ঢাকা     শনিবার   ১৫ জুন ২০২৪ ||  আষাঢ় ১ ১৪৩১

‘মা লো মা’ গান নিয়ে বিতর্ক ও কুতর্ক প্রসঙ্গে

সঞ্জয় সরকার || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৭:১৬, ১১ মে ২০২৪   আপডেট: ১৮:০৫, ১১ মে ২০২৪
‘মা লো মা’ গান নিয়ে বিতর্ক ও কুতর্ক প্রসঙ্গে

কোক স্টুডিও বাংলা থেকে সম্প্রতি প্রকাশ হওয়া ‘মা লো মা ঝি লো ঝি’ গানটির গীতিকারের নাম নিয়ে তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। কোক স্টুডিও দাবি করেছে, তারা যে গানটি প্রকাশ করেছে, সেটি খালেক দেওয়ানের ভার্সন থেকে নেয়া। গানটিতে কণ্ঠও দিয়েছেন দেওয়ান পরিবারের দুই শিল্পী সাগর দেওয়ান ও আরিফ দেওয়ান। তবে রশিদ উদ্দিনের নামে গানটির আরও একটি ভার্সন আছে- এ কথাও স্বীকার করেছে কোক স্টুডিও। 

কিন্তু নেত্রকোনার সংস্কৃতিজনদের দাবি, গানটির মূল স্রষ্টা নেত্রকোনার বাউলসাধক রশিদ উদ্দিন। এ নিয়ে রীতিমতো সংবাদ সম্মেলন এবং মানববন্ধন করে প্রতিবাদ জানিয়েছেন তারা। তাদের সঙ্গে যুক্ত আছেন রশিদ উদ্দিনের পরিবারের সদস্যরাও। আর ওদিকে বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেওয়ান পরিবারের সদস্যদের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেওয়ানদের দাবি- গানটির মূল গীতিকার খালেক দেওয়ানই। দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি দাবির কারণে সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে গানটির প্রকৃত গীতিকার কে? বিষয়টি নিয়ে রীতিমতো এক ধুম্রজালের সৃষ্টি হয়েছে। তা নিয়ে গণমাধ্যমের পাশাপাশি নেট দুনিয়াতেও চলছে তুমুল বিতর্ক এবং কুতর্ক। খালেক বড় না রশিদ বড়- তাও প্রমাণের চেষ্টা করছেন কেউ কেউ! 

নেত্রকোনায় জন্ম, বেড়ে ওঠা এবং স্থায়ীভাবে বসবাসের কারণে এ গানটি আমি শৈশবকাল থেকে শুনে আসছি। বৃহত্তর ময়মনসিংহের অত্যন্ত জনপ্রিয় বাউলগান এটি। এ অঞ্চলের বাউলসঙ্গীত গায়করা প্রায় অনুষ্ঠানেই গানটি গেয়ে থাকেন। আর গানের ভণিতায় তারা বাউলসাধক রশিদ উদ্দিনের নাম উল্লেখ করেন। আমার এ টুকু জীবনে কখনও এখানকার কোনো শিল্পীকে এই গানের ভণিতায় বাউলসাধক খালেক দেওয়ানের নাম নিতে শুনিনি। বোধকরি একই অবস্থা এখানকার অন্য শ্রোতাদেরও। আমার বয়স এখনও পঞ্চাশ ছোঁয়নি। তাই অশীতিপর বৃদ্ধদের সঙ্গেও কথা বলে জেনেছি, গানটি রশিদ উদ্দিনের বলেই এতদিন ধরে তারা জেনে আসছেন। কাজেই হঠাৎ করে সৃষ্ট বিতর্কে স্থানীয় শ্রোতারা বিস্মিত হয়েছেন। 

কিন্তু তাই বলে গানটির গীতিকার সম্পর্কে স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছার জন্য এসব প্রমাণ যথেষ্ট নয়। সিদ্ধান্ত নিতে হলে প্রয়োজন উপযুক্ত প্রমাণকের। আবার দু-একটি দলিলপত্র পাওয়া গেলেই যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছা যাবে, ব্যাপারটি ঠিক সেরকমও নয়। কারণ রশিদ উদ্দিন এবং খালেক দেওয়ান কেউই আর আমাদের মাঝে নেই। এত সহজে বিষয়টি কেউ মেনে নেবেন বলেও মনে হয় না।  

দুই গানের মিল-অমিল

বিষয়টি নিয়ে ঘাঁটঘাঁটি করার আগে দুই গীতিকারের দুটি ভার্সনের দিকে একটু দৃষ্টি নিক্ষেপ করা দরকার। দেখা যায়, দুজনের গানে বাক্য ও শব্দের মিল যেমন আছে, তেমনি যথেষ্ট অমিলও আছে। কোক স্টুডিও থেকে প্রকাশিত খালেক দেওয়ানের গানের শুরুতে বলা হয়েছে:
‘মা লো মা ঝি লো ঝি
বইন লো বইন আমি করলাম কি রঙ্গে
ভাঙ্গা নৌকা বাইতে আইলাম গাঙ্গে’

আর রশিদ উদ্দিনের লেখায় আছে:
‘মা গো মা ঝি গো ঝি করলে কি রঙ্গে
ভাঙ্গা নৌকা বাইতে দিলে গাঙ্গে
গোমাই নদী নষ্ট করলো ঐ না কোলাবেঙ্গে’

অর্থাৎ দুটি গানের শুরুতেই কথার পার্থক্য সুস্পষ্ট। খালেকের গানে ‘বইন লো বইন’ বাক্যটি থাকলেও রশিদের গানে তা অনুপস্থিত। আবার ‘গোমাই নদী নষ্ট করলো ঐ না কোলাবেঙ্গে’ বাক্যটি রশিদের গানে বাড়তি সংযোজন। খালেকের গানে এ বাক্যটি নেই। এখানে আরও উল্লেখ করা দরকার, রশিদের গানে বর্ণিত গোমাই নদীটি নেত্রকোনায় এখনও বর্তমান।
খালেক দেওয়ানের গানের দ্বিতীয় প্যারায় আছে-
‘ছিলাম শিশু ছিলাম ভালা
না ছিল সংসারের জ্বালা
সদাই থাকিতাম মায়ের সঙ্গে
আমার দেহেতে আইলো জোয়ানি
উজান বহে গাঙ্গের পানি
কামিনী বসিল ভাব অঙ্গে।’

অন্যদিকে রশিদ উদ্দিনের লেখা গানের দ্বিতীয় প্যারায় আছে-
‘ভাঙ্গা নৌকায় ওঠে জল
নদী করে কলকল
কলকলাকল পারি না তার সঙ্গে
নদীর নাম কামনা সাগর
বাঁকে বাঁকে উঠে লহর
কত সাধুর ভরা ডিঙ্গা পার হয় তার তরঙ্গে।’
এখানেও দুজনের গানের কথায় একেবারেই কোনো মিল নেই। 

খালেক দেওয়ানের তৃতীয় প্যারায় আছে-
‘ছিলাম জোয়ান হইছি বুড়া
লইড়া গেছে বাঁকা-গুঁড়া
গলই-তলা যেতে চায় মোর ভেঙ্গে
ও তাই ভেবে কয় খালেক দেওয়ানে
চিন্তা করো আপন মনে
মানুষ একদিন মিশিবে মাটির সঙ্গে।’

অন্যদিকে রশিদ উদ্দিনের গানের তৃতীয় প্যারায় আছে-
‘ছিলাম শিশু ছিলাম ভালা
না ছিল সংসারের জ্বালা
হাসিতাম খেলিতাম মায়ের সঙ্গে
এই দেহে আইল জোয়ানি
গাঙ্গে আইলো নয়া পানি
কামকামিনী বসিল বাম অঙ্গে’

এখানেও খালেক দেওয়ানের গানের সঙ্গে রশিদ উদ্দিনের গানের কথার যথেষ্ট অমিল লক্ষ্যণীয়। তবে আবার খালেকের দ্বিতীয় প্যারার সঙ্গে রশিদের তৃতীয় প্যারার কিছুটা মিল যেমন আছে, তেমনি আবার কথার এবং ভাবের অমিলও আছে। খালেকের দ্বিতীয় প্যারায় আছে, ‘সদাই থাকিতাম মায়ের সঙ্গে।’ আর রশিদ তৃতীয় প্যারায় লিখেছেন, ‘হাসিতাম খেলিতাম মায়ের সঙ্গে।’ খালেক দেওয়ান দ্বিতীয় প্যারায় লিখেছেন, ‘কামিনী বসিল ভাব অঙ্গে।’ রশিদ উদ্দিন তৃতীয় প্যারায় লিখেছেন, ‘কামকামিনী বসিল বাম অঙ্গে।’

কোক স্টুডিওর গানে দেখা গেছে, খালেকের গান তৃতীয় প্যারাতেই শেষ। কিন্তু রশিদের গানে একটি বাড়তি প্যারা আছে। রশিদের চতুর্থ প্যারায় আছে-
‘ছিলাম জোয়ান অইলাম বুড়া
লইড়া গেছে বাঁকাজোড়া
গলই-গোড়া সব গিয়াছে ভেঙ্গে
রশিদ উদ্দিন বলে গানে
ভেবে দেখ আপন মনে
একদিন মিশিতে হবে মাটির সঙ্গে।’

এ প্যারাটির সঙ্গে আবার খালেকের গানের তৃতীয় প্যারার মিল আছে। খালেক তৃতীয় প্যারায় লিখেছেন, ‘গলই-তলা যেতে চায় মোর সঙ্গে।’ আর রশিদ চতুর্থ প্যারায় লিখেছেন, ‘গলই-গোড়া সব গিয়াছে ভেঙ্গে।’ খালেকের কথায় আছে, ‘মানুষ একদিন মিশিবে মাটির সঙ্গে।’ আর রশিদের কথায় আছে, ‘একদিন মিশিতে হবে মাটির সঙ্গে।’ 
কাজেই এটি মোটামুটি সুস্পষ্ট যে, দুজনের গানে মিল যেমন আছে, অমিলের পরিমাণও নেহায়েত কম নয়। আছে ভাবেরও পার্থক্য।

নেত্রকোনার সংস্কৃতিজনদের দাবি, গানটিতে বর্ণিত পরিবেশ ও গোমাই নদী ছাড়াও বেশকিছু আঞ্চলিক শব্দ আছে, যেগুলো পূর্ব ময়মনসিংহের আঞ্চলিক শব্দ হিসেবেই বিবেচিত, ঢাকা বা কেরানিগঞ্জের নয়। এ ছাড়া গানটির সুর এবং বাচনভঙ্গিতেও রয়েছে ভাটি অঞ্চলের সাংস্কৃতিক আবহ।

যুক্তির এপিঠ-ওপিঠ 

মালজোড়া বাউল গানের স্রষ্টা হিসেবে খ্যাত বাউলসাধক রশিদ উদ্দিন (১৮৮৯-১৯৬৪) ছিলেন খালেক দেওয়ানের চেয়ে ২০ বছরের বড়। ১৯২৯ সালে রশিদের ৪০ বছর বয়সে তাঁর ‘স্বররাজ লহরী‘ নামে গানের বই প্রকাশিত হয়। ধারণা করা হচ্ছে, এই বইয়ে তাঁর ‘মা গো মা ঝি গো ঝি’ গানটি মুদ্রিত ছিল। কিন্তু দুঃখের ব্যাপার হচ্ছে, ‘স্বররাজ লহরী’র কোনো কপি কারও কাছে সংরক্ষিত নেই। কাজেই বইটিতে গানটি ছাপা হয়েছিল কিনা সে সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। 

তবে রশিদ উদ্দিনের ছেলে আবু আনসার কালা মিয়াসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা বলছেন, রশিদ উদ্দিন জীবদ্দশায় নিজ গানের একটি পাণ্ডুলিপি লিখে গেছেন। অনেক আগে লেখা সেই পাণ্ডুলিপি নষ্ট হতে থাকায় সেটি অনুকরণ করে তিনটি অনুলিপি তৈরি করা হয়। রশিদ উদ্দিনের মৃত্যুর পর সে অনুলিপিগুলো তৈরি করেন তাঁর গানের অনুরাগী দলিল লেখক সুরুজ আলী। সুরুজ আলীর অনুলিখন করা পাণ্ডুলিপিতে এই গানটি রয়েছে। 

তারা আরও জানান, ২০১৩ সালে রশিদের মূল পাণ্ডুলিপি ও অনুলিপির ভিত্তিতে দুটি বই প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে ‘বাউলসাধক রশিদ উদ্দিন ও তাঁর গান’ শিরোনামে একটি বই সম্পাদনা করেছেন আবু দায়েন। ‘রশিদ গীতিকা’ নামে দ্বিতীয় বইটি সম্পাদনা করেছেন অধ্যক্ষ গোলাম মোস্তফা। দুটি বইয়েই ‘মাগো মা’ গানটি অভিন্নভাবে ছাপা হয়েছে। কিন্তু বই দুটি প্রকাশের প্রায় এক যুগেও দেওয়ান ঘরানা থেকে কোনোরূপ আপত্তি আসেনি। পরে সাইফুল ইসলাম শাহীন সম্পাদিত ‘বাউল রশিদ উদ্দিন সমগ্র’ নামে ২০২০ সালে আরও একটি বই প্রকাশিত হয়। তাতেও আছে উল্লিখিত গানটি।

প্রয়াত সংগীতশিল্পী বারী সিদ্দিকী বহুবার টেলিভিশনে তাঁর নিজ কণ্ঠে ‘মাগো মা ঝি গো ঝি’গানটি পরিবেশন করেছেন। বলা যায়, বারী সিদ্দিকীর পরিবেশনার পর গানটির ব্যাপ্তি দেশব্যাপী ছড়িয়েছে। বারী সিদ্দিকী গানটি রশিদ উদ্দিনের নামেই গেয়েছেন। তিনিও মারা গেছেন প্রায় সাত বছর আগে। তাঁর গাওয়ার পরও খালেক দেওয়ানের পরিবার থেকে কোনো অভিযোগ ওঠেনি। তাছাড়া বারী সিদ্দিকী ছাড়াও রশিদ উদ্দিনের নাম উল্লেখ করে গাওয়া আরও অনেকের গান পাওয়া যাচ্ছে ইউটিউবে। 

অন্যদিকে দেওয়ান পরিবারের কাছেও গানটি খালেক দেওয়ানের বলে দাবি করার মতো যুক্তি-প্রমাণ আছে। ওই ঘরানার শিল্পী আজাদ দেওয়ান মুক্তি একটি টেলিভিশন চ্যানেলে বলেছেন, খালেক দেওয়ান ষাটের দশকে প্রথমে হিজ মাস্টার ভয়েজ (এইচএমভি) স্টুডিওতে গানটি রেকর্ড করেন। ওই সময়ই গানটি তুমুল জনপ্রিয় হয়। সেটির রেকর্ড তাদের কাছে আছে। খালেক দেওয়ান বা মালেক দেওয়ানরা ময়মনসিংহ গিয়েও বহুবার এ গান গেয়েছেন। কিন্তু তখনও কেউ বলেননি যে, এ গানটি ময়মনসিংহের কোনো বাউলের লেখা। আবার আজাদ দেওয়ান এটিও স্বীকার করেছেন যে, খালেক দেওয়ানের গানের সঙ্গে রশিদ উদ্দিনের গানের অনেক তফাৎ আছে। হুবহু কোনো মিলই নেই। কথার মধ্যে বহু ফাঁরাক। অর্ধেকের বেশি অমিল। তার কথাতে এটি স্পষ্ট যে, মিল-অমিলের বেড়াজালের মধ্যে থাকা রশিদের গানটিও তারা স্বীকার করে নিয়েছেন।  চলমান বিতর্ককে দেওয়ান পরিবারের ওপর একটি আঘাত বলেও মনে করছেন এই গায়ক। 

একই পরিবারের উজ্জ্বল দেওয়ান ‘দেওয়ান গীতিকা’ নামে একটি বই সামনে এনে জানিয়েছেন, ‘এটি ১৯৭৫ সালে প্রকাশিত এবং তৃতীয় সংস্করণ। এর আগে আরও দুটি সংস্করণ হয়েছে। প্রথম সংস্করণটি প্রকাশ হয়েছিল ৫০এর দশকে সালমা বুক ডিপো থেকে।’ তবে প্রথম দুটি সংস্করণের কোনো কপি আমাদের সামনে নেই। কারও সংরক্ষণে আছে কি-না তাও জানা সম্ভব হয়নি। উজ্জ্বল দেওয়ান দাবি করেন, তখন থেকে এ-যাবত কাল পর্যন্ত এই গান নিয়ে কোনা প্রশ্নের সম্মুখীন হননি তারা। তিনি বলেন, খালেক দেওয়ান জীবিত অবস্থায় ১৯৯৯ সালে ‘খালেক দেওয়ান গীতি সমগ্রেও’ গানটি মুদ্রিত হয়েছে। এ ছাড়াও আরও কিছু বইয়ে গানটি খালেক দেওয়ানের নামে ছাপা হয়েছে। 

তাহলে বিতর্কের শেষ কোথায়?

উপরোক্ত আলোচনা থেকে এটি স্পষ্ট জনপ্রিয় এ বাউলগানটি উল্লিখিত দুজন গীতিকারের নামেই দুটি পৃথক অঞ্চলে প্রচলিত। নেত্রকোনাসহ বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলে গানটি প্রচলিত বাউল রশিদ উদ্দিনের নামে। আবার দেওয়ান ঘরানা প্রভাবিত ঢাকাসহ আশপাশের অঞ্চলে প্রচলিত খালেক দেওয়ানের নামে। রশিদ এবং খালেকের কথার মধ্যে মিল যেমন আছে, তেমনি আবার অমিলও যথেষ্ট। হয়তো একজনের আদলে আরেকজন দ্বিতীয় সংস্করণ করেছেন। 

মিল-অমিলের এই বেড়াজাল এবং উপযুক্ত তথ্য-প্রমাণের অপর্যাপ্ততা ও বর্তমান বাস্তবতায় সুনির্দিষ্ট কোনো একজনের নামে গানটির স্বত্ব প্রতিষ্ঠা করা এখন প্রায় অসম্ভব। বোধকরি এই অপর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার-বিশ্লেষণ করতে গিয়ে খোদ কপিরাইট অফিসও বিব্রতকর অবস্থায় পড়বে।

তাই দুটি পৃথক সংস্করণের কথা স্বীকার করে নিয়ে কোক স্টুডিও কর্তৃপক্ষ যথেষ্ট বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছে। আমাদেরও উচিত হবে তাদের মতো একই তরিকা বা পন্থা অবলম্বন করা। রশিদের ভক্তরা যদি রশিদের মতো করে, খালেকের ভক্তরা যদি খালেকের মতো করে গায়- তাতে অসুবিধাটা কোথায়? গানটা যে আমাদের দেশেরই- এ কথা তো ঠিক। সুতরাং বিতর্ক বাড়িয়ে লাভ কি? শেষ পর্যন্ত সুরাহাই-বা কোন পথে হবে? 

কুতর্ক কেন?

সাধক মহাজনদের গান নিয়ে এমন বিতর্ক নতুন নয়। এর আগেও বহুবার হয়েছে। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির বদৌলতে খুব সহজেই মানুষ এসব বিতর্কে অংশগ্রহণ করতে পারছেন। কেউ কেউ তথ্যপ্রমাণ হাজির করে যুক্তি খণ্ডনেরও চেষ্টা করছেন। ‘মা লো মা’ গানটি নিয়েও অনুরূপ বিতর্ক চলছে। এখন কোনো পক্ষ যদি কপিরাইট অফিসের শরণাপন্ন হন, তবে হয়তো কোনো সুরাহা আসতে পারে। আবার উপযুক্ত প্রমাণাদি না পেলে সুরাহা নাও হতে পারে।  

কয়েক বছর আগে কামরুজ্জামান রাব্বীর গাওয়া ‘আমি তো ভালা না/ ভালা লইয়া থাইকো’ গানটির গীতিকার নিয়েও অনুরূপ বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল। টিটু পাগল ও মাহতাব শাহ নামে দুজন গানটির মালিকানা দাবি করেছিলেন। বিষয়টি কপিরাইট অফিস পর্যন্ত গড়ালে কর্তৃপক্ষ টিটু পাগলের পক্ষে রায় দেয়। কিন্তু পরবর্তীতে আবার আজাদ মিয়া নামে আরেক বাউলও গানটির স্বত্ব দাবি করে বসেন। প্রমাণক হিসেবে তিনি প্রায় ৩০ বছর আগে প্রকাশিত তার একটি গানের ক্যাসেট সামনে আনেন। আজাদ মিয়া এখন প্রয়াত। ফলে বিষয়টির ‘শেষ হয়েও হইলনা শেষ’ অবস্থায় থেকেই গেল।

আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, এ দেশে অসংখ্য লোকগান আছে, যেগুলোর গীতিকারের নাম আমাদের জানা নেই। কিন্তু বড় বড় শিল্পীরা গানগুলো গাইছেন। গীতিকারের নাম উল্লেখ না করে তারা বলছেন ‘সংগৃহীত’। ‘মা লো মা’ গানটির ক্ষেত্রে অন্তত এই ‘সংগৃহীত’ কথাটি আমাদের বলতে হচ্ছে না। কোনো সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত কেউ চাইলে খালেক দেওয়ানের সংস্করণ অনুসরণ করে গাইতে পারবেন। আবার কেউ চাইলে রশিদ উদ্দিনের সংস্করণ অনুসরণ করেও গাইতে পারবেন। যেহেতু দুজনের কথায় শব্দ ও বাক্যের পার্থক্য আছে, সেহেতু আপাতত সংস্করণ দুটি দুজনের নামে মেনে নিলেই বা ক্ষতি কী?

মনে রাখতে হবে, শুধু রশিদ উদ্দিন আর খালেক দেওয়ানের একটি গানের ক্ষেত্রেই এমনটি ঘটেনি। অনেক লোকগানে এমন বাক্য ও শব্দের মিল পাওয়া যায়। আসলে আগের বাউল মহাজনদের বেশিরভাগ প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া জানতেন না। খুব কম বাউলেরই জীবৎকালে গানের বই প্রকাশ হয়েছে। আবার যারা সামান্য লেখাপড়া জানতেন তারা দু-একটি বিবর্ণ খাতায় নিজের লেখা গান যেমন টুকে রাখতেন, তেমনি অন্যের লেখা যে গানটি তিনি সচরাচর পরিবেশন করতেন, সেটিও টুকে রাখতেন। পরবর্তীতে তাদের মৃত্যুর পর দেখা গেছে, পরিবারের সদস্যরা সবগুলো গানকেই তাদের পরিবারের মহাজনের লেখা বলে দাবি করেছেন। কেউ কেউ আবার ভালোভাবে যাচাই না করে ছেপেও দিয়েছেন। 

আবার গানের ভণিতায় কার নাম গেল বা না গেল- সেটি নিয়ে প্রাচীন বাউল মহাজনদের মধ্যে খুব একটা বাহাস হতে কখনও শুনিনি আমরা। দেখা গেছে, যার লেখা গান তার উপস্থিতিতেই অন্য এক বাউল ভণিতায় নিজের নাম যুক্ত করে পরিবেশন করেছেন। এটি বাউলগানের খুব সাধারণ একটি রেওয়াজ। এতে কেউ কিছু মনে করেননি কখনও। এতটা মানসিক দৈন্য তাদের মধ্যে ছিল না। খ্যাতির পিছনে না ছুটে তারা দেহতত্ত্বের সাধনাতেই নিমগ্ন থেকেছেন বেশি। ইহজাগতিক বিষয়গুলোকে যতোটা পেরেছেন এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেছেন। আর আমরা এখন তাদের নিয়ে বাহাসে লিপ্ত হচ্ছি! 

অত্যন্ত পরিতাপের সঙ্গে লক্ষ্য করছি, ‘মা লো মা’ গানটি নিয়ে বিতর্ক শুরু হওয়ার পর কেউ কেউ রীতিমতো কুতর্কে লিপ্ত হয়েছেন। একজনকে বড় করতে গিয়ে আরেকজনকে টেনে হিঁচড়ে রীতিমতো হেয় প্রতিপন্ন করার অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছেন। বিতর্ককে উস্কে দিতে অপ্রাসঙ্গিক অনেক ইস্যু সামনে এনে হাজির করছেন। মজার ব্যাপার হচ্ছে, আলোচিত দুই মহাজনই প্রয়াত। কেউ জীবিত অবস্থায় এ বিতর্কে জড়াননি। কাজেই তাদের অনুপস্থিতিতে একজনকে উচ্চ আসনে বসাতে গিয়ে আরেকজনকে টেনে নামানোর কুতর্ক ব্যক্তি বিশেষের মানসিক দৈন্যের পরিচয়। মনে রাখতে হবে, দুজনেরই অসংখ্য গান আছে যা আমাদের লোকসঙ্গীতের ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করেছে। তাদের গান আমাদের অমূল্য সম্পদ। তাদের সৃষ্টির কারণেই আমাদের লোকগান এত বৈচিত্র্যময় ও আকর্ষণীয়।  

লেখক : লোকসংস্কৃতি গবেষক

তারা//

আরো পড়ুন  



সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়