ঢাকা     শনিবার   ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ||  ফাল্গুন ১১ ১৪৩০

নবীন লেখকেরা ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে রাজি নয় : রফিকুর রশীদ

মুজাহিদ বিল্লাহ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১০:৪৮, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৩   আপডেট: ১০:৫০, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৩
নবীন লেখকেরা ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে রাজি নয় : রফিকুর রশীদ

তিন যুগেরও অধিক সময় সাহিত্যচর্চা করছেন রফিকুর রশীদ। তাঁর গল্পে এ দেশের গ্রামজীবনের চিত্র ভিন্নমাত্রায় উপস্থাপিত হয়েছে। তিনি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গল্প ও উপন্যাস লিখে পাঠকপ্রিয় হয়েছেন। প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা শতাধিক। গল্প, উপন্যাস ছাড়াও শিশুদের জন্য ছড়া, কিশোর-কবিতা লিখেছেন। শিশুসাহিত্যে বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত রফিকুর রশীদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মুজাহিদ বিল্লাহ

মু. বি.: আপনার শিশুসাহিত্যিক হয়ে ওঠার গল্পটা শুনতে চাই। 

রফিকুর রশীদ : আমার বেড়ে ওঠা থানা শহর গাঙনীতে। সেখান থেকে চার কিলোমিটার দূরে আমাদের বাড়ি। বাবা লেখাপড়া জানতেন। তিনি  খুব একটা বই না-পড়লেও মা পড়তে ভালোবাসতেন। মা আমাকে স্কুলের লাইব্রেরি থেকে বই আনতে বলতেন। প্রথমদিন স্কুলে গিয়ে স্যারকে বইয়ের কথা জিজ্ঞেস করলে তিনি ধমক দিয়ে বললেন, বই পড়বি? ক্লাসের বই পড়তে পারো না আবার লাইব্রেরির বই। কিন্তু যখন আমি বললাম, আমার মা পড়বে। তখন তিনি বই দিলেন। তো মার জন্য স্কুল থেকে বই নিয়ে আসতাম, পড়া শেষে আবার দিয়ে আসতাম। ধীরে ধীরে মনে হলো কী লেখা আছে এই বইয়ে? সেই কৌতূহল থেকে আমার বই পড়া শুরু। সময়টা তখন ১৯৬৭ বা ৬৮ হবে।

তবে শিশুসাহিত্যিক হবো এমন ভাবিনি। সাহিত্যিক হতে চেয়েছি। মুক্তিযুদ্ধের সময় স্কুল বন্ধ ছিলো। তখন আরো বেশি করে বই পড়ার  সুযোগ পেলাম। কবিতা খুব ভালো লাগতো। বিশেষ করে অন্তমিলের কবিতাগুলো। মনে হতো জসীমউদদীনের ‘কবর’ কি আমি লিখতে পারি না? এভাবেই যাত্রা শুরু। এরপর দেশ স্বাধীন হলো। মেহেরপুর কলেজে ভর্তি হলাম ১৯৭৩ সালে। কলেজের লাইব্রেরিতে অনেক বই ছিল। বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলাম। কিন্তু মানিক, শরৎ, বিভূতিভূষণ পড়তে গিয়ে দেখি কেমিস্ট্রি- ফিজিক্স ভালো লাগছে না। আমি ঠিক করলাম, বাংলায় অনার্স পড়বো। সাহিত্য পাঠেই আমার আনন্দ। 

এরপর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৭৫ সালে যখন পড়তে এলাম, তখন বঙ্গবন্ধু নিহত হয়েছেন, কেউ মুখ খুলে কথা বলে না। তখন আমরা নাটক শুরু করলাম, কবিতা শুরু করলাম এবং স্লোগান দেওয়া শুরু করলাম- সেটাই আমার লেখার প্রস্ততিপূর্ব। লিখতে গিয়ে প্রথম যে গল্পটি লিখি সেটি একটি কিশোর গল্প। নাম ‘দুঃস্বপ্ন’। ‘দৈনিক বার্তা’য়  ছাপা হয়েছিল ১৯৭৭ বা ১৯৭৮ সালে। 

মু. বি.: এখন অনেক তরুণ লিখছেন। তাদের লেখায় একজন প্রবীণ সাহিত্যিক হিসেবে কী ধরনের পরিবর্তন দেখছেন?

রফিকুর রশীদ : ছোটদের জন্য লিখতে গেলে আমাকে হতে হবে ১০-১২ বছর বা ১৭ বছরের বালক। বড় হওয়ার পর ছোট হয়ে যাওয়া খুব কঠিন। বড় বা ছোট কথা নয়, খুব দ্রুত কিছু পাওয়ার প্রত্যাশা লেখকদেও মধ্যে যেটা দেখি আমাকে ব্যথিত করে। আমরা কত লেখা কত পত্রিকায় পাঠিয়েছি; তখন ডাকযোগ পাঠানো ছাড়া উপায় ছিল না। ফলে সেই লেখা কত জায়গায় পৌঁছেছে আবার পৌঁছায়নি। কত জায়গায় ছাপা হয়েছি, আবার হয়নি। এতে দুঃখ পেয়েছি। কিন্তু পুনরায়  আবার পাঠিয়েছি। একটি লেখা ছাপা হওয়ার জন্য তিন-চারমাস প্রতীক্ষা করেছি। নবীনরা ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে রাজি নয়। তারা শর্টকাট রাস্তা খুঁজছে। রাস্তা হয়েছেও বটে। 

আরেকটা কথা জোর দিয়ে বলতে চাই, আমাদের শিশুরা ক্রমশই প্রকৃতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। আমাদের ছেলেমেয়েরা আকাশ দেখতে জানে না, গাছ চেনে না, ফুল চেনে না, পাখির নাম জানে না। একদিন চিড়িয়াখানা গেলো কয়েকটি পাখি দেখলো বা জীবজন্তু দেখলো বটে কিন্তু নিবিড়ভাবে প্রকৃতি দেখা হলো না। এই শিক্ষাটা আমাদের অভিভাবকরা দিচ্ছেন না। ফলে এক ধরনের প্রকৃতির সঙ্গে সংলগ্নতার অভাব ঘটছে। প্রকৃতপক্ষে লেখক হতে হলে বিভূতিভূষণ সবাই হবে না, দরকারও নেই। কিন্তু প্রকৃতিলগ্নতা থাকা জরুরি। আমি সেদিকটির খুব অভাব দেখছি। আমরা যখন নতুন লেখক ছিলাম; লেখক হওয়ার জন্য বহু বাধার সম্মুুখীন হয়েছি। বহু পরীক্ষা দিয়েছি। কোথায় ভুল হলো জানতে চেয়েছি। বড়দের পরামর্শ চেয়েছি। এখন পরামর্শ কেউ পছন্দ করে না। যারা ছড়া-কবিতা লেখে তারাও ছন্দের অনুশীলন করে না। ফলে নিবিড় ছন্দচর্চাও হচ্ছে না। 

মু. বি.: বই প্রকাশের ক্ষেত্রেও কিছু বিষয় থাকে। সেখানেও অবহেলার অভিযোগ রয়েছে।

রফিকুর রশীদ : আমি এই অভিযোগগুলো খুব পজিটিভভাবে নেই। এই অভিযোগগুলো সত্য। আমাদের দুর্ভাগ্য সরকারি বই কেনার কমিটি হয় না। যারা বই সাপ্লাই দেয়, একদল প্রকাশক, একদল লেখককে দিয়ে লিখিয়ে নেয় বটে, কিন্তু সেই লেখকের লেখাটা হচ্ছে কিনা তা দেখার জন্য কেউ নেই। অধিকাংশ প্রকাশকই সম্পাদক রাখে না। অথচ ভালো প্রকাশনার জন্য এডিটর প্যানেল খুব দরকার। দুই নাম্বার হচ্ছে, ছোটদের জন্য লেখা যতটা পরিচ্ছন্ন করে ছাপা প্রয়োজন সেটাও হচ্ছে না। যেনতেন একটা কিছু করে দিলেই যেন হয়ে গেল! অথচ আজকাল ছাপাখানার উন্নতি হয়েছে। ফোর কালার ছেপে দিচ্ছে। কিন্তু বইয়ে তার প্রতিফলন নেই। রঙের প্রয়োগ, অলঙ্করণ অত্যন্ত জরুরি। শিল্পীকে পয়সা না-দেওয়ার জন্য গ্রাফিক ডিজাইনার দিয়ে সেই কাজ কম্পিউটারে করিয়ে নেয়া হয়। এখানে-ওখানে কাট কপি পেস্ট। এটা খুব অবহেলার, খুব অপমানের শিশুদের বইয়ের ক্ষেত্রে।

তাছাড়া আমি যদি ৭-৮-১০ বছরের শিশুদের কথা ধরি, তাদের জন্য লেখাটা হচ্ছে না। খুব দুঃখ নিয়েই বলতে হয়, আমাদের দেশে শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় আছে, শিশু একাডেমির মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান আছে। শিশুদের জন্য এই প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘকাল ভালো কাজ করেছে, কিন্তু সেই কাজটি ৮-১০ বছর ধরে প্রায় বন্ধই হয়ে আছে। সেখানে মাসিক পত্রিকাটি কোনভাবে টিকে আছে। বাংলা একাডেমি যে ‘ধানশালিকের দেশ’ প্রকাশ করে, একমাত্র এই পত্রিকাটিই মান ধরে রেখেছে। কিন্তু সেটাও ছ’মাসে একটি সংখ্যা বের হয়। সেই সংখ্যাটির সঙ্গে শিশু লেখকের, পাঠকের, প্রকাশকের যোগাযোগটা নিবিড় নয়। সরকারের টাকায় ‘নবারুণ’ বের হয় তথ্য ও চলচ্চিত্র মন্ত্রণালয় থেকে। সেই পত্রিকাটিও একেবারে যেনতেন অবস্থা। সেখানে যারা যুক্ত তারা সরকারি চাকরি করে, তাদের শিশুসাহিত্য বা কোনো সাহিত্য নিয়েই বড় কোনো ধারণা নেই। ফলে সেখানে সরকারি টাকার অপচয় ঘটছে।  এবার আসুন দৈনিক পত্রিকায় যে শিশুপাতা ছাপা হচ্ছে তা বড্ড সীমিত ও অল্প জায়গা। সেখানে সম্পাদক বাধ্য হন লেখককে বলতে- ‘না না এত শব্দের মধ্যে দেবেন, এর বেশি হলে ছাপতে পারছি না’। একটি ভালো গল্প কিন্তু শব্দসংখ্যায় মেপে তোলা যায় না। আমাদের শিশুসাহিত্যের বিচিত্র দিক নিয়ে আমাদেরই ভাবতে হবে। সেই জায়গাগুলো আসলে নেই। আমাদের সময় ছিল ‘খেলাঘর’, ‘কঁচিকাচার আসর’। এসব পাতা যারা সম্পাদনা করতেন তাদের মতো যোগ্য মানুষ হয়তো এখন নেই। এখন এসব সংকুচিত হয়ে আসছে। 

মু. বি. : রবীন্দ্রনাথ, নজরুল শিশুকিশোরদের জন্য লিখেছেন। কিন্তু এখন খ্যাতিমান অনেক কথাসাহিত্যিক শিশুদের জন্য লিখছেন না। এর কারণ কী বলে মনে হয়?

রফিকুর রশীদ : আমাদের দেশে একটা বাজে প্রবণতা রয়েছে- পিঠে সিল মেরে দেওয়া। আমাদের বড় লেখক যারা বয়সে বড়, লেখাতেও বড় তাদের মধ্যে অল্প কিছু লেখক ছোটদের নিয়ে লিখেছেন। সেলিনা আপার কথাই বলি, তাঁর কিন্তু শিশুসাহিত্যের পরিমাণ একেবারে কম নয়। বড়দের লেখক যদি বলি আনোয়ারা সৈয়দ হক বা শামসুল হকের লেখাও কম নয়। তারা মূলধারার লেখক হিসেবে বড়দের লেখক হিসেবে এতটাই প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন যে, ছোটদের জন্যও যে লিখেছেন সেই জায়গাটি পৃথকভাবে আলোচিত হয় না। এর পরের যারা তাঁরা ভয় পান- আমি কি শিশুসাহিত্যিক হবো নাকি! যেন শিশুসাহিত্যিক হওয়াটা গৌরব কমে যাওয়ার বিষয়! এই যে কিছুক্ষণ আগে আমি বললাম- আমি বড়দের জন্য লিখি। তার মানে আমাকে ঠেলে বের করে ‘শিশুসাহিত্যিক’ বলছেন। এই প্রবণতা ঠিক নয়। যে যেমন লিখছেন লিখুন না! কারও জন্য পথ বেঁধে দেওয়া ঠিক নয়। আপনি লিখুন, তবে শিশুদের জন্য লেখার সময় একটু দায়িত্ববোধ নিয়ে লিখুন। এই শিশুগুলো আমাদের ভবিষ্যৎ। ওদেরকে গড়ে তোলা, ওদের ভেতরে চিন্তাশীলতা, স্বপ্নময়তা, সৃজনশীলতা এগুলো সৃষ্টি করে দেওয়ার ক্ষেত্রে যেন আমাদের শিশুসাহিত্যিকদের ইতিবাচক ভূমিকা থাকে। 

মু. বি. : তরুণদের জন্য তাদের আপনি কী পরামর্শ দেবেন?

রফিকুর রশীদ : শিশুসাহিত্যিক হতে হলে প্রথমেই তাকে শিশু মনস্তত্ত্ব বুঝতে হবে। দূরে নয়, নিজের ঘরে তাকান, ছেলের দিকে তাকান, নাতির দিকে তাকান। শিশুদের ভালো লাগা, মন্দ লাগার জায়গাগুলো বুঝতে হবে। শিশুদের ভেতর যেসব দোষ পাই সেসবও নির্দোষ এবং পজিটিভলি দেখতে হবে। কেবলই মন্দ করে দেখা- সেটা যেন আমরা না করি। আর প্রকৃতিলগ্ন হতে হবে।  
 

তারা//

সম্পর্কিত বিষয়:

আরো পড়ুন  



সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়