ঢাকা     রোববার   ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ||  মাঘ ২২ ১৪২৯

বিশ্বকাপ যার যার উৎসব আমাদের

নাজমুল হক তপন || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৬:৪১, ১৫ নভেম্বর ২০২২   আপডেট: ১৬:৫৯, ১৫ নভেম্বর ২০২২
বিশ্বকাপ যার যার উৎসব আমাদের

ফুটবলে বিশ্বকাপ শিরোপা জেতা তো অনেক দূরের ব্যাপার, শুধু বিশ্বকাপে অংশ নেয়ার জন্যই আমাদের আরও কত যুগ অপেক্ষা করতে হবে সেটিই বড় প্রশ্ন। খেলতে না পারার ঘাটতি আমরা পুষিয়ে দেই ভক্তি দিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে। ক্ষেত্র বিশেষে খোদ ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার মানুষের চেয়েও এই দুই দেশটির সমর্থনে আমরা এক কাঠি সরেস। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পতাকা বানিয়ে গিনেস বুকে আমরা নাম লেখাই। বিশ্বকাপ আসরে অচেনা হুন্ডুরাসের প্রতি ভালোবাসায়, বাংলাদেশে গড়ে ওঠে হন্ডুরাস সমর্থক গোষ্ঠী। আর তাই বিশ্বকাপ ঘিরে এই ভালোবাসার দাবি নিয়ে আমরাও বলতে পারি, যোগ্যতায় হার মানিতে পারি কিন্তু ভক্তিতে কে হারাইবে? বিশ্বকাপ তোমাদেরই থাক কিন্তু উৎসবের চ্যাম্পিয়ন যে আমরাই।

১৯৯০ এর বিশ্বকাপ। ওই সময় গ্রামে ছিলাম। গ্রামে টিভি মাত্র একটি। ক্লাবের উদ্যোগে গ্রামবাসীদের চাঁদা নিয়ে কেনা হয়েছিল এই সাদা-কালো ২৪ ইঞ্চি ন্যাশনাল টিভি। বলাবাহুল্য ব্যাটারিচালিত। দিয়েগো ম্যারাডোনা মানে আর্জেন্টিনার খেলার দিন হাজারো মানুষের খেলা দেখার দাবি। এই দাবি মেটাতে, স্কুলের মাঠে অনেক উঁচুতে টিভি রাখা হলো। মাঠে মাটিতে বসে ম্যারাডোনার খেলা দেখছে হাজারো মানুষ। ম্যারাডোনার পায়ে বল যাওয়া মানেই উল্লাসে মাতোয়ারা দর্শককুল। হাততালি দিচ্ছে! চিৎকার করছে! 

ওই সময়ত ম্যারাডোনা ক্রেজ কোন পর্যায়ে পৌঁছেছিল, তার একটা দৃষ্টান্ত দিচ্ছি। ঘটনাটা শুনেছিলাম এক বড় ভাইয়ের কাছে। এক বয়স্কা মহিলা শুধু ম্যারাডোনার খেলা দেখেন। মানে আর্জেন্টিনার খেলা। একদিন খেলা দেখার একটা পর্যায়ে ওই বয়স্কা গ্রামীণ মহিলা বলে উঠলেন, খেলার সময় টেলিভিশনে সব কথাই হয় ইংরাজিতে। খালি, ম্যারাডোনা নামটাই বাংলা। আমাদের দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষও ম্যারাডোনাকে নিজের ছাড়া ভাবতে পারেনি। বিশ্বকাপ ফুটবল ঘিরে আমাদের উন্মদনা নিয়ে লিখতে গেলে হয়ত সোস্যাল সায়েন্সের বিশ্বসেরা গবেষকও কোনো কুলকিনারা করতে পারবেন না। দু’চারটা   নমুনা স্মরণ করছি। 

১৯৯০ বিশ্বকাপের ফাইনালে ম্যারাডোনার দলকে হারিয়ে শিরোপা জিতল পশ্চিম জার্মানি। ম্যাচের শেষ দিকে বিতর্কিত পেনাল্টি পেল জার্মানরা। আর ওই পেনাল্টির গোলেই নিষ্পত্তি হলো শিরোপার। ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন মেক্সিকান রেফারি কোডেসাল। দেশজুড়ে শুরু হলো কোডেসালের মুন্ডুপাত। পাল্লা দিয়ে চলল ‘কোডেসালের ফাঁসি চাই’ শ্লোগানে মিছিল। বাংলাদেশের জাতীয় ভিলেনে পরিণত হলেন মি. কোডেসাল। 

গত চার দশক ধরে বাংলাদেশে রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় নাম শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া। দুই নেত্রীর রাজনৈতিক দলের বৈরিতা নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। এই বৈরিতা অনেকটা যেন ফোরাত-দজলার প্রবহমান পানির মতো। একই মোহনাতেও নিজস্ব আলাদা বৈশিষ্ট্য ধরে রাখবে। কেবল বিশ্বকাপ ফুটবলই পারে দুই নেত্রীকে এক কাতারে আনতে। একাধিক সাক্ষাৎকারে খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা দুজনই বলেছেন, তারা ব্রাজিলের সমর্থক। 

বিশ্বকাপ মানেই টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া দুভাগে ভাগ হয়ে যাওয়া। ১৯৯৪ এর বিশ্বকাপে ভার্সিটিতে মেয়েরা হয়ে গেল তিন ভাগ। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনার  পাশাপাশি মেয়েদের একটা বড় অংশ হয়ে উঠল ইতালির সমর্থক। পাওলো মালদিনি, রবার্তো ব্যাজিওরা হয়ে উঠলেন ভার্সিটিপড়ুয়া মেয়েদের চোখের মণি। মেয়েদের হলে শোভিত হলো তাদের পোস্টার। কারণ হিসাবে জানা গেল, ইতালিয়ানরা সুদর্শন। আর স্টাইল, ব্যক্তিত্বে মালদিনি, ব্যাজিওরা অন্যদের চেয়ে স্বতন্ত্র। 

বিশ্বকাপ ফুটবল মানেই প্রিয় দলের পতাকা ওড়ানো। আর এই পতাকা দিয়ে গোটা বিশ্বের কেন্দ্রে মাগুরার কৃষক আমজাদ হোসেন। জার্মানির প্রবল সমর্থক তিনি। প্রায় ৩ মাইল ব্যাপি জার্মানির দীর্ঘ পতাকা তৈরি করে আলোচিত হন। এজন্য জায়গা-জমিও বিক্রি করেছেন আমজাদ হোসেন। বিশ্বের সবচেয়ে বড় পতাকা তৈরি করার স্বীকৃতিও পেয়েছেন তিনি। তার নাম উঠেছে গিনেস বুকে। এসএ টিভির একটা প্রোগ্রামে আমন্ত্রিত হয়ে এসেছিলেন আমজাদ হোসেন। ওই অনুষ্ঠানে ছিলেন ঢাকাস্থ জার্মান রাষ্ট্রদূত। আমন্ত্রিত সাংবাদিকদের মধ্যে থাকার সৌভাগ্য হয়েছিল আমারও। কেন এত বড় পতাকা তৈরি করলেন এমন প্রশ্নের জবাবে আমজাদ হোসেন যা বলেছিলেন তার সারমর্ম হলো: একসময় তিনি দুরারোগ্য ব্যধিতে ভুগছিলেন। বহু চিকিৎসা করেও ফল পাননি। শেষ পর্যন্ত জার্মান হোমিওপ্যাথি ওষুধ খেয়ে তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন। এ থেকেই তার জার্মানপ্রীতি। আর তাছাড়া জার্মানদের খেলাও তার ভালো লাগে। দুইয়ে মিলে জীবনের সর্বস্ব দিয়ে প্রিয় দলের জন্য তার এই পতাকা মিশন। 

ফুটবলের প্রতি বাংলাদেশের মানুষের ভালোবাসা খুব হালকাভাবে দেখার সুযোগও কিন্তু নেই। ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা সমর্থকগোষ্ঠীর ঝগড়া, তর্ক-বিতর্ক, মারামারি শুধু কি এটুকুর মধ্যেই এই ভালোবাসা সীমাবদ্ধ? উত্তরটা অবশ্যই না।  ১৯৯৮ এর বিশ^কাপের কথা স্মরণ করা যাক। একই গ্রুপে পড়েছিল ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। ওই সময় যুক্তরাষ্ট্র আর ইরানের সম্পর্ক উঠেছিল চরমে। ইরানের উপর বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল মার্কিনিরা। খেলার গুণ-মানের দিক থেকে এই ম্যাচটির সেই অর্থে তেমন গুরুত্ব ছিল না। কিন্তু এই ম্যাচটি দেখার জন্য ভার্সিটির হলের টিভিগুলোর সামনে ছিল উপচে পড়া ভিড়। ম্যাচে যুক্তরাষ্ট্রকে ২-১ গোলে হারায় ইরান। ম্যাচ শেষে মিছিল বের হয় ক্যাম্পাসে। দুর্বলের প্রতি সবলের অন্যায়-অবিচারের প্রতিবাদে ফেটে পড়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। 

২০১৪ বিশ্বকাপের মূল পর্বে জায়গা করে নেয় হন্ডুরাস। বোধকরি বিশ্বকাপের সবেচেয়ে অনালোচিত দল ছিল তারা। এই অচেনা দলটিকেই আলোচনায় নিয়ে এলো বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীরা। গড়ে উঠল হন্ডুরাস ফ্যান ক্লাব। সোশ্যাল  মিডিয়ায় সরব হয়ে উঠলেন হন্ডুরাস ভক্তরা। আন্তর্জাতিক মিডিয়ার নজরেও ব্যাপারটি এলো। সুদূর হন্ডুরাস থেকে জানানো হলো কৃতজ্ঞতা। প্রমাণিত হলো, আমাদের ফুটবল প্রেম বহুমাত্রিক। 

ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা বাড়াবাড়ি রকমের সমর্থন নিয়ে দু’চারটি কথা না বললেই নয়। ব্রাজিল ভক্তের উদ্দেশ্যে আর্জেন্টাইন সমর্থকদের ভাষ্য, ব্রাজিল, এক নম্বরের ফাজিল। জবাবে কম যায় না ব্রাজিলপ্রেমীরাও। ২০১০ বিশ^কাপ। লিওনেল মেসিদের কোচ ম্যারাডোনা। ব্রাজিল সমর্থকদের ভাষ্য, এক দল গু (হি-গু-য়াইন, আ-গু-য়েরো, রদ্রি-গু- য়েজ, গু-তিয়েরেজ ) নিয়ে বিশ্বকাপে এসেছে ম্যারাডোনা। খালি দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।  

ভোরের আলো সবে ফুটেছে। পত্রিকায় আর্জেন্টিনার ম্যাচ রিপোর্ট লিখে বাসায় ফিরছি। আর্জেন্টিনার সমর্থকদের একটা মটর বাইক শোভাযাত্রার সামনে পড়লাম। তাদের অনেক শ্লোগানের মধ্যে একটা ছিল, ‘তোমার আমার ঠিকানা আর্জেন্টিনা আর্জেন্টিনা।’

একটা সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার বেশিরভাগ ছাত্র থাকত এফ রহমান হলে। ১৯৯৮ বিশ্বকাপের সময় এক অভিনব ঘটনা ঘটল। হলের টিভি রুমে, এক সুদৃশ্য বক্ষবন্ধনী এঁকে তার পাশে বড় করে ‘জিল’ লেখা। ওই বিশ্বকাপে আলোচনার কেন্দ্রে ছিলেন ব্রাজিলের রোনালদো। তার প্রেমিকার নাম ছিল সুজানা। সুজানা আবার জার্মান।  ভার্সিটিতে অনেক কারণেই আলোচিত মাসুদ রানা। সম্ভবত সমাজকল্যাণ বিভাগের ছাত্র। সুজানাকে নিয়ে গান লিখল মাসুদ রানা- সুজানা সুজানা, তুমি কেন বুঝলা না। 
আমাদের বড় উৎসবগুলোর অন্যতম বিশ্বকাপ। এবারও এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে বিশ্বকাপের উত্তাপ। ব্রাজিলের জার্সিও রঙে বাড়ি বানানোর খবর এসেছে মিডিয়াতে। ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার সমর্থকদের প্রস্তুতি চলছে সরবে। অতি উৎসাহী সমর্থকদের বাড়াবাড়ি হানাহানিতে না-গড়ায় থাকছে সেই আশঙ্কাও। ভালোবাসার স্রোতে আমরা আগের মতোই ভাসব। শেষপর্যন্ত উৎসবের মেজাজ ধরে রাখতে পারব কি না সেটাই এখন বড় কথা!

/তারা/ 

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়