ঢাকা, বুধবার, ২ কার্তিক ১৪২৪, ১৮ অক্টোবর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

দায় মুশফিককেই নিতে হবে || দেবব্রত মুখোপাধ্যায়

দেবব্রত মুখোপাধ্যায় : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-১০-১১ ১:৪৭:১৩ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-১০-১২ ৫:১৭:৫৫ পিএম

মুশফিকুর রহিম আদর্শ ক্রিকেটার। মাশরাফি বিন মুর্তজা, সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবাল- যাকেই জিজ্ঞেস করবেন- আদর্শ ক্রিকেটার কে? উত্তর পাবেন মুশফিকের নাম। এমন শৃঙ্খলাপরায়ণ, এমন পরিশ্রমী এবং এমন নিবেদিতপ্রাণ ক্রিকেটার আপনি সহজে খুঁজে পাবেন না।

শুধু আদর্শ ক্রিকেটার নন; মুশফিক বাংলাদেশের সেরা ব্যাটসম্যানদেরও একজন বটে। তারপরও বাংলাদেশে এখন মনে হয় সবচেয়ে আলোচিত ও সমালোচিত ক্রিকেটার মুশফিকুর রহিম। আর এখানেই একটা ফাঁক আছে। আলোচনা বা সমালোচনাটা ক্রিকেটার মুশফিককে নিয়ে নয়, এই সব ঝড় চলছে আসলে অধিনায়ক মুশফিককে নিয়ে।

অধিনায়ক মুশফিককে নিয়ে সমালোচনাটা আজকের নয়। মাঠে তার নিস্পৃহ থাকা, সতীর্থদের অনুপ্রাণিত করতে পারার বদলে নিজেই ভেঙে পড়া; এগুলো পুরোনো সমালোচনা। পাশাপাশি মুশফিকের অনফিল্ড অধিনায়কত্বের স্টাইল নিয়েও আছে জোর সমালোচনা। তিনি অধিনায়ক হিসেবে খুবই রক্ষনাত্মক এবং তার স্টাইল খুবই অনুমেয়। নতুন কিছু করা বা আক্রমণাত্মক কোনো চাল দিয়ে ম্যাচের মোড় ঘোরানোর মতো ব্যাপার তার ভেতর নেই।  কিন্তু ওই যে বললাম, এসব পুরোনো কথা। তাহলে আবার নতুন করে আলোচনাটা তৈরি হলো কেনো?

মুশফিকের বিপক্ষে এই দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজে বড় সমালোচনা হলো, পরপর দুই টেস্টেই টসে জিতে বোলিং করার সিদ্ধান্ত নেয়া। প্রথম টেস্টে একেবারে নিখাঁদ ব্যাটিং উইকেটে মুশফিকের নেয়া এই সিদ্ধান্ত চমকে দিয়েছিলো খোদ বোর্ড সভাপতিকেও। এরপর দ্বিতীয় টেস্টে, যেখানে প্রথম দুই ঘণ্টা ব্যাটিং করতে একটু সাহস দরকার ছিলো, সেই উইকেটেও একই সিদ্ধান্ত নেন মুশফিক। দুই টেস্টেই তিনি বলেছেন, বোলারদের তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার কন্ডিশন কাজে লাগানোর সুযোগ দিতে চেয়েছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দুটি টেস্টের কোনো টেস্টে ‘দক্ষিণ আফ্রিকার কন্ডিশন’ বলতে যা বোঝায়, তেমন বাউন্সি ও সবুজ ঘাসের উইকেট ছিলো না। এখানে মনে করা হচ্ছে, মুশফিক আসলে ব্যাটসম্যানদের ওপর ভরসাই রাখতে পারেননি। তিনি ভয় পেয়েছেন যে, আগে ব্যাট করলে আরও দ্রুত শেষ হয়ে যেতে পারে তাদের ইনিংস।
এর চেয়েও বড় সমালোচনা হলো- মুশফিকের কথাবার্তা।

প্রথম টেস্টে তিনি সংবাদ সম্মেলনে এসে বোলারদের সরাসরি আক্রমণ করে বসেন। মুশফিক সেখানে বোলারদের আন্তরিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। দ্বিতীয় টেস্টের প্রথম দিন শেষে সংবাদ সম্মেলনে এসে হাজির হন অধিনায়ক। সেখানে আবারও বোলারদের নিয়ে নেতিবাচক কথা বলেন। সেখানে বলেছেন, তিনি অধিনায়ক হিসেবে বোলারদের অনুপ্রাণিত করতে হয়তো ব্যর্থ হচ্ছেন। এভাবে সংবাদ সম্মেলনে নিজের অসহায়ত্ব স্বীকার করাটাও সহজভাবে নিচ্ছে না বোর্ড। তবে আরও গুরুতর হয়ে উঠেছে দুটো ব্যাপারে তিনি নিজের ‘স্বাধীনতা নেই’ এমন ইঙ্গিত দেয়ায়। টসের ব্যাপারে বলতে গিয়ে বলেছেন, টস জেতাটাই ভুল ছিলো। এতে মনে হয়েছে, টস জেতার পর যে সিদ্ধান্ত তিনি নিয়েছেন, সেটা তারও পছন্দের সিদ্ধান্ত নয়। আরও ভয়ানক ব্যাপার হলো, নিজে বাউন্ডারির কাছে ফিল্ডিং করার প্রসঙ্গে বলেছেন, টিম ম্যানেজমেন্ট এটা চায়; তারা মনে করে মুশফিক ভালো ফিল্ডার নন।

এখানে দুটো পক্ষ তৈরি হয়েছে। এক পক্ষ সরাসরি মনে করছেন, ড্রেসিংরুমে বা ম্যানেজমেন্টের কাছে বলার কথা মিডিয়াতে বলে মুশফিক অন্যায় করেছেন। আরেক পক্ষ বলছেন, ম্যানেজমেন্ট, তথা কোচ চান্দিকা হাতুরুসিংহে এতোটাই স্বৈরাচারী হয়েছেন যে, সেখানে কথা বলাটা অর্থহীন মনে করেই মুশফিক মিডিয়াতে বলেছেন।
প্রথমে বলা যাক, অবশ্যই ভেতরের আলাপ বাইরে করাটা মুশফিকের অন্যায় হয়েছে। তবে এটা অনেকদিন ধরে বাংলাদেশের ক্রিকেটের একটা নতুন সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। ভেতরের আলাপ ইদানিং আরও বড় বড় পদাধিকারীরা এমন করে বাইরেই বলেছেন। প্রত্যেকে অন্যায় করেছেন। মুশফিকও অন্যায় করেছেন। এসব আলাপ মিডিয়াতে করলে সাংবাদিক হিসেবে আমরা খুশী হই। কারণ, গরম খবর পাওয়া যায়। কিন্তু দলীয় শৃঙ্খলাটা একেবারেই শেষ হয়ে যায়।

দ্বিতীয়ত চান্দিকা হাথুরুসিংহে। হ্যাঁ, আমরা স্বীকার করি যে, এই সফল কোচ বেশ কিছুদিন ধরেই একজন স্বৈরাচারী ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছেন। তার কাছে অন্য কারো মতই ‘মত’ নয়। তাকে এই অবস্থায় নিয়ে যেতে বোর্ড একটার পর একটা সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। হাতুরুসিংহের সমালোচনার শেষ নেই। কিন্তু সেই সমালোচনার অর্থ এই নয় যে, টেস্ট অধিনায়ক সংবাদ সম্মেলনে এসে বলবেন, নিজের ফিল্ডিং করার স্বাধীনতা নেই। এটা তাকে ভেতরে বলতেই হবে। বলে বলে লড়াই করতে হবে। লড়াইতে একেবারে না পারলে আগে পদত্যাগ করতে হবে। তারপর এসব কথা বলা যাবে। পদে থেকে আপনি কখনো নিজের সৈন্যদের এবং নিজের কর্মকর্তাদের সমালোচনা করতে পারেন না। এটা চেইন অব কমান্ড নষ্ট করে দেয়।

লেখক: কথাশিল্পী, ক্রীড়া সাংবাদিক

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/১১ অক্টোবর ২০১৭/তারা

Walton
 
   
Marcel