমরা দেখছি। এ বিষয়ে আলাদা করে কোনো বিধিনিষেধ চোখে পড়ছে না। এমনকি গণপরিবহন যেমন, যাত্রীবাহী বাস, লঞ্চ, ট্রেনে অর্ধেক যাত্রী নিয়ে চলার কথা, সেখানে পরিবহন মালিকদের চাপে সরকার বিধিনিষেধ আরোপের অবস্থান থেকে সরে এসেছে। ফলে গণপরিবহন শতভাগ যাত্রী নিয়েই শুধু চলছে না, বরং সক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী বহন করছে। শুধু ট্রেনে অর্ধেক আসন শূন্য রেখে যাত্রী পরিবহন করা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে কেউ যদি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকেই ‘যত দোষ নন্দ ঘোষ’ মনে করেন তাহলে তাকে দোষ দেওয়া যায় না।

কোভিড-১৯ অতিমারির কারণে ২০২০ সালের মার্চ থেকে সারাদেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া হয়। সেই থেকেই আমাদের শিক্ষা কার্যক্রম ধুঁকে ধুঁকে চলছে। ২০২০ সালের শেষ দিকে এসে ওই বছরের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের অটো পাস করিয়ে দেয়া হয়। আর ২০২১ সালে এসে এই তো সেদিন এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের সিলেবাস সংক্ষিপ্ত করে তিন বিষয়ে পরীক্ষা নেয়া হয়। একেবারে থেমে থাকার চেয়ে বা অটো পাসের চেয়ে আপাতদৃষ্টিতে এটি সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভালো উদ্যোগ। কিন্তু এতে করে কি আমাদের শিক্ষার্থীদের শতভাগ শিক্ষা কার্যক্রম পূরণ করা সম্ভব হয়েছে?

কোভিড-১৯ এর চোখ রাঙানি কিছুটা নিম্নমুখী হওয়ায় ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে এসে সরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়। কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি স্বাভাবিক সময়ের মতো হয়নি। অভিভাবকরা ধীরে ধীরে সাহস সঞ্চয় করে সন্তানকে বিদ্যালয়ে পাঠাতে শুরু করেছিলেন। ঠিক তখনই পুনরায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের ঘোষণা এলো। এতে বিদ্যালয় খুলে দিয়ে যে স্বাভাবিক শিক্ষাকার্যক্রম শুরু হওয়ার একটা প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল সেই ধারাবাহিকতায় হঠাৎ করে ছেদ পড়ল।

শুধু শিক্ষা কার্যক্রমের ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়েছে এমন নয়। বরং কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মনেও একটা বড় ধাক্কা দিয়েছে। বিদ্যালয় বন্ধ হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষার্থীরা গত দুই বছর বাসায় বসে থেকে অনিশ্চিত, অস্থির সময় পার করছে। এর প্রভাব পড়ছে মানসিক স্বাস্থ্যে। বাসায় বসে শুধু নেট দুনিয়া, মোবাইল চালানো আর গেইম-এর মধ্যে ডুবে আছে কোমলমতি শিশুরা। বইয়ের সঙ্গে তাদের দূরত্ব দিনে দিনে বাড়ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শৈশব-কৈশোরের যে সোনালি সময় তা থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছে। 

বিশ্বে কোভিডের চোখ রাঙানি চলছে। এর মধ্যেই ইউরোপ, আমেরিকাসহ এশিয়া তথা দক্ষিণ এশিয়ার বহু দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা আছে। শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে যাচ্ছে। তাহলে আমরা কেন বিদ্যালয় খোলা রাখতে পারছি না? যদিও শিক্ষামন্ত্রী বলে আসছিলেন, শিক্ষার্থীদের টিকা দেওয়া হচ্ছে। আমরা চেষ্টা করবো বিদ্যালয় বন্ধ না করতে। ইতোমধ্যে এক কোটিরও বেশি শিক্ষার্থীর এক ডোজ টিকা নেয়া হয়ে গেছে। তাহলে কেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিতে হলো? এখানে কি আসলে আমাদের ব্যবস্থাপনায় সংকট নাকি দূরদর্শিতার অভাব?

এসব বিষয় নিয়ে সামগ্রিকভাবে এবং বৃহৎ পরিসরে ভাবনার কোনো বিকল্প নেই। কোন উপায় এই কোভিড-কালেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা রাখা, শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়মুখী করা, শিক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত রাখা যায় সরকারের নীতিনির্ধারকদের ভাবতে হবে। সব কিছু খোলা রেখে, স্বাভাবিক রেখে শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া কোনো সমাধান নয়। বরং এটি বড় সংকট হয়েই সামনের দিনগুলোতে হাজির হবে।

লেখক: সাংবাদিক
 

/তারা/ 

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়