ঢাকা     বুধবার   ২৯ জুন ২০২২ ||  আষাঢ় ১৫ ১৪২৯ ||  ২৮ জিলক্বদ ১৪৪৩

ফিনল্যান্ড ও সুইডেনকে নিয়েও এখন রাশিয়াকে ভাবতে হচ্ছে 

অলোক আচার্য || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৩:০৮, ২৩ মে ২০২২  
ফিনল্যান্ড ও সুইডেনকে নিয়েও এখন রাশিয়াকে ভাবতে হচ্ছে 

বিশ্ব গত কয়েক দশকের চেয়ে অনেক বেশি উত্তপ্ত। করোনা মহামারির পর যেখানে পরিস্থিতি শান্ত থাকা প্রয়োজন ছিল এখন সেখানে যেন আরও ক্ষোভ-উত্তাপ! যেখানে পৃথিবীর একত্রিত হওয়া দরকার ছিল সেখানে বিভক্তির ছায়া।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ চলছে। এ নিয়ে বিশ্বজুড়ে উত্তেজনা। বহু বছর ধরেই নিজেকে সুরক্ষিত করতে ব্যস্ত তুলনামূলক ছোট দেশগুলো। সুরক্ষিত হতে গিয়ে বিভিন্ন জোটে অন্তর্ভুক্তিসহ নানা কৌশলে হাঁটছে তারা। কারণ আধিপত্যবাদের ছায়া ঘিরে রেখেছে পৃথিবীকে। এটি যেমন প্রতিটি দেশে সামাজিক শৃঙ্খলা বাধাগ্রস্ত করে, তেমনি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও আধিপত্যবাদ বিস্তার করে। আজকের বিশ্বে এটি নতুন কোনো ধারণা নয়। আধিপত্যবাদ নির্ভর করে প্রকৃতপক্ষে ক্ষমতার ওপর। আর ক্ষমতা বলতে বোঝায় আর্থিক সামর্থ্য, রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, প্রযুক্তির ক্রমাগত উন্নয়ন এবং আধুনিকায়ন যা অন্য দেশের থেকে এগিয়ে থাকে এবং উন্নত অবকাঠামোর সমন্বয়। 

বিশেষত ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পাল্টে গেছে অনেক দেশের নিরাপত্তার হিসাব নিকাশ। প্রত্যেকেই যার যার মতো করে নিজের সুরক্ষায় ব্যস্ত। এ ক্ষেত্রে কোনো দেশই পিছিয়ে থাকতে চাইছে না। প্রয়োজনে মিত্রদেশের সঙ্গে জোটভুক্ত হয়েও নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে চাইছে তারা। আর এ কারণেই যে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে জড়িয়েছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার ইঙ্গিত মিলেছে। রাশিয়ার যুদ্ধ ইউক্রেনের সঙ্গে হলেও মূলত রাশিয়াকে পশ্চিমা দেশগুলোর চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে হচ্ছে। অন্যদিকে বিভিন্ন দেশের সহায়তায় রাশিয়ার সঙ্গে লড়ছে ইউক্রেন। এর মধ্যেই স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দুটি দেশ ফিনল্যান্ড এবং সুইডেনের ন্যাটোতে জোটে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দেশ দুটি নিজেদের অবস্থান নিরপেক্ষ রেখেছিল। তারা কোনো সামরিক জোটে যোগ দেয়নি। ফিনল্যান্ডও একসময় ভারসাম্যের নীতি অনুসরণ করে চলতো। যুদ্ধ শুরুর পর ক্রমেই ন্যাটোতে যোগ দেওয়ার বিষয়ে ফিনল্যান্ডের মনোভাব বদলাতে শুরু করে। সে দেশের সাধারণ মানুষের ভেতর ন্যাটোতে যোগ দেওয়ার আগ্রহ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফিনল্যান্ডের সঙ্গে রাশিয়ার ১ হাজার ৩০০ কিলোমিটারের দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে ইউক্রেনকে থামাতে যে পন্থা অবলম্বন করলো রাশিয়া, ফিনল্যান্ড এবং সুইডেনের ক্ষেত্রে এ রকম ঘটবে কিনা? তাহলে এই চলমান যুদ্ধ আরও ছড়িয়ে পড়বে, এমনকি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধও লেগে যেতে পারে। 

এ দিকে ফিনল্যান্ডের এমন ঘোষণার পরপরই রুশ বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান, বিদ্যুতের পাওনা মূল্য পরিশোধ করেনি এমন অভিযোগে ফিনল্যান্ডে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে। দেশটিতে গ্যাস সরবরাহও বন্ধ করেছে বলে জানা গেছে। যদিও দুই দেশের বাণিজ্য ইতিহাসে প্রথমবার এ রকম ঘটলো। ন্যাটো জোট গঠিত হয় ১৯৪৯ সালে। এটি একটি সামরিক সহযোগিতার জোট। এর সদস্য দেশ ৩০টি। সর্বশেষ ২০২০ সালে উত্তর মেসিডোনিয়া ন্যাটোতে যোগ দেয়। শুরুতে মাত্র ১২টি দেশ নিয়ে ন্যাটো গঠিত হয়। যদি ফিনল্যান্ড এবং সুইডেন ন্যাটো জোটভুক্ত হয় তাহলে এর সদস্য সংখ্যা হবে ৩২। ন্যাটো জোটভুক্ত দেশগুলোর পারস্পরিক সামরিক সহযোগিতা প্রদানে অঙ্গীকারবদ্ধ।

স্মরণ করা যেতে পারে স্নায়ুযুদ্ধের সময় সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের হুমকি এড়াতে জোটটি গঠন করা হয়। তখন থেকেই সেই জোটে প্রতিবেশী দেশগুলোর যোগ দেওয়া নিয়ে রাশিয়ার আপত্তি রয়েছে। আর তারই পরিনাম রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণ। এই যুদ্ধ পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে। যদিও রয়টার্সের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, সুইডেন ও ফিনল্যান্ডের এই সিদ্ধান্তে একমত হতে পারেনি ন্যাটোর সদস্য দেশ তুরস্ক। নিয়ম অনুযায়ী, কোনো দেশকে ন্যাটোর সদস্য করতে হলে সদস্য দেশগুলোর সমর্থন প্রয়োজন। সংবাদ থেকে আরও জানা যায়, ন্যাটোর মহাসচিব ইয়েন্স স্তোলতেনবার্গ বলেছেন, ন্যাটো জোটে ফিনল্যান্ডকে উষ্ণতার সঙ্গে স্বাগত জানানো হবে। ফিনল্যান্ডকে দ্রুত ও মৃসণ যোগদান প্রক্রিয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। কিন্তু তুরস্ক বিরোধীতা করলে ফিনল্যান্ডের জন্য ন্যাটোর সদস্যপদ পেতে ঝামেলা হতে পারে। তবে পরিস্থিতি বদলাতে সময় লাগে না। কারণ ওদিকে ফিনল্যান্ড, সুইডেন ন্যাটোতে যোগ দিতে চাইলে জার্মানি তাদের সমর্থন করবে এমন আভাস পাওয়া গেছে। অর্থাৎ বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যেই প্রতিক্রিয়া জানাতে শুরু করেছে। 

এ দিকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের তীব্রতা বৈশ্বিক খাদ্য সংকট তীব্র করছে। যার ফল প্রায় সব দেশই কম-বেশি ভোগ করছে। যুদ্ধের দুই মাস পরে পৃথিবী যে সংকটের আভাস পাচ্ছে, যুদ্ধ যদি আরও দীর্ঘায়িত হয় তাহলে এই সংকট কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে বা খাদ্য সংকট কি ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনবে তা পৃথিবীবাসী কিছুটা অনুমান করতে পারছে। সুতরাং যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে। অথচ এই পরিস্থিতিতে ফিনল্যান্ডের ন্যাটোতে যোগ দেওয়া নিয়ে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। এখানে স্পষ্ট হবে শক্তির বিভক্তি বলয়। বলয়ের একদিকে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রশক্তি এবং অন্যদিকে রয়েছে রাশিয়া-চীন। এই যুদ্ধে বিশ্বে নতুন মেরুকরণ শুরু হয়েছে যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্যের বিষয়টি প্রবলভাবে ধাক্কা খাচ্ছে। আধিপত্যবাদের সূত্র বহু বছর ধরেই বদলে গেছে। পরাশক্তিগুলো আগের চেয়ে বেশি সতর্ক। সুতরাং ফিনল্যান্ড এবং সুইডেন ন্যাটোভুক্ত হলে নিজেদের সুরক্ষা এবং নিরাপত্তাজনিত বিষয়গুলো নিয়ে রাশিয়া আরো বেশি সতর্ক হবে। এবং এ ঘটনা তারা গভীর পর্যবেক্ষণ রাখবে। সুতরাং শুধু ইউক্রেন নয়, রাশিয়াকে এখন ফিনল্যান্ড ও সুইডেনকে নিয়েও নতুন করে ভাবতে হবে। 

লেখক: শিক্ষক ও মুক্তগদ্য লেখক
 

/তারা/ 

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়