ঢাকা     বৃহস্পতিবার   ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ||  ফাল্গুন ১৭ ১৪৩০

মণিপুরী মহারাস লীলা কাল, কমলগঞ্জের সর্বত্র উৎসবের আমেজ

|| রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১২:০৩, ৭ নভেম্বর ২০২২  
মণিপুরী মহারাস লীলা কাল, কমলগঞ্জের সর্বত্র উৎসবের আমেজ

বৃহত্তর সিলেটের এক অনন্য ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক প্রান্তিক জনগোষ্ঠী হচ্ছে মণিপুরি। এদের বিরাট সংখ্যক লোকই সনাতন ধর্মের অনুসারী। সনাতন ধর্মাবলম্বী মণিপুরিদের বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব ‘মহারাস লীলা’।

প্রতি বছর কার্তিকের পূর্ণিমা তিথিতে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার মাধবপুর জোড়া মণ্ডপে এবং আদমপুর সানাঠাকুর মণ্ডপে এ উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। 

পূর্ণিমার দিন সকালে পাপমোচন ও পূণ্য লাভের আশায় সনাতন ধর্মাবলম্বীরা দলে দলে পূজা-অর্চনা পাঠ ও পুণ্যস্নান করেন। মণিপুরি সনাতনধর্মের একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের উৎসব হলেও দিনে দিনে রাসউৎসব হয়ে উঠছে সর্বজনীন উৎসব।

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার মাধবপুর ও আদমপুরের মণিপুরী অধ্যুষিত গ্রামের পাড়ায় পাড়ায় এখন রাস উৎসবের রং। মণ্ডপে মণ্ডপে চলছে রং করানোর কাজ। এলাকার হাওয়ায় সুর বাজছে এই রাস উৎসবের। 

আগামীকাল মঙ্গলবার (৮ নভেম্বর) তুমুল হৈচৈ, আনন্দ-উৎসাহে ঢাক-ঢোল, খোল-করতাল আর শঙ্খ ধ্বনির মধ্যদিয়ে হিন্দুধর্মের অবতার পুরুষ শ্রীকৃষ্ণ ও তার সখি রাধার লীলাকে ঘিরে জমে উঠবে রাস উৎসব। এই দিন দুপুরে উৎসবস্থল মাধবপুরের শিববাজার উন্মুক্ত মঞ্চ প্রাঙ্গণে হবে গোষ্ঠলীলা বা রাখাল নৃত্য। রাতে জোড় মণ্ডপে হবে রাসের মূল প্রাণ মহারাস লীলা। 

আর তাই মণিপুরী পল্লীর বাড়ির উঠোনে ছেলেমেয়েরা নাচছে। নাচের প্রশিক্ষণ চলছে। প্রশিক্ষক দেখিয়ে দিচ্ছেন নাচের ভঙ্গিসমূহ। কোনো জায়গায় চলছে রাসনৃত্যের মহড়া। কোনো জায়গায় রাখালনৃত্যের। এগুলো এখন শেষ সময়ের প্রস্তুতি। নৃত্যকে নিখুঁত করার ঘঁষামাজার শেষ পর্যায়ে। 

রাস উৎসবে মণিপুরী সম্প্রদায়ের পাশাপাশি অন্যান্য জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে অন্যরাও মেতে উঠবেন একদিনের এই আনন্দ ধামাকায়। মহারাত্রির আনন্দের পরশ পেতে আসা হাজার হাজার নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর, কবি-সাহিত্যিক, সাংবাদিক, দেশি-বিদেশি পর্যটক, বরেণ্য জ্ঞানী-গুণী লোকজনসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠবে মাধবপুর ও আদমপুরের মণ্ডপ প্রাঙ্গণ। 

মাধবপুর ও আদমপুরের মণ্ডপগুলো সাজানো হয়েছে সাদা কাগজের নকশার নিপুণ কারুকাজে। করা হয়েছে আলোকসজ্জাও। সেখানে মণিপুরী শিশু নৃত্যশিল্পীদের সুনিপুণ নৃত্যাভিনয় রাতভর মনমুগ্ধ করে রাখবে লাখো ভক্ত ও দর্শনার্থীদের। মণিপুরী পল্লীর এ উৎসবে দেশের বিভিন্ন স্থানসহ ভারত থেকেও মণিপুরী সম্প্রদায়ের লোকজনসহ জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে অনেকেই ছুটে আসেন মহারাস লীলা অনুষ্ঠান উপভোগের জন্য। 

এবার মাধবপুর জোড় মণ্ডপে ১৮০তম রাস উৎসব। মাধবপুরের রাসমেলার আয়োজক হচ্ছে মণিপুরী মহারাস লীলা সেবা সংঘ। মণিপুরী বিষ্ণুপ্রিয়া সম্প্রদায়। উৎসবস্থল মাধবপুরের শিববাজার উন্মুক্ত মঞ্চ প্রাঙ্গণে হবে গোষ্ঠলীলা বা রাখাল নৃত্য। 

অন্যদিকে ১৯৮৬ সাল থেকে কমলগঞ্জের আদমপুরে মণিপুরী মৈতৈ সম্প্রদায় আয়োজন করছে পৃথক রাসমেলার। এখানে এবার ৪০তম উৎসব। এখানেও থাকবে যথারীতি রাখাল নৃত্য ও রাসলীলা। তবে মণিপুরী বিষ্ণুপ্রিয়া ও মণিপুরী মৈতৈ এরা আলাদা স্থানে আয়োজন করলেও উৎসবের অন্ত:স্রোত, রসের কথা, আনন্দ-প্রার্থণা সবই এক। উৎসবের ভেতরের কথা হচ্ছে বিশ্বশান্তি, সম্প্রীতি ও সত্যসুন্দর মানবপ্রেম।

মাধবপুর মণিপুরী মহারাসলীলা সেবা সংঘের সাধারণ সম্পাদক শ্যাম সিংহ এবং আদমপুর মহারাস উদযাপন কমিটির অন্যতম নেতা ইবুংহাল সিংহ শ্যামল বলেন, রাস উৎসবকে সফল করতে প্রায় মাস খানেক ধরে ছয়টি বাড়িতে রাসনৃত্য এবং রাখালনৃত্যের প্রশিক্ষণ ও মহড়া চলছে। ৩ টিতে রাসনৃত্য ও ৩ টিতে রাখাল নৃত্য। মাধবপুরে ৩ টি জোড় মণ্ডপের আওতায় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। একেকটি মণ্ডপে আছেন একজন পুরোহিত। সেই পুরোহিতের পরামর্শে একজন প্রশিক্ষক ধর্মীয় বিধিবিধান মতো গোপী বা শিল্পীদের প্রশিক্ষণ দেন। গোপীবেশী শিল্পীদের বয়স ১৬ থেকে ২২ বছর। শুধুমাত্র রাধার বয়স ৫ থেকে ৬ বছর। নৃত্যের প্রতিটি দলে ন্যূনতম ১২ জন অংশ নিয়ে থাকে। একইভাবে রাখাল নৃত্যেরও প্রতিটি দলে ২০ থেকে ২২ জন ১৪ থেকে ১৫ বছর বয়সী বালক অংশ নিয়ে থাকে। 

মাধবপুর ও আদমপুরে রাসমেলার আয়োজকরা জানিয়েছেন, মহারাস লীলার মূল উপস্থাপনা শুরু হবে সকাল ১১টা থেকে ‘গোষ্ঠলীলা বা রাখালনৃত্য’ দিয়ে। গোষ্ঠলীলায় রাখাল সাজে কৃষ্ণের বালকবেলাকে উপস্থাপন করা হবে। এতে থাকবে কৃষ্ণের সখ্য ও বাৎসল্য রসের বিবরণ। গোধূলি পর্যন্ত চলবে রাখালনৃত্য। রাত ১১টা থেকে পরিবেশিত হবে মধুর রসের নৃত্য বা শ্রীশ্রীকৃষ্ণের মহারাসলীলানুসরণ। রাসনৃত্য ভোর (ব্রাহ্ম মুহূর্ত) পর্যন্ত চলবে। রাসনৃত্যে গোপিনীদের সাথে কৃষ্ণের মধুরলীলার কথা, গানে ও সুরে ফুটিয়ে তুলবেন শিল্পীরা।

কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার সিফাত উদ্দিন ও কমলগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ সঞ্জয় চক্রবর্তী বলেন, আয়োজকদের সঙ্গে কথা বলে নিরাপত্তার জন্য দুই স্থানেই যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অনুণ্ঠানের নিরাপত্তায় পুলিশের তিন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। 

হামিদ/টিপু

আরো পড়ুন  



সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়