ঢাকা, সোমবার, ২২ আষাঢ় ১৪২৭, ০৬ জুলাই ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

গুজবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার প্রবণতা

কবীর চৌধুরী তন্ময় : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৫-২৮ ৯:৪৮:৪৪ এএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৬-২৪ ১:৩১:২৫ পিএম

বাংলাদেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত প্রথম রোগীর খোঁজ মেলে গত ৮ মার্চ। আর তার দশ দিনের মাথায় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে প্রথম মৃত্যু ঘটে। আর ২৭ মে পর্যন্ত আইইডিসিআর-এর তথ্য মতে বাংলাদেশে মোট করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন ৩৮ হাজার ২৯২ জন, সুস্থ হয়েছেন ৭ হাজার ৯২২ জন। অন্যদিকে এ পর্যন্ত মৃত্যুর সংখ্যা ৫৪৪ জনে পৌঁছেছে।

করোনাভাইরাস নিয়ে বাংলাদেশে অপরাজনীতি রীতিমত চোখে পড়ার মতো! শুরু থেকে এক শ্রেণীর মানুষ প্রথম গুজব ছড়ালো- জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশত বার্ষিকীর অনুষ্ঠান পালন করতে সরকার পরিকল্পিতভাবে হাজার-হাজার করোনারোগীর তথ্য লুকিয়েছে। দেশে করোনাভাইরাস আছে কিন্তু অনুষ্ঠানের জন্য প্রকাশ করা হচ্ছে না। ছোট্ট একটি অডিও বার্তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিশেষ করে ফেসবুকের ইনবক্সে পাঠিয়ে মানুষকে উল্টো পথে চলতে বিভ্রান্ত করেছে। একজন বিতর্কিত শিক্ষক তার মনগড়া গাণিতিক সংখ্যা দিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে দেশে হাজার-হাজার করোনাভাইরাস আক্রান্তের  রোগী আছে (!) বলে কৌশলে ওই গুজবের পক্ষে ‘আরও গুজব’ চাপিয়ে দিয়েছে, মিথ্যা তথ্য ভাইরাল করেছে!

প্রথম যারা গুজব ছড়িয়েছে, যারা ওই গুজবে কান দিয়েছে এবং যারা ঘুরিয়ে পেচিয়ে ওই গুজবের পক্ষে নিজেদের অবস্থান শক্ত করে নানা কথায় তর্ক করেছে- এই ধরনের অনেকের ডেটা আমি নিয়েছি। পরিচিত যারা ছিল, তাদের কিছু তথ্য তো আগেই জানা ছিল। আর আমাদের টিম যেসব মানুষের তথ্য সংগ্রহ করেছে- সংবাদকর্মী, সাংবাদিক, সম্পাদক, সাংবাদিক নেতা, আইনজীবী, লেখক, শিক্ষক, রাজনীতিক, সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়িকসহ রীতিমত সব শ্রেণী-পেশার মানুষকে পেয়েছি।

টক-শোতে জাতিকে উপদেশ দিয়ে বেড়ায়, কথায়-কথায় সরকারের চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করে এমন লোকের পাশাপাশি কতিপয় কলাম লেখক, গবেষকও গুজবে কান দিয়ে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। আমাদের কাজের অংশ হিসেবে তথ্য-উপাত্ত যাচাই করতে গিয়ে শুধু হতাশা ছাড়া আর কিছুই সংগ্রহ করতে পারিনি। অন্যদিকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যারা হম্বিতম্বি করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করতে চেয়েছিল- বিশ্ব মহামারি করোনাভাইরাস মোকাবিলায় তাদের কার্যক্রম বা অবদান কী? এটিও আমাদের হতাশ করেছে।

করোনাভাইরাস মোকাবিলায় নেতা, নেতৃত্ব বলতে একমাত্র শেখ হাসিনাই মাঠে আছেন। বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষকে সুরক্ষিত করতে, খাদ্য সহায়তাসহ ভবিষ্যৎ চিন্তা-ভাবনাও একমাত্র শেখ হাসিনার নির্দেশনায় ফুটে উঠেছে। অনেক প্রতিকূল আর অব্যবস্থাপনার মাঝেও শেখ হাসিনাই আত্মবিশ্বাসী হয়ে দৃঢ় চিত্তে এগিয়ে এসেছেন। সরকার প্রধানের রুটিন কর্মকান্ডের বাইরেও তিনি ওয়ার্ড-ইউনিয়নের খবর পর্যন্ত নিয়েছেন। যেখানে যা প্রয়োজন ধীরে-ধীরে সেখানে ব্যবস্থা করার নির্দেশ দিয়েছেন, পরবর্তীতে পুনরায় খোঁজ নিয়েছেন, তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। এসবই দেশে করোনাসৃষ্ট ভয়াবহ বিপর্যয় ঠেকাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

কাজের অংশ হিসেবে আমরা অনেক ব্যক্তি বিশেষের খোঁজখবর নিতে গিয়ে তাদের জাত চিনতে সক্ষম হয়েছি। তবে আশার কথা, কয়েকজন গুজবকারীকে সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ইতোমধ্যে গ্রেফতারও করেছে। এখানে একশ্রেণীর মানুষ পরিকল্পিতভাবে গুজব ছড়িয়েছে- এটা জাত স্বভাব বলতে পারেন। এরা ৪৭, ৭১-এর পরে ৭৫-এ এদেশে রাজনীতির পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায়ও অধিষ্ঠিত হয়েছে। তাই, গুজব তাদের স্বভাবজাত।

কিন্তু যারা ওই গুজবে কান দিয়েছে, গুজবের পক্ষে কথা বলেছে- এরকম অনেকের ডেটা বলে, চোরে চোরে মাসতুতো ভাই। কিন্তু এরা আবার সমাজ-রাষ্ট্রে ‘ব্রিটিশ পোশাক’ পরে বড় বাবু বা ভদ্রতার মুখোশ পরে বসে আছে। তাই অনেক সময় তাদের প্রকৃত জাত চেনা কঠিন হয়ে পড়ে। যে কারণে তাদের মন ভোলানো কথায় বা মিথ্যে অভিনয়ে অনেকে বিভ্রান্ত হন। কিন্তু ‘ল্যাঞ্জা ইজ ভেরি ডিফিকাল্ট টু হাইড’ মানে ‘সত্যিকারের স্বাভাব’ আসলেও লুকানো কঠিন। কথাগুলো এভাবে বলতে চাইনি। কিন্তু ওইসব গুজব দেশ ও জাতির কতটুকু ক্ষতি করেছে, সাধারণ মানুষকে কতটুকু বিভ্রান্ত করেছে- খালি চোখে বুঝে ওঠা কঠিন!
যেভাবে করোনাভাইরাস ট্রান্সমিশন হয়েছে বা হচ্ছে, নাগরিক সচেতনতার অগ্রভাগে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ওই গুজব।

এদেশে করোনাভাইরাস আসবে না, মুলসমানদের করোনাভাইরাস কিচ্ছু করতে পারবে না, এটা ইহুদিদের জন্য, কাফেরদের জন্য- ইত্যাদির সাথে যুক্ত হয়েছে ওয়াজ-মাহফিলের নামে মানুষকে ভ্রান্ত পথে পরিচালিত করতে কতিপয় আলেম ওলামা নামের বিতর্কিত ব্যক্তিদের উসকানিমূলক বক্তব্য। এসব সাধারণ মানুষকে করোনাভাইরাস সম্পর্কে গুরুত্বহীন করে তুলেছে! সাধারণ মানুষ ভাবলেশহীনভাবে চলাফেরা করছে। ঈদ মার্কেটে জনসমাগম, ঈদের আগে বাড়িতে যাওয়ার দৃশ্য- এগুলো করোনাভাইরাসকে তোয়াক্কা না করারই বহিঃপ্রকাশ!

৭৫ পরবর্তী রাষ্ট্র ক্ষমতা, রাজনীতি আর স্বাধীনতাবিরোধী, বঙ্গবন্ধু হত্যাকারীদের বানানো মিথ্যা ইতিহাস স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে এক শ্রেণীর সাধারণ মানুষকে এতোটাই ভুল পথে পরিচালিত করেছে যে যার খেসারত দেশের প্রতিটি ক্রান্তিলগ্নে দিতে হচ্ছে। এখানে সরকার স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য যতই বিধিবিধান বা নিধিনিষেধ জারি করুক- আমার জীবন আমার হাতে, আমার মৃত্যুও আমার হাতে। তাই আমাকে বেঁচে থাকতে হলে আমাকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমাদের সচেতনতা, আমাদের আলোর পথের দিশারী। বিশ্ব মহামারি করোনাভাইরাস মোকাবিলায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, আইইডিসিআর ও সরকারের স্বাস্থ্য সুরক্ষার গাইড লাইনই বাঁচার একমাত্র অবলম্বন।

লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশ অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ফোরাম (বোয়াফ)


ঢাকা/তারা