ঢাকা     মঙ্গলবার   ১৬ এপ্রিল ২০২৪ ||  বৈশাখ ৩ ১৪৩১

জন্মদিনের সাক্ষাৎকার

‘সুবিধার নামে বানরের পিঠাভাগ হচ্ছে ৫২ বছর ধরে’

মানিকলাল সাহা || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৮:৫২, ২০ জানুয়ারি ২০২৪   আপডেট: ১৪:১৯, ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪
‘সুবিধার নামে বানরের পিঠাভাগ হচ্ছে ৫২ বছর ধরে’

জাকির তালুকদারের কথাসাহিত্য বাস্তবতা, কল্পবাস্তবতা, সমাজ-রাজনৈতিক বাস্তবতাসহ, যাদুবাস্তবতার সম্মিলনে অনন্য শিল্পোত্তীর্ণ। সমকালীন মূলধারার বাংলা কথাসাহিত্যে তাঁর অপরিহার্যতা প্রতিষ্ঠিত। অনবরত বাঁকবদল তাঁর সাহিত্যিকতার প্রধান বৈশিষ্ট্য। বিষয় ও আঙ্গিকে, মাধ্যম ও প্রকরণে তাঁর অবস্থান স্বাতন্ত্র্যচিহ্নিত। জাকির তালুকদারের লেখায় ধর্মীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে পুরাণের সংমিশ্রণ ভিন্ন এক মাত্রা নিয়ে উপস্থিত হয়েছে। ‘কুরসিনামা’, ‘মুসলমানমঙ্গল’, ‘কবি ও কামিনী’, ‘ছায়াবাস্তব’, ‘কল্পনা চাকমা ও রাজার সেপাই’, ‘পিতৃগণ’ তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ।  

জাকির তালুকদারের জন্ম ২০ জনুয়ারি, নাটোরে। কথাসাহিত্যিকের জন্মদিনের শ্রদ্ধার্ঘ্য হিসেবে সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হলো। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মানিকলাল সাহা। তিনি রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘বাংলাদেশের ছোটোগল্প (নির্বাচিত): সময়ের অভিঘাত’ বিষয়ে পিএইচ. ডি. গবেষণা করছেন। 

মানিকলাল সাহা : আপনার চিকিৎসক-সত্তা এবং লেখক-সত্তা সম্পর্কে যদি কিছু বলতেন।

জাকির তালুকদার : আপনি কি কোনো লেখককে প্রশ্ন করেছেন তার কেরানি-সত্তা ও লেখক-সত্তা নিয়ে? আমলা-সত্তা, শিক্ষক-সত্তা, অধ্যাপক-সত্তা, সাংবাদিক-সত্তা, ব্যবসায়ী-সত্তা নিয়ে? তাহলে চিকিৎসকের বেলায় এই প্রশ্ন আসে কেন? চিকিৎসকের জন্য লেখক হওয়া কি নিষিদ্ধ কিছু? নাকি নতুন কিছু? পৃথিবীর কত লেখকই তো চিকিৎসক ছিলেন। আন্তন চেখভ, সমারসেট মম, বনফুল, এমনকি বিপ্লবী চে গুয়েভারাও।  

আসলে এই প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে আমি ক্লান্ত হয়ে গেছি। আমার উত্তর পরিষ্কার। এই বাংলাদেশে কোনো লেখক শুধু লেখালেখির উপার্জনে পরিবার-পরিজন নিয়ে বাঁচতে পারেন না। লেখক হিসাবে যে সম্মানী পাওয়া যায় তা এতই অকিঞ্চিতকর যে প্রত্যেক লেখক-কবিকে আলাদা একটি পেশা গ্রহণ করতেই হয়। তাছাড়া বাংলাদেশ এখনো এতটা সভ্য দেশ হয়নি যে, শুধু লেখক বা কবি পরিচয় দিলে লোকে সম্মানের সাথে তাকাবে। কোনো পাত্র যদি পরিচয় দেয় যে, সে কবি বা লেখক, তাহলে কি মেয়ের বাপ তাকে জামাই বানাবে? 

অন্য সব পেশার মতোই চিকিৎসা আমার পেশা। তবে আমার এই পেশা যেহেতু আমাকে বাঁচিয়ে রাখে, তাই বলা যায় আমার লেখক সত্তাকেও বাঁচিয়ে রাখে। সেইসাথে আনন্দও আছে। মুমূর্ষু রোগিকে নিয়ে মৃত্যুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে ভালো লাগে। তাছাড়া ডাক্তারদের কাছে রোগিরা নিজেকে যেহেতু উন্মুক্ত করে দেয়, তাই শুধু শারীরিক খবরই নয়, তাদের জীবনযাপন, দৈনন্দিন জীবনযুদ্ধ সম্পর্কেও জানা যায়। আর যেহেতু চাকরি করি না, তাই কাউকে সালাম ঠুকতে হয় না। এই পেশা আমাকে একটি স্বাধীন এবং সম্মানজনক জীবন দিয়েছে। ব্যক্তিত্ব বজায় রেখে চলতে সাহায্য করেছে।

মানিকলাল সাহা : আপনি কবে থেকে গল্প লেখা শুরু করেছেন?

জাকির তালুকদার : তারুণ্যের শুরুতে ছড়া লিখতাম। সেইসাথে শিশুতোষ গল্পও। তারপরে একে একে সব মাধ্যমেই লেখালেখি করেছি। এমনকি মঞ্চনাটক এবং পথনাটকও লিখেছি। সেগুলো অবশ্য ছিল গণতান্ত্রিক এবং সমাজবদলের আন্দোলনেরই অংশ। কিন্তু যখন গ্রামে চাকরি করতে গেলাম, একেবারে হতদরিদ্র মানুষগুলোর মধ্যে বাস করতে শুরু করলাম, তখন মনে হলো কবিতা বা ছড়ায় এই জীবন তুলে আনা আমার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে লিখে দেখলাম গল্পতে তারা অবয়ব পাচ্ছে। তখন সিদ্ধান্ত নিলাম কথাসাহিত্যই হবে আমার কাজের ক্ষেত্র। আশির দশকের শেষাংশে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া।

মানিকলাল সাহা : শুরুর লেখাগুলো সম্পর্কে যদি কিছু বলেন।

জাকির তালুকদার : স্বাভাবিকভাবেই অপরিপক্ব হতো। তবে নতুন লেখকদের যে মনোভাব থাকে যে, সে দারুণ কিছু লিখে ফেলেছে, সেটি আমার ছিল না। কারণ তার আগেই পড়েছি প্রচুর। স্ট্যান্ডার্ড হিসাবে সমকালীন কোনো লেখককে ধরিনি। ধরেছি বাংলাসাহিত্যের উজ্জ্বলতম গল্পগুলো। তাই নিজের লেখার দুর্বলতা যে কোথায় তা ঠিকঠাক ধরতে না পারলেও সার্বিকভাবে লেখাটি যে দুর্বল তা বুঝতে পারতাম। তাই যথারীতি ছিঁড়ে ফেলতাম সেগুলি।

মানিকলাল সাহা :  গল্প লেখার জন্য কি বিশেষ কোনো প্রস্তুতি নিতে হয়েছে আপনাকে?

জাকির তালুকদার : প্রস্তুতি তো এখনো নিয়েই চলেছি। প্রতিটি লেখার জন্যই আলাদা আলাদা প্রস্তুতি নিতে হয়। আগে যদি ৭০টি গল্প লিখে থাকি, তাহলে ৭১ নম্বর গল্পটি লিখতে বসলে আগের লেখাগুলো কোনোই সাহায্য করে না। আবার শুরু করতে হয় অ আ দিয়ে। শুরুর প্রস্তুতি বলতে পড়া আর পড়া। শুধু গল্প-উপন্যাস নয়। সবকিছু পড়া। সাহিত্য পড়া, রাজনীতি পড়া, সমাজবিদ্যা পড়া, বিজ্ঞান পড়া। আর সেইসাথে অবিরাম চারপাশের মানুষের জীবনপাঠ। 

মানিকলাল সাহা :  আপনার আদর্শ গল্পকার কে বা কারা? কেন তাদের আদর্শ মনে করেন?

জাকির তালুকদার : কোনো একজন বা দুই-চারজন লেখক আমার আদর্শ নন। ঠাকুরমার ঝুলি’র দক্ষিণারঞ্জন মিত্র থেকে শুরু করে গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ পর্যন্ত অসংখ্য লেখকের কাছ থেকে শিক্ষা নিয়েছি আমি। কারো কাছে শিখেছি গল্প বলার ভঙ্গি, কারো কাছে ভাষার গাঁথুনি, কারো কাছে আঙ্গিকের জাদু।

মানিকলাল সাহা :  মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তী সময়ের প্রতিক্রিয়া আপনার লেখাকে কি কোনোভাবে প্রভাবিত করেছে?

জাকির তালুকদার : মুক্তিযুদ্ধ বাঙালি জাতির জীবনের মহত্তম ঘটনা। যুগান্তকারীও। হাজার বছর পরে বাঙালির নিজস্ব রাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে। ফলে অন্য সবকিছুর মতোই মুক্তিযুদ্ধ যে সাহিত্যে প্রভাব ফেলবে, তা প্রশ্নের অপক্ষো রাখে না। আমার লেখাতেও মুক্তিযুদ্ধ আসে। আমার পূর্বসূরি লেখকদের লেখাতে এসেছে। গল্পে-উপন্যাসে এসেছে, কবিতায় এসেছে, মঞ্চনাটকে এসেছে, চিত্রকলা-ভাস্কর্যে এসেছে।

তবে মনে রাখতে হবে মুক্তিযুদ্ধের মাত্রা অনেক। মুক্তিযুদ্ধ ছিল সত্যিকারের জনযুদ্ধ। তার সবগুলো মাত্রা ধারণ করার মতো রচনা বা গবেষণা এখন পর্যন্ত সম্ভব হয়ে ওঠেনি। বলেছি মুক্তিযুদ্ধ মানে জনযুদ্ধ। সামরিক বাহিনীর কথা দিয়েই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস শেষ হয় না। শুধু গেরিলাদের দিয়েও নয়। ভারতীয় জনগণ এবং সেনাবাহিনীর অবদান লিখেই তার বর্ণনা শেষ হয়ে যায় না। বিদেশে যারা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত তৈরি করেছেন, তাদের ইতিহাসও কিছুটা লেখা হয়েছে। কিন্তু কৃষকের সন্তান, শ্রমিক, নিতান্তই সাধারণ মানুষ, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে মুক্তিযুদ্ধে যে অবদান রেখেছেন সেগুলো লেখা হয়নি কিছুই।

খেতাবপ্রাপ্ত বা তালিকাভুক্ত মুক্তিযোদ্ধারাই মুক্তিযুদ্ধের মূল কুশীলব নয়। তালিকাভুক্তদের মধ্যে অনেক ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা আছে। এমন দুই হাজার লোকের নামও আছে তালিকায় যাদের জন্মই হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের পরে। আমাদের কৃষক-শ্রমিক এবং তাদের সন্তানরা তালিকায় নাম লেখাতে যাননি। সার্টিফিকেটও নেননি। মুক্তিযুদ্ধো ভাতা বা চাকরির কোটা বা অন্য কোনো সুবিধার নামে বানরের পিঠাভাগ হচ্ছে ৫২ বছর ধরে। সেই পিঠাভাগের লাইনে দাঁড়াননি এমন মানুষের সংখ্যাই বেশি। সেই মানুষদের কথাই আমি তুলে আনতে চেয়েছি আমার লেখাগুলোতে। কাজটি শেষ হয়নি। কিন্তু করতে চাই। করতে হবে। লেখক হিসাবে এটি আমার দায়।  

মানিকলাল সাহা : সমাজের প্রায় সর্বস্তরের মানুষই আপনার গল্পে উঠে এসেছে, আপনি কীভাবে তাদের অনুসন্ধান করেছেন?

জাকির তালুকদার : কোনো কোনো জনগোষ্ঠীকে নিয়ে লেখার সময় তাদের সাথে গিয়ে বসবাস করেছি আমি। তবে তা বেশি নয়। আমার পেশার কারণে, গ্রামে চাকরি করার সুবাদে আমার কাছে সব শ্রেণীর রোগি আসতেন। ডাক্তারের কাছে মন খুলে দেওয়া রোগিদের জন্য খুব স্বাভাবিক ঘটনা। আমরা যখন আউটডোরে রোগি দেখি তখন আসলে রোগিদের সাথে কথা বলা হয় খুব কম। আপনাকে যখন ৬ ঘণ্টায় দেড়শো বা দুইশো রোগি দেখতে হয়, তখন আপনি একজন রোগিকে বেশি সময় দিতে পারবেন না। কিন্তু তার মধ্যেই কোনো কোনো রোগিকে আমি শুধু অসুখ নয়, অন্য বিষয়েও জিজ্ঞাসা করতাম। যাদের মনে হতো সমাজের একেবারে ভিন্ন ধারার প্রতিনিধি, তাদের জিজ্ঞাসা করতাম তারা অপেক্ষা করতে পারবেন কিনা। বেশিরভাগই রাজি হতেন। অন্য রোগি দেখা শেষ করে তারপর তাকে নিয়ে বসতাম। নিজে চা খাওয়ার পাশাপাশি তার জন্যও কিছু স্ন্যাক্সের ব্যবস্থা করে কথা বলতাম। কারো কারো গ্রামের নাম-ধাম ঠিকানা নিয়ে রাখতাম। ছুটির দিনে বা অফ-ডিউটির সময় চলে যেতাম তাদের বাড়িতে। খুব সহজে আপন করে নিতেন তারা। মনখুলে বলতেন সব ধরনের কথা। তাদের কাছে বর্তমানের অভাব-অভিযোগই শুধু নয়, শুনতে পেতাম স্থানীয় বিভিন্ন উপকথা, যেগুলোর সাথে আবার ইতিহাসের কিছুটা সম্পর্কও আছে। খুব বেশি প্রশ্ন আমাকে করতে হতো না। তারাই নিজ থেকে জানাতেন।

তারও আগে বাম ছাত্র রাজনীতির সুবাদে সারাদেশের ছাত্রনেতা ও কর্মীদের সাথে সম্পর্কিত ছিলাম। বিভিন্ন সাংগঠনিক শাখাতে যেতে হতো। সেখানকার আনুষ্ঠানিকতা শেষে তাদের কাউকে নিয়ে ঘুরে বেড়াতাম সেই জনপদে। যতটা সম্ভব আর কী। ছাত্রজীবন শেষ করার পরে কিছুদিন কাজ করেছি ক্ষেতমজুর সমিতিতে। খাসজমি প্রভাবশালীদের অবৈধ দখল থেকে মুক্ত করে সত্যিকারের ভূমিহীনদের দখলে এনে দেওয়া- অনেকসময় প্রায় প্রত্যক্ষ লড়াইয়ের পর্যায়ে পৌঁছে যেত। লাঠালাঠি, মামলা-মোকদ্দমার আসামি, উস্কানিদাতা হিসাবে চিহ্নিত করে হয়রানির চেষ্টা- এসব ঘটত নিয়মিত। তো সেই খেতমজুর-কৃষক আন্দোলনকারীরা চিরকালের সাথী-বন্ধুতে পরিণত হয়েছিলেন।

পাহাড় ও সমতলের আদিবাসী সংগঠনগুলোর সাথে কাজ করেছি। এখনো করি। তাই দেশে ৫৫টি আদিবাসী নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী সম্পর্কে জানি। প্রত্যেক জাতির গ্রামে থেকেছি। রাজধানীতে কোনো কাজ থাকলে আদিবাসীদের অনেকেই আমার বাসায় এসে উঠতেন। এসব করতে করতেই বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষকে দেখা হয়েছে মোটামুটি গভীরভাবেই।

মানিকলাল সাহা :  পুরাণ, ইতিহাস আপনার গল্পে উঠে এসেছে। ‘স্বপ্নযাত্রা কিংবা উদ্বাস্তুপুরাণ’ ‘দাস পরম্পরা’ প্রভৃতি গল্পে। এখানে আপনি কি পাঠককে বিশেষ বার্তা দিতে চেয়েছেন?

জাকির তালুকদার : পুরাণ বা ইতিহাস চিরকালই গল্প-উপন্যাস-কবিতায়-নাটকে এসেছে। সেই হিসাবে বলা যায় আমি নতুন কোনো কাজ করিনি। নতুন যেটি করেছি তা হচ্ছে ইসলামি মিথের ব্যবহার। ইসলামপন্থিরা কোনো মিথের কথা স্বীকার করেন না। তাদের কাছে পুরাণটাও সত্য। তাই হয়তো আমাদের পূর্বসূরি লেখকরা তাদের চটাতে চাননি। কিন্তু আসলে পুরাণ তো পুরাণই। আমি যখন ‘সোলেমান পয়গম্বরের দেয়াল’, ‘স্বপ্নযাত্রা কিংবা উদ্বাস্তুপুরাণ’, ‘বিশ্বাসের আগুন’, ‘যখন বদলে যায় অভিশাপের ভাষা’ গল্পগুলি লিখলাম, আমার সমকালীন লেখক এবং সম্পাদকরা ভয় পাচ্ছিলেন। তবে সুখের বিষয় হচ্ছে যেহেতু মোল্লা-মৌলানারা সাহিত্য পড়ে না, তাই তাদের নজরে আসেনি। আর সরকারের লোকেরাও সেটাই পড়ে, যে লেখা সম্পর্কে তাদের কাছে কেউ নালিশ জানায়। কেউ নালিশ করেনি।

আর এখন তো আমার পথ ধরে অনেকেই লিখছেন। তাই বিষয়টির নতুন করে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠার সুযোগ বোধহয় এখন নেই। আমি তো পুরাণ হুবহু ব্যবহার করি না। তার পুনর্নবায়ন ঘটাই। বর্তমানের কোনো বিশ্বাস বা ঘটনাকে নতুনভাবে দেখানোর জন্য পুরাণকে ব্যবহার করি। আর ইতিহাস নিয়ে লিখি কারণ আমাদের ইতিহাস এখনো অপূর্ণাঙ্গ। বিজয়ীদের লেখা ইতিহাস। মানে তাদেরই গুণকীর্তন। তাদেরই মহৎ করে দেখানো। কিন্তু পরাজিতদের যুদ্ধ বা লড়াই যে ন্যায়যুদ্ধ ছিল, সেটি তুলে ধরা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়।

মানিকলাল সাহা :   ‘স্বপ্নযাত্রা কিংবা উদ্বাস্তুপুরাণ’ (১৯৮৮) এবং ‘বিশ্বাসের আগুন’ (২০০০)। গ্রন্থদুটির প্রকাশকালের ব্যবধান প্রায় ১২ বছর। 

জাকির তালুকদার : প্রথম বইয়ের রেশ পাঠক-সমালোচক, এমনকি আমার মধ্যেও অনেকদিন ধরে বাহিত হচ্ছিল। নতুন গল্প লিখছিলাম। সেগুলো পত্র-পত্রিকায় ছাপাও হচ্ছিল। কিন্তু কেন জানি না, নতুন বই করার তেমন কোনো আগ্রহ পাচ্ছিলাম না। তাছাড়াও একটি ব্যাপার ছিল। প্রথম বই নিজের টাকায় ছেপেছিলাম। পরে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম নিজের টাকায় আর বই করব না। আবার কোনো প্রকাশকের সাথে যোগাযোগ তো দূরের কথা, চিন-পরিচয়ও ছিল না। তবু জেদ, কোনো প্রকাশক সম্মানের সাথে যোগাযোগ করে বইয়ের পাণ্ডুলিপি চাইলে তবেই পরবর্তী বই বের হবে। সেই অপেক্ষাতেই মাঝখানে কেটে গেল এতগুলো বছর। 

মানিকলাল সাহা :   ‘সত্যকাম’, ‘টানাবাবা’ গল্পে আপনি গল্পের প্রচলিত আঙ্গিক থেকে সরে এসেছেন। গল্পের আঙ্গিক সম্পর্কে আপনার অভিমত জানতে চাচ্ছি। 

জাকির তালুকদার : আঙ্গিকের ব্যাপারে আমি ফ্রেডারিক এঙ্গেলস-এর কথা মেনে চলি। যথার্থ বিষয় প্রকাশের জন্য যথার্থ ভাষা ও আঙ্গিক দান করতে পারাই হচ্ছে সার্থক শিল্পসৃষ্টি। গল্পে নিরীক্ষার নামে অনেকেই ভাষা, আঙ্গিক নিয়ে অনেক ধরনের উদ্ভটত্ব করেছেন। আপনিও জানেন যে সেগুলো শিল্প হিসাবে টেকেনি। অনেকে নিজেকে ঘোষণা দিয়ে নিরীক্ষাধর্মী লেখক বলেন। আমি এই বিষয় নিয়ে ভাবিই নি কখনো। গল্প লিখতে শুরু করেছি। কিছুটা লেখার পরে মনে হলো ভাষাটি ঠিক আমার গল্পের সাথে খাপ খাচ্ছে না। তখন সেটুকু ফেলে দিয়ে নতুন ভাবে লিখতে শুরু করি। অনেক গল্প পুরোটা লিখেও ফেলে দিয়ে আবার নতুন করে লিখেছি। ‘টানাবাবা’ গল্পের ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে। সেটিতে একটি গল্পের মধ্যে অনেকগুলো গল্প। সেই আলাদা আলাদা গল্পগুলিকে এক আধারে আঁটানোর জন্য, এবং সেগুলোকে শেষে একসাথে মিলিয়ে দেবার জন্য যে আঙ্গিকের দরকার ছিল, সেটাই খুঁজে বের করতে হয়েছে আমাকে। খাটুনি হয়েছিল খুব!

মানিকলাল সাহা :  গল্প না উপন্যাস কী লিখতে আপনার বেশি ভালোলাগে? এই ভালোলাগার কারণ কী?

জাকির তালুকদার : উপন্যাসের কারণে আমার নাম ছড়িয়েছে বেশি। কিন্তু আমি মূলত গল্পলেখক। উপন্যাস লিখতে ভালোবাসি না তা নয়। কিন্তু গল্প লেখা আমার কাছে অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং মনে হয়। একটাও বাড়তি শব্দ থাকতে পারবে না, ইঙ্গিতে কথা বোঝাতে হবে মাঝে মাঝে, চরিত্রগুলোর মুখ থেকে কথার ফুলঝুড়ি ছোটানো যাবে না, ন্যারেশনের পদ্ধতি গতানুগতিক হওয়া চলবে না, ক্লিশে শব্দ ব্যবহার করা চলবে না, গদ্যের মধ্যে প্রয়োজনে ছন্দ-কবিতা-গানের সুর আনতে হবে, আবার প্রয়োজনে সমস্ত সুর-ছন্দ ভেঙে ফেলতে হবে।

গল্পের সাথে এই দ্বৈরথ আমি উপভোগ করি।


 

তারা//

সম্পর্কিত বিষয়:

আরো পড়ুন  



সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়