ঢাকা     শুক্রবার   ১৯ জুলাই ২০২৪ ||  শ্রাবণ ৪ ১৪৩১

রাজধানীতে বিভিন্ন এলাকায় পানির তীব্র সংকট 

মেসবাহ য়াযাদ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ২১:৪৪, ১৯ মার্চ ২০২৪  
রাজধানীতে বিভিন্ন এলাকায় পানির তীব্র সংকট 

ঢাকা ওয়াসার পানির পাম্প

রমজান মাসে পানির চাহিদা অন্য সময়ের তুলনায় বেশি থাকে। অথচ, চলতি রমজান মাসে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় পানির তীব্র সংকট বিরাজ করছে। টাকা দিয়েও পানি কিনতে না পারায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন নগরবাসী।

প্রতিবছর গরমের সময় রাজধানীর প্রায় সর্বত্রই ওয়াসার পানি সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেয়। পানির সংকট সাধারণত এপ্রিল ও মে মাসে দেখা দিলেও এবারের চিত্র ভিন্ন। এ বছর মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময়েই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর সেন্ট্রাল রোড, হাতিরপুল, শেওড়াপাড়া, বাড্ডা, রামপুরা, মেরুল, মালিবাগ, বাসাবো, মুগদা, লালবাগ ও পুরান ঢাকার কিছু এলাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় ছয়-সাত দিন ধরে পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। রমজান মাসে পানির তীব্র সংকটের কারণে গোসল, অজু করা, জামা-কাপড় ধোওয়া থেকে শুরু করে রান্না করা, রমজানের ইফতার তৈরি করাসহ দৈনন্দিন কাজ সারতে না পেরে এক ধরনের মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন এসব এলাকার লাখো বাসিন্দারা। তারা পানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ওয়াসার প্রতি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

দৈনন্দিন চাহিদামতো পানি পাওয়া যাচ্ছে না। রাতে সামান্য পানি পাওয়া গেলেও সে পানিতে ময়লা থাকে। চাহিদা মেটাতে এসব এলাকার বাসিন্দারা বারবার ওয়াসার গাড়ির মাধ্যমে পানি নেওয়ার জন্য ফোন করলেও সময়মতো পানি পাচ্ছেন না। ঢাকা ওয়াসার আওতায় ১০টি মডস জোনে পানির চাহিদা জানানো হলে বিশেষ গাড়ির মাধ্যমে বাসা বাড়িতে পানি পৌঁছে দেওয়া হয়। সেক্ষেত্রে প্রতি ছয় হাজার লিটারের একটি বড় গাড়িভর্তি পানির জন্য নেওয়া হয় ৬০০ টাকা। কিন্তু, চাহিদা অনেক বেশি থাকায় ফোন করেও এসব পানির গাড়ি পাচ্ছেন না পানি সংকটে ভোগা এলাকার বাসিন্দারা। ৬০০ টাকার জায়গায় ১ হাজার টাকা দিয়েও সিরিয়াল পাচ্ছেন না তারা। আর পানির চাহিদা বেশি থাকায় গ্রাহকদের কাছ থেকে গাড়ির দায়িত্বে থাকা কর্মচারীরা বেশি টাকা দাবি করছেন বলেও অভিযোগ করেছেন অনেক বাসিন্দা।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অসময়ে, বিশেষ করে রমজানের সময়ে পানির তীব্র সংকটের কারণ হিসেবে ঢাকা ওয়াসার পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সার্বিকভাবে ওয়াসার পানি সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই। তবে, গরম এবং রমজানের কারণে রাজধানীবাসীর পানির চাহিদা বেড়েছে কয়েক গুণ। ওয়াসা স্বীকার করেছে, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ায় গভীর নলকূপের মাধ্যমে পানি উত্তোলন কিছু কিছু জায়গায় কম হচ্ছে। এ কারণে কিছু এলাকায় পানির সংকট দেখা দিয়েছে। এছাড়া, কিছু কিছু এলাকায় ওয়াসার গভীর নলকূপ কম থাকায় সেসব এলাকার বাসিন্দাদেরকে কিছুটা পানির সংকট পোহাতে হচ্ছে। তবে, ওয়াসা এ বিষয়ে কাজ করছে। তারা আশা করছেন, দুই-চার দিনের মধ্যে এ সমস্যার সমাধান হবে।

রাজধানীর সেন্ট্রাল রোডের গৃহিণী মনোয়ারা আক্তার বলেন, ছয়-সাত দিন ধরে আমাদের বাসা ছাড়াও আশপাশের এলাকায় ওয়াসার লাইনে কোনো পানি সরবরাহ নেই। ওয়াসার মডস জোনে যোগাযোগ করে পানি আনার চেষ্টা করছি। ৬০০ টাকার পানি আনতে ১ হাজার টাকা লেগে যাচ্ছে। তারপরও চাহিদামতো পানি পাওয়া যাচ্ছে না। রোজার প্রথম দুই-তিন দিন কোনো পানি পাইনি। দোকান থেকে পানি কিনে চলেছি। পানির চাহিদা বাড়াতে ৫ লিটার বোতলের পানি ৯০-১০০ টাকা এবং ৮ লিটারের বোতল ১৪০-১৫০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। গত ৩-৪ দিন যাবৎ মধ্যরাতে এক গাড়ি করে পানি কিনে চলছি। সে পানিও আবার ঘোলা।

মেরুল বাড্ডার বাসিন্দা কনক বলেন, রমজানে পানির চাহিদা অন্যসময়ের তুলনায় বেশি। অথচ, নিয়মিত পানির যে সরবরাহ, সেটাও পাচ্ছিনা ৪-৫ দিন ধরে। কত আর পানি কিনে চলা যায়? ওয়াসার লাইনে পানি একদম আসে না। পানি ছাড়া রোজার সময় কীভাবে চলি? পুরো এলাকার বাসিন্দারা খুব কষ্টে আছি। বারবার ওয়াসার সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। কিন্তু, এখনো পানি সরবরাহ ঠিক হয়নি।

শেওড়াপাড়ার বাসিন্দা তারেকুল ইসলাম অভিযোগ জানিয়ে বলেন, রমজান মাসে ইফতার ও সেহরিসহ অন্যান্য কাজে বাসায় প্রচুর পানির প্রয়োজন হয়। কিন্তু, আমাদের কী দুর্ভাগ্য! রমজান মাসেও আমরা ঠিকমতো পানি পাচ্ছি না। অনেকবার ফোন করার পর গভীর রাতে একবার করে পানির গাড়ি আসে, সেই পানি কিনে কোনোভাবে চলছি। পানি না থাকলে কেমন ভয়ঙ্কর অবস্থা হতে পারে, তা আমরা এখন বুঝতে পারছি। আশপাশের বাসার মালিকরা মিলে বারবার ওয়াসার সঙ্গে যোগাযোগ করছি, তারপরও পানির সমস্যা সমাধান হচ্ছে না।

রাজধানীর বিভিন্ন এরাকায় রোজার শুরু থেকে পানির সংকটের বিষয়টি সরাসরি স্বীকার না করে ঢাকা ওয়াসার উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে এম সহিদ উদ্দিন বলেন, সার্বিকভাবে ঢাকা শহরে পানির সংকট নেই। তবে, কিছু কিছু এলাকায় সাময়িক সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। আমরা সেসবের জন্য কাজ করছি। আশা করছি, খুব দ্রুত এ সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা ওয়াসার এক কর্মকর্তা বলেন, সার্বিকভাবে পানি সরবরাহে ঘাটতি নেই। তবে, গরম ও রমজানের কারণে ঢাকায় পানির চাহিদা বেড়েছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ায় গভীর নলকূপের মাধ্যমে পানির উৎপাদন কিছু কিছু জায়গায় কম হচ্ছে। মূলত, সেসব এলাকাতেই পানির সংকট দেখা দিয়েছে। রাজধানীর যেসব স্থানে পানির সমস্যা দেখা দিয়েছে, আমরা সেখানে রেশনিং পদ্ধতিতে পানি সরবরাহের চেষ্টা করছি।

ঢাকা ওয়াসা দাবি করছে, চাহিদার তুলনায় বেশি পানি উত্তোলনের সক্ষমতা রয়েছে তাদের। অন্যান্য সময় বা শীতকালে রাজধানীতে দৈনিক পানির চাহিদা থাকে ২১০ কোটি লিটার থেকে ২৩০-২৪০ কোটি লিটার। গরমকালে যা বেড়ে ২৬০ কোটি লিটারে দাঁড়ায়। বর্তমানে ঢাকা ওয়াসার প্রতিদিন প্রায় ২৯০ কোটি লিটার পানির উৎপাদনের সক্ষমতা আছে। বর্তমানে চাহিদা অনুযায়ী প্রতিদিন গড়ে ২৬০ কোটি লিটার পানি উৎপাদন করছে ঢাকা ওয়াসা। সার্বিকভাবে পানি সরবরাহের কোনো সমস্যা নেই। তবে, কিছু কিছু এলাকায় পানি সরবরাহের সাময়িক সমস্যা হচ্ছে। সেটাও দ্রুত নিরসন হয়ে যাবে।

ঢাকা ওয়াসা সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে ঢাকা ওয়াসার পানি শোধনাগার পাঁচটি থাকলেও সংস্থাটি পানি পাচ্ছে চারটি শোধনাগার থেকে। উপরিতলের পানির উৎপাদন ৭০ শতাংশে উন্নীত করার কথা থাকলেও সেই লক্ষ্য এখনও পূরণ করতে পারেনি ঢাকা ওয়াসা। বর্তমানে উপরিতলের পানি পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৩৫ শতাংশ। বাকি ৬৫ শতাংশ পানি তারা পাচ্ছে ভূগর্ভ থেকে।

/রফিক/

আরো পড়ুন  



সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়