ঢাকা     সোমবার   ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ||  আশ্বিন ১০ ১৪৩০

উত্তপ্ত হচ্ছে বাংলাদেশ, অবহেলায় মহাবিপদ

মনজুরুল আলম মুকুল || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১০:৪৫, ৫ জুন ২০২৩   আপডেট: ১১:১৬, ৫ জুন ২০২৩
উত্তপ্ত হচ্ছে বাংলাদেশ, অবহেলায় মহাবিপদ

প্রবাদে আছে যেমন কর্ম তেমন ফল। মানুষ যেমন কাজ করবে, তেমন ফল পাবে। শাস্ত্র অনুসারে কর্মফল একজন শুধু নিজে নয় পরের জন্মের মানুষও ভোগ করে। শাস্ত্রের এই কথা বিশ্বাস করুন আর নাই করুন, প্রকৃতি কাউকে দয়া বা ক্ষমা করে না। প্রকৃতিতে যা করা হবে, তাই সে একদিন ফিরিয়ে দেবে, একটু কমও নয়, আবার একটু বেশিও নয়। অনুপার্জিত সম্পদ ও সামান্য কিছু প্রাপ্তির নীতি, টেন্ডারবাজি, স্বজনপ্রীতি, দায়সারা নীতি কেবল মানুষরাই মেনে নেই, প্রকৃতি কোন দিন মানে না। আর আঘাতটা যখন সরাসরি প্রকৃতির উপর আসে, সেক্ষেত্রে সে যে কত নিষ্ঠুর ও নির্মম হতে পারে সেটা এখন বিশ্ববাসী হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করা শুরু করছে।

অতি আধুনিকতা ও উন্নয়নের নামে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের পরিমাণ বাড়িয়ে ওজোনস্তরের ক্ষয়, নির্বিচারে বৃক্ষনিধন, বনভূমি উজাড়, প্রাকৃতিক সম্পদের অপব্যবহার, শিল্প-কলকারখানার বর্জ্য, গাড়ির বিষাক্ত ধোঁয়া, অপরিকল্পিত শিল্পায়ন ও নগরায়ণ, রাস্তাঘাট ও ব্রিজ-কালভাট নির্মাণ এবং খাল, নদী ও জলাভূমি ভরাট, কি না হচ্ছে প্রকৃতির উপর।

তাপমাত্রা এমন একটি বিষয়, এক জায়গায় বাড়লে সব জায়গায় বাড়ে। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে বিশ্বজুড়ে উষ্ণতা বেড়ে চলছে। বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশেও। তীব্র তাপপ্রবাহে পুড়ছে দেশের গ্রাম, শহর, প্রতিটি জনপদ। প্রচণ্ড গরমে পিচের রাস্তা ও রেলের পাত নরম হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

জাতিসংঘের জলবায়ুবিষয়ক সংস্থা ওয়ার্ল্ড মেটিওরোজিক্যাল অর্গানাইজেশন (ডব্লিউএমও) সতর্ক করেছে, আগামী পাঁচ বছরে (২০২৩-২০২৭) বিশ্বের গড় তাপমাত্রা এক দশমিক আট ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে এবং মেরু অঞ্চলের তাপমাত্রা তিন গুণ বাড়তে পারে। ২০০০ সালের পর থেকে প্রতি বছর তাপমাত্রা চরমভাবে বৃদ্ধি অব্যাহত আছে। প্রতি বছর দক্ষিণ এশিয়ার ১ কোটি ৭০ লাখ মানুষ নতুন করে অতিরিক্ত তাপের সংস্পর্শে আসছে। ৪৬/৪৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস এখন ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের নিয়মিত তাপমাত্রা। ২০২২/২৩ সালে ভারতের তাপমাত্রা গত ১২২ বছরের মধ্যে সর্বাধিক। তাপপ্রবাহজনিত কারণে ভারতে মৃত্যুর ঘটনা বেড়েই চলছে। পাকিস্তানের বিভিন্ন এলাকাও তাপে পুড়ে ছারখার হওয়া শুরু করেছে। তাপপ্রবাহের কারণে ভারত ও পাকিস্তানে খাদ্যশস্য, দুধ, ডিমসহ অন্যান্য উৎপাদন ব্যাপক হারে কমা শুরু করেছে। উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণে পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ প্রতিদিন খাদ্য অনিশ্চয়তার শিকার হচ্ছে।

বাংলাদেশে ক্রমশ প্রখর থেকে প্রখরতর হচ্ছে প্রতিটি গ্রীষ্ম। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের অনেক অঞ্চলে তাপমাত্রার নতুন নতুন রেকর্ড তৈরি হচ্ছে। আবহাওয়া দপ্তরের তথ্যমতে, চলতি বছরের (২০২৩ সাল) ১৫ এপ্রিল ৫৮ বছরের মধ্যে সবচেয়ে উত্তপ্ত ছিল রাজধানী ঢাকা। যেদিন ঢাকার তাপমাত্রা ওঠে ৪০ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে, যা ১৯৬৫ সালের পর সর্বোচ্চ। একই দিনে চুয়াডাঙ্গায় দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৪২ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ১৭ এপ্রিল পাবনার ঈশ্বরদীতে তাপমাত্রা ওঠে ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। একই দিনে রাজশাহী জেলায় ৯ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ওঠে ৪২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। এপ্রিল মাস জুড়ে স্বাভাবিকের চেয়ে তাপমাত্রা ছিল ২ ডিগ্রি বেশি।

তাপপ্রবাহ রীতিমতো বাংলাদেশে আপদ (হ্যাজার্ড) থেকে দুর্যোগে রূপ নিচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০০ থেকে বাংলাদেশে গ্রীষ্মকালের তাপমাত্রা বেড়েই চলছে। এই হারে বাড়তে থাকলে ২০৫০ সাল নাগাদ গ্রীষ্মকালে দেশের সার্বিক গড় তাপমাত্রা ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস হতে পারে, যা চরম পরিস্থিতি বলে ধরা হয়।

এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাংলাদেশের তাপমাত্রা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সময় এবং এলাকাভিত্তিক পার্থক্য রয়েছে। সবচেয়ে বেশি গরম বেড়েছে চুয়াডাঙ্গা, যশোর ও ঝিনাইদহে। রাজশাহী বিভাগের রাজশাহী, পাবনা ও নওগাঁর তাপমাত্রা অন্য জেলাগুলোর তুলনায় বেশি। দেশের মধ্যাঞ্চলের জেলাগুলোর মধ্যে ঢাকার তাপমাত্রা সবচেয়ে বেশি।

আবহাওয়াবিদদের মতে, বিশেষ ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে রাজশাহী, চুয়াডাঙ্গা ও যশোর অঞ্চলে মৌসুমি বায়ু দেরিতে পৌঁছায়। ফলে বৃষ্টি কম হয়। অন্যদিকে বর্ষার আগে গ্রীষ্মকালের বৃষ্টি হয় মূলত স্থানীয় উৎসের জলীয় বাষ্প থেকে। ওই অঞ্চলে নদী-নালা ও জলাভূমি কম থাকায় জলীয় বাষ্প কম তৈরি হয় এবং বৃষ্টিও কম হয়। ফলে তাপমাত্রা বেশি থাকার প্রবণতা থাকে।

প্রচণ্ড গরমে ঢাকা শহর যেন গনগন করছে, এর অন্যতম কারণ হচ্ছে কংক্রিটের আধিক্য। তাপশোষণকারী কংক্রিট যেমন উত্তাপ বাড়ায়, তেমনি তাপমাত্রাও বেশি সময় ধরে রাখে। ফলে শীতকালেও তাপমাত্রা খুব বেশি কমছে না। তারপর শিল্প-কলকারখানা, অফিস আদালত, শপিংমল, যানবাহন ও এসি তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে।

এক জরিপে দেখা গেছে, ১৯৯২ সালে ঢাকার উত্তর অংশে গাছপালায় আচ্ছাদিত এলাকার পরিমাণ ছিল ৯২.২১ বর্গ কিলোমিটার, ২০২২ সালে তার পরিমাণ ৬৬ শতাংশ কমে এসে দাঁড়িয়েছে ৩১.৪০ বর্গ কিলোমিটার।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বস্তিবাসীরা। নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে বস্তির ঘরবাড়ি তৈরি যা পর্যাপ্ত তাপ নিরোধক নয়, বাতাস চলাচলের তেমন সুযোগও থাকে না। গরমে সেগুলো চুলার মতো হয়ে যায়। যেসব শ্রমিক তাদের কর্মস্থলে বা নির্মাণাধীন ভবনে কিংবা যারা রাস্তার ধারে প্লাস্টিকের তাবু ও ঝুপড়ি ঘরে বাস করে, তাদেরকেও ভয়াবহতার মধ্যে দিন পার করতে হচ্ছে।

তীব্র তাপপ্রবাহ দেশের স্বাস্থ্য, জীবনযাত্রা, কৃষি ও উৎপাদন ব্যবস্থার উপরে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। অতিরিক্ত গরমে এ বছর অনেক এলাকার বোরো ধান চিটা হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মতে বোরো ধানের জন্য ৩৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচের তাপমাত্রা প্রয়োজন। সার্বক্ষণিক সেচের পানি দিতে গিয়ে এ বছর কৃষকদের বোরো ধান উৎপাদনে বাড়তি খরচ করতে হয়েছে। চরম তাপের কারণে ঢাকা শহরের বার্ষিক উৎপাদনের প্রায় ৮ শতাংশ কমছে।

সম্প্রতি নেচার পত্রিকার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাপমাত্রা বাড়ার সাথে সাথে আর্দ্রতা বাড়ে আর আর্দ্রতা যত বাড়ে, তত বেশি ঘাম হয়, শরীর থেকে পানি বেরিয়ে যায়। সে কারণে ক্লান্তি এবং তৎসংশ্লিষ্ট সমস্যা তৈরি হয়। অতি উষ্ণ তাপের মধ্যে কেউ যদি টানা ছয় ঘণ্টা থাকে, তাহলে তাঁর শরীরের ভেতরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ যেমন কিডনি, ফুসফুস ও যকৃতের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি হতে পারে। এমনকি হিটস্ট্রোকে মৃত্যুর ঝুঁকিও রয়েছে। এক্ষেত্রে বয়স্ক, শিশু, গর্ভবতী নারী এবং শারীরিকভাবে অসুস্থরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছে।

জলবায়ুর এই পরিবর্তন মূলত মানবসৃষ্ট বৈশ্বিক সমস্যা। কে বা কারা অধিক কার্বন নিঃসরণ ও জলবায়ুর ক্ষতির জন্য বেশি দায়ী, এ নিয়ে নিয়ে কাঁদা ছোড়াছুড়ির শেষ নেই। ১৯৮৬ সালের এক সমীক্ষায় দেখা যায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের উৎপাদন সমগ্র বিশ্বের উৎপাদনের ৭০ শতাংশ এবং ব্যবহারের ৫০ শতাংশ। এর ফলে পৃথিবীর দক্ষিণ মেরুর ওজোন স্তরে ছিদ্রের সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্বে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণকারী দেশ চীন (২৮%), তারপরের অবস্থানে যুক্তরাষ্ট্র, তিনে আছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চারে ভারত এবং পাঁচ নম্বরে রাশিয়া। উন্নত দেশগুলো দুষছে চীন ও ভারতকে, আর তারা দুষছে উন্নত দেশগুলোকে। চীন-ভারতসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর বক্তব্য-তাদের শিল্পায়নের ইতিহাস ৫০-৬০ বছরের আর উন্নত দেশগুলোর কয়েকশ’ বছরের। শিল্পবিপ্লবের মাধ্যমে পরিবেশের ১২টা বাজিয়ে উন্নয়ন করার পর এখন তারা বড়বড় কথা বলছে। অতএব পরিবেশ বিপর্যয়ের দায় তাদেরই অধিক নিতে হবে।

বিজ্ঞানীদের পীড়াপীড়িতে বার বার পৃথিবীর দেশগুলি জলবায়ু সম্মেলনে বসছে। কত আলোচনা, নথিপত্র, দলিল-দস্তাবেজ আর কত প্রতিশ্রুতি! নীতিগত দড়ি-টানাটানির শেষ নেই, এক দেশ সই করে তো অন্য দেশ করে না। কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না।

উন্নয়নশীল বা অনুন্নত দেশগুলোর ওপর এই পরিবেশ বিপর্যয়ের প্রভাব সবচেয়ে বেশি ভয়ংকর। পৃথিবীর মোট গ্রিনহাউস গ্যাসের মাত্র শূন্য দশমিক ৪০ শতাংশ নিঃসরিত হয় বাংলাদেশে। অথচ দুর্ভাগ্যজনকভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত শীর্ষ ১০টি দেশের একটি বাংলাদেশ।

বৈশ্বিক কারণের সাথে সাথে আমাদের অযাচিতভাবে পরিবেশকে ব্যবহার বিশেষ করে বনভূমি ও কৃষি জমি গায়েব করে ও খাল-বিল-পুকুর-নদ-নদী ভরাট করে আমরা দেশটাকেও একটা ইটভাটা বানিয়ে তুলেছি।

পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে, এই বিপর্যয় পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব নয় এবং ভবিষ্যতে অবস্থা আরও খারাপ হতে পারে। সেক্ষেত্রে উন্নত দেশগুলোর আশায় অপেক্ষা না করে তীব্রতার মাত্রা কমানো ও খাপ খাওয়ানোর জন্য নিজেদেরকেই পদক্ষেপ নিতে হবে।

বৃক্ষরোপণ ও সবুজায়ন কর্মসূচিকে আরও গুরুত্ব দিতে হবে, কীভাবে ছোট ছোট বন বা বৃক্ষ আচ্ছাদিত পার্ক তৈরি করা যায় ও জলাধার সংরক্ষণসহ কীভাবে নতুন নতুন জলাধার সৃষ্টি করা যায় তা নিয়ে ভাবতে হবে।

আমাদের দেশে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার সব প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা মূলত ঘূর্ণিঝড় ও বন্যা ঘিরে। বিভিন্ন দেশের আবহাওয়া বিভাগ আলাদাভাবে অতি উষ্ণ তাপমাত্রার পূর্বাভাসও দিয়ে থাকে। আমদের দেশ এটি চালু করাসহ অবকাঠামোগত সুবিধা বাড়ানোর বিষয় নিয়েও ভাবতে হবে। সাধারণ ও প্রান্তিক মানুষ বিশেষ করে কৃষক, শ্রমিক ও অন্যান্য কর্মজীবীদের সূর্যালোক ও উচ্চ তাপমাত্রার প্রভাব এড়ানোর করণীয় কাজ সম্পর্কে পরামর্শ দেওয়া বা সচেতন করা বিশেষ প্রয়োজন। সবার আগে বিপদটি স্বীকার করা, সবার আলোচনার বিষয়বস্তুতে পরিণত করা ও পরিবেশকে গুরুত্ব দিয়েই উন্নয়নের জোয়ারে শামিল হওয়া এখন সময়ের দাবি।

তবে আশার কথা হলো, আমাদের দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু হয়েছে। সম্প্রতি ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান আর্শট-রকফেলার ফাউন্ডেশনের সাথে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এ চুক্তির আওতায় এশিয়ার প্রথম শহর হিসেবে ঢাকার জন্য একজন চিফ হিট অফিসার (সিএইচও) নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সিএইচও তাপমাত্রা কমাতে শহরব্যাপী স্বল্প এবং দীর্ঘমেয়াদি নানা কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে ভূমিকা পালন করবে। তবে সিএইচও নিয়োগ নিয়ে অনেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিরূপ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে।  প্রশ্ন উঠেছে, এই ধরনের প্রকল্পে দেখা যায় বরাদ্দের একটা বড় অংশ দেশি-বিদেশি কর্মকর্তা উপদেষ্টাদের পিছনে ও অন্যান্য কারণে খরচ করতে হয়। ফলে টার্গেট গ্রুপ বা আসল কাজ তেমন হয় না।

আরও প্রশ্ন উঠেছে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগের কর্মকর্তাদের নিয়ে চিফ হিট অফিসার কীভাবে কাজ করবে সেটাও দেখার বিষয়। সারা পৃথিবীতে আন্দোলন চলছে, গাছ লাগান, গাছ বাঁচান। নগর কর্তৃপক্ষের প্রকল্প নেওয়া উচিত গাছ লাগানোর, গাছ রক্ষা করার ও রাজধানীকে সবুজ করে তোলার। সেখানে শহরের সৌন্দর্যের নামে গাছ কাটা হচ্ছে। সম্প্রতি ঢাকার এয়ারপোর্ট রোডের ও ধানমন্ডি সাত মসজিদ রোডের গাছগুলো কাটার মর্মবিদারী দৃশ্য সাধারণ মানুষের মনে অনেক প্রশ্ন তুলেছে।

রাজধানীর এয়ারপোর্ট রোডে ছিল সারি সারি জারুল, সোনালু, কদম, শিমুল, রাধাচূড়া, কৃষ্ণচূড়া, কাঠ বাদাম, নাগেশ্বর, হিজলসহ অসংখ্য দেশি প্রজাতির গাছ। যাদের বাহারী ফুল, ফল, পাতা সবাইকে মুগ্ধ করতো। অভিযোগ উঠেছে, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের প্রকল্প ও রাস্তা প্রশস্ত করার কথা বললেও মূলত সেজন্য গাছগুলো কাটা হয়নি। বরং দেশীয় গাছের স্থলে বিদেশি বনসাই লাগাবার জন্যে নির্মমভাবে এসব বৃক্ষ নিধন হয়েছে। কোটি কোটি টাকা খরচ করে চীন থেকে আমদানি করে বনসাই ফাইকাস রোপণ করা হয়েছে। বাঙালি সংস্কৃতির সাথে সম্পর্কহীন এই ধরনের নকল গাছের সৌন্দর্যবর্ধন, সবুজায়ন এবং অক্সিজেন সরবরাহ করার সক্ষমতা নিয়েও অনেকে প্রশ্ন তুলেছে। এসব ব্যাপারে পরিবেশবাদী ও ওসব এলাকার অধিবাসী ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। এমনকি উত্তরা এবং ধানমন্ডিতে মিছিলও হয়েছে। অথচ ঢাকা সিটি করপোরেশন এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগ ছিল নীরব, কাদা ছোড়াছুড়িতে ব্যস্ত।

জলবায়ুর এই পরিবর্তন এখন আর ভবিষ্যদ্বাণী নয়, বাস্তবতা। তাপমাত্রা বেড়েই চলেছে, মেরু অঞ্চলের বরফ গলতে শুরু করছে, সমুদ্রের পানির স্তর উঁচু হচ্ছে। সাতক্ষীরায় গেলে দেখা যায়, বিগত ঘূর্ণিঝড়গুলোর সময় যেসব এলাকা প্লাবিত হয়েছিল, পানি সেখান থেকে আর নামছে না।

চাইলেই হঠাৎ করে বা রাতারাতি পরিবেশ উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব নয়। তবে কাজ করলে, পদক্ষেপ নিলে সবই ব্যর্থ হবে এমনও নয়। যেমন কর্ম তেমন ফল এই নীতিতে প্রকৃতি বিশ্বাসী। এড়িয়ে যাওয়া বা দায়সারাভাবে কাজ করলে বিশাল সংকটের মধ্যে পড়তে হবে। এতে কোনো সন্দেহ নেই। সাথে সাথে আমাদের চরিত্রেরও পরিবর্তন করতে হবে। যেমনটা বাঙালির চরিত্র সম্পর্কে কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন-
‘আমরা আরম্ভ করি, শেষ করি না,
আড়ম্বর করি, কাজ করি না,
যাহা অনুষ্ঠান করি তাহা বিশ্বাস করি না,
যাহা বিশ্বাস করি তাহা পালন করি না’

লেখক: সাংবাদিক

/এসবি/

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়