ঢাকা     মঙ্গলবার   ২১ মে ২০২৪ ||  জ্যৈষ্ঠ ৭ ১৪৩১

হাওর এবং হাওরের কৃষক উভয়কেই বাঁচাতে হবে 

নিজামুল হক বিপুল || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১২:২০, ২২ এপ্রিল ২০২২   আপডেট: ১২:২৫, ২২ এপ্রিল ২০২২
হাওর এবং হাওরের কৃষক উভয়কেই বাঁচাতে হবে 

কৃষকের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে হাওরের বাতাস। যে সোনালি ফসল ঘরে তোলার প্রহর গুণছিলেন হাওরাঞ্চলের কৃষক, স্বপ্ন দেখছিলেন উৎসবের, সেই ফসল তলিয়ে গেছে। ফলে কৃষকের স্বপ্ন এবং আগামী এক বছরের খোরাকিরও সলিল সমাধি ঘটেছে।

তীরে এসে তরী ডুবে যাওয়ায় হাওরের কৃষক, যারা এই বোরো ফসলের উপর নির্ভরশীল তাদের চোখে এখন রাজ্যের অন্ধকার। মহাজনের ঋণের বোঝা, সন্তানের পড়ালেখার খরচ, বছরজুড়ে সংসারের খরচ, চিকিৎসা খরচ বহন করা নিয়ে তারা এখন চরম দুশ্চিন্তায়। অনেকেই অপেক্ষায় থাকেন ধান ওঠার পর সেই ফসল বিক্রি করে নানাবিধ প্রয়োজন মেটাবেন। বড় বড় স্বপ্ন বা দায়িত্ব এর সঙ্গে জড়িত। যেমন বিবাহযোগ্য সন্তানের বিয়ে দেওয়া। তাদের সেই অপেক্ষা আরও দীর্ঘায়িত হলো।

কিন্তু কেন বারবার দরিদ্র কৃষকের স্বপ্নই ভেঙে যায়? এর জন্য কি শুধু প্রকৃতিই দায়ী? মানবসৃষ্ট দুর্যোগ, ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ কাজে দুর্নীতি, অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক স্বেচ্ছাচারিতা, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় প্রশাসনের গাফিলতি কি দায়ী নয়?

সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের কৃষক ফসল তলিয়ে যাওয়ার জন্য সরাসরি দায়ী করছেন বাঁধ নির্মাণ ও মেরামত কাজের অনিয়ম, দুর্নীতিকে। স্থানীয় প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের দুর্বল তদারকি এবং গাফিলতিকে। কৃষকের অভিযোগের তীর স্থানীয় রাজনৈতিক নের্তৃত্বের বিরুদ্ধেও। কারণ বাঁধ নির্মাণ ও মেরামত কাজের জন্য যেসব প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) গঠন করা হয়েছে তাতে স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করা হয়েছে। যাদের বিরুদ্ধে বাঁধ নির্মাণ ও মেরামত কাজে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।   

কৃষকের এই অভিযোগের সত্যতা পওয়া যায় সরকারের মন্ত্রী, এমপিদের কথায়ও। কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক গত সপ্তাহে সুনামগঞ্জের দিরাই ও শাল্লা উপজেলায় ক্ষতিগ্রস্ত ফসল দেখতে গিয়ে বলেছেন, ‘হাওরের বাঁধগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামত কাজ আশানুরূপ হয়নি।’ বাঁধ নির্মাণে পিআইসি’র অনিয়ম, দুর্নীতির কথা তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে বলবেন বলেও জানিয়েছেন। 

সুনামগঞ্জ, সিলেট, হবিগঞ্জসহ হাওরাঞ্চলের ফসল রক্ষার জন্য সরকার প্রতি বছর শত শত কোটি টাকা বরাদ্দ দেয় হাওরের ভেতরে প্রবাহিত বিভিন্ন নদ-নদী এবং নদীগুলোর শাখা-প্রশাখা, খালের বাঁধ নির্মাণ ও মেরামত কাজের জন্য। কিন্তু সরকারের এই বরাদ্দ প্রতি বছরই জলে যায় অনিয়ম, দুর্নীতির কারণে। আগে পানি উন্নয়ন বোর্ড নিজেরাই এসব বাঁধ নির্মাণ ও মেরামত কাজ করাত। কিন্তু তাতে কৃষকের ফসল রক্ষা করা যেত না। পাহাড়ি ঢল আর আগাম বন্যায় বাঁধ ভেসে গিয়ে দিগন্তজোড়া বিস্তীর্ণ ফসলি মাঠ তলিয়ে যেত। কারণ বাঁধগুলো নির্মাণ ও মেরামত করা হতো দুর্বলভাবে। আবার কাজগুলোও সময়মত শেষ হতো না। এ নিয়ে গণমাধ্যমে বারবার সংবাদ হলে হাওরে বাঁধ মেরামত ও নির্মাণ কাজে সরকার কিছুটা পরিবর্তন আনে।

যেসব এলাকায় বাঁধ নির্মাণ ও মেরামত কাজ হয় সেগুলো যেন যথাযথভাবে হয় সেজন্য সংশ্লিষ্ট এলাকার কৃষককে সম্পৃক্ত করে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায়ও গলদ দেখা দিয়েছে। প্রকৃত কৃষকের বদলে স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা পিআইসি’র দখল নেওয়ায় দুর্নীতি, অনিয়ম ঠেকানো যায়নি। যার প্রতিফলন ঘটেছে গত কয়েক দিনে বাঁধ ভেঙে হাওরের বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ তলিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে।

সীমান্তের ওপারের আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরায় ভারী বর্ষণ বিশেষ করে চেরাপুঞ্জিতে মাত্রাতিরিক্ত বৃষ্টিপাত হওয়ায় উজানের ঢল নেমে আসে সুনামগঞ্জের হাওরে। ফলে কিছু বুঝে ওঠার আগেই দুর্বল বাঁধ ভেঙে তলিয়ে যায় কৃষকের লালিত স্বপ্ন।

সাধারণত এপ্রিলের শেষ দিকে পাহাড়ি ঢল এবং আগাম বন্যা দেখা দেয় সিলেট অঞ্চলে। কিন্তু এবার এপ্রিলের শুরুতেই ঢল এবং আগাম বন্যা দেখা দেওয়ায় পূর্ব প্রস্তুতিও নেওয়া যায়নি। চেরাপুঞ্জিতে বছরে বৃষ্টিপাত হয় গড়ে পাঁচ হাজার মিলিমিটার। কিন্তু এবার এপ্রিল মাসে ১৭ তারিখ পর্যন্ত এক হাজার ২০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে চেরাপুঞ্জি ও তৎসংলগ্ন এলাকায়। সেই বৃষ্টির পানিই নেমে এসেছে সুনামগঞ্জের হাওরে। আর তাতেই তলিয়ে গেছে হাজার হাজার হেক্টর জমির আধা পাকা ফসল। আর মাত্র কয়েকটা দিন সময় পেলে এই ফসল হাওরের কৃষকের ঘর উৎসবে ভাসিয়ে দিতো। কিন্তু এবার ঘটনা ঘটেছে উল্টো। আনন্দের বদলে কৃষককে অতল কান্নায় ভাসিয়ে দিয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং কৃষি বিভাগ বলছে, সুনামগঞ্জের ১৭টি হাওর ও বিলের পাঁচ হাজার ৫১০ হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে। অপরদিকে হবিগঞ্জের হাওরে তলিয়েছে প্রায় ৫০০ হেক্টর জমির ফসল। অবশ্য সুনামগঞ্জ বা হবিগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দেওয়া এ তথ্য মানতে নারাজ ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। তাদের দাবি, সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার চাপতির হাওরে বাঁধ ভেঙে ফসল তলিয়ে গেছে চার হাজার ৮০০ হেক্টর জমির। আর হুরামন্দিরা হাওরের বাঁধ ভেঙে আরও ৩০০ হেক্টর জমির ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। এছাড়া  তাহিরপুর উপজেলার গুরমার বর্ধিতাংশের বাঁধ ভেঙে ধর্মপাশা ও তাহিরপুরের বিস্তীর্ণ জমির আধাপাকা ধান ডুবে গেছে। যার মধ্য দিয়ে কৃষকের সারা বছরের স্বপ্নের সলির সমাধি ঘটেছে।

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দাবি, হাওর থেকে গরুকে খাওয়ানোর জন্য কিছু ধান ছাড়া আর কোন ধানই কাটা যায়নি। বেশিরভাগ ধান কাঁচা ছিল। তারা বলছেন, কৃষি সম্পসারণ বিভাগের হিসাব মনগড়া। সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কনুনা সিন্ধু চৌধুরী গণমাধ্যমে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, শুধু তাহিরপুর উপজেলাতেই তলিয়ে গেছে দুই থেকে আড়াই হাজার হেক্টর জমির ফসল। অথচ কৃষি বিভাগ বলছে মাত্র ৩০০ হেক্টরের কথা। তার মতে, ‘ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে হবে। তাহলে সরকারের পরবর্তী কার্যক্রম বা কৃষকের পাশে দাঁড়ানোটা সহজ হবে।

হাওরাঞ্চলের একজন মানুষ হিসেবে আমারও মনে হয়, ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে সরকারি দপ্তরগুলোর এসব লুকোচুরি বন্ধ করা উচিত। এটা ফসল হারানো নিঃস্ব কৃষকের সঙ্গে তামাশা ছাড়া আর কিছুই নয়।

এই যে ফি-বছর আগাম বন্যা আর পাহাড়ি ঢলে হাওরের ফসল তলিয়ে যায় এ থেকে মুক্তির একটা স্থায়ী সমাধান হওয়া দরকার। প্রথমত, হাওরের ফসল তলিয়ে যাওয়ার প্রধান কারণগুলোকে চিহ্নিত করা জরুরি। দ্বিতীয়ত, কারণগুলো চিহ্নিত করে সেগুলোকে ধরে ধরে স্থায়ী সমাধানের পথ বের করতে হবে। করতে হবে দীর্ঘমেয়াদি স্থায়ী পরিকল্পনা। তৃতীয়ত, ফসল তলিয়ে যাওয়ার পর ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে হবে। না হলে দরিদ্র কৃষক যাদের ঘাম-শ্রমে খাদ্যে স্বয়ং সম্পূর্ণতার কৃতিত্ব সরকারের ঘরে আসে সেই কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সে ভবিষ্যতে ধান উৎপাদনে উৎসাহ হারিয়ে ফেলবে।

মোটা দাগে হাওরের যেসব সমস্যা রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- প্রতি বছর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে হাজার হাজার টন পলি মাটি এসে হাওরের তলদেশ ভরাট করে দিচ্ছে। হাওরাঞ্চলে যেসব নদী-নালা, খাল রয়েছে সেগুলোর তলদেশও ভরাট হয়ে যাচ্ছে। যার ফলে আগাম বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে মুহূর্তেই ফসল তলিয়ে যায়। অথচ হাওর ও হাওরের ভিতরের নদ-নদী, নালা-খাল খননের কোনো উদ্যোগ দেখা যায় না। শুধু কাগজপত্রে নানান উদ্যোগের কথা, প্রকল্পের কথা শোনা যায়। যা দৃশ্যমান না। এই বিষয়ে দ্রুত উদ্যোগ নিতে হবে।

হাওরে যে প্রতি বছর বাঁধ নির্মাণ ও মেরামত করা হয় সেগুলো সঠিকভাবে হয় না। তার উপর আবার দুর্নীতি-অনিয়ম তো আছেই। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বাঁধ নির্মাণ করা হয় নদ-নদীর একেবারে তীর ঘেঁষে। এতে করে পানি আসার সঙ্গে সঙ্গে সহজেই বাঁধ ধসে যায়। জনগণের টাকায় এমন অপচয় কাজ বন্ধ করতে হবে। আরেকটা সমস্যা হচ্ছে বাঁধ যে পরিমাণ উঁচু করা দরকার সেই পরিমাণ উঁচু করা হয় না। যেহেতু নদ-নদীর তলদেশ পলিতে ভরাট হয়ে গেছে সে কারণে সেগুলো খনন না হওয়া পর্যন্ত বাঁধ উঁচু করার কোনো বিকল্প নেই। হাওরের মধ্যে কোনো রকম সড়ক, সেতু, কালভার্ট বা অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ করা যাবে না। যে কারণে হাওরের পানি প্রবাহ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ দিকে সরকারের নীতি নির্ধারকদের গভীর মনোযোগ দিতে হবে।

অবশ্য গত সোমবার (১৮ এপ্রিল) মন্ত্রিসভা বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী হাওরে রাস্তাঘাট নির্মাণ না করার নির্দেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি এমন নির্দেশনাও দিয়েছেন যে, এখন থেকে হাওরে কোনো সড়ক নির্মাণ করতে হলে সেটা উড়াল পথ করতে হবে। আমি মনে করি, এটি আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত। কারণ যখনই উড়াল সড়ক নির্মাণ করা হবে তখন হাওরের বুকে অসংখ্য পিলার বসানো হবে। যেগুলো হাওরের চরিত্রকে নষ্ট করবে। উজান থেকে নেমে আসা পলি মাটি সেসব পিলারে আটকা পরে হাওরের বুকে চর তৈরি করবে। তাই এই বিষয়টি নিয়ে আরও গভীরভাবে ভাবা উচিত। এটা ভুলে গেলে চলবে না- হাওর হচ্ছে শস্য ভাণ্ডার ও  মিঠা পানির মাছের আঁধার।

শেষ করতে চাই হাওরের একটা প্রবাদ দিয়ে। জন্মের পর থেকে শুনে আসছি- হেমন্তে নাও আর বর্ষায় পাও। এটিই হচ্ছে হাওরের প্রাধান বাহন। এটিই হাওরের সৌন্দর্য্য। প্রকৃতির উপর ছুরি চালিয়ে হাওরের নিজস্ব চরিত্র ধ্বংস করার অর্থ হচ্ছে প্রকৃতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা। শান্ত-স্নিগ্ধ পরিবেশকে হুমকির দিকে ঠেলে দেওয়া। তাই সবিনয় বলতে চাই, হাওরের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগ নিন। দয়া করে হাওরকে তার নিজের মতো থাকতে দিন।

লেখক: সাংবাদিক
 

/তারা/ 

আরো পড়ুন  



সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়