ঢাকা     বৃহস্পতিবার   ২৫ এপ্রিল ২০২৪ ||  বৈশাখ ১২ ১৪৩১

বইবান্ধব সমাজ গঠনে কার কী ভূমিকা

মিনার মনসুর || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৩:০৮, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪   আপডেট: ১৩:১১, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪
বইবান্ধব সমাজ গঠনে কার কী ভূমিকা

এটা এখন অনস্বীকার্য যে বইয়ের দিনকাল ভালো যাচ্ছে না। পাঠ্যবই আমাদের এ আলোচনার বিষয় নয়। আর নোট বই, গাইড বই প্রভৃতি এখন সিন্দবাদের দৈত্যের মতো যেভাবে আমাদের ঘাড়ে চেপে বসেছে তাতে তাকে ছুড়ে ফেলা খুব সহজ হবে বলে মনে হয় না। আমাদের আলোচনা মূলত সৃজনশীল, মননশীল বই নিয়ে- যেগুলোকে একদা ‘আউট’ বই বলা হতো। মাত্র কয়েক দশক আগেও এ ক্ষেত্রে বাঙালির ব্যাপক সুনাম ছিল। সাতচল্লিশ-পূর্ব অবিভক্ত ভারতকে যারা জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করেছিল, তাদের মধ্যে বাঙালির ভাগটাই ছিল বেশি। বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে মাইকেল মধুসূদন দত্ত, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন থেকে শুরু করে আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পর্যন্ত যে-সূর্যপ্রতিম মানুষগুলোকে আমরা দেখি তাদের প্রায় সকলেই ছিলেন এক অর্থে স্বশিক্ষিত। নিঃসংশয়ে বলা যায় যে, তাদের প্রত্যেকেরই মূল অবলম্বন ছিল বই। বইয়ের আলোয় তাঁরা নিজেরা আলোকিত হয়েছেন। ক্রমে বাংলা কিংবা ভারত শুধু নয়, পৃথিবীকেই আলোকিত করেছেন। কালের ধূলিঝড় পার হয়ে সেই আলো এখনো অনির্বাণ।


এখনকার দৃশ্যপট একেবারেই ভিন্ন। একদা ব্যাপকসংখ্যক বাঙালির ঘরে ভাত ছিল না। ছিল না অন্ন বস্ত্র শিক্ষা চিকিৎসার কোনো নিশ্চয়তা। সবচেয়ে বড় কথা, তার অস্তিত্বের, তার জাতিসত্তার কোনো স্বীকৃতিও ছিল না। কখনো মোগল, কখনো ইংরেজ, কখনো-বা হিন্দি-উর্দুর চাপে সে পিষ্ট হয়েছে। কিন্তু এতসব অপ্রাপ্তির মধ্যেও তার হাতে বই ছিল। ছিল ‘সিম্পল লিভিং হাই থিংকিং’-এর ইস্পাতকঠিন সংকল্প। কোনো প্রলোভন তাকে সেই সংকল্প থেকে চ্যুত করতে পারেনি। আজ তার প্রাপ্তির ডালা উপচে পড়ছে। হাজার বছর ধরে যে-স্বাধীনতা তার অধরা ছিল সেই স্বাধীনতাও সে পেয়েছে। পেয়েছে বাংলাদেশ নামে একটি জাতিরাষ্ট্র। আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে তার তরক্কি সারা পৃথিবীর নজর কেড়েছে। বলতে গেলে তার এখন সবই আছে। নেই কেবল বই। বিরল কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে প্রবীণ-নবীন সকল হাতই এখন বইশূন্য। হাত শুধু নয়, যা ছিল একসময় বাঙালি মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্তের গর্বের বিষয় তার সেই বইভর্তি ঘরও এখন বইশূন্য হতে চলেছে। রীতিমতো বিপর্যয়কর এক অবস্থা! কীভাবে এমন বদলে গেল বাঙালির মনোজগৎ তা নিয়ে আছে নানা মত। নানা তর্ক।


মূল দায়টি চাপানো হচ্ছে তথ্যপ্রযুক্তির বিস্ফোরণের ওপর। আরও সরাসরি বললে, বইয়ের প্রতিপক্ষ হিসেবে ফেসবুক, ইউটিউবসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমকেই দাঁড় করানো হচ্ছে আসামির কাঠগড়ায়। অনস্বীকার্য যে, সবার হাতেই এখন একটি করে স্মার্টফোন। সবার চোখ শুধু নয়, হৃদয়মনসহ সব মনোযোগ এখন সেখানেই নিবদ্ধ। ঘরেবাইরে সর্বত্র এ এক সাধারণ ও সার্বক্ষণিক চিত্র। বইপড়ার জন্য যে অবকাশটুকু দরকার, অভিযোগ হলো, তার সবটুকুই হরণ করে নিচ্ছে এই স্মার্টফোন। এ অভিযোগ ভিত্তিহীন নয়।

বাস্তবতা হলো, বর্তমান বিশ্বে বইয়ের শত্রু অনেক- যদিও সবাই দৃশ্যমান নয়। সামাজিক মাধ্যম এ ক্ষেত্রে প্রধান বা একনম্বর শত্রু কি-না তা নিয়ে সংশয় আছে। কারণ গোপন আরেকটি শত্রু আছে- যার প্রভাব সঠিকভাবে ও যথাযথ গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি বা হচ্ছে না বলে আমার বিশ্বাস। সেটি হলো, যে-পৃথিবীতে আমাদের বসবাস তার আর্থসামাজিক দর্শন বা দৃষ্টিভঙ্গি। প্রশ্ন হলো, যে-অর্থনীতিকে সমাজের চালিকাশক্তি হিসেবে গণ্য করা হয়, সেই অর্থনীতির বৈশ্বিক গতিপথ এখন কোন দিকে? অর্থনীতি কি আমাদের মনুষ্যত্বের দিকে, ত্যাগের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, নাকি ভোগের দিকে?

আমি অর্থনীতিবিদ নই, আর বিশদ আলোচনার অবকাশও এখানে নেই। আমার সীমিত জ্ঞানে মনে হয় এ প্রশ্নের সহজ ও সংক্ষিপ্ত উত্তরটি হলো, বিশ্বজুড়েই এখন চলছে ভোগবাদিতার মহোৎসব। আর তার মূলে রয়েছে প্রবৃদ্ধিনির্ভর আগ্রাসী অর্থনীতির প্রত্যক্ষ প্রণোদনা। অর্থনৈতিক দর্শনই মানবসমগ্রকে ক্রমবর্ধমান হারে ভোগবাদী করে তুলছে। মানুষের ক্রমবর্ধমান অসহিষ্ণুতা ও বইবিমুখতার মূল কারণটিও এখানেই নিহিত রয়েছে বলে আমার বিশ্বাস। কারণ বই ও ভোগবাদিতার গন্তব্য ও গতিপথ ভিন্ন। 


প্রতিপক্ষ আরও আছে। তবে বইয়ের প্রত্যক্ষ প্রতিপক্ষ হিসেবে এই যে দুটি প্রবল পরাশক্তির সন্ধান আমরা পেলাম- তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার মতো প্রস্তুতি কি আমাদের আছে? পৃথিবীর উন্নত দেশগুলো বহু আগে থেকেই নানাভাবে এ পরিস্থিতি মোকাবিলার চেষ্টা চালিয়ে আসছে। তার সুফলও তারা পেয়েছে এবং পাচ্ছে নানাভাবে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে আমাদের অবস্থা অনেকটা পলাশীর প্রান্তরের মতো। অত্যাধুনিক অস্ত্রসজ্জিত প্রবল পরাক্রান্ত দুই বা ততোধিক শত্রুর বিরুদ্ধে আমাদের লড়তে হচ্ছে অনেকটা খালি হাতে। এই যে অপ্রস্তুত অবস্থা এটাও বইয়ের শত্রুদের হাতকে নানাভাবে শক্তিশালী করছে। মনে রাখতে হবে যে, বইবিমুখতা আমাদের একার সমস্যা নয়। এটি এখন বিশ্বজনীন এক সমস্যা। এই সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে প্রথমে আমাদের সমস্যার স্বরূপ সঠিকভাবে বুঝতে বা চিহ্নিত করতে হবে। তারপর ঠিক করতে হবে তার উপযুক্ত চিকিৎসাপদ্ধতি।


প্রকৃত মানুষ হয়ে উঠতে হলে যে বইপড়ার বিকল্প নেই এটা সর্বজনস্বীকৃত। কেন বিকল্প নেই তা নিয়ে বিশ্ববরেণ্য মনীষীরা বিস্তর বলেছেন। এমনকি যে-মানুষ তার সারাজীবনে পাঠ্যবইয়ের বাইরে একটিও বই পড়েননি তিনিও সভাসমিতিতে এ নিয়ে কথার আতশবাজি ছড়াতে একটুও দ্বিধা করেন না। কারণ এটি কমবেশি সকলেই জানেন ও মানেন যে, বইয়ের মধ্যে যা আছে তা আর কোথাও নেই। সহজ কথায়, মানবসমগ্রের সুদীর্ঘ যাত্রাপথের যা কিছু সঞ্চয় সবই গুপ্তধনের মতো নিভৃতে সঞ্চিত হয়ে আছে বইয়ের দুই মলাটের মাঝখানে।  

প্রশ্ন হলো, প্রকৃত মানুষ হওয়ার শিক্ষাটি আমরা কোথায় পাই? সন্দেহ নেই যে, গোটা পৃথিবীটাই একটা পাঠশালা। আর সেই পাঠশালার অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি অনুষদ বা অনুষঙ্গ হলো প্রকৃতি। তবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার কথা যদি বলি, ঐতিহ্যগতভাবে যে তিনটি আদি ও অপরিহার্য প্রতিষ্ঠান আমাদের সামনে চলে আসে তার প্রথমটি হলো পরিবার; দ্বিতীয়টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং তৃতীয়টি নিঃসন্দেহে সমাজ বা সামাজিক প্রতিষ্ঠান। ধনী-গরিব ও ধর্মবর্ণনির্বিশেষে বইপড়ার প্রথম পাঠটি আমরা পেতাম পরিবারের কাছ থেকে। প্রকৃত মানুষ হওয়ার সঙ্গে যে বইপড়ার একটি অনিবার্য সম্পর্ক আছে সেটি তারা জানতেন এবং মানতেন; যদিও অর্থাভাবে অনেকেই তার নাগাল পেতেন না। 
আমাদের অপর দুটি প্রতিষ্ঠানও এ ক্ষেত্রে সারা ভারতের পথপ্রদর্শক হয়ে উঠেছিল। বিশেষ করে আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সেই সময়ে যেসব মেধাবী সন্তানের জন্ম দিয়েছিল এবং একইসঙ্গে যারা এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনেকটা স্বতঃপ্রণোদিতভাবে শিক্ষকতাকে ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন অবিভক্ত ভারতে তার তুলনা মেলা ভার। মূলত তাদের আলোয় আলোকিত হয়ে উঠেছিল সারা ভারত। আর যদি বলি, আমাদের সবচেয়ে বড় পুঁজিটি ছিল সমাজ বা সামাজিক প্রতিষ্ঠান তাহলে একটুও বাড়িয়ে বলা হবে না। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে অবিভক্ত বাংলা যে সমগ্র ভারতের বাতিঘর হয়ে উঠেছিল তার মূলে ছিল সমাজের অপরিমেয় প্রাণশক্তি। আর এই প্রাণশক্তির জোগানটি এসেছিল বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। সমাজশক্তির এই যে বিপুল জাগরণ তার নেপথ্যে মুখ্য ভূমিকাটি ছিল গ্রন্থ ও গ্রন্থাগারের। কিন্তু আজ আমরা কী দেখছি?


অপ্রিয় হলেও সত্য যে পরিবার বই থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো হয়ে উঠেছে পরীক্ষা-সেমিষ্টার-নোট-গাইড ও কোচিংনির্ভর, যার অভিমুখ যত না শিক্ষার দিকে তার চেয়ে অধিক হলো বাণিজ্যের দিকে। আর সমাজ ছুটছে সোনার হরিণের পেছনে। শুধু কি সমাজ? সবারই লক্ষ্য এখন রাতারাতি তরক্কি অর্জন। শত শত বছর ধরে ঔপনিবেশিক শাসনের চরম বৈরিতার মধ্যেও পরাধীন বাঙালি মনুষ্যত্বের যে-সাধনাটি জারি রেখেছিল সেই অভিমুখটিই বদলে গেছে। 

দেশ এখন স্বাধীন। প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই রয়েছে রাষ্ট্রের প্রণোদনা। কিন্তু তারপরও মানুষ হওয়ার দীক্ষাটি সমাজ থেকে প্রায় উবে গেছে। সন্তান বলি আর ভবিষ্যৎ প্রজন্মই বলি, সম্মিলিতভাবে তাদের কানে দিনরাত একমাত্র যে-মন্ত্রটি জপ করা হচ্ছে তা হলো, যে কোনো উপায়ে প্রথম হতে হবে। হাতিয়ে নিতে হবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ডিগ্রি থেকে শুরু করে পদপদবি সব। অতএব, দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যে এখন সেদিকেই ছুটছে তার দায় কিন্তু তাদের নয়।

প্রায় ১৮ কোটি মানুষের এই দেশে আমাদের লক্ষ লক্ষ পরিবার আছে। এই পরিবারগুলো আমাদের পূর্বসূরিদের তুলনায় ধনে-মানে-শিক্ষায় অনেক এগিয়ে আছে। আমাদের হাজার হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আছে। শুধু নানারকম বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যাই এখন শতাধিক। নিয়মিতভাবে ১৫ থেকে ২০ লক্ষ শিশু-কিশোর-তরুণ এইসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষা গ্রহণ করছে। আর সামাজিক প্রতিষ্ঠানের কথা যদি বলি তা এখন বিদ্যাসাগর কিংবা রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের সময়ের তুলনায় হাজারগুণ বেশি। নিয়মিত সরকারি অনুদান পাচ্ছে এমন সরকারি-বেসরকারি গ্রন্থাগারের সংখ্যাও সহস্রাধিক। 

পাশাপাশি, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়সহ সরকারের নানা প্রতিষ্ঠানও নিয়মিত বড় অঙ্কের বই কিনে পাঠাচ্ছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ দেশের প্রায় সর্বত্র। কিন্তু এতসব সত্ত্বেও কোনোভাবেই বইবিমুখতার লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না। পাঠাগারগুলো হাহাকার করছে প্রকৃত পাঠকের অভাবে। অপ্রিয় হলেও সত্য যে অধিকাংশ পাঠাগারই ভরে আছে নোট-গাইড বইয়ের পাঠকে। এই যদি হয়, প্রকৃত অবস্থা তাহলে আমরা একটি রিডিং সোসাইটি গড়ে তুলবো কীভাবে?


এটি কোনো গবেষণা নিবন্ধ নয়। তবে গ্রন্থ ও গ্রন্থাগার নিয়ে প্রত্যক্ষভাবে কাজ করতে গিয়ে আমার মনে হয়েছে যে ‘পুরনো সঞ্চয় নিয়ে বেচাকেনা আর চলিবে না’। আমাদের কৌশল বদলাতে হবে। পরিবর্তিত পরিস্থিতির আলোকে গ্রহণ করতে হবে বাস্তবসম্মত ও কার্যকর কৌশল। ঐতিহ্যগতভাবে পাঠাগার বলতে আমরা বুঝি যে সেখানে নানারকম বই থাকবে। থাকবে বইপড়ার পরিবেশ। পাঠক নিজ আগ্রহে স্বতঃপ্রণোদিতভাবে সেখানে আসবেন। তার পছন্দের বইটি খুঁজে নিয়ে পাঠ করবেন। কিন্তু এখনকার বাস্তবতায় সেটি আর সম্ভবপর বলে মনে হয় না। 

কী সেই বাস্তবতা? খুব জটিল সেই চিত্র। এককথায় তার উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। প্রথমত, বইপড়ার জন্য যে অবকাশটুকু দরকার সেটি আমাদের জীবন থেকে উধাও হয়ে গেছে। সেসঙ্গে বদলে গেছে আমাদের শিক্ষার্থীদের জীবনধারাও। তাদের সঙ্গে তাল মিলাতে গিয়ে অভিভাবকদেরও দমবন্ধ অবস্থা। অন্যদিকে, জটিল হয়ে গেছে আমাদের যাতায়াতব্যবস্থা। ইচ্ছে থাকলেও শিশুকিশোর কিংবা প্রবীণ কারো পক্ষেই এখন পাঠাগারে গিয়ে বইপড়া আর সম্ভব নয়। সর্বোপরি, বাসাবাড়ির কাছে পাড়া-মহল্লায় যেসব পাঠাগার আছে (বা একদা ছিল) সেগুলোর দরজা খোলা রাখার মতো মানুষও এখন আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এই পরিবর্তিত বাস্তবতাকে মেনে নিয়েই আমাদের যথোপযুক্ত কর্মকৌশল গ্রহণ করতে হবে।

অমর একুশের বইমেলা উদ্বোধন করতে গিয়ে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন ডিজিটাল বই প্রকাশের ওপর। ডিজিটাল প্লাটফরমে আমাদের গুরুত্বপূর্ণ সব বই বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি। বলা বাহুল্য, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাদের সামনে স্মার্ট বাংলাদেশের যে-রূপকল্প বা ভিশন তুলে ধরেছেন এটি নিঃসন্দেহে তারই অবিচ্ছেদ্য অংশ। এ কাজটি সফলভাবে সম্পাদন করা গেলে তা কেবল দেশের অভ্যন্তরেই যুগান্তকারী পরিবর্তন আনবে না, বহির্বিশ্বের সঙ্গেও তৈরি করবে বইসংস্কৃতির মজবুত এক সেতুবন্ধন। তবে বইয়ের অনুবাদ ও ডিজিটাইজেশনের ব্যাপারটি সময়সাপেক্ষ। সেসঙ্গে রয়েছে চাহিদা অনুযায়ী অর্থ বরাদ্দের একটি বিষয়ও। সেটিও রাতারাতি সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। 

এমতাবস্থায়, রিডিং সোসাইটি গড়ে তোলার জন্য এ মুহূর্তে আমাদের কী করণীয় সঠিকভাবে সেটি চিহ্নিত করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের অভিজ্ঞতা থেকে এ ক্ষেত্রে দুটি কৌশল খুব কার্যকর বিবেচিত হতে পারে বলে আমার মনে হয়েছে। প্রথমত, স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্পৃক্ত করে সরকারি-বেসরকারি গ্রন্থাগারগুলোর মাধ্যমে দেশব্যাপী নিয়মিত পাঠ কার্যক্রম বাস্তবায়ন। জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র এ ক্ষেত্রে ভালো সাফল্য পেয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যেতে পারে। 
দ্বিতীয়ত, গ্রন্থাগারের ঐতিহ্যগত ধারণায় কিঞ্চিৎ পরিবর্তন আনা যেতে পারে। যেমন- এতকাল পাঠক পাঠাগারে গিয়ে তার পছন্দের বইটি পাঠ করেছেন; এখন পাঠাগারই পছন্দের বইটি নিয়ে পাঠকের কাছে হাজির হতে পারেন, যে কাজটি ইতোমধ্যে খাবার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো খুব সফলভাবে করে দেখিয়েছেন। বেসরকারি গ্রন্থাগারগুলো স্থানীয়ভাবে এ অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পারেন। সর্বশেষ কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটি হলো, বইপড়া নিয়ে একটি সামাজিক জাগরণ তৈরি করা দরকার। প্রশ্ন হলো, কে করবে? কীভাবে করবে? এখানে অবশ্যই সরকারের দায়িত্ব আছে। সরকার নীতিগত ও গবেষণা সহায়তা দেবে। প্রয়োজনে অর্থেরও জোগান দেবে। কিন্তু মূল কাজটি করতে হবে আমাকে, আপনাকে।

লেখক : একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি ও প্রাবন্ধিক। পরিচালক, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র 
    

  
 

তারা//

আরো পড়ুন  



সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়