ঢাকা     বুধবার   ২৯ মে ২০২৪ ||  জ্যৈষ্ঠ ১৫ ১৪৩১

বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে ফেনীতে ইসলামি ভাস্কর্য উদ্বোধন কী বার্তা দেয়

অনার্য মুর্শিদ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৫:৩৩, ১৯ মার্চ ২০২৪   আপডেট: ১৫:৩৯, ১৯ মার্চ ২০২৪
বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে ফেনীতে ইসলামি ভাস্কর্য উদ্বোধন কী বার্তা দেয়

সম্প্রতি ফেনীতে ইসলামি ভাস্কর্যের উদ্বোধন আমার মনে কিছু প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। আমার মনে পড়ছে, বর্তমান সংসদ সদস্য নিজাম হাজারী মেয়র থাকা অবস্থায় ২০১৩ সালে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক একটি ভাস্কর্য স্থাপন করতে চেয়েছিলেন ফেনীর মিজান রোডের পশ্চিম মাথায়। সে সময় ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর তোপের মুখে ভাস্কর্যটি সেখান থেকে সরিয়ে ফেলা হয়। এটি স্থান পায় পুরাতন ঢাকা মহাসড়কের তিন রাস্তার মোড়ে। অযত্নে অবহেলায় পড়ে থাকা এই ভাস্কর্যটির কোনো নামকরণও হয়নি! সেই শহরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিনে ইসলামি ভাস্কর্যের উদ্বোধন ভাবনার উদ্রেক করে বৈকি! কারণ আরো রয়েছে। 

মীযান ময়দান ফেনী শহরের ইসলামি প্রাণকেন্দ্র। কিন্তু এই প্রাণকেন্দ্রটির পাশেই ছিল ফেনীর সংস্কৃতি চর্চার স্থান জহির রায়হান মিলনায়তন। রাজনৈতিক গুটির চালে পড়ে মিলনায়তনের ভবনটি আজ নেই। কেন নেই সে আরেক প্রশ্ন। কিন্তু এখানে তো একদিন নতুন ভবন উঠবেই। ফেনীর রাজনীতিকরা যদি মনে করেন, সেখানে একটি গোষ্ঠী অত্যন্ত সুকৌশলে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়াচ্ছে না তাহলে বেশি কিছু বলার নেই। কারণ সহজ দৃষ্টিতে এই ভাস্কর্য স্থাপনে কোনো দোষ নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো- বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে এরকম সাম্প্রদায়িক একটি ভাস্কর্যের উদ্বোধন করে ফেনীর রাজনীতিকরা কি বার্তা দিলেন? এখানে মনে করিয়ে দিতে চাই, কয়েক বছর আগে ছাগলনাইয়া জিরো পয়েন্ট চত্বরে ‘আল্লাহু’ ভাস্কর্য তৈরি করা হয় শেখ কামালের জন্মদিনে। পরে রাজনীতিকদের যখন বোধোদয় হলো, তখন তারা এর নাম দিলেন ‘শেখ কামাল চত্বর’। তবে এবার এখন পর্যন্ত সেই বোধোদয়ের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। 

ফেনীতে ইসলামি ভাস্কর্য চর্চার নামে ইসলামি রাজনীতি প্রতিস্থাপনের প্রচেষ্টা নতুন নয়। সাবেক মেয়র হাজী আলাউদ্দিন মিনার দিয়ে একটি ইসলামি ভাস্কর্য তৈরি করেছেন সালা উদ্দিন মোড়ে। অথচ ভাস্কর্যটি শহীদ মেজর সালাউদ্দিনের নামে হতে পারত। ট্রাংক রোডের দোয়েল চত্বরের অদূরেই করা হয়েছে আল্লাহু সম্বলিত ওয়াচ টাওয়ার। ট্রাংক রোডে এরাবিয়ান খেজুর গাছের চত্বর নিয়ে ফেনীর মুক্তচিন্তকরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা করেছেন। তারপরও ফেনীকে এমন আরব্যকরণের হেতু কি!  

ফেনীর রাজনীতিকদের ধর্মান্ধতার ছায়াতলে কারা আনছে? তারা কি অতীতে এতটা ধর্মান্ধ ছিলেন? তারা কি জনপ্রিয়তা পাওয়ার জন্য এতটা ধর্মের ব্যবহার করতেন? এভাবে যদি একের পর এক ইসলামি ভাস্কর্য স্থাপিত হতে থাকে, তাহলে অন্য ধর্মের মানুষ যখন তাদের মতো করে ভাস্কর্য গড়তে চায় তখন আপনারা মেনে নিতে পারবেন তো? দেশের অন্য ধর্মাবলম্বীরা এ ঘটনায় কী ভাবছে? এতে যদি তাদের মনে সামান্য হলেও ক্ষোভ সৃষ্টি হয়, নাগরিকের মনে সেই ক্ষোভ সৃষ্টির অধিকার কি রাজনীতিকদের আছে? এটা ১৯৪৭ সাল নয়, এটা ২০২৪ সাল। এত বছর পরও যদি আপনারা রায়ট তৈরির প্রেক্ষাপট সম্পর্কে সচেতন না হন তাহলে আর কবে সচেতন হবেন?
ফেনীর কোনো ঐতিহাসিক মসজিদের সামনে একটি ইসলামি ভাস্কর্য স্থাপিত হতেই পারে। তবে মসজিদের সামনে যদি একটা হয়ে থাকে, তাহলে কোনো মন্দিরের সামনেও তো একটা হিন্দুদের ভাস্কর্য হতে পারে। এরপর যদি বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা, তাপর খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বীরা দাবি তোলে তখন তাদের মতো করেও ভাস্কর্য তৈরি করে স্থাপন করার অনুমতি দিতে হবে বৈকি। তখন আমাদের দেশ হয়ে উঠবে একটি যথার্থ ধর্মরাষ্ট্র। অথচ একাত্তরে আমরা এই ধর্মরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য যুদ্ধ করিনি। আমরা যুদ্ধ করেছি একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের জন্য। শুধু ফেনী নয় এই ইসলামিকরণের হিড়িক এখন সারাদেশে। কোথাও প্রকাশিত হচ্ছে, কোথাও হচ্ছে না- এই আর কি! 

আমরা ভাস্কর্যচর্চায় আগ্রহী হচ্ছি এটা খুবই সুখবর। যুগ যুগ ধরে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ইসলামের সালাফি মতের অনুসারীরা শিল্পকলার সঙ্গে ইসলামের একটি বিরোধ দাঁড় করিয়ে আসছে। তাদের সৃষ্ট বৈরি পরিবেশের মধ্যেও মুসলিমপ্রধান দেশগুলোতে শিল্পকলার চর্চা থেমে থাকেনি। প্রায় প্রত্যেকটি দেশেই চর্চিত হয়েছে চিত্রকলা এবং ভাস্কর্য। মুসলিম স্থাপত্যরীতি সমগ্র স্থাপত্য এবং ভাস্কর্য শিল্পে যে একটি উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে তা স্বীকার না করলে শিল্পকলার ইতিহাসের প্রতি অন্যায় হবে। মুসলিম দেশগুলোতে কি ধরনের ভাস্কর্যচর্চা হয় আমরা তা দেখে আসতে পারি। 

সৌদি আরবের কথায় আসা যাক, সারা বিশ্বের মুসলিমদের তীর্থস্থান সৌদি আরব। ইসলাম ধর্মের পবিত্র নগরী মক্কা এবং মদিনা এই দেশে অবস্থিত। প্রতি বছর গোটা বিশ্ব থেকে অগণিত মুসলমান দেশটিতে হজ পালন করতে যায়। সেখানেও শিল্পকর্মের প্রতি মানুষের আলাদা ঝোঁক লক্ষণীয়। দেশটির বিভিন্ন স্থানে পাঁচ শতাধিক ভাস্কর্য নির্মিত হয়েছে। দেশটির বাণিজ্যিক রাজধানী জেদ্দায় রয়েছে প্রায় চারশ ভাস্কর্যের একটি জাদুঘর। এখানে আছে উটের দৃষ্টিনন্দন ভাস্কর্য, মুষ্টিবদ্ধ হাত, হাংরি হর্স, মানব চোখ। ১৯৭০ সালে জেদ্দার মেয়র মো. সাইদ ফার্সি জেদ্দার ‘সৌন্দর্য বর্ধন প্রকল্প’গ্রহণ করেন। এবং বিশ্বের স্বনামধন্য শিল্পীদের দিয়ে প্রায় চারশর অধিক ভাস্কর্য নির্মাণ করেন। এই শিল্পীদের মধ্যে রয়েছেন হেনরি মুর, জোয়ান মিরো, আলেকজান্ডার কাল্ডার, মাহা মাল্লুহ্ প্রমুখ। তিনি এর নাম দিয়েছেন ‘ওপেন এ্যায়ার স্কাল্পচার মিউজিয়াম’ বা ‘উন্মুক্ত ভাস্কর্য জাদুঘর’। 

তিনি জেদ্দার কর্ণিশেখের সাথে ৭ বর্গকিলোমিটারের পার্কজুড়ে ২০টি ভাস্কর্য প্রদর্শন করেন। যা স্থানীয়দের কাছে ‘আল হামারা’ নামে পরিচিত। এই চারশ ভাস্কর্যের প্রায় সবকটিই ছিল বৈশ্বিক, সর্বজনীন, ঐতিহ্যবাহী আরবি ডিজাইনে করা। এর মধ্যে রয়েছে স্মৃতিস্তম্ভ, প্রাণী এবং বিভিন্ন বিষয়ের কিছু মূর্ত-বিমূর্ত ভাস্কর্য। কোন কোন ভাস্কর্য স্থাপিত হয়েছে মসজিদের আঙিনাতেই। যেমন দেশটির নারী ভাস্কর মাহামাল্লুহ্-এর ভাস্কর্য ‘ফুড ফর থট্‌স’স্থাপিত হয়েছে জেদ্দার ‘আল আনানি’ নামক মসজিদের সামনে। এটি স্টেনলেস স্টিল দিয়ে তৈরি। ২০১৫ সালে এর নির্মাণ কাজ শুরু হয়, শেষ হয় ২০১৬ সালে। সৌদি দেশের সংস্কৃতি অনুযায়ী তার ভাস্কর্য স্থাপন করেছে। বাংলাদেশের মানুষ কি তার দেশের সংস্কৃতি অনুযায়ী ভাস্কর্য করতে প্রস্তুত?

বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র ইন্দোনেশিয়া থেকে ঘুরে আসা যাক। মোট ইসলাম ধর্মাবলম্বীর প্রায় তের ভাগ বাস করে ইন্দোনেশিয়ায়। বারোশ শতাব্দীতে ইন্দোনেশিয়ায় ইসলাম প্রবেশ করে। ষোলশ শতকের দিকে জাভা ও সুমাত্রার অধিবাসীরা ইসলামে দীক্ষিত হয়। ইন্দোনেশিয়ায় প্রায় সাড়ে ১৭ হাজার দ্বীপ রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ৬ হাজার দ্বীপে মানুষ বসতি। এই ৬ হাজার দ্বীপের প্রায় প্রত্যেকটিতে স্থাপিত হয়েছে ভাস্কর্য। প্রচুর ভাস্কর্য রয়েছে দেশজুড়ে। এর মধ্যে বালিতে ভাস্কর্যের সংখ্যা বেশি।
ইন্দোনেশিয়ার বেশ কয়েকটি স্থানে বড় পাথরের তৈরি মেগালিথিক কিছু ভাস্কর্য আবিষ্কৃত হয়েছে। দেশটিতে নিয়াস, বাটক, আসমত, দয়াক এবং তোরাজার সংস্কৃতির আদিবাসীদের বিকাশ ঘটে। এই আদিবাসীরা কাঠ এবং পাথরকে ভাস্কর্যের মিডিয়া হিসাবে ব্যবহার করেন। 

অষ্টম থেকে পঞ্চদশ শতাব্দীতে জাভানীয় সভ্যতা পাথরের ভাস্কর্য ও স্থাপত্য তৈরি করেছে যা হিন্দু-বৌদ্ধ ধর্মীয় সভ্যতা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল। এর উদাহরণ হলো বোরোবুদুর এবং প্রাম্বানন মন্দির। বোরোবুদুরে আছে বুদ্ধের চিত্র। প্রম্বানন মন্দির প্রাঙ্গণে শিব, মহাদেব, ব্রহ্মা, বিষ্ণু, গণেশ, দুর্গা, অগস্ত্য এবং নন্দীর হিন্দু মণ্ডলও রয়েছে। জাভার প্রজ্ঞাপ্রমিতা জাভানীয় ধ্রুপদী হিন্দু-বৌদ্ধ শিল্পের একটি মাস্টারপিস, যা ১৩তম শতাব্দীতে পূর্ব জাভা সিংহাসারিতে তৈরি হয়েছিল। 

কাঠ খোদাইয়ের শিল্পটি ইন্দোনেশিয়ায় বেশ উন্নত। অসমত, দয়াক, নায়াস এবং তোরাজা অঞ্চলের আদিবাসীদের শিল্পকলায় কাঁচ এবং কাঠের খোদাই সংস্কৃতির জন্য সুপরিচিত। বালির উবুদের নিকটে মাস নামক গ্রামটি তাদের কাঠের খোদাই শিল্পের জন্য বিখ্যাত। তাদের চেষ্টার ফলেই বালিতে আজ কাঠের এবং কাঁচের একটি টেকসই পর্যটন বাজার তৈরি হয়েছে। ২০১৬ সালের জানুয়ারি মাসে ইসলামের কট্টরপন্থি একটি গোষ্ঠি দেশটির অন্তর্গত পূর্ব জাভার সিদোয়ারজো টাউন স্কয়ারের

‘জয়ানদারু’ভার্স্কযটি ভেঙে ফেলার দাবি জানায়। অথচ ভার্স্কযটি তৈরি করা হয় দেশটির অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি জেলে ও কৃষকদরে প্রতি সম্মান জানিয়ে। যারা ভাঙতে চেয়েছিল তারাও ইরাকের আইএসের  মত শিরক তথা পূজার প্রসঙ্গটি সামনে আনে। দেশটির প্রগতিশীল ব্যক্তিদের প্রতিবাদের ফলে ভার্স্কযটি এখনো ইন্দোনেশিয়ার বুকে স্বগর্বে দাঁড়িয়ে আছে। সৌদি এবং ইন্দোনেশিয়াসহ অন্যান্য মুসলিম দেশগুলো যেভাবে তাদের সংস্কৃতিকে আঁকড়ে রেখে ভাস্কর্যের চর্চা করে যাচ্ছে আমরা কি আমাদের সংস্কৃতি ধারণ করার জন্য বিন্দুমাত্র প্রস্তুত? নাকি আমরা শুধুই ধর্মের নামে কিছু ভাস্কর্য তৈরি করব?

কাকে বলে ভাস্কর্য? কী বৈশিষ্ট্য থাকলে তা ভাস্কর্য হয়? তারও তো আছে একটা ব্যাকরণ। সরাদেশে আমরা যা নির্মাণ করছি এগুলো কি আসলে ভাস্কর্য নাকি ইট আর বালু-সিমেন্টের স্তূপ। জাদুঘরে যান, বাংলার ভাস্কর্যের বৈশিষ্ট্য দেখে আসুন। তারপর শিল্পকর্ম করুন। আমাদের শিল্পের একটা গর্বিত পরম্পরা আছে। আমরা যা নির্মাণ করছি তা দেখে শিল্পে পিছিয়ে থাকা সৌদি আরবও হাসবে। আপনার যা খুশি চর্চা করার অধিকার আছে। কিন্তু দেশকে বিশ্বের সামনে, ভবিষ্যৎ ইতিহাসের কাছে হাস্যকর করে তোলার অধিকার আপনাদের কেউ দেয়নি। বাংলার সংস্কৃতি ও শিল্পচর্চার পরম্পরাকে অপমান করলে তার প্রতিজবাব পেয়ে যাবেন। বাংলার শিল্পীসমাজ, সংস্কৃতিবান মানুষ এখনও মরে যায়নি। 


লেখক : চলচ্চিত্র নির্মাতা, শিল্প সমালোচক

তারা//

আরো পড়ুন  



সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়