ঢাকা     সোমবার   ২২ এপ্রিল ২০২৪ ||  বৈশাখ ৯ ১৪৩১

শীতকাল কদিন থাকবে, সুপর্ণা? 

টোকন ঠাকুর  || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৮:১৯, ১৩ জানুয়ারি ২০২৪   আপডেট: ১৮:২০, ১৩ জানুয়ারি ২০২৪
শীতকাল কদিন থাকবে, সুপর্ণা? 

শীত এসে গেছে। রাতে, জানালায় কুয়াশা উঁকি দিচ্ছে ঘরে। কুয়াশা ঘরে ঢুকতে পারছে না। কুয়াশা কি বাইরেই ভালো, ঘরে নয়? শীত এসে গেছে। শীত এক পরাবাস্তব ঋতু। এত যে অপেক্ষা থাকে শীতের জন্যে, কেন? সুপর্ণা সুপর্ণা বলে এত মনোবাসনা তৈরি হয়, কেন? শীত আসার আগেই কি ভাস্কর চক্রবর্তী মরে গেলেন, কেন? কবি মরে যাওয়ার এত বছর পরেও যে সুপর্ণা বেঁচে আছেন, কেন? সবই শীতের জন্যে। শীত আছে বলেই এত প্রশ্ন। শীত আসে বলেই এত বিহ্বলতা। এত ব্যাকুলতা। সেই শীত এসে গেছে। এসো আমরা শীত শীত বলে আনন্দ করি। 
‘শীত বলে কিছু নেই, সবই বিয়ে করার ধান্দা’— রবীন্দ্রনাথ বলেছেন।

রবীন্দ্রনাথ এই কথা বলছেন?
হ্যাঁ, বলছেন।
কাকে বলছেন কথাটা?
কাকে বলছেন মানে? রবীন্দ্রনাথ কি জনে জনে ধরে ধরে কথা বলে বেড়াবেন নাকি?
তাইলে বুঝব কেমনে, কথাটা রবীন্দ্রনাথের? কোনো কবিতায় লিখেছেন?
সব কথা কবিতায় লেখা যায় না। কিছু কথা বুঝে নিতে হয়।
তাই বলে নিজের মনগড়া একটা কথা তুমি রবীন্দ্রনাথের নামে চালায়ে দিবা— তাও এত সহজ না।

হ্যাঁ হ্যাঁ, রবীন্দ্রনাথই লিখেছেন, আনন্দ সহজ নহে, বেদনা সহজ নহে, কিছুই সহজ নহে... কী তবে সহজ?
বিয়ে করা সহজ।
বিনয় কি গায়ত্রীকে বিয়ে করতে পেরেছেন? কিম্বা আমাদের মারজুক রাসেল কি জেরিনকে বিয়ে করতে পেরেছেন? কাজেই, বিয়েও সহজ নহে। আর বিয়ে জিনিসটাই বা কী? নারী-পুরুষ একসঙ্গে থাকা? তারপর কলকারখানার আয়-উৎপাদন বাড়ানোর মতো বাচ্চা-কাচ্চা বানানো, বাড়ানো? তারপর সেই বাচ্চা-কাচ্চাদের বড় করে তোলা, যাতে তারাও একদিন বিয়ে টিয়ে করে, বাচ্চা-কাচ্চা বানায়! এই খেলা কদ্দিন চলবে?

এটা কোনো খেলা নয়। পরম্পরা। ভালোবাসার পরম্পরা।
ভালোবাসা! সেটা কী?
ভালোবাসাই তো আসল কথা। ভালোবাসা না থাকলে কিছুই হতো না। শীতকালও আসত না। আর আমরাও, এত্ত ভোরে এই শর্ষেফুলের মাঠ দেখতে আসতাম না।

ভোরবেলা, শর্ষেফুলের মাঠের মধ্যে, ‘তোমার সিঁথির মতো’ আলপথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে কতদূর যাওয়া যায়? দূরে, কুয়াশা সরে সরে যাচ্ছে। ভোরের রোদে সারা মাঠের হলুদ ফুটে ফুটে উঠছে। আলপথ ধরে হেঁটে যাচ্ছে দুজন মানুষ। তাদের কথা, আবোল-তাবোল কথা, কথারা জন্ম নিচ্ছে। কথারা তর্কে জড়াচ্ছে। কথারা গড়িয়ে যাচ্ছে, ছড়িয়ে পড়ছে কথার পিঠে চড়ে। আমাদের শীতকাল দেখা হচ্ছে। আমাদের শীতকাল চলে যাচ্ছে। কোথায় যাচ্ছে? কার কাছে যাচ্ছে? শ্রীমতী শীত কিম্বা সীতা!
কবির কাছে।
কোন কবি?
যিনি লিখেছেন, ‘শিশির শিকার করে নিয়ে গেছে সমস্ত সকাল’ তার কাছে?
কবি কোথায় থাকেন?
মাঠের ওপারে, ঐ দিকে।
ওদিকে তো কুয়াশা থমকে আছে।
কুয়াশা বলে কিছু নেই, সবই ছদ্মবেশী মেঘ।

মনে পড়ল, আমার প্রথম প্রডাকশন ‘মনে নেই’ বা ‘ব্ল্যাকআউট’ ছবিতে একটা দৃশ্য আছে এ রকম যে, রাতে, তরুণ কবি চরিত্রের মাদল বিছানায় কোলবালিশের ওপর উপগত হয়ে কোলবালিশকেই আদর করছে। ঘরের দেয়ালে একগুচ্ছ ফড়িংয়ের কঙ্কাল, মানে বেশ কিছু ফড়িং ধরে এনে আইকা দিয়ে পেস্ট করে রাখা। ফড়িংগুলো মৃত। তরুণ কবি কোলবালিশের ওপর শুয়ে পড়েছে। সে কোলবালিশকেই শোনাচ্ছে প্রায় আত্মপ্রলাপ, ‘ব্যথা লাগে? লাগুক। তুমি মেঘ, রাতে যখন বাসায় ফিরি, কুয়াশার ছদ্মবেশে তুমি আমার পথের ওপর এসে দাঁড়াও। তুমি আমার পথ আগলাতে চাও, হুম? সর্বনাশী, পথের ওপর কুয়াশা হয়ে থাকো, যাতে আমি পথ চিনতে না পারি। বাড়ি ফিরতে না পারি...?

আসলে বাড়িঘর বলে কিছু নেই, সবই শুকনো খালের সাঁকো।
তার মানে?
শীতকাল। খাল শুকিয়ে যাবেই, নদী শুকিয়ে যাবেই। শুকিয়ে যাবে মন! জীবন!
আর?
আর গাছ শুকিয়ে যাবে, গাছের পাতারা ঝরে ঝরে পড়বে। শুকনো পাতা হাওয়ায় উড়তে থাকবে। হতে পারে, একটি পাতা উড়তে উড়তে শেষ পর্যন্ত তোমার জানলা দিয়ে ঢুকে পড়বে। তুমি হয়তো ঘুমোচ্ছিলে বা হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল তোমার, শিয়রে শুকনো পাতা আছড়ে পড়ার শব্দে। কী করবে তুমি? কোথাকার কোন বনভূমি থেকে খসে আসা শীতকালের শুকনো পাতাটি তুমি কি আর তুলে নেবে? কী আছে শুকনো পাতায়, কী লেখা সেই পাতার শিরায় শিরায়?

তুমি বলো, কী লেখা?
তুমি বলে দাও।
তুমি বলো, কী লেখা শুকনো পাতায়?
ভালোবাসি। শুধু এই একটি শব্দ লেখা শীতকালের পাতায়। আর কিছু নেই।
হ্যাঁ, ভালোবাসা ছাড়া আর কিছু নেই।
নেই তো!
হুম, নেই।
আছে।
আছে?
আছে!
কী আছে?
ভালোবাসা।
ভালোবাসাই তো আছে। ভালোবাসা ছাড়া আর কিছু নেই, লেপের আদরে, কম্বলে, চাদরে।

শীতরোদে সেই ভালোবাসা থাকে। শীতরোদ সেই ভালোবাসা আঁকে, আমাদের শরীরে শরীরে। শীতরোদ তাই ডাকে। সেই ডাকে আজ আমরা এসেছি সুহাসিনী গ্রামে। আমরা ভালোবাসতে এসেছি। ভালোবাসতে ভাল্লাগে বলেই আমরা শুকনো খালের সাঁকো দেখতে এসেছি, ভালোবাসতে ভাল্লাগে বলেই আমরা ভোরের কুয়াশার ভেতর দিয়ে, জলজ্যান্ত এক দুপুরে এসে পৌঁছেছি। শর্ষেফুলের হলুদ দুপুর। ভালোবাসব বলেই আমরা আলোকচিত্রে শীতের দুপুর ধরে রেখেছি, ভোরের কুয়াশা ধরে রেখেছি।

শীতের বিকেলটা নামে ঘরের বারান্দায় বসে দূরে তাকিয়ে থাকা এক কিশোরীর চোখে, সেই চোখে চিকচিক করে ওঠে অপেক্ষার গান। সেই গানে ছড়িয়ে পড়ে ছন্দিত পালক, নাম কী তার?

ভালোবাসা। সেই কিশোরী কী খুঁজছিল? কী খুঁজছ?
ভালোবাসা।

সন্ধ্যার আগেই ফের নামতে থাকে কুয়াশা, সেই সর্বনাশী, শাদা মেঘ, ছদ্মবেশী। কুয়াশায় ভালোবাসা ওঁৎ পেতে থাকে। ছদ্মবেশে। ফলে, পথিক কেউ কেউ পথ-বিভ্রমে পড়েই, তার আর সহজে বাড়ি ফেরা হয় না। তার বাড়ি ফিরতে দেরি হয়ে যায়, তার বাড়ি ফিরতে মন চায় না, তার কুয়াশাতেই হাঁটতে ভালো লাগে, নির্জন নদীর পাড়ে, শর্ষেফুলের মাঠে, শুকনো পাতা বিছিয়ে রাখা বনভূমিতে। বনভূমিতে কুয়াশা জমে যে মায়া তৈরি হয়, কার না ভাল্লাগে? কাকে না টানে? সেই মায়াটানই ভালোবাসা।

সেই জন্যেই কি আমাকে সন্ধ্যার বনভূমিতে নিয়ে এলে?
আমি একাই নিয়ে আসিনি, তুমিও নিয়ে এসেছ।
কাকে?
আমাকে।
আহ্!
আহ্ কী আবার!
এসেছি।
তবে আর অভিযুক্ত কেন আমি?
অভিযোগ তা থাকবেই। অভিযোগ অলঙ্কার বিশেষ।
হুম! শীত কি একটু বেশি?
শীতের চেয়েও কুয়াশা একটু বেশি।
আমাদের কি ফেরা উচিত?
এই সন্ধ্যা,হিম কুয়াশা, এই বনভূমির নৈঃশব্দ্য তোমার ভাল্লাগছে না?
খুব।

তাহলে ফেরার কথা বললে যে!
কিন্তু একসময় না একসময় রাত একটু বাড়লে নিশ্চয়ই আমাদের ফিরতে হবে।
মানুষ পেছনে ফিরতে পারে না।
এ হচ্ছে কথার কথা। ব্যাঙের মাথা।
যে পথে এসেছি, সেই পথ দিয়েও যদি ফিরি, তবু আমরা পেছনে ফিরি না। ফিরতে পারি না।
আচ্ছা, চলো এগিয়ে যাই।
কোন দিকে?
রাতের দিকে। অন্ধকারের দিকে।
শীতরাতের অন্ধকারে আমরা ফের নদীঘাটে পৌঁছুব?
হুম, পৌঁছুব।
আর কোথাও কি পৌঁছুতে পারি না আমরা?
পারি।
কোথায়?

হয়তো ট্রেনে চেপে বসব। ট্রেন যাচ্ছে শীতকাল ভেদ করে, বসন্তপুর ইস্টিশনের দিকে। জানলা খোলা ফ্রেমে সেই কুয়াশার ওপারে কালো-শ্যামল গ্রামরেখার আঁচড়, মাঠজুড়ে হলুদের বিস্তারিত গল্প। যেতে যেতে সেই একটা নদী, নদীর ওপরের রেলব্রিজে শব্দ একটু বেশি, ট্রেন চলে যায় খোকসা-জানিপুর ছাড়িয়ে কুষ্টিয়ার দিকে। ট্রেন-লাইনের ধারে সাধু ও সাধুর ভক্তরা বসে আছে। কলকিতে ধোঁয়া-ধোঁয়া শীতকাল পান করছে। ঝাঁক ঝাঁক পাখি উড়ে যাচ্ছে। শীতের বিল শুকিয়ে যাওয়ায় সেখানে প্রচুর মাছ উঠেছে, গ্রামের মানুষ মাছ মারছে, উৎসব করছে। জানলা দিয়ে সব দেখা যায়, ট্রেনের জানলা দিয়ে শীতকাল দেখা যায়।

তা যায়।
তাহলে চলো, নইলে রাতে বনের মধ্যেই থেকে যেতে হবে।
থাকব না হয়।
সম্ভব?
সম্ভব করলেই সম্ভব। দুজন মানুষ একরাত সারারাত বনভূমিতে থাকতে পারবে না! এ কোন সভ্যতা?
সভ্যতার কথা আর বোলো না। সভ্যতা দেশে দেশে, কালে কালে, শ্রেণীতে শ্রেণীতে একেক রকম।
মানে?
মানে, তিবেত নিয়ম হলে পরে, এক নারী বহু পতি ধরে, এই দেশে তে হলে পরে—
ব্যভিচারী গণ্য হয়।
হ্যাঁ। কাজেই সভ্যতা কথাটার শেষপর্যন্ত কোনো মানেই নেই।
এই যে আমরা দুজন শীতকাল দেখার নাম করে এতদূরে এসেছি, এর কোনো মানে আছে?
আছে।
কী মানে?
চখা তার চখিরে নিয়ে বহুদূরে যাবে, পালাবে-হারাবে, শীতকাল দেখতে যাবে, ভালোবাসবে— এই আর কি!

সেই জন্যেই তো রবীন্দ্রনাথ বলেছেন— শীতকাল বলে কিছু নেই, সবই বিয়ে করার ধান্দা।
কিন্তু রবীন্দ্রনাথ কি ঠিক এ রকম ভাষায় বলেছেন?
তা হয়তো নয়। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন তার ভাষায়, যেটাকে লোকে বলে, রাবীন্দ্রিক ভাষা। কিন্তু রবীন্দ্রনাথও নিশ্চয়ই শীতকালে এই রকমই ফিল করতেন।

শীত নিয়ে কিছু কথা হয়তো আমাদের আছে, কবিতা আছে, আলোকচিত্র আছে— কিন্তু এর মধ্যে রবীন্দ্রনাথকে টেনে আনার তো কিছু নেই। তাই না?
তাইলে শীতকালে আমরা রবীন্দ্রনাথকে এড়িয়ে যাব? তোমরাই না বলো, ‘বাঙালির প্রতিটি মুহূর্তে রবীন্দ্রনাথ আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে।’
আছে তো।
এইভাবে?
সব ভাবেই।
আমার কিন্তু এখন রবীন্দ্রনাথকে সহ্য হচ্ছে না।
আমারও না।
কারণ?
কারণ, এই মুহূর্তে, এই অন্ধকারে, এই গাছের আড়ালে শুধু তুমি আর আমি থাকব। শীতকাল আমাদের পাহারা দেবে। এখানে আর কেউ না থাকবে না। আর কেউ না।
দু’একটা পাখি, অ্যাম্বিয়েন্স লাগবে না?
আমাদের নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসই যথেষ্ট।
হুম!।
উম।?
সত্যি, এমন যদি হতো, খুব ভালো হতো। কিন্তু এমন হয় না, খুব ভালো হয় না। শুধু এমন হোক, এ আমরা চাই। খুব ভালো হোক, এ আমরা কামনা করি। করি, শীতকালকে উপলক্ষ করে করি।

তাই কবিতা লিখি। তাই ছবি হয়ে ছড়িয়ে থাকি কুয়াশায়, শিশিরে শিশিরে। ভালোবাসা হয়ে বিস্তীর্ণ হতে চাই, একটি হলুদ শর্ষেফুলের মাঠে, বনভূমি থেকে উড়ে যাওয়া একটি শুকনো পাতায়।

ছবি বানাই, শীতকালকে ফ্রেমে ধরি। প্রেমে ধরি। ধরতে ভাল্লাগে। ভাল্লাগে বলেই, মনে মনে বলি, স্মরণী, তোমাকে ভালোবাসি।
স্মরণী কে? কোথায় থাকে?
স্মরণী থাকে শীতের দেশে, ধরলা নদীর পাড়ে, কুড়িগ্রামে।
কুড়িগ্রাম কোথায়?
মনে হয় উনিশ গ্রামের পর।
তুমি স্মরণীকে কোথায় দেখেছ?
রাজশাহীতে, সার্কিট হাউসে।
কবে?
দুহাজার বারো সালের মার্চ মাসের সাতাশ তারিখ দুপুরের পর।
তখন কি শীতকাল ছিল?
তখন শীত পেরিয়ে বসন্ত, বসন্তেই দেখা হয়েছিল প্রথম স্মরণীর সঙ্গে।
সব মনে আছে?
আছে। কারণ স্মরণীকে খুব ভালো লেগেছে।
স্মরণী এখন কোথায়, এই শীতে?
কী জানি কোন ঝিলের ধারে, শাদা বক হয়ে ডানা মেলে দিয়ে উড়ছে কোথায়?
তাহলে তুমি স্মরণীকে খুঁজে বেড়াচ্ছ?
হ্যাঁ।
আমি চললাম।
না।
কেন?
কেননা, বহু শীতকাল বহু শর্ষেফুলের মাঠ, শুকিয়ে যাওয়া নদী, শুকনো খালের সাঁকো, কুয়াশা মোড়ানো হিম-চরাচরের শাইশাই নৈঃশব্দ্য পাড়ি দিয়ে আমি তোমার কাছে এসেছি। পুুঁজি-বাণিজ্যের দখলে চলে যাওয়া সময়ের ফাঁক গলিয়ে আমি তোমার কাছে এসে তাকিয়ে আছি। তুমি সেই ডাক, যা আমি শুনব বলে উৎকর্ণ ছিলাম, উৎকর্ণ আছি। তুমিই তো রয়ে গেছ আমর স্মৃতির মধ্যে। স্মৃতি যা বহন করছে, স্মৃতি যা স্মরণে রেখেছে, তাই-ই তো স্মরণী।

কুয়াশা এলেই, হিম-নৈশব্দের জানলা দিয়ে আমি দেখতে পাই, হাতে বোনা উলের চাদর পরে স্মরণী হাঁটতে হাঁটতে যাচ্ছে। আলপথ দিয়ে হাঁটছে। দুপাশে শর্ষেফুলের মাঠ। দূরে ইলেক্ট্রিকের খাম্বা। তার তারে পাখিরা বসে আছে। রোদ আছে রোদ নেই ভাব। খেজুরগাছে রসের কলস ঝুলছে। খোলা মাঠে কারা যেন নাড়ার আগুন জ্বেলেছে। মহাশীতকাল উপস্থিত সামনে। কবিতা হচ্ছে, ছবি হচ্ছে, গান হচ্ছে, ফাঁকা লাগছে। ফাঁকার সঙ্গে একা লাগছে, একাকার লাগছে। বুকের মধ্যে হাহাকার লাগছে। ভালোবাসার জন্য উথাল-পাথাল লাগছে। শীতের ভয়ে মোটা কাপড় পরলেও, শরীরের একেবারে ভেতরের দিকে কিসের যেন আগুনে জ্বলছে। চারদিকে এত মানুষ কিন্তু আমার মানুষ ভাল্লাগতেছে না। আমি তোমাকে খুঁজছি। খুঁজছি সেই হরপ্পার সময় থেকেই খুঁজছি। আজও খুঁজছি, এই শীতে, এই ২০২৪ সালেও। পাইনি। তুমি কোথায়, স্মরণী?

উপসংহার হলো, আদতে শীতকাল বলে আসলে কিছুই নেই। সবই নৈসঙ্গের প্রলাপ। বিয়ে করার ধান্দা, যেটা রবীন্দ্রনাথও বলেছেন। হয়তো তার ভাষায় বলেছেন। না বললেও বলেছেন। ঘটনা সত্য, কেউ না কেউ বলবেই।

আমাকেও বলতে হচ্ছে, বলেইছি তো, ভালোবাসি। শীতে একটু বেশিই বাসি। বাসতে ভাল্লাগে আমি কী করব?

আলাপ কি চলতেই থাকবে? আমরা কি চুপ করে পরস্পর একাকার হবো না?  মনে হয়, এই শীত, শীতকাল থেকে যাক। শীত থেকে যাক বসন্তেও। সারাবছর শীতকাল থাক। সারাবছর আমরা বনভূমির মধ্যে থেকে যাই। শীতই তো বলে দিচ্ছে, ঘরে ফেরার কিছু নেই, ঘর বলে কিছু নেই, প্রজাপতিদের ঘর থাকে না।  

তারা//

আরো পড়ুন  



সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়