ঢাকা     বৃহস্পতিবার   ২৫ এপ্রিল ২০২৪ ||  বৈশাখ ১২ ১৪৩১

টাঙ্গাইলের শাড়ি এবং এর সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার

কাজী রাফি || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৩:০৫, ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪   আপডেট: ১৩:১৯, ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪
টাঙ্গাইলের শাড়ি এবং এর সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার

সংস্কৃতি বলতে সাধারণভাবে আমরা বুঝি, বিশেষ কোনো জনগোষ্ঠীর বৈশিষ্ট্য এবং সেই বৈশিষ্ট্য চর্চায়-লালনে তাদের অর্জিত জ্ঞান। যার মধ্যে ভাষা, ধর্ম, খাদ্যাভ্যাস, সামাজিক আচার, সঙ্গীত এবং শিল্পকলা এই বিষয়গুলোও অন্তর্ভুক্ত।  মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড রিসার্চ অন ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যাকুইজিশন  সংস্কৃতির সংজ্ঞা দিয়েছে এভাবে- ‘সামাজিক আচরণ এবং মিথষ্ক্রিয়ার ধরণ, জ্ঞানীয় গঠন এবং সামাজিকীকরনের মধ্য দিয়ে যে উপলব্ধি/জ্ঞান/অভিজ্ঞান অর্জিত হয় সেটাই সংস্কৃতি। সুতরাং সংস্কৃতিকে বলা যেতে পারে, অনন্য সামাজিক গড়নকে লালনের মধ্য দিয়ে বিশেষ কোনো জনগোষ্ঠীর যে সামষ্টিক আত্মপরিচয় গড়ে ওঠে তা।’

লন্ডনের বার্নেট অ্যান্ড সাউথগেট কলেজের নৃবিজ্ঞানী ক্রিস্টিনা ডে রসি লাইভ সায়েন্সকে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে বলেন, ‘সংস্কৃতির আওতায় রয়েছে, ধর্ম, খাদ্য, পোশাক, পোশাক পরার ধরণ, ভাষা, বিয়ে, সঙ্গীত, আমরা যা কিছুকে ন্যায় বা অন্যায় বলে ভাবি, আমরা যেভাবে টেবিলে বসি, যেভাবে অতিথিকে অভিবাদন জানাই, ভালোবাসার মানুষের সঙ্গে যেভাবে আচরণ করি এবং দৈনন্দিন জীবন যাত্রার আরো অন্তত কয়েক লাখ বিষয়।’

বাঙালির রয়েছে চার হাজার বছরের অধিক সময় ধরে অর্জিত, লালিত এবং চর্চিত ভাষা-সংস্কৃতি। জারি-সারি-ভাটিয়ারির মতো শত ব্যঞ্জনার গান-সুরে জীবন চর্চার অনন্য সব সাংস্কৃতিক উপাদান। সংস্কৃতি একটা জাতির মননেরই পরিচায়ক নয়, বরং তাদের নিজস্ব সত্তা নির্ণয়ের উৎকৃষ্ট মাধ্যম। একটা জাতির গৌরব, তাদের অর্জিত ইতিহাসের জন্ম হয় তাদের সংস্কৃতির হাত ধরে ধরে। 

আমাদের টাঙ্গাইলের শাড়ি তেমনি এক ঐতিহ্য যার সাথে জড়িয়ে আছে অনেক অনেক কালের লালিত সামাজিক অভিজ্ঞান। সকল গবেষণায় এটা প্রতিষ্ঠিত এবং প্রমাণিত যে, এই শাড়ি (টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি) পাথরাইল, নলশোধা,ঘারিন্দাসহ টাঙ্গাইলের বাইশ-তেইশটি গ্রামে এই শাড়ি শিল্পের আদি সম্পৃক্ততা। ২০০৯ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত আমি আমার স্ত্রীকে নিয়ে কয়েকবার পাথরাইল গ্রামে গিয়েছি এই তাঁত-শিল্পের কার্যক্রম দেখতে এবং শাড়ি কিনতে। সেই এলাকার এই শাড়ি উৎপাদনের সাথে জড়িত গ্রামগুলোকে ‘বাইশগ্রাম’ বলে চিহ্নিত করা হতো। অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকেই এই বাইশটি গ্রামই ছিল তাঁতিদের। টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার জমিদারি পত্তনের গোড়ার দিকে ( অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে) এই তাঁতিদের এই অঞ্চলে বসতি স্থাপন করা হয়। এই গ্রামগুলোর তাঁতিদের তৈরি শাড়িই কালক্রমে ‘টাঙ্গাইলের শাড়ি’ নামে পরিচিতি লাভ করে। কিন্তু অদ্ভুতভাবে, গত ১লা ফেব্রুয়ারি, ভারত সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ফেসবুক পেইজে একটি পোস্টে টাঙ্গাইল শাড়িকে পশ্চিমবঙ্গের ঐতিহ্য উল্লেখ করা হয়। বলা হয়, এটি এই অঞ্চলের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের বহিঃপ্রকাশ। 

ইতোমধ্যে ভারত নাকি এই শাড়ির জি আই (জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিক্যাশনস) পেটেন্ট পেয়েছে!  জি আই ইন্ডিকেশনের সংগায় বলা হয়েছে- ‘Geographical indications (GIs) are indications that identify a good as originating in the territory of a country, or from a region or locality within that territory, where a given quality, reputation, or other characteristic of the good is essentially attributable to its geographic origin.’

প্রসঙ্গত প্রশ্ন জাগে, টাঙ্গাইল জেলা কি পশ্চিমবঙ্গের কোনো জেলা যে, টাঙ্গাইলের শাড়ি তাদের ঐতিহ্য এবং সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার হতে পারে? 

২০০৬ সালে এশিয়া উইকে প্রকাশিত একটা ফিচার দেখে আমি অস্থির হয়ে উঠেছিলাম। সেই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, পুণ্ড্র সভ্যতা গড়ে উঠেছিল ভারতের 'পাণ্ডুয়া' নামক স্থানে। প্রাচীন পুণ্ড্র সভ্যতা যেখানে গড়ে উঠেছিল আমি সেই শহর, সেই উপজেলায় জন্মগ্রহনকারী এক সন্তান হিসেবে এমন অনৈতিক দাবি মানতে পারছিলাম না। হাতে কলম তুলে নিয়েছিলাম। যেন পৃথিবীতে আর কেউ কোনোদিন পুণ্ড্রকে নিজের বলে দাবি করতে না পারে। পুণ্ড্র সভ্যতার আনাচে কানাচে ঢুকে গিয়েছিলাম। পাঁচ বছর ধরে নির্মাণ করেছিলাম প্রায় পাঁচশ পৃষ্ঠার 'ত্রিমোহিনী' নামের এক উপন্যাস/আখ্যান।

এখন টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ির জি আই প্যাটেন্ট ভারতের হলে এর চেয়ে বড় দুঃখের আর কিছু নেই।  আমাদের মায়েরা আমাদের চিত্রপটে, আমাদের শিল্প-সংস্কৃতি, গল্প এবং কবিতায় আজীবন আমাদের তাঁতিদের তৈরি এইসব শাড়িতে আঁকা আছেন এবং থাকবেন। আমাদের তাঁতিদের ঘাম-শ্রম, রক্তে গড়া ইতিহাস এবং আমাদের এই ঐতিহ্যকে অন্য কেউ নিজেদের বলে দাবি করলে আমরা তা মানব না। মানতে পারি না। এই প্যাটেন্ট নিজেদের করে পাবার জন্য কী কী করণীয়, তা কার্যকর করার জন্য আমাদের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করবে –এই প্রত্যাশা। নিজেদের ঐতিহ্যকে অন্যদের দখলে দিয়ে দিলে আমরা এই সময়ে যারা জীবিত ছিলাম, সময় এবং ইতিহাস আমাদের কাউকে ছাড় দেবে। আগামী প্রজন্মের কাছে আমরা দায়-দায়িত্বহীন, কাণ্ড-জ্ঞানহীন এবং নির্বিকার এক অগ্রজ বলে চিহ্নিত হয়ে থাকব।

ভারতবাসীদের বলব, বিশ্বকে দেখানোর মতো আপনাদের অনেক কিছু আছে।  আমাদের এই অস্তিত্বসমূহের জায়গাগুলোকে সম্মান প্রদর্শন করুন।  প্রতিবেশির কাছে এ আমাদের একান্ত চাওয়া। 

লেখক: কথাশিল্পী 

আরও পড়ুন: টাঙ্গাইল তুমি কার: একটি নাগরিক প্রতিক্রিয়া

/লিপি

সম্পর্কিত বিষয়:

আরো পড়ুন  



সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়